মুক্তমত

বই: জ্ঞান এবং আনন্দের জননী

বিভাস গুহ


জ্ঞানের তৃষ্ণা মানুষের আজন্মকালের। সে তৃষ্ণা মেটাবার জন্য চেষ্টারও কোনো ত্রুটি নাই। তৃষ্ণা মেটাতে দিবারাত্র মানুষের ছুটে চলা। শিখে চলেছেও নিরন্তর। মানুষের এই নিরন্তর ছুটে চলা শেখাচ্ছে অনেক কিছু। শেখার যেমন কোনো বয়স নেই তেমনি শেখারও শেষ নেই। আমৃত্যু মানুষের শেখা। শেখার মাধ্যমে মানুষ অজ্ঞানের তিমির থেকে আলোর সন্ধান খুঁজে পাচ্ছে। সে আলো বিশ্বকে জয় করতে পথ দেখাচ্ছে। মানুষ চাঁদের বুকে পদচিহ্ন এঁকে দিয়েছে, মঙ্গল গ্রহকে জয় করেছে সেটা আমরা জানতে পারছি বইয়ের পাতায় তাঁদের জয়ের ইতিহাস পড়ে। বইয়ের পাতায় লেখা ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে। আমাদের মধ্যেও প্রেরণা, উৎসাহ, উদ্দীপনা জাগছে নতুন কিছু করার। বিখ্যাত হয়ে জগৎব্যাপী পরিচিত হবার। যুগে যুগে বিখ্যাত মানুষের জীবনকথা লেখা আছে বইয়ের পাতায় পাতায়। বই পড়ে সেকথা আমরা অনায়াসে জানতে পারি। কীভাবে স্বামী বিবেকানন্দ সনাতন ধর্মের ধ্বজাকে বিশ্বে সমুন্নত রেখে বিশ্ববাসীকে সনাতন ধর্মের উদারতার কথা শুনিয়েছেন। সব ধর্মের প্রতি সনাতন ধর্মের বিশ্বাসের কথা শুনিয়ে বিশ্ববাসীকে বিমোহিত করেছেন।

হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, শিল্প, সাহিত্য ও মহামানবদের সুনির্মল কর্মধারার যে প্রবাহমান চিত্র তা কালো অক্ষরে যার বক্ষে যুগ যুগ ধরে কালের সাক্ষী হয়ে মুদ্রিত আছে তা হচ্ছে বই। বই জীবনকে যেমন সুন্দর করতে পারে আবার জ্ঞানের পরিধিকেও বাড়াতে পারে। তাই বইকে বলা হয় জ্ঞান এবং আনন্দের জননী।

বই পড়ে অতীতকে যেমন জানা যায় তেমনি মহামানবের জীবনচরিত থেকে শিক্ষা লাভ করে নিজের জীবনের গতিপ্রবাহকে সফলতার পথে পরিচালিত করার জ্ঞান লাভ করা যায়। কবির ভাষায়- মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন/ হয়েছেন প্রাতস্মরণীয়/ সে পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্তি ধ্বজা ধরে/ আমরাও হব বরণীয়। নিজেদেরকে বরণীয় করে তোলার জন্য করণীয় শিক্ষা বই পড়ে জানা যায়। তাই বইকে বলা হয় আলোর উৎস। বই জ্ঞানের আলোয় জগতকে আলোকিত করে আছে। জ্ঞানের আলোয় নিজেকে আলোকিত করতে হলে বই পড়ার কোন বিকল্প নেই। বইয়ের মাঝে জীবন নাট্যের যে ঘটনাপ্রবাহ লেখকেরা কল্পনার তুলিতে চিত্রিত করেন তা আমাদের চতুর্দিকে ঘটে যাওয়া ঘটনার বাস্তব চিত্র। তাই বই হচ্ছে অতীত এবং বর্তমানের ঘটে যাওয়া ঘটনার লিখিত দলিল।

বইকে বলা হয় অফুরন্ত জ্ঞানের ভাণ্ডার। যেখানে ডুব দিয়ে আহরণ করা যায় জ্ঞান রত্ন। যে রত্নমালায় নিজেকে এবং জগতকে সমৃদ্ধ করা যায়। বই পড়ে যে জ্ঞান লাভ করা যায় সে জ্ঞানের সুধাধারায় অভিস্নাত করা যায় নিজেকে এবং নিজের চতুর্পাশকে।

দেহকে সুস্থ সবল ও নিরোগ রাখার জন্য যেমন পুষ্টিকর খাদ্যের প্রয়োজন ঠিক তেমনি মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য সদগ্রন্থ পাঠের প্রয়োজন। অর্থাৎ দেহের ক্ষুধা নিবারণের জন্য খাদ্য আর মনের ক্ষুধা নিবারণের জন্য বই পড়া।

মানুষের জীবন কর্মময়। কর্মের মাঝেও রয়েছে সবার কমবেশি অবসর। প্রাত্যহিক কর্মময় জীবনের ব্যস্ততা ও সাংসারিক জীবনের একঘেয়েমি থেকে মানুষ মাঝে মাঝে নিজেকে মুক্ত করে প্রশান্তির বাতাবরণে হারিয়ে যেতে চায়। সুখ দুঃখ হাসি কান্না আনন্দ বেদনাময় জীবন থেকে মাঝে মাঝে মানুষ ছুটি চায়। হারিয়ে যেতে মন চায় স্বপ্নলোকের অচিনপুরে। যেখানে নেই কোনো ব্যস্ততা, নেই কোন কোলাহল আছে শুধু প্রশান্তময় এক জীবনের পথে ক্লান্তিহীন অভিযাত্রা। একমাত্র বইই পারে সে অভিযাত্রায় আলোর পথ দেখাতে। বইই পারে স্বপ্নলোকের অচিনপুরের বাসিন্দা করতে।
এমন কিছু সময় জীবনে এসে উপস্থিত হয় যখন চতুর্পাশে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব পরিবার পরিজনের ভীড়েও নিজেকে খুবই নিঃস্ব মনে হয়। সে নিঃসঙ্গতার মাঝে বই পারে একমাত্র সঙ্গী হতে। সেজন্য বলা হয়, নিঃসঙ্গতার একমাত্র উত্তম সঙ্গী হচ্ছে বই।

বইয়ের কালো অক্ষরে অপরিসীম জ্ঞানের যে আনন্দের ছোঁয়া লুকিয়ে আছে সে ছোঁয়ার পরশ আজীবন মানুষের মনকে জ্ঞানালোকে সতেজ ও স্নিগ্ধ করে রাখে। সেজন্য বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ম বলেছেন, ‘রুটি মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চুল ঘোলাটে হয়ে যাবে, কিন্তু একখানা বই অনন্ত যৌবনা যদি তেমন বই হয়।’ যত বেশি বই পড়া যায় তত বেশি কল্পনা শক্তি বৃদ্ধি পায়।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে আমরা অনেকে অপ্রয়োজনে অনেক সময় অর্থ ব্যয় করে থাকি সে অপ্রয়োজনীয় অর্থ যদি বই কেনার পিছনে ব্যয় করি তবে সে অর্থের যেমন সদ্ব্যবহার করা হয় অাবার সে অর্থ দিয়ে কেনা বই নিজেকে এবং পরিবারকে জ্ঞানের আলোয় সমৃদ্ধ করে তোলার জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। সেটার মাধ্যমে পরিবারে বই পড়ার একটা চর্চা তৈরি হয়ে যায়। সময়কে সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য একটা ভালো অভ্যাস তৈরি হয়। যে অভ্যাস ভালো মানুষ তৈরিতে সহযোগিতা করে। জ্ঞানভিত্তিক একটা পরিবার এবং সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখে। পাশাপাশি পরিবারে একটা পাঠাগার গড়ে ওঠে। পরিবারে আলমারি পূর্ণ অনেক জিনিস থাকে কিন্তু বইয়ের জন্য কোনো আলমারি থাকে না। প্রত্যকের পরিবারে বই রাখার জন্য অন্তত একটা আলমারি রাখা প্রয়োজন। যাতে পরিবারের সদস্যরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বইগুলো নাড়াচড়া করে দেখতে দেখতে আপনা থেকেই বই পড়ার প্রতি আগ্রহ তৈরি হবে। সে আগ্রহ একসময় ভালো পাঠক তৈরি করে ফেলবে। সেটাই প্রয়োজন আজ সমাজের জন্য। নৈতিকতার অবক্ষয় থেকে সমাজকে মুক্ত করার জন্য বইই হতে পারে উৎকৃষ্ট হাতিয়ার।

প্রতিনিয়ত সমাজে সামাজিক কোনো না কোনো অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সে অনুষ্ঠানগুলোতে আমরা নানারকম উপহার সামগ্রী দিয়ে অংশগ্রহণ করে থাকি। সেখানে নিত্য প্রয়োজনীয় অনেক জিনিসও উপহারের তালিকায় থাকে। বহু টাকা মূল্যের উপহারও স্থান পেয়ে থাকে। কিন্তু বই উপহার হিসেবে দেবার প্রবণতা আমাদের খুবই কম। আমাদের কালচারকে আমরা এখনও সেভাবে গড়ে তুলতে পারি নি। অথচ বইই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ উপহার। কারণ বই নিজেকে সমৃদ্ধ করে। জানার ক্ষেত্রকে বিস্তৃত করে। আঁধার দূরীভূত করে আলোর উদ্বোধন ঘটায়। সূর্যের আলো জগতের অন্ধকার দূর করে আলোকিত করে আর বইয়ের আলো হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে পবিত্রতায় ভরে তোলে। সূর্য যেমন আলোর উৎস তেমনি বই জ্ঞানের উৎস।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরণের প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান থাকে যেগুলোতে বিজয়ীদের বই উপহার হিসেবে দেয়া যায়। তবে সে বই অন্তত শিক্ষার্থীরা পড়বে। পাঠ্যসূচির বাইরে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হবে। সে অভ্যাস তৈরি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

বইয়ের মাঝে যে জ্ঞান রয়েছে সে জ্ঞান মনের অন্ধকার দূর করে আলোকিত করে এবং মনের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। আমরা আমাদের বাইরের সৌন্দর্যকে বৃদ্ধি করার জন্য যত আগ্রহী সে তুলনায় অন্তরের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করার জন্য ততটা আগ্রহী নয়। বাইরের সৌন্দর্যের প্রতি আমাদের যতটা মোহ অন্তরের সৌন্দর্যের প্রতি ততটা মোহ না থাকার কারণে আমরা দিন দিন নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছি। মানবতাকে করছি ভূলুন্ঠিত। মানুষের প্রতি মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছে অন্তরের সৌন্দর্যকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণে।

অন্তরের সৌন্দর্যকে গুরুত্ব না দেয়ার কারণে নানারকম কুসংস্কার আমাদের আঁকড়ে ধরে। আমরা সেখান থেকে বের হতে পারি না। যদি জ্ঞানের আলোয় মনকে আলোকিত করা যায় তবে কুসংস্কারের কালো দিক আলো পাবে। কুসংস্কার থেকে মুক্ত হবার জন্য জ্ঞানের সঙ্গে সন্ধি করা প্রয়োজন।

প্রত্যেক মানুষ চায় প্রাত্যহিক জীবনের অবসর সময়কে আনন্দময় ও মধুময় করে তোলার জন্য। ব্যস্তময় জীবনের ক্ষণিক অবসর যেন রুটিন ওয়ার্ক থেকে মুক্ত হয়ে ভালোবাসার জগতে ছুটে যেতে। বাধা বিঘ্ন দায়িত্ববোধ কোনোকিছু যেখানে এসে আলিঙ্গন করবে না। মুক্ত বিহঙ্গের মতো জ্ঞানের আকাশ পানে উড়ে চলা যাবে। বইই সে পরিবেশ নিজেকে এনে দিতে পারে। তাই বইকে বলা হয় সুশৃঙ্খল ও আনন্দময় জীবনের পরম ও শ্রেষ্ঠ বন্ধু। যে বন্ধু শুধু অন্ধকার থেকে নিজেকে আলোকিত পথের সন্ধান দেবে। মানুষে মানুষে ভেদাভেদ বিভেদ বিচ্ছিন্নতা ভুলে ভালোবাসার অমৃত পরশে মনপ্রাণকে স্নিগ্ধ পরশে ভরিয়ে তুলবে। মানুষের জীবনে এ অবসর সময়টাকে সুন্দর, আনন্দময়, মধুময় ও প্রশান্তময় করে তোলার জন্য বই এর সঙ্গ করা প্রয়োজন।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension