
বাদশাহ সালমান – শেখ হাসিনা বৈঠকে ঢাকা – রিয়াদ সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্য
রূপসী বাংলা ঢাকা ডেস্ক রিপোর্ট: সৌদি আরবের বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বুধবার স্থানীয় সময় দুপুরে রিয়াদের রাজকীয় প্রাসাদে শেখ হাসিনার সঙ্গে বাদশাহ সালমানের বৈঠক হয়। পরে তারা মধ্যাহ্ন ভোজে অংশ নেন। বৈঠকে ঢাকা-রিয়াদ সহযোগিতা জোরদারে ঐকমত্য প্রকাশ করেন দুই নেতা। বিশেষ করে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিকদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, শ্রমিক কল্যাণ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং মুসলিম উম্মাহর বৃহত্তর ঐক্য ও সমৃদ্ধি নিয়েও আলোচনা হয়।
সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের সঙ্গে বৈঠকের পর রিয়াদে বাংলাদেশ দূতাবাসের নতুন ভবনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা বলেন, সৌদি আরবের সঙ্গে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক। খুব ভালো আলোচনা হয়েছে। সৌদি বাদশাহকে সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। বাদশাহ বলেছেন, তিনি বাংলাদেশে আসবেন।
বুধবার সকালে রিয়াদে কিং সৌদ প্যালেসে সৌদি আরবের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠকে সৌদি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, কৌশলগত অবস্থান, আঞ্চলিক সংযোগ, বিদেশি বিনিয়োগ ও গ্লোবাল আউটসোর্সিংয়ের জন্য বাংলাদেশকে একটি উদীয়মান কেন্দ্রে পরিণত করছে। বাংলাদেশে পূর্ণাঙ্গভাবে চলমান ৮টি শতভাগ রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র রয়েছে।
অনুষ্ঠানে কাউন্সিল অব সৌদি চেম্বারের (সিএসসি) নেতৃবৃন্দ, রিয়াদ চেম্বার অব কমার্সের নেতৃবৃন্দ ও বাংলাদেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদলের সদস্যরা ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ সম্পর্কে বিশদভাবে তুলে ধরেন। বাংলাদেশ ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে অসাধারণ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সাধারণ বিশ্বাস, সংস্কৃতি, মান এবং আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দু’দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ এক বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে বলে তথ্য দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সুযোগগুলোকে পুরোপুরি কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশে ২৫টি প্রকল্পে ৫ বিলিয়ন ডলার সৌদি বিনিয়োগের কথা মনে করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মূলত কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, বস্ত্র ও পোশাক, চামড়া, পেট্রো-রাসায়নিক, প্রকৌশল ও সেবা খাতে সৌদি বিনিয়োগ আসছে।
২০১৮ সালের মার্চে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পন করার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে আমরা উন্নয়নশীল দেশ হব এবং ২০৪১ সালের মধ্যে আমরা উন্নত দেশ হব। আগামি বছরে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ হবে বলে আশার কথা শোনান প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, ২০০৮-০৯ সাল থেকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৯ গুণ বেড়ে ২০১৮ সালে ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরকে দ্রুততর করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর তৈরি পোশাক রফতানিকারক দেশ। গত অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৬৫১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রফতানি করেছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখন সবজি উৎপাদনে তৃতীয় বৃহত্তম, ধান উৎপাদনে চতুর্থ বৃহত্তম এবং মৎস্য উৎপাদনকারী বিশ্বে তৃতীয় বৃহত্তম উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া ওষুধ শিল্প বাংলাদেশের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর মধ্যে একটি। এই খাত থেকে স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে এবং প্রায় ১২৫টি দেশে রফতানি হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ এখন বাস্তবতা। ইন্টারনেটভিত্তিক পাবলিক সার্ভিস ডেলিভারি ব্যাপক অবদানের জন্য তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় দ্রুত ও সহজে সেবা দেয়ার জন্য আমরা তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো তৈরি করেছি। দেশে ১৫ কোটিরও বেশি সিম ব্যবহার এবং ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের সংখ্যা ৯ কোটি ছাড়িয়ে গেছে বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষপণের কথাও বলেন তিনি। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২০ হাজার মেগাওয়াটে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ শুরু করার পর আমরা পরমাণু শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে এক ধাপ এগিয়ে চলেছি।
এ সময় সিএসসির চেয়ারম্যান সামি এ আলাবাদি, সিএসসির মহাসচিব সৌদ এ আলমাসারি এবং বাংলাদেশে সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ এইচ এম আল-মুতাইরি উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী এএইচ মাহমুদ আলী, শেখ হাসিনার বেসরকারি খাত বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বিডার চেয়ারম্যান কাজী মো. আমিনুল হক, পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহও উপস্থিত ছিলেন।
সৌদি বাদশাহর আমন্ত্রণে চার দিনের সফরে মঙ্গলবার সৌদি আরব পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার এই সফরে সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী মক্কায় ওমরাহ পালন করবেন। সফর শেষে শুক্রবার তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে।



