
গল্প
গল্প: অঙ্গীকার
এক
‘বাপরে! ছেলের বাপের কী নূরানি চেহারা! আর কপালে নামাজের কত্তবড় গাঢ় দাগ! সাথে বোন দুইটাও আসছে কী পর্দানশীল! খুবই পরহেজগার বংশ বাবা! এই যুগে এমন বাড়ীতে মেয়ের বিয়ে দেয়া ভাগ্যের ব্যাপার। খালি ছেলেপক্ষরা এখন রাজী হলেই হয়, তোমার মেয়ের কপালটা খুলে যাবে।’ কথাগুলো বলতে বলতে বড় চাচী রান্নাঘরে ঢুকল।
কাবাবটা ভাজতে ভাজতে মা ও স্বগতোক্তি করল, ‘আল্লাহর হুকুম হলে সবই সম্ভব।’
‘মেয়েরে কইয়ো ভালো করে গায়ে মাথায় কাপড় দিয়া য্যান সামনে যায়।’ বিনে পয়সায় এমন জরুরী একটি উপদেশ দিতে পেরে বেশ একটা গর্বিত ভঙ্গী ফুটে উঠল চাচীজানের চেহারায়।
পাত্রের বাবা হাজী। পা পর্যন্ত লম্বা জোব্বা পরে এসেছেন। এমন পোশাক দেখলে আসলেই বেশি পর্দা-পূর্সিতার ব্যাপারটা মাথায় আসে। মেয়েমানুষের যেন তেনভাবে এসব পোশাকধারীর সামনে যাওয়াটা সত্যিই অস্বস্তিকর।
বাসায় পরা সালোয়ার কামিজটি বদলে বাইরে পরা এক সেট থ্রিপিস পরে নিল রুহিতা। এটার ওড়নাটা সূতি মোটা কাপড়ের এবং বেশ চওড়া। ওড়নাটা মাথায় দিয়ে পিন আটকে নিল যেন চুল বের হয়ে না থাকে। এরপর ডাক পড়ার অপেক্ষায় বসে রইল।
মা ঘরে ঢুকে রুহিতার চোখে পানি দেখে অগ্নিশর্মা হয়ে বলল, ‘কাঁদার কি হলো এখানে?’
মা জানে কান্নার কারণ, তবু প্রশ্নটা কেন করছে রুহিতা জানে না। সে চুপ করে রইল। শোকেস থেকে কিছু প্লেট বাটি নিয়ে মা আবার বেরিয়ে গেল।
একটু পর বাবা ঢুকল। রুহিতা জানে তাকে মাই পাঠিয়েছে, নিশ্চয় এমন কিছু বলে, ‘দেখ গিয়ে তোমার আল্লাদী মেয়ের ন্যাকামি। ভাব দেখে মনে হয় আমরা বড় পাপ করছি তার বিয়ের চেষ্টা করে। ‘
বাবা এসে চুপচাপ রুহিতার পাশে বসল। মৃদুকন্ঠে বলল, ‘ধর্মীয় মূল্যবোধ থাকাটা কিন্তু ভালো মা, ওটা মানুষকে সঠিক পথে রাখে।’
রুহিতার পিত্তি জ্বলে উঠল। বাবা,ভালো করেই জানে, ধর্মের সাথে রুহিতার কোনও বিরোধ নেই। তার সমস্যা পাত্রী পছন্দ করার এই সনাতন পদ্ধতিতে।
‘বাবা, তুমি এখন এ ঘর থেকে যাও।’ বলে রুহিতা চোখ মুছল।
মানুষের নিরীহ আচরণকে এই মুহূর্তে একটা ভয়ানক ক্রাইম মনে হলো রুহিতার। অন্তত কোনও বাবার এতটা নিরীহ হওয়া ঠিক নয় যাতে সে সমাজ, সংসার, স্ত্রী, আত্নীয়-স্বজন ইত্যাদি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সন্তানের সামান্য চাওয়া পূরণ করতে না পারে।
রুহিতার চেহারা, চুল এবং হাত-পা খুঁটিয়ে দেখার পাশাপাশি যোগ্যতাভিত্তিক প্রশ্ন-উত্তরের পর্বও শুরু হলো। প্রশ্নকারী কমিটির প্রধান পাত্রের বাবা। নূরানি চেহারা ঠিক কেমন হয় রুহিতা কল্পনা করার চেষ্টা করল। কিন্তু কেন জানি নূর ধরনের কোনও কিছু ভদ্রলোকের চেহারায় খুঁজে পেল না রুহিতা। হয়ত নূরানি বোঝার ব্যাপারটা এখনও আয়ত্তে আসে নি রুহিতার।
একাডেমিক শিক্ষার বিষয়ে প্রশ্নকারীদের আগ্রহ তেমন একটা লক্ষ করা যাচ্ছে না। শিক্ষাগত যোগ্যতায় বেশ শীর্ষে থাকা একজন পাত্রীর সাথে লেখাপড়া বিষয়ক কোনও আলোচনা নেই! বিষয়টা রুহিতাকে অবাক করল। যাহোক, ধর্মীয় শিক্ষা বিষয়ক প্রথম প্রশ্ন করা হলো, ‘একজন মায়ের তার সন্তানকে সবার প্রথমে কি শিক্ষা দেওয়া উচিত?
‘ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক গুণাবলী শেখানো জরুরি।’
‘যে মানুষের প্রথম ও শেষ কথা কলেমা তাইয়্যেবাহ, সে বিনা হিসেবে জান্নাত পাবে, এই হাদীস টা কি তুমি জানো?’
‘জ্বী জানি। ‘
‘তাহলে বাচ্চার কথা ফুটলে সবার আগেই তাকে কালিমা শেখানোর চেষ্টা করা উচিত – এই উত্তরটাই আসলে তোমার কাছে আশা করছিলাম!’
‘জ্বী। মাফ করবেন! আপনাকে কি আমি কোনও প্রশ্ন করতে পারি?
‘বলো!’
‘আপনার তো তিনটি সন্তান। তাদের প্রত্যেকের শেখা প্রথম কথা কি কালিমা?’
‘না,তা নয়। তখন তো আর আমরা এত সচেতন ছিলাম না। কিন্তু এখনকার যুগে তো ধর্মীয় শিক্ষার অনেক সুযোগ! এখন সবার এসব ব্যাপারে সচেতন হওয়া উচিত। আচ্ছা,আয়াতুল কুরসী জানো তুমি?’
‘জ্বী, জানি।’
‘আমল করো নিয়মিত?’
‘মাঝেমধ্যে পড়ি।’
‘সুরা ইয়াসীন বা আর রহমানের কিছু অংশ না দেখে পড়তে পারবে?’
‘জ্বী,সুরা ইয়াসীন পারব।’
‘কতটুকু পারবে?’
‘সম্পূর্ণ পারব।’
‘মাশআল্লাহ!’
‘ইসলামে পর্দার সঠিক বিধান সম্পর্কে জানো?’
‘জ্বী,জানি।’
‘কোনও একটি সুরার নাম বলতে পারবে, যেখানে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে?’
‘জ্বী, সুরা আহযাবে পর্দার বিধান সম্পর্কে বর্ণিত রয়েছে!’
‘সেভাবে মেনে চল কি?
‘জ্বী না, সম্পূর্ণভাবে মানা হয় না।’
‘সম্পূর্ণভাবেই মেনে চলতে হবে। যে পুরুষের কন্যা বা স্ত্রী বিনা পর্দায় গায়রে মাহরামের সামনে যায়, তারা দাইয়ুস শ্রেণীর অন্তর্গত। আর দাইয়ুস কখনও জান্নাতে প্রবেশ করবে না! সে হিসেবে তুমি তোমার বাবাকে পাপী করছ।’
‘আমি তো আমার বাবাকে পাপী করছি, কিন্তু এই মুহূর্তে যে আপনারা স্বেচ্ছায় পাপী হচ্ছেন,সেই বিষয়ে কিছু ভেবেছেন কি?’
‘মানে? এটা কি ধরনের কথা!’
‘আমি যতদূর জানি এই মুহূর্তে আপনি এবং আপনার ছেলে আমার জন্য গায়রে মাহরাম আর আমি আপনাদের সামনে আসার পর আপনারা যেভাবে আমার মুখ, গলা, চুল, হাত, পা সব দেখলেন, তাহলে স্বেচ্ছায় পাপী হলেন না?’
মা আড়াল থেকে হঠাৎ করে হনহন করে সামনে এসে রুহিতার হাত ধরে টান মারল। তারপর পাত্রের বাবার দিকে তাকিয়ে খুবই লজ্জিত অবনত মুখে বলল, ‘আপনারা দয়া করে কিছু মনে করবেন না। মেয়েটা না বুঝে কি সব বলে ফেলল।’
এটুকু বলেই মা তৎক্ষণাৎ রুহিতাকে উঠিয়ে নিয়ে বেরিয়ে গেল। ভেতরে গিয়ে রুহিতাকে শারীরিক প্রহার করতে না পারলেও বিচিত্র ধরনের কথার আঘাতে মা সেটা পুষিয়ে নেবে এটা নিশ্চিত। তা সে যত পারে করুক, তবে বিয়েটা তো হবার সম্ভাবনা আর থাকছে না,এটা ভেবে শান্তি পেল রুহিতা।
এক সপ্তাহ বাড়ীতে থমথমে অবস্থা!
মাকে কোনও কথা বললে হু,হা করে উত্তর দেয়। সেটাও রাগান্বিত স্বরে। বাবা কথা বলে যৎসামান্য। উদাসীন ভঙ্গীতে। রুহিতা বিসিএস কোচিং থেকে ফিরে সন্ধ্যার পর নিজ ঘরে শুয়েছিল। ছোট ভাই নিয়ন ঘরে ঢুকল, ‘আপু, তোমাকে সবাই ডাকছে।’
‘কি রে! সবাই ডাকছে মানেটা কি? মোট কতজন ডাকছে আমায়?’
‘বাবা,মা,বড় চাচী আর উনার সেই ভাই যে তোমার বিয়ের সম্বন্ধ এনেছিলেন!’
‘রুহিতার একটু গা কেঁপে উঠল, ‘উনি! উনি কেন এলেন হঠাৎ!’
‘তার আমি কি জানি! এসো! নিজেই জেনে নাও।’
‘তুই যা,আমি আসছি।’
বসার ঘরটিতে সবাই বসে। মৃদুস্বরেই কথা চলছে। বড় চাচীর গর্বিত ভঙ্গীটা আজ আরও বেড়েছে ! রুহিতার দিকে তাচ্ছিল্যভরে তাকাল সে। ব্যাপারটা কি! মনের মধ্যে প্রশ্ন থাকলেও মুখে সেটা প্রকাশ না করে চুপচাপ বসল রুহিতা।
বড়চাচীর ঘটক ভাইই বলতে শুরু করলেন, ‘তোমাকে উনাদের পছন্দ হয়েছে। তোমাদের বাড়ী থেকে সবাই গিয়ে এখন বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করলেই হয়!’
‘কাদের পছন্দ হয়েছে? খুলে বলুন।’
‘যে পাত্রপক্ষ এসছিল গত সপ্তাহে।’
‘তো উনাদের পছন্দ হয়েছে বলেই আমাদের দৌড়ে গিয়ে বিয়ের তারিখ ঠিক করতে হবে কেন? আমাদের পছন্দের খবর নিয়েছেন উনারা?’
‘উনারা তো জানেন তোমাদের অমত নেই এ বিয়েতে।’
‘কিভাবে জানেন?’
‘আমিই বলেছি।’
‘আপনি কেন তা বললেন?’
‘এত আল্লাহওয়ালা পরিবার! পাত্র সুদর্শন, ভালো চাকরি করে,এমন পরিবারে কার আবার অমত থাকে? তাছাড়া তোমার মা, চাচী উনারা তো খুব খুশি হয়েছিলেন এমন সম্বন্ধ এনেছি বলে।’
রুহিতাকে আর কথা বলতে না দিয়ে মা বলে উঠলেন, ‘আপনি ওর কথায় কান দেবেন না, বরং আমাদের যাবার ব্যবস্থা করুন কাল-পরশুর মধ্যে। এ বিয়ে হবে!’
দুই
রুহিতা গত এক বছর থেকে ‘অঙ্গীকার’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংগঠনের সাথে যুক্ত রয়েছে। সংগঠনটি সম্প্রতি ‘জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা)’-এর অধীনে নিবন্ধিত সংগঠনের তালিকায় স্থান পেয়েছে। ইতোমধ্যে বেশ কটি জাতীয় দৈনিকে সংগঠনটির কাজের অগ্রগতির প্রশংসা করে বলা হয়েছে –
‘শুধুমাত্র কিছু স্বার্থসিদ্ধির নিমিত্তে দেশে বর্তমানে মুক্তিযুদ্ধের নাম ব্যবহারকারী অনেক ভুয়া সংগঠন আগাছার মতো গজিয়েছে, এবং তারা নিবন্ধিত ও হচ্ছে অনায়াসে কিন্তু ‘অঙ্গীকার’ সংগঠনটি তাদের অভিনব কর্মপদ্ধতির সুবাদে অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অনেক বেশি সফল। তারা যেভাবে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন সারাদেশে,তাতে নিশ্চিত করে বলা যায় কোনও প্রচার প্রচারণা,বা স্বার্থ উদ্ধার তাদের উদ্দেশ্য নয়, শুধুমাত্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখাই এই সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য।
এ সংগঠনটি তাদের একবছরের কর্মতৎপরতায় দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল ঘুরে খুঁজে বের করেছেন প্রায় এক ডজন মুক্তিযোদ্ধা যারা রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনও প্রকার স্বীকৃতি কখনও পান নি। বরং বর্তমানে মানবেতর জীবন যাপন করছেন তাঁদের পরিবারের সদস্যবৃন্দ। তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান ও তাঁদের পরিবারের উন্নততর জীবন যাপনের ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের লক্ষে এ সংগঠন নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছে।এটি তাদের এক অঙ্গীকার রক্ষার প্রয়াস। এর ঠিক অন্য পাশেই রয়েছে সংগঠনটির বিপরীত অর্জন। মুষ্টিমেয় কিছু রাজাকারও খুঁজে বের করেছে সংগঠনটি, যাদের সম্পর্কে রাষ্ট্র ওয়াকিবহাল নয়। শুধু রাষ্ট্রই নয়,এদের সম্পর্কে বলতে গেলে কেউই আজ আর অবগত নয় যে, তারা একসময় যুদ্ধবিরোধী শক্তির অন্তর্গত ছিল। এদেরকে আইনের আওতায় নিয়ে যাওয়ার জোর প্রচেষ্টাও অব্যাহত রেখেছে সংগঠনটি। “
আজ রুহিতাদের সংগঠনের ষান্মাসিক মিটিং রয়েছে। আর এ মিটিংয়ে সবাইকেই উপস্থিত থাকতে হয় । কিন্তু রুহিতা বুঝতে পারছিল না, বিয়ের মাত্র পঞ্চম দিনের মাথায় রুহিতার একা বাইরে যাওয়ার ব্যাপারটিকে কিভাবে নেবেন তার শ্বশুর, যে কিনা মুসলিম নারীর চলাফেরার বিধিবিধান নিয়ে এতটা সচেতন !
স্বামী তামিমকেই প্রথমে ব্যাপারটি জানাল রুহিতা। সে নিশ্চয় শ্বশুরমশাইকে বলে ম্যানেজ করবে। আসলে শুধু তামিমের কথা ভেবেই রুহিতা এই বিয়েতে শেষমেশ মত দিয়েছিল।
তামিম নাকি ঘটক সাহেবের কাছে বলেছিল, রুহিতার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন আচরণ এবং স্বাধীনচেতা অভিব্যক্তি তার খুবই পছন্দ হয়েছে। তাই সে রুহিতাকে বিয়ে করতে আগ্রহী। রুহিতা তখন ভেবে নিল, স্বামী অমন মনের হলে তাহলে রুহিতার প্রয়োজনীয় স্বাধীনতাটুকু অন্তত বিঘ্নিত হবে না।
তামিম রুহিতাকে বোঝালো, ‘দেখো তোমার ব্যাপারটি আমি বললে সেটি খারাপ দেখায়,বাবা কষ্ট পেতে পারেন।’
রুহিতা প্রমাদ গুণল। এ সংগঠন থেকে তার স্থায়ীভাবে সরে আসার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয় কিনা- এমন আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল তার সমস্ত ভেতরটা।
রুহিতার বড় চাচা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। নির্মমভাবে পাকসেনারা তাকে মেরে ফেলেছিল। বিশ্বাসঘাতকতা করে তাকে পাক সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিল তিন রাজাকার। তাদের মধ্যে একজন আর বেঁচে নেই। কিন্তু বাকী দুজন সমাজের ওপর তলার মানুষ হিসেবে বহাল তবিয়তে আছে। বিত্ত বৈভবে তারা এখন এতটাই ওপরে যে, তাদের রাজাকার পরিচয় কবেই মুছে গেছে। তাদেরকে আইনের আওতায় আনাও এখন যারপরনাই কঠিন কাজ। বাবাকে অনেকবার এ ব্যাপারে চেষ্টা করতে বলেছে রুহিতা। কিন্তু তার মুখভঙ্গী দেখে প্রতিবারই মনে হয়েছে, যেন মঙ্গলগ্রহে গিয়ে কোনও এলিয়েন ধরার কথা বলা হলো বাবাকে। তাই তাকে এসব বলা বন্ধ করেছে রুহিতা। কিন্তু নিজে হাল সে ছাড়ে নি।
এ সংগঠনে কাজ করার এটা একটা বড় কারণ। সম্পূর্ণ পরিবার এসব ভুলে গেলেও রুহিতা কেন জানি ভুলতে পারে নি। ছোটবেলা থেকেই এসব গল্প শুনে শুনে মুক্তিযুদ্ধ আর চাচার নৃশংস মৃত্যু- দুটো ব্যাপারই তার ভেতরে প্রচন্ড প্রভাব বিস্তার করে রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক কোনও চলচ্চিত্র, নাটক, প্রবন্ধ কিংবা কোনও ডকুমেন্টারি এসব রুহিতার শরীরের মধ্যে কেমন যেন শিহরণ সৃষ্টি করে! রুহিতা অবাক হয়। যে যুদ্ধ সে দেখে নি,সেটার বর্ণনা কেন তাকে এমন নাড়া দেয়! রুহিতার ভাবতে ইচ্ছে করে, হয়ত এ শিহরণগুলোও দেশপ্রেম।
সব সাতপাঁচ ভেবে রুহিতা মনে মনে হঠাৎ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠল। সে মনস্থির করেই নিল, শ্বশুরের নিষেধাজ্ঞার কারণে আজকের মিটিং ছাড়তে হলেও সংগঠন সে ছাড়তে পারবে না কোনওমতেই।
সংগঠন সম্পর্কে সংক্ষেপে বলে আজকের মিটিংয়ের ব্যাপারটা উত্থাপন করতেই শ্বশুরমশাই এমনভাবে চমকালেন যেন এমন উদ্ভট কথা উনি জীবনে শুনেন নাই। অগ্নিদৃষ্টি দিলেন রুহিতার দিকে। স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা শুনিয়ে দিলেন, ‘নাহ্,বিনা প্রয়োজনে বাইরে যাওয়া চলবে না।’
‘এই বিষয়টি আপনার অপ্রয়োজনীয় মনে হলো?’
‘অবশ্যই অপ্রয়োজনীয়। যে যুদ্ধ এত বছর আগে হয়ে গেছে, তা নিয়ে এত মাতামাতি কিসের? বাজে বিলাসিতায় সময় নষ্ট এসব।’
রুহিতা হতভম্ভ হলো! যতটা না তার বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞার কারণে,তার চেয়ে বেশি এটা ভেবে যে, এমন একটি পরিবারে তার বিয়েটা হলো, যে পরিবারের বুজুর্গ দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টাতে এমন নির্বিকার! রুহিতা বিস্মিত হয়ে তার শ্বশুরকে দেখছিল। তিনি সেটা বুঝতে পেরে রুহিতার চোখে চোখ রেখে বললেন, ‘শোন, আজকের পৃথিবীতে যে বেলেল্লাপনা, সেটা শুধুমাত্র এই নারীদের অবাধ চলাফেরার কারণে।’
‘কিন্তু সমস্যাটি হলো, যে বেলেল্লাপনার কথা বলে আপনি নাক সিটকাচ্ছেন, এই আপনাদের মতো মানুষেরাই মওকা পেলে সেই বেলেল্লাপনা উপভোগ করতে পিছপা হন না!’
‘কি রকম?’
‘কাল রাত একটার দিকে উঠেছিলাম পানি খেতে। দেখলাম আপনার রুমের আলো জ্বলছে। তাকিয়ে দেখি আপনি বসে টিভি সিরিয়াল দেখছেন। তো, সিরিয়ালে অভিনয় করা মেয়েগুলো নিশ্চয় বোরখা পরে অভিনয় করছিল না। ওরা বাইরে গিয়ে বেলেল্লাপনা করেছিল বলেই আপনাদের কিছুটা বিনোদন আর কিছুটা ভালো থাকার ব্যবস্থাটা হলো।’
‘এটা নিতান্তই একটা তুচ্ছ ব্যাপার।’
রুহিতা হাসল, ‘আচ্ছা এটা না হয় তুচ্ছ ব্যাপার। আমাদের বিয়ে উপলক্ষে আপনার একজন ধর্মের বোন এ বাড়ীতে দুদিন থেকে গেলেন। আপনি তার সাথে বসে সারাবেলা গল্পও করলেন। আচ্ছা, বলুন তো উনার সাথে সময় কাটানোটা কি আপনার জন্য জায়েজ?’
‘নিজের বাইরে যাওয়াটাকে জায়েজ করতে এসব তুলনা টেনে এনে নির্বুদ্ধিতার পরিচয় দিলে আর নিজেকে ছোট করলে! তাতে লাভও কিছুমাত্র হলো না। বাইরে যাওয়ার অনুমতি তুমি পাবে না।’
‘আপনি ভুল ভাবছেন! ইসলামি বিধিবিধান মেনে বাইরে গেলে আমাকে কেউ আটকাতে পারবে না, আপনি ও না। আমি শুধু বোঝাতে চাইছিলাম, আপনাদের মতো ধর্মভীরু মানুষরাও নিজের স্বার্থে কখনও কখনও ধর্মীয় আদেশ নিষেধগুলোকে শিথিল করে নেয়।’
‘শোন, সে যেটাই হোক,এ বাড়ীতে থাকতে হলে আমার কথা মানতে হবে। তোমাকে এ বাড়ীতে আনা হয়েছে,শুধু আমার ছেলের পছন্দের কারণে। আমি তোমাকে এতটুকুও পছন্দ করি নি। বড়দের সাথে তোমার এমন বেয়াদবির কারণে।
রুহিতার একটু খারাপ লাগল। সত্যিই কি অনেক বেশি বেয়াদবি করে ফেলছে সে একজন বুজুর্গের সাথে? কিন্তু সে তো শুধু যুক্তিগুলো বলেছে! বেয়াদবি করতে চায় নি। যাহোক তবুও সে শ্বশুরমশাইকে বলল, ‘বাবা, বেয়াদবি হলে আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি শুধু আপনাকে লজিক্যালি বোঝাতে চেয়েছি, আর কিছু নয়।’
এরপর উনি আর কথা বাড়ান নি। নীরবে উঠে চলে গেলেন।
বিয়ের দুমাস পার হয়ে গেল রুহিতার। সংসারের কাজকর্ম আর বিসিএস পরীক্ষার পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ততাতেই তার সময় কেটে যাচ্ছে। না, বিসিএস কোচিং করতে বাইরে সে যায় না। কোনও কাজেই একা বাইরে সে সত্যিই এখনও যায় নি। প্রয়োজন হলে তামিমের সাথে গিয়েছে।
তামিম তাকে বুঝিয়েছে, ‘দেখ, ধর্মীয় ইস্যুটা এত স্পর্শকাতর যে, এটা নিয়ে বাবার সাথে ঝগড়ায়ও লিপ্ত হওয়া যায় না বা কৈফিয়তও চাওয়া যায় না। নিরুপায় এক্ষেত্রে আমি। তাই একটু টেকনিক্যালি চলতে চেষ্টা করো।’
এটা শোনার পর থেকে রুহিতাও চেষ্টা করে যাচ্ছে শ্বশুরকে ভালোবেসে তার গোঁড়ামিগুলো দূর করে রুহিতার প্রয়োজনীয় স্বাধীনতাটুকু অর্জন করতে। চেষ্টা অবশ্য এতটুকুও সফল হয় নি। হবে কি না বোঝাও যাচ্ছে না। তবু রুহিতা আপাতত এভাবেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে চায়।
রুহিতার শাশুড়ী মারা গেছেন তিন বছর হলো। আজ তার মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। কিছু হাফেজ ডেকে কোরআন খতম করানো হলো। তামিমদের কিছু নিকটাত্মীয়ও এসেছিলেন দোয়ার অনুষ্ঠানে। বেশিরভাগই সন্ধ্যার মধ্যে ফিরে গেছেন। শুধু তামিমের এক মামা আর ওদের সেই ধর্মের ফুফু বাড়ি দূরে হওয়ায় রাতে রয়ে গেছেন এ বাড়িতে। রুহিতা আতিথেয়তা করে ক্লান্ত হয়ে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল।
গভীর রাতে হঠাৎ রুহিতার খুব পেটে ব্যথায় ঘুম ভেঙে গেল। গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা মনে হয়ে ওষুধ খাওয়ার জন্য উঠে পড়ল সে। কিন্তু বাইরে ডাইনিং টেবিলের কাছটায় গিয়ে আলো জ্বালানোর আগেই সে যে দৃশ্য দেখল তাতে তার অজ্ঞান হবার জোগাড়। রুহিতার শ্বশুর তার পাতানো বোনের ঘরে নিঃশব্দে ঢুকছেন। ঢোকার পর দরজাটা লাগিয়ে দিলেন।
রুহিতার গা গুলিয়ে উঠল। কি করবে কুল কিনারা পাচ্ছিল না সে। একবার ভাবল, বাড়ির সবাইকে ডেকে তুলে ঘটনাটি বলবে। আরেকবার ভাবল, ওই ঘরটায় ঢুকে সরেজমিনে ব্যাপারটির সাক্ষী হয়ে থাকবে,যেন শ্বশুরের বড় বড় লেকচার এখন থেকে বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু কোনটাই করার রুচি হলো না রুহিতার। সে চুপচাপ নিজের রুমে গিয়ে অনেকটা দম বন্ধ অবস্থায় রাতটুকু পার করল।
একদম ভোরে কাউকে কিছু না বলে রুহিতা বেরিয়ে পড়ল। রাস্তায় যেতে যেতে পুরো পৃথিবীটাকেই তার এই মুহূর্তে নোংরা লাগছিল। সব মানুষ গুলোকেই যেন মুখোশধারী মনে হতে লাগল।
মেয়ের হুট করে চলে আসা দেখে, তার চোখমুখের অবস্থা দেখে রুহিতার বাবা, মা হতবাক হয়ে গেল।
কিন্তু রুহিতার কোনও কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না কারও সাথে। নিজের পরিবারের প্রতি ও ক্ষোভ জমা হচ্ছিল ওর। মনে হচ্ছিল এ বাড়ি থেকেও এখন দূরে থাকতে পারলে ভালো লাগত । কিন্তু নিরাপদ আর কোনও জায়গার কথা তার মাথায় এল না ,যেখানে গিয়ে থাকা যেতে পারে।
রুহিতার হুট করে ঘর ছাড়ার ব্যাপারটা জানাজানি হতেই তামিম বার বার ফোন দিতে লাগল। রুহিতা শুধু তাকে বলতে পারল, ওকে যেন আপাতত ফোন না দেয়া হয়।
কয়েকটা দিন রুহিতা চুপচাপ কাটালো এ বাড়িতে। কিছুতেই ও বাড়ীতে তার ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিল না। মানুষ কত নীচে নামতে পারে! যার সাথে হরদম যৌনতার সম্পর্ক, তাকে এই জগতের সামনে কিভাবে বোন সাজিয়ে রাখতে পারে! আবার এদেরই মুখে সারাদিন হাদীসের বয়ান। দম বন্ধ ভাব দূর করতে ক’দিন পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল রুহিতা। ওদের সংগঠনের অফিসে হাজির হল। ঘন্টা দুয়েক সেখানেই চুপচাপ বসে রইল। সারা পৃথিবীর মধ্যে এই জায়গাটাই এখন তার কাছে পবিত্র মনে হচ্ছিল।
সংগঠনের হায়দার ভাই প্রথমে অবাক হয়েছিলেন এতদিন পরে ওকে দেখে। তবে তার চেয়েও বোধহয় অবাক হয়েছেন ওর বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে। কারণ অনেকক্ষণ হয়ে গেছে সংগঠনের আপডেট নিয়ে কোনও কথাই বলছেন না। বরং সবার ব্যক্তিগত জীবন যাপনের খবরাখবর দিচ্ছিলেন। মাঝেমধ্যে মজার কথাও বলার চেষ্টা করছিলেন তিনি। কিন্তু রুহিতার কানে খুব কম কথাই ঢুকছিল। আর যা-ও বা ঢুকছিল,সেসবের বেশির ভাগই বোধগম্য হচ্ছিল না। এক পর্যায়ে হায়দার ভাইয়ের কথাও শেষ হয়ে এল। নীরবতা ভাঙল এবার রুহিতা। জানতে চাইল, সংগঠনের সর্বশেষ অগ্রগতি। অবশ্য সে এর মধ্যে ও অনেকবার ফোনে সব জেনে নিয়েছিল আর তার উপস্থিতির অপারগতার বিষয়টিও জানিয়েছিল ফোনে।
হায়দার ভাই ওর হাতে একটা কাগজ দিয়ে বললেন দেখতে । খুঁজে পাওয়া আরও চারজন রাজাকারের তালিকা ছিল সেটি। রুহিতা চোখ বুলাতে লাগল। হঠাৎ ভয়ানক চমকে গেল সে! তিন নম্বর নামটিতে চোখ আটকে গেল তার। নাম আর ঠিকানা বারবার মিলিয়ে নিল। নাহ! কিছুই ভুল হচ্ছে না তার, ভুল দেখছে না তার চোখ। তার শ্বশুর সম্পর্কের নোংরা ওই লোকটি একাত্তরে রাজাকার ছিল! তার মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঘৃণ্য কাজসমূহের কিছু প্রমাণও এরা যোগাড় করে ফেলেছে। বেশ কিছু মুক্তিযোদ্ধার ওপর নির্যাতন নিপীড়ন এবং কয়েকজনকে হত্যা আর কয়েকটি ধর্ষণের প্রমাণও এখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
রুহিতার মাথার ভেতরে হঠাৎ কিছু টলমল করতে লাগল। সামনের সবকিছু ঝাপসা হয়ে উঠতে লাগল। মনে হলো,সবাই ওর মুখের ওপর ঝুঁকে এসে জড়ানো গলায় কি যেন খুব করে বোঝাতে চাইছে ওকে।
চোখ খোলার পর নিজেকে একটা পরিপাটি সাজানো ঘরে দেখে অবাক হলো রুহিতা। একটুপরই মৃদুলা এসে ঘরে ঢুকল। হাসিমুখে বলল, ‘কংগ্রাচুলেশনস! কনসিভ করেছ তুমি। অফিসে ওভাবে অজ্ঞান হয়ে গেলে! বাব্বা! যে ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আমাদের সবাইকে! ডক্টর এসে আমাদের সুখবরটা জানালেন।বললেন, ভয় পাওয়ার কিছু নেই,জাস্ট প্রেগন্যান্সি সিকনেস! কতবার বলেছি আমার বাড়িতে আসতে,আসো নাই। আজ দেখো! নিজের অজান্তেই চলে এলে! যাহোক তোমার বাড়িতে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছি সুখবরটা। আর বলেছি তুমি ভালো মতো সুস্থ হলেই তবে ফিরবে!’
হড়বড় করে কথাগুলো বলে থামল মৃদুলা। মৃদুলার সাথে রুহিতার পরিচয় ভার্সিটির সেকেন্ড ইয়ার থেকেই।দুজন ইয়ারমেট। তবে ওরা একই ডিপার্টমেন্টের নয়। এরপর একই সংগঠনে কাজ করতে গিয়ে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হওয়া।
বিকেলের দিকে বাড়িতে ফিরে এল রুহিতা। তার প্রেগন্যান্সির খবর শুনে বাড়ির সকলের চোখ খুশিতে চকচক করছে। ও বাড়িতেও ইতোমধ্যে খবর পৌঁছে গেছে। তামিম অফিস শেষ করে চলে এসেছে রুহিতার সাথে দেখা করতে। এক গাদা মিষ্টি নিয়ে এসেছে সে। রুহিতাকে খুশিতে জড়িয়ে ধরে অনেক আবেগের কথা শোনাচ্ছে সে। কিন্তু একটু পরেই তার বোধগম্য হলো, তার স্ত্রীর প্রকাশ অত্যন্ত নিথর এবং শীতল। তামিম কেঁপে উঠল ওর এমন শীতলতা দেখে। কয়েকবার জানতে চাওয়ার পর রুহিতা ওদের সংগঠনের দেয়া কাগজটা তামিমের হাতে ধরিয়ে দিল চুপচাপ।
তামিম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে উঠল, ‘ওহ তাহলে জেনে গেছ এটা?’
‘মানে? তুমি তাহলে জানতে এটা?’
‘হুম।’
‘আমাকে বলো নি কেন?’
‘এটা নিশ্চয় প্রচার করার মতও কোনও খবর নয়।’
‘তুমি জানতে আমি এমন একটি সংগঠনে কাজ করি, তবু বলার প্রয়োজন মনে হয় নি?’
‘না। প্রয়োজনীয় কথাটা এখন বলব তোমাকে। শোন, বাবা অনেক আগে থেকেই এই সংগঠন সম্পর্কে জানেন। সমাজের বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি সংগঠনটির পৃষ্ঠপোষকতায় রয়েছে বলে এটি খুব শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এটি বাবা জানতেন। আর এ নিয়ে তার মধ্যে দুশ্চিন্তাও চলছিল বেশ অনেকদিন থেকেই। তিনি নিয়মিত খোঁজখবর রাখতেন সংগঠনটির। সে সুবাদেই তোমাকে চেনা, আর সেখান থেকেই বিয়ের প্রস্তাব। তোমাকে আমার সাথে বিয়ে দেয়ার উদ্দেশ্যই ছিল তুমি যেন আমাদের উপকারে আসতে পারো।
‘তার মানে দাঁড়াচ্ছে তুমি আমাকে পছন্দ করে বিয়ে করো নি, তুমি জাস্ট আমাকে এক্সপ্লয়েট করার জন্য বিয়েটা করেছ,তাই তো!’
‘ভুল বুঝো না! তোমাকে সত্যিই আমার পছন্দ হয়েছিল।’
‘এখন তুমি কি চাও আমার কাছে?’
‘শোন, এদেশে আইনের অনেক ফাঁকফোকর আছে। কিছু না কিছু ব্যবস্থা হয়েই যাবে বাবাকে বাঁচানোর। তুমি যদি কোনও সাহায্য করতে নাও পারো, শুধু কোনও প্রকার বাড়াবাড়িটুকু কোরো না।’
‘তুমি এখন আসতে পারো। এই মুহূর্ত থেকে তোমার সাথে থাকা তো দূরের কথা, তোমার চেহারা দেখাও আমার পক্ষে অসম্ভব! আশ্চর্য! আমি এই ক’দিনে এতটুকুও বুঝতে পারলাম না, একটা অমানুষকে আমি বিয়ে করেছি! আর শোনও, আমাদের দেশের নিরানব্বই ভাগ মানুষ যদি তোমার বাবাকে বাঁচাতে চায়, আমি একা তখনও তোমার বাবার প্রাপ্য সাজা দেয়ার পক্ষে লড়ে যাব। আমার কথা শেষ!’
‘ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি। কিন্তু ভুলে যেও না তুমি বিবাহিতা। শ্বশুরবাড়ির পরিচয়ই এখন তোমার আসল পরিচয়। জেদের কারণে নিজের জীবনটা যেন নষ্ট কোরো না!’
‘এই দাঁড়াও দাঁড়াও! তুমি কি একটু ব্যাখ্যা করবে আমার জীবনটা কীভাবে নষ্ট হবে?’
‘তুমি আমাদের একদম বিপক্ষে দাঁড়ালে, তখন কি ডিভোর্স ছাড়া আর কোনও রাস্তা থাকবে?’
‘এ্যাজ এক্সপেক্টেড! সো, থ্যাংকস মিস্টার তামিম। ইউ ক্যান গো নাও!’
তামিম উঠে চলে যাবার সময় আবার পেছন ফিরে তাকাল, ‘আর একটা কথা ভুলে যেও না, তুমি এখন নিজের ভেতরে ধারণ করছ এক নতুন প্রাণ যে কিনা আমার ঔরসজাত!’
ঘরটায় এখন সুনসান নীরবতা। দরজা লাগিয়ে বাতিটা নিভিয়ে প্রবল কান্নায় ভেঙে পড়ল রুহিতা!
পৃথিবীর কোথাও কেউ এখনও জানে নি, তার মধ্যে কি মহাপ্রলয় চলছে। একা অন্ধকার ঘরে সারারাত সেই প্রলয়ের নির্মমতা ঠেকাতে ঠেকাতে সে যেন মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গেল । অভিযোগের একটা আস্ত সাম্রাজ্য তার ভেতরে এখন। সে অভিযোগ তার বাবা মায়ের বিরুদ্ধে, এই ঘুনে ধরা সমাজের বিরুদ্ধে। সেটা উগরে দিতে সে মরিয়া হয়ে উঠল। কিন্তু পারল না। পরিবর্তে হড়হড় করে বমি বেরিয়ে এল। নেতিয়ে পড়ল সে। হাতটা ধীরে ধীরে নিজের উদরে ঠেকাল। বিড় বিড় করে বলে উঠল, ‘রাজাকারের রক্ত! রাজাকারের বংশ!’
কিন্তু পরক্ষণেই নিজেকে খুবই নির্বোধ শ্রেণির মনে হলো! কিসের রক্ত! কিসের বংশ! এসব রক্ত, বংশ নিতান্তই কুসংস্কার আসলে! মানুষের পরিচয় কখনও তার জন্ম ইতিহাস দিয়ে হতে পারে না। প্রত্যেকটা মানুষই এক আলাদা মানুষ,আলাদা সত্ত্বা, সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা পরিচয় সবার, আর সে পরিচয় তৈরি হয় তার চিন্তা, চেতনা আর কর্ম দিয়ে।
যে আসছে সে তো পবিত্রতা নিয়ে জন্মাবে! সেই পবিত্রতা ধরে রাখার দায়িত্ব শুধুই তারই, তার পিতা বা পিতামহ কারও নয়। রুহিতা তাকে সে পবিত্রতা ধারণ করতে শেখাবে। তাকে আলোর মশাল জ্বালাতে শেখাবে। এই কদর্য পৃথিবীটাকে বদলে দেয়ার শ্লোগানে চারিদিক মুখরিত করতে শেখাবে ! রুহিতা তাকে শেখাবে কিভাবে নিশ্চিন্ত নির্ভরতা হয়ে উঠতে হয় পৃথিবীর ভালো মানুষগুলোর জন্য। আর অন্যায়কারীর জন্য কিভাবে হয়ে উঠতে হয় শাস্তির এক জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ড! হোক না অন্যায়কারী দেশদ্রোহী তার পিতামহ, তবুও তাকে তার প্রাপ্য শাস্তি পেতেই হবে।
একটা নিকষ কালো রাত পার হলো। হাতের তালুতে সবটুকু কান্না মুছে নিল রুহিতা! অধীরভাবে এক নতুন সূর্যের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
যে কচি প্রাণগুলো এই পৃথিবীতে আসছে তাদের জন্য যে এক নতুন প্রত্যুষ আনতে হবে কলুষিত অন্ধকার মিটিয়ে। ঘোষণা দিতে হবে এক নতুন মুক্তিযুদ্ধের। ঝরবে আরও কত রক্ত নবীন মুক্তিযোদ্ধাদের! নগ্ন পায়ে মাড়াতে হবে গনগনে অগ্নিপথ! যেতে হবে অনেকটা দূর এখনও! অনেক দূর!♦



