Uncategorized

মা…আমি আর আসব না

মৌসুমী প্রামাণিক মৌসান

 

-হ্যালো, মা শুনছো…ঘুমিয়ে পড়লে?

-না রে। তোর সঙ্গে কথা না বলে কোনদিন ঘুমিয়েছি, সোনা? আজ কি শুনবি, বল? গান? না কি গল্প?

-তাতেও ঘুম আসবে না মা।

-অনেক রাত হল যে! তুই না ঘুমোলে আমাকেও জেগে থাকতে হয়, বাবু!

-তুমি বুঝি জানতে পার, আমি জেগে না ঘুমিয়ে?

-পারব না! দেখতে না পেলেও তোকে অনুভব করতে পারি তো!

-কিভাবে? আমি তোমাকে খুব বিরক্ত করি, তাই না মা?

-তা বৈকি! লাথি খেয়ে ব্যাথায় ককিয়ে উঠি; তবুও দিন গুনছি, এক এক করে, কবে তোকে দেখতে পাব! কোলে নিয়ে আদর করব!

-যদি না আসি?

-অমন কথা বলিস না, সোনা। দিনরাত তোকে নিয়ে কত স্বপ্ন দেখি; সব ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে যে!

-ভয় লাগছে মা!

-কিসের ভয়?

-সুস্থ, স্বাভাবিক, নিরাপদ জীবন কি আমাকে দিতে পারবে তোমরা? সম্ভব?

-আঁচল দিয়ে ঢেকে রাখব তোকে! জীবন দিয়ে আগলে রাখব তোকে!

-তুমিই কি নিরাপদে আছ মা? সারা জগতটাই তো অশান্ত আজ!

-তুই আমার ঘরে, আমার বাংলায় জন্মগ্রহণ করবি সোনা। ভয় কি?

-যেখানে মৃত্যু নিয়ে রাজনীতি হয় সেখানে? আমাকেও নোংরা রাজনীতির স্বীকার হতে হয় যদি?

-তবে কোথায় যাবি বল? দিল্লী? তোর মামার বাড়িতে?

-তোমার যুবতী মেয়ে ধর্ষিতা হলে সহ্য করতে পারবে তো?

-মুম্বাই যাবি সোনা? কাকাই থাকেন সেখানে।

-মা তোমার সাংবাদিক মেয়েকে খুন হতে হবে, দেখে নিও।

-তবে পাহাড়ে চল। আমি হিমালয়কে বড্ডো ভালোবাসি।

-কাশ্মিরে জঙ্গি হানা, উত্তর-পূর্বে চীনের হুমকি, হিমালয়বাসী সুখে নেই মা!

-দক্ষিনভারতে কোনও অশান্তি নেই! যাবি?

-সেদিনের কথা ভুলে গেলে, যেদিন তামিল জঙ্গির হাতে খুন হয়েছিলেন দেশের হবু প্রধানমন্ত্রী?

-না , ভুলি নি বাবা, সে এক কলঙ্কিত অধ্যায়!

-অশান্তি, অসহিষ্ণুতায় ভরা তোমার ভারতবর্ষ!

-তবুও সে আমার দেশ, আমার মাতৃভূমি।

-যেভাবে বেকারত্ব বাড়ছে, ভাইয়ে ভাইয়ে সংঘর্ষ বাড়ছে, তোমার দেশকে আপন করে নিতে পারব তো, মা?

-তবে চল মা, আমরা এ দেশ ছেড়ে বিদেশে যাই। ওখানে আরামের জীবন, আবহাওয়া দূষন মুক্ত।

-কোথায় যাবার কথা বলছ, বল তো?

-কেন? লন্ডন, প্যারিস, আমেরিকা!

-প্রতি তিনমাসে যেখানে একটি করে জঙ্গীহানা হয়? কঠিন নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও যেখানে টুইন টাওয়ার ভেঙে পড়ে!

-আচ্ছা, পিরামিডের দেশে যাবি? কাকাবাবুর মিশর রহস্য তোকে শুনিয়েছি না? যাবি? যাবি সোনা? শুনেছি, সে দেশ নাকি বেশ শান্ত!

-শান্ত ছিল, আজ আর নেই। তোমার সঙ্গে আমিও যে খবরটা শুনলাম!

-হ্যাঁ। অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। জঙ্গিহানায় সাড়ে তিনশ’র বেশি মানুষ নিহত!

-কি নৃশংস মাগো! তোমাদের পৃথিবীর লোকেরা! নামাজ পড়ার সময়ে নিজের ভাইদের শরীরের রক্ত ঝরাতে তারা দ্বিধা বোধ করে না!

-কি করা যাবে, বল? লক্ষ-কোটি মানুষ এইভাবেই তো বেঁচে আছে, সোনা!

-জীবন্ত লাশ হয়ে, যন্ত্রচালিত কারখানার অংশ হয়ে? কোনও অনুযোগ নেই! কোনও প্রতিবাদ নেই!

-এই তো জীবন!

-এই জীবন আমি চাই না, মামনি!

-তবে?

-আমি যেখান থেকে এসেছি, সেখানে আমায় ফেরৎ পাঠিয়ে দাও!

-সে ক্ষমতা কি আমার আছে? জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে, তিন বিধাতা নিয়ে!

-বিধাতার হাতে আর কিছুই নেই মা, তিনিও আজ অসহায়! জন্ম ডাক্তারদের হাতে, মৃত্যু সন্ত্রাসবাদীদের হাতে, আর বিয়ে? কি জানি কার হাতে? একজন মুসলিম মেয়ে যদি হিন্দু ছেলেকে ভালোবেসে বিয়ে করতে চায়, একজন হিন্দু মেয়ে যদি গরিব, মেহনতি মুসলমানকে বিয়ে করতে চায়, তখন ভাগ্য বিধাতা কে হয় মা?

-কিছু অসহিষ্ণু মানুষ!

-তারপরও তুমি আমায় জন্ম নিতে বলছ?

-সত্যিই তো ।এই অশান্ত, দূষিত, দুর্গন্ধ পৃথিবী তোর বাসযোগ্য নয়! তুই ফিরে যা মা, ফিরেই যা!

তুমি আমার মা, জানতাম ঠিক, যে তুমি আমায় ভুল বুঝবে না।

-যেখানেই থাকিস্, ভাল থাকিস্ সোনা! তোকে এই পৃথিবীর আলো দেখাতে পারব না, এ আমার লজ্জা!

-হতাশ আমিও! তাই তো আমি আসতে চাই না। মা! আমায় ক্ষমা করে দাও। আমি আর আসব না!

কোলকাতা থেকে

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension