
সাহিত্য
মান্টো, একজন ক্ষণজন্মা গল্প-বলিয়ে
গ্রন্থনা: আনিসুজ্জামান মুহাম্মদ
সাদাত হাসান মান্টো। উপমহাদেশের নন্দিত লেখক। উর্দু সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ছোটগল্পকার। জন্ম ১৯১২ সালের ১১ মে। পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার সামরালায়। মধ্যবিত্ত এক কাশ্মিরি পরিবারে। রাষ্ট্র, ধর্মবাদী থেকে প্রগতিশীল—সবাই একযোগে সাদত হাসান মান্টোকে খারিজ করে দিলেও তিনি গল্পকার হিসেবে নিজের অবস্থান জানতেন। মৃত্যুর এক বছর আগে লেখা নিজের এপিটাফে তিনি বলে গেছেন, ‘এখানে সমাধিতলে শুয়ে আছে মান্টো এবং তাঁর বুকে সমাহিত হয়ে আছে গল্প বলার সব কৌশল আর রহস্য।’ কখনেও ফতোয়া এসেছে, অশ্লীলতার জন্য মামলা হয়েছে ছয়বার, বন্ধুরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু মান্টোর চারপাশে বয়ে চলা জীবনের প্রতি আকর্ষণ আর তাঁর কলম কেউ থামাতে পারে নি।
মাত্র সাত বছর বয়সে জালিয়ানওয়ালাবাগের গণহত্যার পটভূমিতে লেখেন তার প্রথম গল্প ‘তামাশা।’ পুলিশের ভয়ে ছদ্মনামে লিখেছিলেন। ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিবাদীদের দলে ভিড়তেও রাজনীতিসচেতন এ নবীন কিশোরের সময় লাগে নি। কিন্তু প্রগতি লেখক সংঘের ছকে-বাঁধা সাহিত্য, ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের নৃশংসতা ফুুটিয়ে তোলার ছাঁচে-ঢালা রোমান্টিক সমাজবাস্তবতায় আটকে থাকেন নি। সমাজের নিচুতলা অর্থাৎ পানওয়ালা, দোকানদার, ড্রাইভার, ধোপা, দালাল, বেশ্যা ও অসংগঠিত শ্রমজীবীদের পাশাপাশি ওপরতলার গ্লানি ও পাপ, রিরংসা ও নিঃস্বার্থতার মিশ্র জীবনই তাকে আকৃষ্ট করত বেশি। তাঁকে উপমহাদেশের দাঙ্গা ও দেশভাগের শ্রেষ্ঠ কথাকার বললে কেউ আপত্তি করবে না। দেশভাগের যন্ত্রণা, ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, দাঙ্গার আতঙ্ক, সাম্প্রদায়িকতার বিষাক্ত বিদ্বেষ এত নিপুণ দরদে তাঁর মতো করে আর কে চিত্রিত করতে পেরেছেন?
বেঁচেছেন মাত্র ৪৩ বছর। কিন্তু লিখে গেছেন কী প্রবল উদ্যমে! ২২টি ছোটগল্পের সংকলন, ১টা উপন্যাস, রেডিও নাটকের ৭টা সংগ্রহ, ৩টা প্রবন্ধ সংকলন আর ২টা চেনা মানুষদের স্মৃতিকথা! তাঁর লেখা সিনেমার চিত্রনাট্যগুলো এক করে ছাপানো হয়েছে বলে জানা যায় না। এগুলোর একটা উল্লেখযোগ্য অংশ লিখেছেন দুই দানবের জন্য—মদ আর সংসার।
তবে এসবের মধ্যে তিনি ভারত ভাগের ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আজও শুনিয়ে যাচ্ছেন রক্ত হিম করা গল্প। গল্পগুলো শোনাচ্ছেন সেই দেশগুলোতে, যেখানে ইতিহাস হিসাব করে অবহেলা করা হয়, যে দেশগুলোতে বর্তমানের শাসন অনুযায়ী অতীতও পাল্টে যায়। এই ইতিহাস প্রকল্পের সামনে মান্টো একটা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। বেঁচে থাকতে তিনি যেমন অনেকের কাছে অস্বস্তিকর ছিলেন, মরে গিয়ে ঝাঁজ আরও বেড়েছে। সাময়িক কর্তার খায়েশ অনুযায়ী বদলে যাওয়া ইতিহাসের আসল পাঠ নিতে গেলে মান্টোর তুলনা নেই; বিশেষ করে, যে ইতিহাস এমন অস্বস্তিকর, অনিশ্চিত আর বিপজ্জনক বর্তমান তৈরি করেছে। মান্টো নিজে সে কথা জানতেন।
সে জন্য তখন যা ঘটেছে, মান্টো তাতে কোনো পক্ষাবলম্বন না করে কেবল লিখে রেখে গেছেন। তাতে কোনো তত্ত্ব বিশ্লেষণ নেই, কোনো বেদনাবোধও নেই যেন। মান্টো যেন ১৯৪৭ সালের দাঙ্গার চলমান ছবি তুলে রাখছেন কাগজে আর কলমে! এমন নিস্পৃহ কিন্তু নির্মম কাজ কেন করলেন মান্টো? মানুষের মন আর কদর্যতার বহু মাত্রা তুলে আনতে মান্টোর কোনো জুড়ি নেই। তিনি দেখেছেন যে বর্তমান যখন অতীত হয়, তখন সবকিছু কেমন প্রয়োজনমতো বদলে দেওয়া হয়। তাই কি তিনি কেবল যা ঘটেছে, তার অবিকল ফটোগ্রাফমাত্র রেখে গেছেন, তাতে কোনো পক্ষের, ঘৃণার বা সহমর্মিতার কোনও রং না লাগিয়ে? অতীত যখন পাল্টে যাওয়ার নিরন্তর হুমকির মুখে থাকে, তখন মান্টোর এই ছবি মারাত্মক হয়ে হাজির হতে পারে কারও কারও জন্য।এমন এক মানবিক বিপর্যয়ের পর সিয়াহ হাশিয়ে লেখার সময় মান্টো নিজেই-বা কোথায়, কেমন আছেন? তিনি তখন বোম্বে (মুম্বাই) ছেড়ে লাহোর পাড়ি দিতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁর ভালোবাসার বোম্বের সিনেমাজগৎ, তাঁর বন্ধু আর চেনা মুখগুলো সহসা অচেনা হয়ে যাওয়ার শহর ছেড়ে তিনি যেন নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছেন। লাহোরের সিনেমাজগৎ তখন সবে বুঝতে শুরু করেছে যে তার সামনে বিশাল সম্ভাবনা। কিন্তু তা বাস্তব হয়ে উঠতে অনেক দেরি। মান্টো তত দিনে প্রগতিশীল ঘরানা থেকে ধর্মবাদী আর রাষ্ট্র—সবার সমান চক্ষুশূল। সংসার চালানোর টাকা জোগাড় করা কঠিন হচ্ছে দিন দিন। প্রিয় বন্ধু ইসমত চুগতাইয়ের কাছে তিনটি চিঠিতে মান্টো বলছেন—কোনোভাবে আমাকে ফেরত নিয়ে যাও, এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।
মদের প্রতি আকর্ষণ ছিল আগেও। এই পরবাসে এসে বন্ধু আর সহায়হীন হয়ে তা হয়ে গেল নেশা। বুদ্ধিমান লেখকেরা তখন সরকারের কাছ থেকে বাড়ি, ব্যবসা ইত্যাদি বরাদ্দ নিয়ে নিচ্ছেন। এতটা বাস্তববুদ্ধি মান্টোর কোনকালেই ছিল না। একমাত্র অবলম্বন পত্রিকায় লিখে রোজগার। তাও কি সহজ? কোনও কিছুই তখনও বোঝা যাচ্ছে না। ইংরেজ সরকারের আমলের অশ্লীলতার অভিযোগে করা মামলা নতুন দেশের সরকার উঠিয়ে নেয় নি। আমৃত্যু সেই বোঝা তাঁকে বইতে হয়েছে। তাঁর লেখা ছাপতে পত্রিকার সম্পাদক ভয় পান, কখন পত্রিকা বন্ধের খাঁড়া নেমে আসে, কে জানে!
বিকেল হলেই বেরিয়ে পড়েন মান্টো। পত্রিকা অফিসে গিয়ে নাছোড়বান্দার মতো টাকা চান, পরে লিখে শোধ করে দেবেন। এমন হিসাবে তো পত্রিকা চলে না। সম্পাদক কাগজ-কলম এগিয়ে দিয়ে বলেন—মান্টো সাহেব, কিছু একটা লিখে দিন। মদ আর বাজার খরচের টাকার জন্য দুশ্চিন্তিত লেখক সদ্য দেখা দাঙ্গার গল্প লিখে দেন কাঁপা কাঁপা হাতে। সেই গল্প কখনও কেবল এক লাইন, বেশি হলে পৃষ্ঠা দেড়েক। এভাবে লেখা ৩২টা গল্প নিয়ে ১৯৪৮ সালে বের হয় সিয়াহ হাশিয়ে, মানে কালো সীমানা। এই নাম দ্ব্যর্থবোধক। এক অর্থে কালো সীমান্ত, নতুন দেশের বর্ডার, মান্টো যাকে কালোই বলতেন; আরেক অর্থ হলো, পত্রিকায় কোনও শোকসংবাদ বা দুঃখের সংবাদ যে কালো বর্ডারে ছাপা হয়, সেই কালো সীমানা।
এই বই মান্টো আর প্রগতিশীল লেখক সংঘের মধ্যে বিচ্ছেদেরও কারণ হলো। মান্টো এই বইয়ের ভূমিকা লিখতে দিলেন হাসান আসকারিকে। আসকারি নতুন পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে দায়িত্ব পেয়েছিলেন নতুন রাষ্ট্রের পরিচয় কী হবে, সে ব্যাপারে পরামর্শ দেওয়ার। তিনি ছিলেন লেখক সংঘের সাহিত্য দৃষ্টিভঙ্গির বিরোধী। লেখক সংঘের ঘনিষ্ঠ বন্ধু সরদার জাফরি, আহমদ নাদিম কাসমি মান্টোকে অনুরোধ করলেন আসকারিকে দিয়ে ভূমিকা না লেখাতে। মান্টো চুপ রইলেন। আসকারির ভূমিকাসহই বই বের হলো। প্রগতিশীল লেখক সংঘের সঙ্গে মান্টোর বিচ্ছেদ চূড়ান্ত হয়ে গেল। মান্টো বন্ধুহীন হয়ে পড়লেন। বন্ধু বলতে রইল তারা, যারা তাঁকে সস্তা মদ জোগাড় করে দেয়, যারা তাঁর মৃত্যু এগিয়ে নিয়ে এসেছিল।
দেশভাগের প্রতিদিনের বাস্তবতা, তার আতঙ্ক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ছাপিয়ে আমাদের আজকের চেতনা আর অবচেতনায় সমানভাবে হানা দেয়। সমকালে রামুতে পোড়া মন্দিরের ছাইয়ের মধ্যে স্মিত হাসির বুদ্ধ, গুজরাটের দাঙ্গা, পাকিস্তানের শিয়া মহল্লায় নির্বিচার আগুন বা খ্রিষ্টানদের প্রার্থনার সময় নির্বিচার গুলিবর্ষণ মান্টোকে বারবার ফিরিয়ে আনে। কিন্তু তিনি আজ সহজে কোনও শরীর খুঁজে পান না, যে শরীর মাত্র ৪৩ বছর বয়সে নিজেকে উজাড় করে দেওয়ার সাহস রাখবে।

১৯৪৮ সাল থেকে তিনি লাহোরবাসী। সেখানে মাত্র সাত বছর বেঁচেছিলেন। এই সামান্য সময়ে তাঁর লেখক-জীবনের সর্বোত্তম ফসল ফলিয়েছেন। লিখেছেন ‘ঠাণ্ডা গোস্ত’, ‘খোল দো’, ‘টোবা টেক সিং’ এবং আরও অনেক নানা ধরনের লেখা। লিভারের সিরোসিস রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৫৫ সালের ১৮ জানুয়ারি এক প্রচণ্ড শীতের দিনে তার মৃত্যু হয়। এ স্বল্প জীবৎকালে মান্টো হয়ে উঠেছিলেন ভারত-পাকিস্তানের শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প লেখক।
ক্ষণজন্মা এই কথাসাহিত্যিক ভারত ভাগের নির্মম শিকার। জীবদ্দশায় মান্টো হিন্দুস্তান পাকিস্তান দুই রাষ্ট্রেই নিগৃহীত হয়েছেন, ’৪৭-এর আগে তিনবার গেছেন হিন্দুস্তানের কাঠগড়ায়, আর ’৪৭-এর পরে তিনবার গেছেন পাকিস্তানের কাঠগড়ায়। ১৯৫০ সালে মান্টো স্বভাবসিদ্ধভাবে লেখেন, ‘একদিন হয়ত পাকিস্তান সরকার আমার কফিনে একটা মেডেলও পরিয়ে দেবে। সেটাই হবে আমার চরম অপমান।’ পাক সরকার ঠিক সেটাই করেছে। ২০১২ সালের ১৪ আগস্ট আজাদি দিবসে সাদাত হাসান মান্টোকে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান নিশান-ই-ইমতিয়াজ প্রদান করে।
তিনি তার ‘এপিটাফে’ লিখে গিয়েছিলেন, ‘এই সমাধিতে টন টন মাটির তলায় শুয়ে আছে সেই ছোটগল্পকার, যে ভাবছে খোদা, নাকি সে নিজে, কে বেশি ভালো গল্পকার!’ মৌলবাদীদের হামলার ভয়ে মান্টোর পরিবার তার সমাধিতে এটা খোদাই করার সাহস পায় নি।



