অনুবাদআন্তর্জাতিক

মার্কিন বাহিনী আফগানিস্তান ছাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে নারীদের সুদীর্ঘ লড়াইয়ের সম্ভাবনা

অ্যাক্টিভিস্টরা মার্কিন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আফগানিস্তান ছাড়ার সঙ্গে ভবিষ্যতে নারীদের সুদীর্ঘ লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন। সিমা সমর, একজন বিশিষ্ট এক্টিভিস্ট বিগত ৪০ বছর ধরে আফগানিস্তানের নারীদের অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন


মূল প্রতিবেদন : ক্যাথি গ্যানন


কাবুল, আফগানিস্তান (এপি): বিশিষ্ট কর্মী সীমা সমর বিগত ৪০ বছর ধরে আফগানিস্তানে নারীদের অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। তার বিশ্বাস, সংগ্রাম অবসানের এখনো সুদীর্ঘ পথ বাকি। বিশেষত এমন একটা সময়ে যখন কিনা সহিংসতা প্রতি মূহুর্তে বেড়েই চলেছে, প্রতিদ্বন্দ্বী আফগান গোষ্ঠীগুলির মধ্যকার শান্তি আলোচনা ঝুলে আছে এবং মার্কিন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী দল আগামী মে মাসে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

বিশিষ্ট কর্মী ও চিকিৎসক সিমা সমর, গেল ৪০ বছর ধরে আফগানিস্তানে নারীর অধিকারের জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন (এপি ছবি / রহমত গুল)

চৌষট্টি বছর বয়সি সীমা সমর আফগানিস্তানের নিরাপত্তাহীনতা ও অস্থিতিশীলতা বর্তমানে ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে জানিয়ে দেশের ভবিষ্যত নিয়ে তার উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছেন।

সমর আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে নিজের বাসায় একটি বিস্ফোরণ প্রতিরোধক প্রাচীর/ব্লাস্ট ওয়াল, গার্ড এবং একটি জার্মান শেফার্ডের (যেটা কিনা কেবলমাত্র রাস্তায় চলাচলকারী গাড়ির দিকে লক্ষ্য রাখে এবং নিজের সুবিধাজনক অবস্থানে থেকেই দৌড়ঝাঁপ করে) সুরক্ষাবলয়ের অভ্যন্তরে বসে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আগামীকাল কি ঘটবে তা কেউ বলতে পারে না’।

যদিও অনেক কিছু নিয়ে বাজি ধরা আছে এবং ‘২০ বছরে অনেক বলিদান দেওয়া হয়েছে’, তিনি বলেন, সমাজনেতাদের মধ্যেকার উদ্বেগ লক্ষ্য করে আমেরিকা এখন তার দীর্ঘতম যুদ্ধ থেকে ভালোভাবে বেরিয়ে যাওয়ার পন্থা অবলম্বন করেছে।

তালেবান ও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যকার ২০২০ সালের চুক্তি অনুযায়ী মার্কিন বাহিনী ১ মে, ২০২১-এর মধ্যে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে। বাইডেন প্রশাসন জানিয়েছে, তারা চুক্তির পর্যালোচনা করছে। বাইডেন প্রশাসন ধারণা করছে, নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী বিষয়টা সম্পন্ন নাও হতে পারে।

গত সপ্তাহে সমর এবং কয়েকজন সমাজ প্রতিনিধি মার্কিন শান্তিদূত জালমে খলিলজাদের সঙ্গে একটি জুম কলে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি তাদের আশ্বস্ত করে বলেন বিগত ২০ বছরের অর্জন রক্ষার্থে ওয়াশিংটন আফগানিস্তানের নাগরিক সমাজের সাথে রয়েছে।

সমরের কাছে এই জুমকলটি শেষ মুহুর্তে বলা কথার মতো মনে হয়েছিল। কারণ, খলিলজাদ তালেবান মধ্যস্থতাকারী, রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধবাজ রাজনীতিবিদ গণের সাথে মুখোমুখি বৈঠকের জন্য আলোচনার জন্য কাতারের উদ্দেশ্যে কাবুল ছেড়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে এটা অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

যুদ্ধবাজ এবং আফগানদের আস্থা অর্জনের জন্য লড়াই রত রাজনৈতিক নেতৃত্বে আবারও বিশিষ্টতা দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে সমর বলেন, ‘আমার মনেহয় অতীতেরই পুনরাবৃত্তি ঘটছে’। মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের মাধ্যমে ২০০১ সালে তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সময় তিনি ন্যায়বিচারের জন্য জোর দিয়েছিলেন, পূর্ববর্তী সরকারের অপরাধীদের শাস্তি দেওয়া, জবাবদিহিতা, সাম্যতা এবং ন্যায়বিচারের অগ্রাধিকারের জন্য।

১৯৯০ এর দশকে গৃহযুদ্ধে অংশ নিয়ে কাবুলকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে ফেলা যুদ্ধবাজ, যারা তালেবান পরবর্তী প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ভূমিকা পেয়েছিল তাদের বিরুদ্ধে তিনি নিষ্ফল হুঁশিয়ারি করেছিলেন। সেসময় তিনি মৃত্যুর হুমকিও পেয়েছিলেন এবং তাকে লক্ষ্য করে ‘আফগানিস্তানের সালমান রুশদি, সীমা সমর’ অপবাদ প্রচার করা হয়েছিল।

সমর বলেন, ‘সবাইকেই জেলখানায় পুরে দিতে হবে, আমি সেটা বলি না, কিন্তু অপরাধ অপরাধই। তাদের অন্ততপক্ষে, ‘আমি দুঃখিত’ কথাটা বলার মতো সাহস থাকা উচিত। এটা একটা সূচনা।’ তিনি বলেন, প্রদেয় প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে এবং স্বাধীনভাবে যুদ্ধবিরতি মনিটরিং করতে আফগানিস্তানের আন্তর্জাতিক কমিউনিটির সঙ্গে যুক্ত হওয়া দরকার। তিনি বলেন, অপরাধীদের শাস্তি হওয়া উচিত।

অনেকের মনের তাৎক্ষণিক প্রশ্ন হলো কে বা কারা সিভিল সোসাইটির সদস্যদেরকে পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করে হত্যা করছে। ইসলামিক স্টেট গ্রুপটি বেশ কয়েকটি হামলার দাবি করেছে। তালেবানরা বেশিরভাগ ঘটনায় নিজেদের জড়িত থাকাকে অস্বীকার করেছে। সরকার এবং তালেবানরা প্রায়শই একে অপরকে দোষারোপ করে। সমরের সূচনাকৃত এবং নেতৃত্বাধীন আফগানিস্তানের স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের ২০০২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তথ্য অনুসারে, গত বছর এই টার্গেট কিলিং পূর্ববর্তী হত্যার সংখ্যার তুলনায় তিনগুণ বেড়েছে।

কমিশনের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ ফরহাঙ বলেছেন, ২০২০ সালের টার্গেট হামলায় ৬৫ জন নারী নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন। আক্রমণকারীরা একটি প্রসূতিসদনে হামলা চালায়। দুইবার তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ৫০ জনকে হত্যা করে, যাদের অধিকাংশই ছিল ছাত্র। নিহতদের মধ্যকার কয়েকজন হলেন সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, তরুণ বিচারক, আইনজীবী। বিশ্লেষক এবং আফগানিস্তান সরকারের সাবেক উপদেষ্টা টোরেক ফরহাদি বলেন, ‘এটা অনেকটা আমাদের মধ্য থেকে মহামূল্যবান মুক্তোগুলো ছিনিয়ে নেওয়ার মতো।’

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট, অ্যান্টনি ব্লিংকেন সোমবার আন্তর্জাতিক নারী দিবসে স্বীকৃতি স্বরূপ, ছয়জন আফগান মহিলাকে ইন্টারন্যাশনাল উওমেন অব কোরেজ পুরষ্কার দিচ্ছেন, যারা গত বছরের নিহতদের তালিকায় ছিলেন। অনুষ্ঠান আয়োজনের আগে ব্লিংকেন বলেছেন, ‘এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড আফগানিস্তানের নারীদের হত্যার লক্ষ্যে পরিণত হওয়ার পরিসংখ্যান বৃদ্ধির উদ্বেগজনক পরিস্থিতির প্রতি জোর দেয় এবং যুক্তরাষ্ট্র এই সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।’

রবিবার আফগানিস্তানের রাষ্ট্রপতি আশরাফ গনিকে উদ্দেশ্য করে আফগানিস্তানের টলোনিউজে প্রকাশিত ব্লিংকেন এর চিঠিতে বলা হয়েছে, ব্লিনকেন সরকার ও তালেবানদের মধ্যে স্থগিত শান্তি প্রক্রিয়া পুনরায় চালু এবং জোরদার করতে সহায়তা করার পদক্ষেপের প্রস্তাব জানিয়েছেন। এই চিঠিতে রাশিয়ার, চীন, পাকিস্তান, ইরান, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রদূতদের সাথে জাতিসংঘ সুবিধাযুক্ত সম্মেলনের জন্য উভয়পক্ষকে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে, ‘আফগানিস্তানে শান্তির সমর্থনে একটি সমন্বিত পন্থা নিয়ে আলোচনা।’

সমর বলেন, তালেবানদের ক্ষমতাচ্যুত করার পরে গত ২০ বছরে অনেক কিছু অর্জন হয়েছে। এখন মেয়েদের স্কুলগুলো খোলা। নারীরা বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়েছেন, রাজনীতি করছেন, বিচারক হয়েছেন। এমনকি নারীরা এখন তালেবান ও আফগান সরকারের যুদ্ধবিরতির পন্থা খোঁজার মধ্যস্থতার টেবিলেও রয়েছেন।

কিন্তু এই অর্জন এখনো সাবলীল নয় এবং আফগানিস্তানে মানবাধিকারকর্মীদের অনেক শত্রু রয়েছে। জঙ্গি এবং যুদ্ধবাজদের থেকে শুরু করে ক্ষমতার বিরুদ্ধে সমালোচনা বা প্রতিবাদকে যারা দমন করতে চান, সবাই।

জর্জটাউন ইনস্টিটিউট ফর উওমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি এবং অসলোতে পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট দ্বারা সংকলিত ২০১৯ মহিলা, শান্তি ও সুরক্ষা সূচী অনুসারে, নারীর জন্য বিশ্বের সবচেয়ে কুখ্যাত স্থান হিসাবে ইয়েমেনের পরে আফগানিস্তান দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। আফগান নারীদের নিরক্ষরতার হার ৮২% এবং আফগান কারাগারের অধিকাংশ নারীকে বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়ার মতো তথাকথিত ‘নৈতিক’ অপরাধের জন্য কারাগারে বন্দী করা হয়েছে।

সমর, যিনি মাত্র ২৩ বছর বয়সে একটি শিশু পুত্র সহ মেডিকেলের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে একজন এক্টিভিস্ট হয়ে উঠেছিলেন। তিনি বলেন, ন্যায়বিচার ও সাম্যের পথের রাস্তাটা সবসময় সুদীর্ঘ হয়। তৎকালীন কমিউনিস্ট সরকার তার অ্যাক্টিভিস্ট স্বামীকে গ্রেপ্তার করে এবং তারপর তিনি আর কোনোদিন তার দেখা পান নি। সমর, আফগানিস্তানের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় হাজারার একজন সদস্য, যিনি বহু শতাব্দী ধরে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, যিনি বলেন, জাতিগত ও লিঙ্গ বৈষম্য এখনও ব্যাপকভাবে বিস্তৃত।

তারা বেশিরভাগ সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলিম, আফগানিস্তানের শিয়া মুসলিম এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামিক স্টেট জঙ্গিদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। অবিচ্ছিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের আফগানিস্তান অন্যরকম, সাম্প্রতিক পরিদর্শনে একটি টি-শার্ট পরে চলে আসা অসংখ্য পুরষ্কার প্রাপ্ত সমর ঘোষণা করেন, ‘এটাই একজন ফেমিনিস্টের মতো দেখতে।’

মানবাধিকার, নারী অধিকার এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে এখন অন্তত আলোচনাটা হচ্ছে। সমর বলেন, ‘অন্ততপক্ষে আমরা এখন নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতার কথাটা বলতে পারছি। এর আগে এগুলো এই দেশে কোনও ঘটনাই ছিল না আমার মতো কিছু ক্রেজি মানুষের কাছে ছাড়া।’❐

ভাষান্তর : জাহান আরা দোলন

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension