গল্পসাহিত্য

এক সমুদ্র অথৈ সুখের জোয়ার

নীলুফার পারভীন মিতু


হংসমিথুন গল্পের অবয়ব জুড়ে ক্রমশই আঁধার নেমেছিল ভীষণ। সে সময়েও আশার আলোক জ্বেলে চারপাশে ভেসে থাকা কয়েকটা জোনাকি সে আঁধারে সন্তর্পণে জানিয়ে দিয়েছিল— এ আধার নৈঋতে আবারও ভেসে বেড়াবে দুজনা।

পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই হঠাৎ গভীর রাতে জানা গেল তিনি কাজের খাতিরে পরদিন ভোরবেলা বের হবেন।
সাথে সাথে তানপুরার তারে নাচন উঠল যেন!

সে বলল, আমারে নিবা লগে?
উত্তর আসে, মাথা কাজ করে না। কীভাবে নিবো! কোথায় রাখব তোকে?

বোঝা গেল এ যাত্রায়ও হবে না। আজন্ম লালিত সে স্বপ্নময় ঘোরে ডুবে যেতে এখনও হাজার বছরের প্রতীক্ষা দরকার। আশাহত তানপুরা ডুবে যায় গভীর মগ্নতায়।

ভৈরবী তানে ঘুম ভেঙে দেখে, উনি লিখেছেন, ‘তাইলে কি যাবি?’

উত্তর না পেয়ে আবারও জানায়, ‘তাইলে যাবি না- আমি রওনা দিচ্ছি।’

আহা! আহা! আহা!

কে রুখে তানপুরার তান? দুপুরেই ঠিক হয় আকাশপথে সে যাবে চমকে দিতে! ভয়ও আছে! তাঁর তো যাযাবরের জীবন। খুঁজে পাওয়া মুশকিল। আবার যদি গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই উল্টোপথে যাত্রা শুরু করেন উনি??

ধ্যাত! এতসব ভেবে কেউ ভালোবাসে বুঝি? ভাবনার চাই তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন। তানপুরা রওনা করে আকাশপথে।

ফ্লাইট বিপর্যয়ে আটকে থাকতে হয় টার্মিনালে দু-তিন ঘন্টা। ফিরে আসে না সে। কফি আর পেটিস খেয়ে গান শুনতে শুনতে এক সময় যাত্রা শুরু হয়। পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁরও সেদিনের মতো কাজের সমাপ্তি হয়।

ভালোবাসাহীনতায় যতবার ঝরে পড়ে সমস্ত পত্রপল্লব ততবার তানপুরা স্বপ্নাধারে পুরে নেয় কাঙ্ক্ষা-তেষ্টাময়
বাসন্তিক কলরব।

আদা-রসুন-লংকা আর রোজকার দায়িত্ববোধের শেকলে বাঁধা পড়েছে অনেকটা কাল। অলৌকিক দীর্ঘশ্বাসে লণ্ডভণ্ড করেছে তানপুরার সুর। আজ না হয় চেপে ধরবে ভালোবাসার আঙুলগুলো। ভালোবাসি বলতে বলতে উগড়ে দেবে গগনবিদারী চিৎকার। যখন এমনই মনের ভাব, আজ শেষবারের মতো ভালোবাসাই ছুঁয়ে থাকবে সে।

এয়ারপোর্টে নামতেই অবাক করে দিয়ে উনি জানালেন নিজেই এসেছেন তানপুরাকে নিতে। শীতের হিমেল হাওয়ায় মন উচাটন। মনটাকে সামলে রাখাই দায়। বেদম বেহায়া মনটাকে শান্ত করে এমন সাধ্যি কার! দেখা হলো দুর্ঘটনার মতোন অকস্মাৎ। পলকের দৃষ্টি বিনিময়। পরক্ষণেই নিস্তব্ধ নীরবতা। গাড়ি চলছে— গন্তব্য কোথায় জানে না চালকও।

দূর অতীতের মতোন তানপুরার প্রেমও তো সরলরৈখিক। দুজনারই দুর্মর প্রেম, সমানভাবে ভেঙেচুরে একাকার করে দিতে পারে সবকিছু। একজনার পিছুটান বেশি, দ্বিধা অপার, শেকল বন্ধন অগুনতি। অন্যজন পুড়ে ছাই হতে জানে কেবল। পোড়ানাই তাঁর আজন্ম ভালোবাসা।

গন্তব্যে পৌঁছানোর আর কত সময় বাকি জানা নেই। আবহাওয়ায় বৈরীতা, ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব, রাস্তার যানজট আর অতৃপ্ত প্রাণের স্পন্দন সবমিলিয়ে পথটা দীর্ঘ মনে হতে থাকে। আগে থেকে জানা ছিল না দুজনার দেখা হবে, তাই পূর্বপরিকল্পনা ছাড়া অচেনা গন্তব্যে পৌঁছাতে আরও কিছুটা সময় ক্ষেপন হলো। আবহাওয়ার বৈরীতা ঝড়ে রূপ নিতে আরম্ভ করেছে।

তানপুরা অনুভব করলো, ঝড়ও তাঁর নিজস্ব সৌন্দর্যে বিষণ্ণ! পুরো শহর মুহূর্তে বায়ুর সমূদ্রে পরিণত হলো। তাড়াহুড়া করে কাচের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তাউস মুখ তুলে তাকাল তাঁর দিকে। মুখোমুখি হবার একটা ইতস্তত অনুভূতি ওকে নাড়া দিচ্ছিল ভীষণ ভাবে।

তানপুরা লক্ষ্য করল, এ তো কোনও অচেনা গন্তব্য নয়। তাদের চিরচেনা সেই পরিপাটি বাংলো যা বন্ধু আর্কিটেক্ট তানপুরা-তাউসের জন্যে সুরের মূর্ছনায় আন্দোলিত হবে— এভাবে বিশেষ যত্নে ডিজাইন করেছিল। উঠোনের নরম ঘাসের নিচে নিচে সাউন্ডসিস্টেম সেভাবে বসানো। আলো-আঁধারি এক অনাবিল শান্তিনিকেতন।

ঝড়ের আঘাতে, ধুলোর মিছিলে, ঢেকে গেল পথের ক্লান্তি।

তাউস বিশাল লিভিং রুমে ঢুকেই তাঁর গাওয়া গানের অ্যালবাম ‘মেঘের মাঠে’ প্লেয়ারে ঢুকিয়ে ক্লান্ত শরীর সোফায় ছোঁয়াতেই চোখ বুজলো।

তানপুরা মুগ্ধ নয়নে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির জলধারা জানালা ভেদ করে ছুঁয়ে দিল ফোঁটায় ফোঁটায়। খোয়া যাওয়া প্রেম- ভালোবাসা আদ্যোপান্ত বৃষ্টিজলে নিমজ্জমান মাশুল যেন।

ভালোবাসা মানে তো শোকেসে সাজানো সারি সারি অনিরাময়যোগ্য অসুখ। তানপুরা তার সাতরঙা বেদনার উৎসব ভুলে তাউসের কপালে চুমু খায়। বুকের ভেতর শক্ত করে টেনে নেয় তাকে সে। অঙ্গাঙ্গী লেপ্টে থাকা যুগলের এক মায়বী করুণ মিলন যেন প্রকৃতিই চেয়েছিল।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension