
একজন কবি-কে হত্যা করো না, যদি করো—পৃথিবী ধ্বংস
হয়ে যেতে পারে তাহার কবিতার আঘাতে; সবুজ পাতায়
ভরে যেতে পারে কালো অন্ধকার; শ্বেত বলাকারা বংশ
বিস্তার বন্ধ করে হতাশায় উড়ে যাবে সুদূর অজানায়।
প্রবল প্রতাপশালী সময়ের মুখ শাশ্বত শোকে এবং
বিবেকের বিস্ফোরণে ফিরে যাবে অতীতের পথে; দরজায়
কড়া নাড়ে যদি হারানো হোমার—অগণিত বছরের জং
ধরা বর্ষার ব্যথা আবার আসিবে ফিরে কালের কবিতায়।
একজন কবি-কে হত্যা করো না, যদি করো—নিভে যেতে পারে
পূর্ণিমায় পৃথিবীর প্রেম; নাগরিক নিদারুণ নীরবতা
ভেঙে যাবে প্রতিবাদের ধ্রুপদী গর্জনে, তখন কারাগারে
কাহাদের ছায়া, কাহাদের জানাবে আগত দিনের বারতা?
একটি কবিতা হত্যার প্রতিবাদে অবরুদ্ধ আবেগ যদি
ফেটে পড়ে, যদি নিষিদ্ধ করে দাও কবিতার সত্য-ভাষণ—
পৃথিবীতে হবে না আর গোলাপের চাষ, কামনার কৌমুদী
কেঁদে কেঁদে কবিতার কাছে ভিক্ষা চেয়ে নেবে স্বেচ্ছা-নির্বাসন।
একজন কবি-কে হত্যা করো না, যদি করো—ফসলের ক্ষেতে
জন্ম নেবে দুর্ভিক্ষর দাহ, শ্মশানের শোকে অরণ্য হারাবে
সবুজের সমারোহ; রাতের নিস্তব্ধতার মাঝে কান পেতে
কেটে যাবে পাষাণ-প্রহর; নিরাশায় নিরুদ্দেশে চলে যাবে
নক্ষত্রের দল; পাঠশালায় পাঠ নেবে কালি ও কলমের
ক্ষোভ, শিশু ভুলে যাবে মায়ের আঁচল, প্রেমিকার মনে
বয়ে যাবে রক্তের নদী; ভ্রমরার ভালোবাসায় শরমের
সুখ ভুলে যাবে পুষ্প-পরাগ—প্রেম পরিণত হবে প্রহসনে।
একজন কবি-কে হত্যা করো না, যদি করো—কবিতার কালো
অক্ষরগুলো অভিশাপের অনল জ্বেলে দেবে সিংহাসনে;
কারণ, অক্ষরগুলো ধারণ করে দ্রোহের দাবানল; ভালো
হবে, যদি কবি-কে আসন দাও হৃদয়ের গহীন গহনে।
ক্ষমতা ক্ষয়ে যাবে, অন্ধকারে ডুবে যাবে ইতিহাসের চাকা,
মাটির মাঝে ঘুমিয়ে আছে অতীত দিনের পানের পেয়ালা;
শূন্যতার শোকার্ত সভায়, সময়ের ধূসর পাতায় আঁকা
আছে যে ছবি—সে তো ছবি নয়, কবি’র সাথে কবিতার খেলা।
একজন কবি-কে হত্যা করো না, যদি করো—কালের সাহসী
সন্তানেরা রুখে দেবে পথ—বধ্যভূমির অন্তিম আয়োজনে
যদি ভেবে থাকো, ভীত আজ কবি! তবে ভুল, কবিতার হাসি
দেখ কবি’র ললাটে—সিংহ কি ভয় পায় নগ্ন নিবিড় বনে?
অতএব, কবি-কে হত্যা করো না তোমরা—পাখি-কে নীলাকাশে
উড়তে দাও, গাইতে দাও সময়ের গান, যেতে দাও দূরে;
বাংলার মাটি, বাংলার কোলাহল, আর যদি ভালবাসে
বাংলার বুক—প্রিয় পাখি পথ খুঁজে নেবে, পথে ঘুরে ঘুরে।



