
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বাতিলে সফল হবেন কি ট্রাম্প?
রূপসী বাংলা আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ বলে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার নিয়ম বাতিল করতে চাইছেন। তবে তার এ পরিকল্পনায় বাধ সেধেছেন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পল রায়ান।
দেড়শ বছরের পুরোনো এই নাগরিকত্ব নীতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে জন্মগ্রহণ করলেই সে দেশটির নাগরিকত্ব পাবে।
তবে ট্রাম্প বলছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন, এমন যে কেউ এসে সন্তান জন্ম দিলেই সেই সন্তান নিজেকে মার্কিন নাগরিক বলে দাবি করতে পারে। এই নিয়ম অত্যন্ত হাস্যকর, এটি বন্ধ হওয়া উচিত।’
এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য হচ্ছে, তার আইন বিশেষজ্ঞরা তাকে নিশ্চিত করেছেন যে, এ নিয়ম বাতিলে তেমন কোনো সংশোধনীর প্রয়োজন নেই। নির্বাহী আদেশের মাধ্যমেই এটা করা সম্ভব।
প্রেসিডেন্ট তার একক ক্ষমতাবলে এমন পদক্ষেপ নিতে পারেন কি না? জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের কারণে অবৈধ অভিবাসীরা বিশেষ কোনো সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে কিনা?
ট্রাম্পের বক্তব্যের কারণে এখন যুক্তরাষ্ট্রে এসব প্রশ্ন নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শাসনতন্ত্রে ১৪তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই নাগরিকত্বের বিষয়টি নিশ্চিত করা আছে। এই সংশোধনীর প্রথম বাক্যতেই বলা আছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী সকল ব্যক্তিই দেশটির নাগরিক হবে। সে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে যেখানেই বসবাস করুক, সেটা বিবেচ্য বিষয় নয়।’
অভিবাসন নিয়ে কট্টরপন্থীরা বলছেন, এই ব্যবস্থা অবৈধ অভিবাসনের জন্য ‘চুম্বক’ হিসেবে কাজ করে থাকে এবং সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য গর্ভবতী নারীদের সীমান্ত অতিক্রম করে যুক্তরাষ্ট্র আসতে উৎসাহিত করছে।
ট্রাম্প বলেছেন, এ দেশে জন্ম নেয়া শিশুটি ৮৫ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র্রের সব সুবিধা ভোগ করবে, এটা বন্ধ হতে হবে।
২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, শতকরা ৬০ ভাগ আমেরিকান জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের সুযোগ রাখার পক্ষে রয়েছে। আর এই সুযোগ বাতিলের পক্ষে আছে মাত্র ৩৭ শতাংশ আমেরিকান।
কিভাবে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছিল?
গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ১৮৬৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে চতুর্দশ সংশোধনী আনা হয়েছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়েছিল ১৮৬৫ সালে। সেই সংশোধনীর মাধ্যমে দাসত্ব প্রথা বিলুপ্ত করা হয়েছিল। এরপর চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে আমেরিকায় জন্ম নেয়া সাবেক ক্রীতদাসদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করা হয়েছিল।
১৮৫৭ সালে একটি ঘটনায় সুপ্র্রিমকোর্ট সিদ্ধান্ত দিয়েছিল, আফ্রিকান আমেরিকানরা কখনও আমেরিকার নাগরিক হতে পারে না। কিন্তু এরপর চতুর্দশ সংশোধনী তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করে।
১৮৯৮ সালে সুপ্র্রিমকোর্ট একটি মামলায় নিশ্চিত করে যে,অভিবাসীদের শিশুদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে।
চীনা বাবা-মা আমেরিকায় সন্তান জন্ম দিয়েছিলেন। ওয়াং কিম আর্ক নামের সেই শিশু ২৪ বছর বয়সে চীনে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তিনি ফেরার সময় তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়। তখন ওয়াং যুক্তি দেন, তিনি আমেরিকায় জন্ম নিয়েছেন।
চতুর্দশ সংশোধনীতে যে অধিকার আছে, সেখানে তার বাবা-মায়ের অভিবাসন অবস্থা কোনো প্রভাব ফেলে না। এই যুক্তি দিয়ে তিনি সফল হয়েছিলেন।
ইমিগ্রেশন হিস্ট্রি রিসার্চ সেন্টারের পরিচালক ইরিকা লী লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এবং ওয়াং কিম আর্কের মধ্যে তখন যে আইনি লড়াই হয়েছে, সেখানে এই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী সবাই দেশটির নাগরিক হবে। তখন থেকে আদালত আর কখনও এ নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি।
ট্রাম্প কি এই ব্যবস্থা বাতিল করতে পারেন?
আইন বিশেষজ্ঞদের বেশিরভাগই মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের অধিকার বাতিল করতে পারেন না।
ভার্জিনিয়া আইন স্কুলের অধ্যাপক এবং সংবিধান বিশেষজ্ঞ কৃষ্ণ প্রকাশ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এমন কিছু করছেন, যা অনেক মানুষকে আঘাত করবে। তবে শেষপর্যন্ত বিষয়টি আদালতে যাবে এবং আদালতই সিদ্ধান্ত দেবে বলে তিনি মনে করেন।
এতে ট্রাম্পের কি রাজনীতি আছে?
যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর কয়েকদিন বাকি আছে। সে সময় এমন পদক্ষেপের পিছনে রাজনৈতিক স্বার্থ আছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।
অনেকের অভিযোগ, নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ নিয়ে ট্রাম্প নিজের সমর্থকদের চাঙা করতে চাইছেন।
একই ভাবনা থেকে সোমবার মেক্সিকো সীমান্তে ৫০০০ সৈন্য পাঠানোর কথা ঘোষণা করেছে হোয়াইট হাউজ।
দক্ষিণ আমেরিকার তিনটি দেশ থেকে মেক্সিকো হয়ে কয়েক হাজার অবধৈ অভিবাসীর যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ঠেকাতে এই সৈন্য পাঠানোর ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা



