
মূল লেখাঃ ইকবাল বাহার

ইংরেজি থেকে অনুবাদঃ মুবিন খান
প্লেটো বলেছিলেন, ‘জীবনকে এমনভাবে যাপন করতে হবে যেন জীবন শুধুই একটা রঙ্গমঞ্চ।
আপনি যদি বইয়ের দোকানে যান এবং ‘মধ্যাকর্ষণ’ বিষয়ক বই খোঁজাখুঁজি করেন তাহলে হয়ত সে বিষয়ে চার পাঁচটি বই পেয়ে যেতে পারেন। যদি ‘নক্ষত্র’ বিষয়টির ওপর বই খোঁজেন, তাহলে সম্ভবত আট দশটি বই পেয়ে যাবেন। কিন্তু আপনি যদি ‘চেতনা’ বিষয়ক বই খুঁজতে যান, তাহলে দেখবেন শেলফের পর শেলফ, শেলফের পর শেলফ শুধু চেতনা বিষয়ক বই থরে থরে সাজানো রয়েছে। এর মানে হল, আমরা এই বিষয়ে কিছুই জানি না। কেননা আপনি যখন কোন একটা বিষয়ে জেনে গেলেন, তখনই আপনার সে বিষয়ক কৌতুহলটা মিটে গেল। ওই বিষয়ের আর কোন বইপত্রে আপনার আগ্রহ জাগবে না। আপনি তখন পরবর্তী সমস্যা নিয়ে আগ্রহী হবেন।
আমার কাছে আরেকটি রহস্যজনক বিষয় হল প্রণোদনা বিষয়ক বইপত্র আর এ সম্পর্কিত সভা সেমিনারগুলো। কেন কেউ অন্য কারও মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হতে চাইবে! অনুপ্রেরণা তো নিজের ভেতর থেকে আসতে হবে, আপনার কি সেটা মনে হয় না? এখন আসুন এই বিষয়টাকে একটু তুলে রেখে আমাদের দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দিকে একটু দৃষ্টি দেই।
পাঁচ বছর বয়স থেকে শুরু। পাঁচ বছর বয়সেই আমরা আমাদের সন্তানদের কোচিং সেন্টার পাঠাই নার্সারি ভর্তি কোচিং করতে। অতঃপর হাই স্কুলের পড়া শেষ হলে আবারও কলেজ ভর্তি কোচিং। তারপর বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, মেডিকেল ভর্তি কোচিং, ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিং… তালিকা করলে এই তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতেই থাকবে।
বর্তমানে শিক্ষাকে এমনই একটি পণ্য করে ফেলা হয়েছে যে, যার সামর্থ্য আছে চাইলেই তিনি এটি কিনে ফেলতে পারেন। অবস্থা এখন এমন দাঁড়িয়েছে যে পরিক্ষার প্রস্তুতি আসলে ছাত্রছাত্রীরা নিচ্ছে না, নিচ্ছে তাদের বাবা মায়েরা।
ভর্তি পরিক্ষা কেন্দ্রের বাইরে বাবা মায়েরা যখন অপেক্ষা করেন তখন তাদের দেখে মনে হয়, দুঃশ্চিন্তার পারদ যেন পরিক্ষা কেন্দ্রের ছাদ ফুঁড়ে তার সকল চাপ নিয়ে ছেলেমেয়েদের বাবা মায়ের ওপর পড়েছে।
আমাদের সেই পুরনো দিনগুলো কোথায় হারিয়ে গেল যখন আমরা বোর্ড পরিক্ষার মাত্র তিন মাস আগে কোচিং করতে যেতাম? আমাদের সেই চমৎকার দিনগুলো কোথায় হারালো যখন বাবা মায়েদের আমাদের কলেজ ভর্তি নিয়ে দুঃচিন্তা করতে হত না? আমাদের সেই দিনগুলো কোথায় হারালো যখন আমাদের লেখাপড়ার সময় ছিল সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা?
কোথায় গেল সেই দিনগুলো যখন বাবা মায়েরা আমরা ক্লাসের সেরা ছাত্র নই কিনা সেটা নিয়ে ভাবিত হতেন না?
কোথায় হারালো সেইদিনগুলো যখন আমরা ফুটবল খেলতে গিয়ে পা ভেঙে ফেললে বাবা মা সেটাকে তেমন পাত্তা দিতেন না? কি করে হারালো সেইদিনগুলো যখন বাবা মাকে আমাদের টিউশন ফি মেটাতে পারিবারের প্রয়োজনীয় খরচাপাতি সঙ্কুচিত করতে হত না?
কোথায় গেল সেইদিনগুলো যখন আমাদের শিক্ষকের মর্যাদা ছিল ঈশ্বরের মত? এখনকার ষাট লক্ষ টাকার দামের স্যান্টা ফে চড়ে বেড়ানো শিক্ষকদের মাঝে আমাদের পুরনো দিনের হেঁটে স্কুলে যাওয়া শিক্ষকেরা এখন কোথায়? এই যে আমাদের প্রজন্মরা, আমরা কি মানুষ হই নি?
নাকি আমরা আটলান্টিস শহরের ইতিহাসের মতই হারিয়ে গিয়েছি?
শিশুদের বইপত্রর ওজন যখন তাদের নিজেদের শরীরের ওজন থেকে বেশি হয়, যখন শিশুদের খেলাধূলা করতে পারার মত কোন বন্ধু থাকে না, যখন শিশুদের বাবা মায়েদের সময় থাকে না তাদের সঙ্গে কথা বলবার, যখন ট্যাব, আইফোন হয়ে ওঠে শিশুদের একমাত্র বিনোদন- এই যখন বাস্তবতা, তখন আপনি এই শিশুদের কাছ থেকে কি আশা করতে পারেন?
এইরকম অদ্ভুত একটা পদ্ধতিতে, পরিবেশে আমাদের শিশুরা বেড়ে উঠছে, মানুষের মতন নয়, রোবটের মতন। আর রোবট নিজেকে নিজে অনুপ্রাণিত করতে পারে না। ঠিক এইভাবেই আমরা শিশুদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিয়েছি, যার ফলে এখনকার শিশুরা অনুপ্রাণিত হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ঠিক এই কারণেই তাদেরকে অনুপ্রাণিত হতে, তাদের চেতনাকে জাগ্রত করতে অন্য কারও লেখা ‘চেতনা বিষয়ক বই’ পাঠ করতে হয়। এই পুরো ব্যাপারটাই কৃত্রিম। এই পুরো ব্যাপারটিই প্লাস্টিকের মতই কৃত্রিম।
এখন এই প্রক্রিয়ার কঠোর পরিবর্তনের সময় এসেছে। আমরা যদি এইসব প্রক্রিয়ার পরিবর্তনে, প্রতিরোধে ব্যর্থ হই তাহলে আমাদের তরুণ প্রজন্মর মেরুদন্ড বেঁকে যাবে এবং তারা সাম্রাজ্যবাদী প্রভুর ইচ্ছার সামনে নতজানু হয়ে থাকবে।
এখন মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হল, এই সকল কিছুর জন্যে আসলে দায়টা কার? কাকে দোষী বলবেন? এর উত্তর খুঁজতে কিন্তু আপনারে খুব একটা গভীরে যেতে হবে না। শুধু আপনার ঘরে যে আয়নাটা আছে, সে আয়নাটার সামনে গিয়ে দাঁড়ান।
ইকবাল বাহারঃ কলামিস্ট



