রম্য গল্পসাহিত্য

মিল্টন ভাইয়ের ভালোবাসা

নার্গিস জুহি


এক
মিল্টন ভাই তার বউকে অসম্ভব ভালোবাসেন।বউয়ের সবকিছুতে তার গভীর মনোযোগ। বউয়ের শাড়িটা, চুড়িটা, দুলটা ইত্যাদির প্রতি তার কড়া নজর। চাকরির জন্য তাকে সপ্তাহে পাচঁদিন দুরে থাকতে হয়। বৃহস্পতিবার মনের আনন্দে তিনি বাড়ি ফিরেন। এই রাত তার কাছে সহস্র রাত অপেক্ষা উত্তম।

ঘরে ঢুকতেই বউ বললেন যে, কাল তার বান্ধবীর জন্মদিনে নিয়ে যেতে হবে। মিল্টন ভাইয়ের মেজাজ সপ্তমে উঠল। কোথায় বৃহস্পতিবার রাত, বউয়ের সাথে প্রেম ভালোবাসা…। বউ আছে বান্ধবীর জন্মদিন নিয়ে। কি পোশাক পরবেন, কি গিফট্‌ কিনবেন এই নিয়ে চিন্তা করতে করতে মাথা খারাপ অবস্থা! একটুক্ষণ পর পর অন্য বান্ধবীদের সাথে মোবাইলে পরিকল্পনা চলছে।

যাহোক,সাধারণ একটি রাত পার করে শুক্রবার দুপুরবেলা বউ নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এলেন শহরের মাইডাস রেস্টুরেন্টে। বউ মহাখুশি। বউয়ের বান্ধবীরা আরও খুশি। বান্ধবীদের বরেরা গোবেচারা সব। তিনিও তাদের একজন। বউ এবং বান্ধবীদের হৈচৈ, চিৎকার, কেক কাটা, গানবাজনা, খাওয়া দাওয়া ইত্যাদি নিয়ে বেশ আনন্দমুখর পরিবেশ।

এরই মধ্যে মিল্টন ভাইয়ের মন আবার আলগা হলো। বউয়ের পাশ থেকে নড়ছেন না। ঘোষণা দিয়েই বসলেন, এক সপ্তাহ পর বউকে পেয়েছেন। আড়াল খুজঁছেন। তাড়াতাড়ি তিনি বাসায় ফিরতে চান। বউয়ের সাথে তার অনেক কথা আছে।বউটিও খুশি। যদিও গাল ফুলিয়ে কপট রাগ দেখানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু মনে মনে তিনিও এখন ঘরে ফিরতে রাজি।

এবার শুরু হলো বান্ধবীদের গল্প। বউ এবং বউয়ের বান্ধবীদের সাংকেতিক গল্প বরেরা তো আর বোঝেননা। তারা গেলেন ধোঁয়া খেতে। ফিরে এসে মিল্টন ভাই এবং আরেক বান্ধবীর গোবেচারা বর টেবিলের নীচ থেকে একটি চশমা উদ্ধার করলেন। চশমাটির মালিককে খুঁজে বের করতে মিল্টন ভাই প্রাণান্তকর চেষ্টা করলেন। মালিক খুঁজে না পেয়ে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে চশমাটি জমা দিয়ে দিলেন। এরপর বউয়ের বান্ধবীদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চটপট রওনা হলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে।

মাঝপথে এসে বউ চশমাটি চাইলে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। মুখ ফসকে বলে ফেললেন চশমাটির মালিককে না পেয়ে রেস্টুরেন্টের কাউন্টারে জমা দিয়ে এসেছেন। উত্তর শুনে ভালোমানুষ বউটি ঝাঁঝিয়ে গাড়ি থামাতে বললেন, ‘বউয়ের চশমা চেনে না,ভালোবাসা দেখায়’- বলতে বলতে ছুটলেন তার বাপের বাড়ির দিকে।

পথের মাঝখানে বসে মিল্টন ভাই চিন্তা করছেন,এখন কার পিছনে ছুটবেন? বউয়ের? নাকি, চশমার?

 

দুই
মিল্টন ভাই খুব কষ্ট করে নিজের চাকরিটা বউয়ের শহরে করিয়ে নিলেন। বউকে যে তিনি খুব ভালোবাসেন।বউয়ের সবকিছুর দিকে কড়া মনোযোগ শুরু থেকেই।এখন তার কাছে প্রতিটা রাতই উত্তম বলে মনে হয়। সারাদিন মিল্টন ভাইয়ের গভীর প্রশান্তি লাগে।চোখে- মুখে অদ্ভূত রকমের সুখ খেলা করে। অফিসে কাজ করতে করতে মাঝে মাঝে গুনগুন করে সুরও ভাজেঁন।

একদিন এমন সময় বউটি ফোন করে শুকনো আমলকি আনতে বললেন।তিনিও রোমান্টিক গলায় জানতে চাইলেন, ‘এটা দিয়ে কি রান্না হবে।’

হুংকারসহ জবাব এল, ‘এটা দিয়ে কোনো রান্না হবেনা। হেয়ার ট্রিটমেন্ট হবে। বুদ্ধু কোথাকার!’

আরেকদিন যখন অ্যালোভ্যারা আনার কথা হলো তখন তিনি পুরোপুরি অপ্রস্তুত।বউয়ের দৃষ্টিতে অপদার্থ, বোকারাম ইত্যাদিতে পরিণত হলেন, কিন্তু অ্যালোভ্যারা চিনতে পারলেন না। এটা দিয়ে কি হয় তাও তিনি জানেন না। বউয়ের কাছ থেকে বর্ণনা শুনে খুজঁতে বের হলেন। সারা শহর খুঁজে শেষে কলোনি বাজারের চিপা রাস্তার মোড়ে পেলেন অ্যালোভ্যারা। তিনি যেটা ইন্টারমিডিয়েটে ঘৃতকুমারী পড়েছিলেন সেটা এতদিনে অ্যালোভ্যারা হয়ে গেছে কে জানত!

মিল্টন ভাই একটা বাইক কিনেছেন। বাইকের পিছনে বউকে বসিয়ে সারা শহর ঘুরতে দারুণ লাগছে। বউও খুশি। বউ যখন পেছন থেকে কোমর জড়িয়ে বসেন, বউয়ের খুচরো চুলগুলি তার পিঠের ওপর খেলা করতে থাকে, তখন নিজেকে নিজের কাছে সার্থক পুরুষ বলে মনে হয়।

একদিন মিল্টন ভাই বউ নিয়ে মার্কেটে গেলেন। বাইকে করে দুজন চললেন। বউ কি কি সব কসমেটিকস্ কিনলেন নিজের জন্য, মিল্টন ভাইয়ের জন্যেও। সামান্য ক’টা জিনিস, বিল আসলো বিয়াল্লিশ শ’ টাকা। বিল বউ দিলেন। চাকুরীজীবী বউ বলে কথা। এবার মিল্টন ভাই ঠিক করলেন বউকে খাওয়াবেন। নিয়ে গেলেন শহরের বিখ্যাত লাবাম্বা রেস্টুরেন্টে।খাওয়া-দাওয়া শেষ হলো। এই বিলও বউটিই দিয়ে দিলেন। মিল্টন ভাই নিজেকে অতি সুখী মানুষদের একজন বলে মনে করতে লাগলেন। বউ নিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হলেন। মনে মনে ভাবছেন, বউ এভাবে সাপোর্ট দিলে একটা গাড়ি কিনে ফেলা যাবে সহজেই। তারপর বউকে পাশে নিয়ে লং ড্রাইভে চলে যাবেন। এসব সাত-পাচঁ ভাবতে ভাবতে বাইকে স্টার্ট দিলেন।মনে মনে করছেন নানা ধরনের সুখী পরিকল্পনা।কিছুদূর যাওয়ার পর পিছন ফিরে দেখেন বাইকে বউ নেই।

তারমানে বউ ওঠেই নি! তিনি চলে এসেছেন! পড়ি কি মরি করে আবার ছুটলেন লাবাম্বার সামনে। গিয়ে দেখেন বউ পা ছড়িয়ে হাপুস নয়নে কান্নাকাটি করছেন আর মোবাইল ফোন টিপে যাচ্ছেন। ধীরে ধীরে যাবতীয় মামাত ভাই, খালাত ভাইয়েরা এসে উপস্থিত হতে লাগল।

এখন কি করবেন মিল্টন ভাই? তিনি দিশেহারা…

 

তিন
বন্ধুরা কিছু কিছু হাস্যকর মন্তব্য করে যে বউ যদি চাদঁটাকেও এনে দিতে বলে মিল্টন ভাই নাকি সে চেষ্টাও করবেন। চাঁদের দিকে লাফালাফি করবেন, তার হাত-পা ভাঙতে পারে, তবু তিনি চাঁদ ধরার চেষ্টা করবেন। কারণ বউ চেয়েছে। মিল্টন ভাই বন্ধুদের দিকে সরু চোঁখে তাকান ঠিকই কিন্তু মনে মনে খুশিও হন। ঠিকই তো। বউটার জন্য তার অনেক কিছুই করতে ইচ্ছা করে। কিন্তু বউয়ের সামনে এলেই এমন অস্থির লাগে যে সবকিছু কেমন যেন গুলিয়ে যায়।

বউয়ের জন্মদিনকে উপলক্ষ্য করে দু’দিন আগে কিনলেন একটা রিস্টলেট। ভাবলেন একটা সারপ্রাইজ দিবেন।কিসের কী! বাসায় ঢুকে তার এমন অস্বস্তি লাগতে লাগল! তিনি অস্থিরবোধ করতে লাগলেন। বউ বুঝে গেল কিছু একটা গল্প আছে। বউয়ের কঠিন প্রশ্নের তোপে পড়ে মিল্টন ভাই রিস্টলেটের কথা বলে দিলেন। সারপ্রাইজ আর দেওয়া হলো না।

মিল্টন ভাই বউ নিয়ে দার্জিলিং গেলেন। পাহাড় দেখবেন তারা। বিদেশ বিভূঁইয়ে বউয়ের কাপড় চোপড় ঠিকঠাক করা থেকে শুরু করে ওয়াশরুমটা পর্যন্ত বারবার পানি দিয়ে পরিষ্কার করে দিচ্ছিলেন, খুতখুতে স্বভাবের বউয়ের যেন কষ্ট না হয় কোনোকিছুতে। বউ পাহাড় চূড়ার সৌন্দর্য দেখে বিমোহিত। আর তিনি দেখেন বউকে। ফিরে আসার পর বন্ধুদের কেউ কেউ পাহাড়ের সৌন্দর্যের কথা জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গেছেন। কী ই বা বলবেন? পাহাড় দেখার সময়ই তো পান নি তিনি।

এখন চলছে আরেক ব্যাপার। বউ সেই চাকরি বাদ দিয়েছেন। আজকে যাচ্ছেন আরেকটি নতুন চাকরিতে যোগ দিতে। বউয়ের চোখেমুখে দারুণ উত্তেজনা। সকাল থেকে প্রস্তুতি চলছে। শনিবার, মিল্টন ভাইয়ের অফিস ছুটি।তিনি বউয়ের আশেপাশে ঘুরঘুর করছেন। বউ চেহারায় কি কি সব যেন মেখেছে। আরও সুন্দরী দেখাচ্ছ তাকে। একটু অন্যরকমও যেন।

বউ শাড়ি পরছেন। মিল্টন ভাইকে বললেন শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করে দিতে। মিল্টন ভাইও নিচে বসে কুঁচি ঠিক করতে লাগলেন। হঠাৎ তার মাথার ভেতর কি যেন করে উঠল। শাড়ি- টাড়ি ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বউকে জড়িয়ে ধরলেন। বউ অস্থির, কিন্তু মিল্টন ভাই এবার সাহসী পুরুষ। বউকে পাঁজাকোলা করে তুলে ফেললেন। বউয়ের কানের কাছে মুখটি নিয়ে গিয়ে চুলগুলো সরিয়ে ফিসফিস করে বললেন- ‘রূপালী ধান খুঁটবে বলে ছটফটাচ্ছে শালিক।’ ❑

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension