রাজনীতি

বেপরোয়া পল্লবীর মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী নুসরাত

রাজধানীর পল্লবীর মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী নুসরাতের বিরুদ্ধে হামলা, মারধর, হয়রানি, থানায় দালালি, দোকানে খেয়ে টাকা না দেওয়া, ফুটপাতে চাঁদাবাজি ও বিচার সালিশের নামে টাকা হাতিয়ে নেওয়াসহ ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। সাধারণ মানুষ ছাড়াও নিজ দলের নেতাকর্মীরাও বিভিন্ন সময় হয়রানির শিকার হয়েছেন এই নেত্রীর হাতে।

নুসরাত পল্লবী থানার ৩নং ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। তার স্বামীর নাম বিটু। স্বামী বিটুর বিরুদ্ধেও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। মিরপুর ১০নং হোপ স্কুলের ফুটপাত নিয়ন্ত্রণসহ নিরীহ মানুষকে ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিটুর বিরুদ্ধে। স্বামী বিটুর শেল্টারে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এই মহিলা আওয়ামী লীগ নেত্রী নুসরাত।

নুসরাত ও তার স্বামী বিটুর বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় একাধিক অভিযোগ রয়েছে। গত ৪ নভেম্বর মিরপুর ১০ নম্বরের রেশমা আক্তার নামে এক ফুটপাত দোকানি নুসরাতের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় একটি জিডি করেন। জিডি নং-৪১২। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, একটি কাজের উদ্দেশ্যে নুসরাতকে ১১ হাজার টাকা দেই। সেই কাজ শেষ হওয়ার পরও সে আরও টাকা চায়। টাকা না দেওয়ায় আমার ক্ষতির চেষ্টা করে। আবার বিভিন্ন সময় ভয়ভীতি ও হুমকি দেয় নুসরাত।

ফুটপাত দোকানি রেশমা বলেন, কিছুদিন আগে একটি জিডির ঘটনায় আমার ছোটভাইকে পল্লবী থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। বিষয়টি আমি নুসরাতকে জানাই। ওই দিন নুসরাত আমাকে বলে ভাইকে ছাড়াতে ৩০ হাজার টাকা লাগবে। আমি তাকে (নুসরাত) বললাম জিডি হলে কি কাউকে থানায় আটকে রাখা যায়। এত টাকা কেন লাগবে। আর আমার ভাই তো কোনো অপরাধ করে নি। তখন সে (নুসরাত) বলল টাকা না দিলে তোমার ভাইকে পুলিশ ছাড়বে না। আমি তাকে ১১ হাজার টাকা দেই। এরপর স্থানীয় এমপির (সংসদ সদস্য) কাছে ঘটনাটা জানাই। তিনি (এমপি) থানায় ফোন করেন। আমার ভাইকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করে ছেড়ে দেয়। নুসরাত আবারো এসে আমার কাছে আরও টাকা চায়। আর বলে বাকি ১৯ হাজার টাকা দিতে হবে। থানায় নাকি এ টাকা দিতে হবে। আমি তাকে বললাম এমপি স্যার ফোন দেওয়াতে আমার ভাইকে ছেড়ে দিয়েছে। এখন কেন টাকা দিব। আমি তার (নুসরাত) কাছে যে ১১ হাজার টাকা দিয়েছি তা ফেরত চাই। সে টাকা না দিয়ে উল্টো আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।

এদিকে গত ১৯ নভেম্বর শুক্রবার একটি মারামারির ঘটনায় নুসরাত ও তার স্বামী বিটুসহ সাতজনের বিরুদ্ধে পল্লবী থানায় একটি মামলা হয়। মামলার বাদী ময়না নামের এক নারী। মামলার আসামিরা হলেন- শাহজাহান, রিদয়, বিল্লাল, তানিয়া, আজমেরী, নুসরাত, বিটু ও অজ্ঞাত ৪-৫ জন।

মামলায় বাদী অভিযোগে উল্লেখ করেন, কিছুদিন ধরে আসামিদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়াদি নিয়ে বিরোধ চলছিল। এই বিরোধের জেরে আসামিরা বিভিন্ন তারিখ ও সময় বিভিন্ন মাধ্যমে আমাকে নানা ধরনের ভয়ভীতি ও হুমকি দিত। এর আগে নুসরাত ও বিটুর হুকুমে আসামিরা আমাকে মারধরসহ ধারালো চাকু দিয়ে আমার গলার বাম পাশে আঘাত করে গুরুতর রক্তাক্ত জখম করে। এরপর নুসরাত বিষয়টি মীমাংসার জন্য আমাকে তার বাসায় ডাকে। ওই দিন তার বাসায় না যাওয়ায় রাত ১১টার সময় অজ্ঞাতনামা ৪-৫ জন লোক হাতে লোহার শাবল, রড নিয়ে খালপাড় বস্তিতে আমার বাসার ভেতরে প্রবেশ করে অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। তারা এলোপাতাড়ি মারপিট করে আমার শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম করে। সন্ত্রাসীরা তাদের হাতে থাকা লোহার শাবল দিয়ে আমার গলার বাম পাশে আঘাত করে। একপর্যায়ে তারা আমার পরনের কাপড়-চোপড় ও চুল ধরে টানা হেঁচড়া করে আমার শ্লীলতাহানি করে। তারা আমার বাড়ির ভেতর লুটপাট করে টাকা ও গহনা নিয়ে যায়।

ময়না বলেন, নুসরাত ও বিটুর নির্দেশে তার বাহিনী আমার ওপর হামলা চালায়। নুসরাত ও তার স্বামী বিটুর অত্যাচারে ৩নং ওয়ার্ডের জনগণ অতিষ্ঠ। স্বামী–স্ত্রীর সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড থেকে এলাকাবাসী মুক্তি চায়।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও পল্লবী থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, এ ঘটনায় থানায় পালটাপালটি মামলা হয়েছে। আসামি ধরতে অভিযান চলছে।

৩নং ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের কর্মী আসমা বলেন, দশ দিনের কথা বলে নুসরাত আমার কাছ থেকে ৭০ হাজার টাকা নিয়েছে। আজ ২ বছর হতে চলল। টাকা চাইলেই নুসরাত আমাকে হুমকি দেয়। আমি স্বর্ণ বন্ধক রেখে এ টাকা এনে দিয়েছি নুসরাতকে। ২ বছর ধরে সুদ টানছি। শুধু আমি কেন ৩নং ওয়ার্ডের মাছ, মুরগি, ডিম, সবজি দোকানিসহ সব দোকানদারই ওর কাছে টাকা পায়। ও (নুসরাত) সবাইকে ভয় দেখায় ও অনেক বড় আওয়ামী লীগ নেত্রী। আর ওর স্বামী বিটু ‘কিলার’। কেউ ওদের কিছু করতে পারবে না।

আসমা আরও বলেন, নুসরাত আমার টাকা ফেরত না দিলে আমি আত্মহত্যা করব। আর এ জন্য দায়ী থাকবে নুসরাত। কালকেই (রোববার) ওর বিরুদ্ধে জিডি করব।

পল্লবী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সালমা কামাল বলেন, নুসরাতের ব্যাপারে কয়েকটি অভিযোগ আমাদের কানে এসেছে। ঢাকা মহানগরের নেতাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বলব।

পল্লবী থানা মহিলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রিনা বলেন, নুসরাতকে কিছুদিন আগে ৩নং ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়েছে। ওর বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ শুনেছি। তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেব।

নিজের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের বিষয়ে নুসরাত বলেন, আমি কারো বিপদের কথা শুনলে ঝাঁপিয়ে পড়ি। চেষ্টা করি সাধ্যমতো উপকার করতে। থানায় আমার নামে কোনো মামলা হয়েছে কিনা জানি না। যদি হয়ে থাকে মামলার একটা কপি আমাকে দেখান। আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলেও সেটা মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension