Uncategorized

শান্তি-সম্প্রীতির আলো ছড়ায় মাতৃভাষাজ্ঞান

বাঁধন আরেং

মাতৃভাষা মানুষের চেতনাকে আলোকিত করে। দেহমনের সঙ্গে যুক্ত ভাষা অন্তরে শক্তি জোগায়। ভাববিনিময়ে আনন্দ ও স্বতঃস্ফূর্ততা দেয়। এভাবেই মাতৃভাষা চিরন্তন আবেদন সৃষ্টি করে। এটি একটি মৌলিক মানবাধিকারও বটে। তবে মানুষ থাকলেই ভাষা থাকে, মানুষ না থাকলে ভাষা থাকে না। তাই মানুষ এবং মাতৃভাষার গুরুত্ব ও মর্যাদা অভিন্ন। এ কারণেই মাতৃভাষা নিয়ে ভাবতে হয়।

ইউনেস্কো ফ্রান্সের প্যারিসে এবং জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ নিউইয়র্কের সদর দফতর থেকে ১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ সালকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়েছে।

এরই আলোকে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে নানা ভাষার মানুষ বছরজুড়ে কর্মসূচি পালনের উদ্যোগ নিচ্ছে। বাংলাদেশেও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষায় শিক্ষা কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও ভাষা রক্ষায় কর্মরত সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাষাবর্ষ উদযাপনে সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। এর আগে ২০১৬ সালে জাতিসংঘের আদিবাসীবিষয়ক স্থায়ী ফোরামের সুপারিশের ভিত্তিতে সাধারণ পরিষদ ২০১৯ সালকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

ইউনেস্কোর সূত্রমতে পৃথিবীতে বর্তমানে প্রায় ৭০০০ ভাষা রয়েছে। এর বেশির ভাগই বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ব্যবহৃত এবং ভাবনা থেকে জাত ভাষা। বলা হয়ে থাকে, এসব ভাষা ও সংস্কৃতি পৃথিবীর বৃহত্তর অংশের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব করে।

তবে ২৬৮০টি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার হুমকির মধ্যে রয়েছে। বলা হয়, ঝুঁকির মধ্যে থাকা সংশ্লিষ্ট ভাষা ব্যবহারকারীদের সংস্কৃতি ও জ্ঞানব্যবস্থা চিরদিনের জন্য বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। অন্যদিকে বিশ্বের অনেক আদিবাসী জাতি নিজ নিজ দেশে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উভয় দিক দিয়ে পেছনে পড়ে রয়েছে। অনেক ভাষার মানুষ অন্য ভাষার জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিশে হারিয়ে যাচ্ছে।

অনেকেই সংগ্রাম করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। শিক্ষায় অনগ্রসরতা, দারিদ্র্য, নিরক্ষরতা, অভিবাসন অথবা নানা ধরনের বৈষম্য এবং নির্মম মানবাধিকার লঙ্ঘনজনিত কারণে মানুষ ও ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আদিবাসী জাতিগুলো কেবল পরিবেশ ও প্রতিবেশের অভিভাবকই নয়, তাদের ভাষাগুলো একটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জ্ঞানচর্চা এবং বাচনিক ব্যবস্থাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

পৃথিবীর ৯০টি দেশে ৩৭০ মিলিয়ন বিভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ৫ হাজার সংস্কৃতি বিশ্বকে বর্ণময় করে রেখেছে। হাজার বছর ধরে তাদের স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, প্রথা ও মূল্যবোধ, লালনপালন জাতীয় উন্নয়ন, শান্তি স্থাপন ও জাতি গঠনে অবদান রাখে। তাদের ভাষা-সংস্কৃতির অস্তিত্ব যদি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, তাহলে পুরো বিশ্ব সাংস্কৃতিক সংকটে পড়তে পারে।

বিভিন্ন সূত্রমতে, বাংলাদেশে বাংলাসহ ৪০টি ভাষা রয়েছে। অতএব আমাদের দেশ বহু সংস্কৃতি, ভাষা, সমাজ, চেতনা ও মূল্যবোধের একটি দেশ। তবে এদেশের আদিবাসীদের ভাষা-সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক, সামাজিক অবস্থাও ভালো নেই।

ভাষা জ্ঞানচর্চার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যবস্থা, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা, টেকসই উন্নয়ন সাধন, বিনিয়োগ এবং বন্ধুত্ব প্রতিষ্ঠা করা যায়। মাতৃভাষা সর্বজনীন মানবাধিকারসহ আদিবাসীদের অধিকার ও স্বাধীনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম। সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, আন্তর্জাতিক কাজে আদিবাসী মানুষের সমান অংশগ্রহণ ও অবদান রাখার প্রশ্নে তাদের মাতৃভাষার প্রয়োজন।

কারণ সব দৃষ্টিভঙ্গির মানুষের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বৈচিত্র্যময়তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রসারিত হয়। মাতৃভাষাই একমাত্র শক্তি, যা মানুষের অন্তর স্পর্শ করে সবকিছুকে বুঝিয়ে দিতে পারে। মানুষ যখন নিজের চাহিদা বুঝতে পারে, তখনই চিন্তা করে, কল্পনা করে আগামী দিনের জন্য। অনুভূতি জাগ্রত হলেই চিন্তা গতিশীল হতে পারে।

চেতনা সজাগ থাকলেই মানুষ নীতি-নৈতিকতার বিষয় অনুধাবন করতে পারে। দেশ ও মানুষের কল্যাণ নিয়ে ভাবে। অন্তরের এসব ক্ষমতা ও তাড়না প্রকাশ পায় মাতৃভাষার মাধ্যমে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষ ঘোষণায় জ্ঞানচর্চা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সৃষ্টিশীলতা কার্যকর এবং অনুকূল পরিবেশ ও সুযোগ সৃষ্টি, সব ভাষাকে মানসম্মতভাবে সমন্বিত করার বিষয়গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ, আদিবাসী ভাষা টিকে থাকার প্রতিবন্ধকতা দূর করা, গুড গভর্নেন্স এবং শান্তি প্রতিষ্ঠা বিষয়গুলো আদিবাসী ভাষাবর্ষ ঘোষণার লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে। ভাষা সুরক্ষার সঙ্গে জীবনমান উন্নয়ন, সক্ষমতা অর্জনে সহযোগিতা সম্প্রসারণ, আন্তঃসাংস্কৃতিক সংলাপ শক্তিশালী এবং ভাষাবিষয়ক ভাবনা আরও জোরালো করার কথাও বলা হয়েছে।

ভাষা রক্ষা ও উন্নয়নে পরিকল্পনা, কৌশল এবং পদ্ধতি কার্যকরভাবে প্রয়োগে সংশ্লিষ্ট সবার দক্ষতা অর্জন এবং অর্থপূর্ণ অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ঐতিহাসিকভাবে সুদীর্ঘকালের অবহেলা, বঞ্চনা, নির্যাতন, অজ্ঞতা সবকিছুর প্রশমন ঘটানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান, আদিবাসী বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, অধিকার, উন্নয়ন, নারী ও যুব কর্মীদের দায়িত্ব অপরিহার্য।

কারণ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা বিস্তারে নারী ও তরুণদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার মাধ্যমেই মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ হয়। সবকিছু ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও পরিকল্পনা করা হয় ভাষা দিয়েই।

জাতীয় পরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতি স্বাচ্ছন্দ্যে প্রকাশ করা যায়। কারণ ভাষার ওপর ভর করেই শিক্ষা ও মানবাধিকার রক্ষাসহ সমাজের সব কাজ ও ব্যক্তির নামকরণ হয়ে থাকে। কমিউনিটির ইতিহাস, প্রথা, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, চিন্তার অনন্য রূপ ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। এ কারণেই মানবাধিকার রক্ষা, সুশাসন, শান্তি ভাবনা ও টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচিতে মাতৃভাষার প্রয়োজন অপরিহার্য।

মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে অনুধাবন করে। সে কারণেই রাষ্ট্রভাষা বাংলা ছাড়াও আরও পাঁচটি ভাষার শিশুদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভের ব্যবস্থা সরকারিভাবে করা হচ্ছে।

প্রথম ধাপে গারো, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ও সাদরি ভাষার শিশুর শিক্ষা উপকরণ তৈরির কাজ চলছে। এভাবে দেশের আরও অন্য ভাষার শিশুর শিক্ষা উপকরণও তৈরি করার কথা রয়েছে। কোমলমতি শিশু যাতে নিজ নিজ মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ করে শৈশব থেকেই দেশপ্রেম, মানবিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধে বেড়ে উঠতে পারে, সে লক্ষ্যে সরকার এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।

যুগ যুগ ধরে আদিবাসী ভাষার মানুষ স্থানীয় পর্যায়ে বহুমাত্রিক জ্ঞান ও সংস্কৃতি তিলে তিলে গড়ে তোলে। তারা বিলুপ্ত হয়ে গেলে মহামূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদের ভাণ্ডার শূন্য হয়ে যেতে পারে। এতে বৃহত্তর সমাজ সমৃদ্ধ ভাষা-সংস্কৃতির বৈচিত্র্যময়তা থেকে বঞ্চিত হবে। পূর্বপুরুষরা পৃথিবীর প্রাকৃতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং মানবিক উন্নয়নে অবদান রেখে গিয়েছিল। বড় বিষয় যে, সেসবের বিলুপ্তির সঙ্গে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট ভাষা-সংস্কৃতির মানুষ হারিয়ে যাবে। এই শূন্যতার প্রভাব পড়বে বিশ্বের বৃহত্তর সমাজের পরবর্তী প্রজন্মের ওপর।

এ কারণেই জাতিসংঘ আদিবাসী মানুষের ভাষা রক্ষার ত্বরিত কর্মসূচি গ্রহণ করে বাস্তবায়নে প্রণোদনার কাজ করার পুরো একটি বছর বেছে নিয়েছে। আদিবাসীরা সারা বিশ্বে ও নিজ দেশে নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে সহাবস্থান করে জীবনযাপনের চেষ্টা করে। অনেকেই পরিবার ও কমিউনিটিতে স্বাধীনভাবে চর্চা ও ব্যবহার করে নিজস্ব ভাষা রক্ষার বিষয় বলে থাকেন। কিন্তু এ বাস্তবতা সব ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয় না এবং ভাষা রক্ষায় এটি যথেষ্ট হতে পারে না।

২০১৯ সালকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষাবর্ষ হিসেবে উদযাপনের মধ্য দিয়ে হয়তো আদিবাসী ভাষাগুলো রক্ষা পাবে। ভাষা ব্যবহারকারীদের জীবনমান উন্নয়ন প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত হবে। আদিবাসী জাতিগুলোর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘের ঘোষণা এবং স্থায়িত্বশীল উন্নয়ন ঘোষণার ২০৩০-এর নির্ধারিত উদ্দেশ্যগুলো অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। জাতিগুলোর ভাষা বিকাশ ও সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক নির্ধারিত কর্মকৌশল ও পদ্ধতিগুলোকেও সুদৃঢ় করবে এবং সেসব বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে।

বলা যায়, আদিবাসী ভাষাবর্ষ ঘোষণা জ্ঞান, শান্তি ও সম্প্রীতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। ভাষা সুরক্ষার পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে পুনরুজ্জীবন, প্রণোদনা, উদ্যোগ গ্রহণ মানবাধিকার ও টেকসই উন্নয়নের পক্ষে হাজারও কণ্ঠস্বর জাগিয়ে তোলার প্রয়াস।

লেখক: লেখক ও গবেষক।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension