প্রধান খবরভারত

আসামে মুসলিমদের বিরুদ্ধে যেভাবে ঘৃণা ছড়ানো হচ্ছে

রূপসী বাংলা কলকাতা ডেস্ক: আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) হালনাগাদ করার সময়ে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ফেসবুকে ব্যাপক ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য প্রমাণ সহকারে এই অভিযোগ করেছে ‘আওয়াজ’ নামের অনলাইন অ্যাক্টিভিজিমের একটি ওয়েবসাইট ।

তারা বলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের গণহত্যার আগে যে ধরণের ঘৃণা ছড়ানো হয়েছিল আসামে এন আর সি চলাকালে যেসব হেট স্পিচ ছড়ানো হয়েছিল সেগুলির মধ্যে বেশ মিল রয়েছে। আসামে ঘৃণা আর বিদ্বেষ ছড়ানো ওইসব ফেসবুক পোস্ট বিশ্লেষণ করে ‘আওয়াজ’ জানিয়েছে, সেগুলি সর্বমোট ৫৪ লক্ষ বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় এক লক্ষবার শেয়ার করা হয়েছে।

বাংলাভাষীরাই ওইসব বিদ্বেষমূলক পোস্টের লক্ষ্যবস্তু ছিল মুসলমানরা। তখন সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে ব্যাপকহারে গালিগালাজ করা হয়েছে ওইসব পোস্টে।

‘মেগাফোন ফর হেট’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে অনলাইন অ্যাক্টিভিজমের ওয়েবসাইট আওয়াজ বলছে, জাতীয় নাগরিক পঞ্জির প্রক্রিয়া চলাকালীন আসামের বাংলাভাষীদের বিশেষ করে বাংলাভাষী মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়াতে গিয়ে তাদের ‘অপরাধী’, ‘ধর্ষক’, ‘সন্ত্রাসী’, ‘শুকর’,‘কুকুর’ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করা হয়েছিল।

প্রসঙ্গত, নিউইয়র্ক ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আওয়াজ মূলত অনলাইন অ্যাক্টিভিজম করে থাকে সারা পৃথিবী জুড়ে। জলবায়ু পরিবর্তন, মানবাধিকার, পশু-অধিকার, দুর্নীতি, দারিদ্র আর সংঘাতের মতো বিষয়গুলিতেই তারা মনোনিবেশ করে থাকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আর সবচেয়ে প্রভাবশালী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট নেটওয়ার্কটি।

যেভাবে ঘৃণামূলক ওইসব পোস্ট খুঁজে পেয়েছে আওয়াজ

তাদের প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে, ‘বেশ কিছু শব্দ আগে থেকেই ঠিক করে নেওয়া হয়েছিল যেমন ‘মিঞা’, ‘বহিরাগত’,‘অবৈধ নাগরিক’এবং ‘অ-অসমীয়া’। এর পরে আসামের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও পেজগুলিকে খুঁজে বার করা হয় এবং ওইসব শব্দগুলি রয়েছে এমন পোস্ট আর কমেন্ট চিহ্নিত করা হয় একটি একটি করে। এর জন্য ক্রাউডট্যাঙ্গল নামের সামাজিক মাধ্যমে নজরদারির যে ওয়েবসাইট আছে, তার সাহায্যও নেওয়া হয়েছিল।

১০২টি ফেসবুক পেজ আর প্রোফাইলে ৮০০টি পোস্ট চিহ্নিত করা গিয়েছিল যেখানে এন আর সি এবং আসাম নিয়ে কিছু লেখা ছিল। ওই ৮০০ পোস্টের মধ্যে ২৬.৫ % পোস্ট ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড অনুযায়ী হেট স্পীচ বা ঘৃণা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে করা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছে ‘আওয়াজ’।

বাংলাভাষী মুসলমানদের গালিগালাজ

আওয়াজ আরও বলেছে যে ধরণের ঘৃণামূলক পোস্ট তারা খুঁজে পেয়েছে আসলে হয়তো সেটি হিমশৈল চূড়া মাত্র। কারণ তারা শুধু ফেসবুকেই নজর দিয়েছিল আর সেইসব পোস্ট খুঁজেছে, যেখানে এন আর সি আর আসামের সম্বন্ধে লেখা হয়েছিল। শুধু যে ফেসবুকে পোস্ট করেই বাংলাভাষী মুসলমানদের গালাগালি করা হয়েছে, এমন নয়।

অনেকদিন ধরেই আসামে বসবাসকারী বাংলাভাষীদের অভিযোগ যে বাংলা কথা বলতে শুনলেই অনেকে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ বলে কটু মন্তব্য করে থাকেন। এর সঙ্গে যদি কাউকে টুপি, দাড়িসহ দেখা যায়, তাহলে ঘৃণার পরিমাণটা বেড়ে যায়।

এন আর সি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে থেকেই এই কটূক্তি চলে আসছে বলে আসামের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ বিবিসিকে জানিয়েছেন। এন আর সি প্রক্রিয়া নিয়ে খুব সক্রিয় থেকেছেন, এমন একজন বরপেটা জেলার শাহজাহান আলি।

তিনি বিবিসিকে বলছিলেন ফেসবুকের বাইরেও দৈনন্দিন জীবনে তারা কীভাবে ঘৃণার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠেন। এন আর সি শুরু হওয়ার আগে থেকেই মিঞা, বাংলাদেশি এসব বলে ঘৃণা ছড়ানো হয়ে আসছে। সবসময় আসামের বাংলা ভাষাভাষি আর ধর্মীয় সংখ্যালঘুদেরই টার্গেট করা হয়ে থাকে।

পরিচিত রাজনৈতিক নেতারাও বাইরে নয়

আওয়াজ বেশ কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরেছে তাদের প্রতিবেদনে এটা বোঝাতে যে ঠিক কী ধরণের পোস্ট ফেসবুকে করা হয়েছিল। ওইসব পোস্টগুলি যারা করেছিলেন, তাদের মধ্যে পরিচিতি রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন বলে আওয়াজ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রাক্তন আলফা নেতা এবং বিজেপির আইরপ্রণেতাও রয়েছেন।

ওইসব মন্তব্যগুলি নিয়ে এন আর সি প্রক্রিয়া চলাকালীনই বিতর্ক দেখা দিয়েছিল।

যাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের কয়েকজনের সাথে অনেকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায় নি। আওয়াজ আরও কিছু ফেসবুক পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, যেগুলো কারা পোস্ট করেছেন, সেই পরিচয় গোপন রেখেছে তারা।

কয়েকটি ঘৃণামূলক পোস্টের উদাহরণ

শুধু ফেসবুকের পোস্টগুলিকে বিশ্লেষণ করেই ক্ষান্ত হয়নি আওয়াজ। ঘৃণামূলক পোস্টে যেসব কমেন্ট পড়েছে সেগুলির দিকেও তাদের নজর গেছে। আওয়াজ সেরকম কয়েকটি উদাহরণও দিয়েছে।

এক ফেসবুক ব্যবহারকারী একটি ঘৃণামূলক পোস্টের কমেন্টে লিখেছেন, ‘হয় মারব নয় মরব। এক হাজার যুবক তৈরি আছে। স্যার, দয়া করে কিছু করুন।’

আরেকটি কমেন্ট ছিল এরকম: ‘অস্ত্র তুলে নেওয়া ছাড়া কোনও উপায় নেই। রাতের মধ্যেই সব সেরে ফেলতে হবে।’

তৃতীয় একজনের বক্তব্য, ‘এখনই নদীর ধারে ওদের বাড়িগুলো জ্বালিয়ে দেওয়া যায়।’

আওয়াজ বলছে, তারা বেশ কিছু পোস্টের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়ে ফেসবুককে রিপোর্ট করেছিল। ঘৃণামূলক কয়েকটি পোস্ট বা পেজ সরিয়েও দিয়েছিল ফেসবুক। কিন্তু তারপরেই দেখা গেছে নতুনভাবে সেইসব পেজ ফিরে এসেছে এবং আবারও সেগুলি থেকে ঘৃণা আর বিদ্বেষমূলক পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে।

৮০র দশকের যে আসাম আন্দোলনের সমাপ্তি ঘটেছিল আসাম চুক্তির মধ্যে দিয়ে আর নাগরিক পঞ্জি হালনাগাদ করা ছিল সেই চুক্তির অংশ।

আসাম আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন বা আসুর প্রধান উপদেষ্টা সমুজ্জ্বল ভট্টাচার্য বলছিলেন, ‘যে সব হেট স্পীচের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো কী আমি দেখি নি, তাই নির্দিষ্টভাবে কোনও মন্তব্য করব না। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক নেতা নিজের নিজের ভোট ব্যাঙ্ক অটুট রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। একপক্ষ বেআইনিভাবে বাংলাদেশ থেকে আসা মুসলমানদের ধরে রাখার চেষ্টা করছে, আরেক পক্ষ বেআইনি বাংলাদেশি হিন্দুদের ভোট ব্যাঙ্ক ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। এছাড়া আবার কিছু মানবাধিকার সংগঠন বেআইনি বাংলাদেশি মুসলমানদের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছে। আসামের মূল নিবাসী বা ভারতের বৈধ নাগরিকদের স্বার্থ রক্ষার কথা কেউ ভাবছে না। আমাদের বরাবরের অবস্থান হল অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে যারা এসেছেন – তিনি হিন্দু হোন বা মুসলমান, তাদের এখান থেকে বার করে দিতেই হবে।’

গণমাধ্যমের একটা অংশও ফেসবুকের পোস্ট অনুসারে খবরের শিরোনাম করে ঘৃণা ছড়ানোয় ইন্ধন জুগিয়েছে বলে বিশ্লেষণ আওয়াজের।

যেসব পোস্ট ফেসবুকের কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ডের নিরিখেই ‘হেট স্পিচ’বলে পরিগণিত হতে পারে, সেরকম পোস্টগুলি মোট ৫৪ লাখবার দেখা হয়েছে আর শেয়ার হয়েছে প্রায় ১ লক্ষ বার।

গুয়াহাটি হাইকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরী বলছিলেন ওইসব পোস্টগুলি আসলে ছিল সুষ্ঠু ভাবে যাতে এন আর সি না হতে পারে, তারই একটা প্রচেষ্টা।

তিনি বলেন, ‘অসমিয়া-বাঙালী বিভেদ লাগানোর জন্য একটা চক্র সবসময়েই কাজ করে যাচ্ছে। বাঙালী হিন্দু, বাঙালী মুসলমানদের মধ্যে একটা বিরোধ লাগিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হচ্ছে বলেই আমার সন্দেহ। সাইবার অপরাধ দমনের জন্য পুলিশের যে বিভাগ আছে, তাদের উচিত এরকম প্রত্যেকটা ঘটনাকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার। তাহলেই আর কেউ এরকম করতে সাহস করবে না।’

আওয়াজ একটি তুলনামূলক তালিকাও দিয়েছে রোহিঙ্গা গণহত্যার আগে কি ধরণের ঘৃণামূলক মন্তব্য ছড়ানো হয়েছিল আর আসামের ক্ষেত্রে কী ঘটেছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension