কবিতাসাহিত্য

তোমাতে স্থানু, পাহাড়ের মতো

ফারজিনা মালেক


এখানে সন্ধ্যা নামে অনেক সময় ধরে। পাহাড়ের এই পাড়ে অন্ধকার। ঘুরে ঘুরে একটু এগুতেই ঝকঝকে দিন তখনও। তোমাদের বাড়ি থেকে অনেক পাহাড় দূরে আমাদের বাড়ি। কনে দেখা আলো পেতে যাই আরও কিছুদুর। দুই পাশে পাইনের বাগান ভুতুরে ঝোপের কারণে জঙ্গল বলে বিভ্রম হয়। ঝোপের ভেতর বুনো মুরগির সংসার নিয়ে ভাবি। সাঁইসাঁই ঝড়ে তার ঘর কী দোলে অনিশ্চয়তায়!

মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো বাড়ি। কারো কারো বাসায় অনেক এভোকাডো হয়। অথবা চেরি। পাহারা বিহীন বাক্সে গোল্ড কয়েন জমা দিয়ে, নিয়ে ফিরি এক ব্যাগ বুনো ফল। নাতিশীতোষ্ণ বলে আম, আনারস আর মনফুল ফোটে খুব। পাহাড়ের পায়ে বালিতে ফোটে তরমুজ। এ্যালজাইমার রোগীর মতো একাল সেকাল গুলায়ে ফেলি তখন। শওকত ওসমানের জননী। গল্পের কিচ্ছু মনে পড়ে না আমার। কেবল একটা আট দশ বছরের ছেলে। উদাম গায়ে বাবার সাথে মাঠে যাচ্ছে। ক্ষুদার্ত। আকাশে তাকানো যায় না এমন গনগনে সূর্য। বাবার বন্ধুর তরমুজ ক্ষেত। সবুজ, নকশাকাটা তরমুজ। গরমে বিলীন তরমুজ। বালির নীচে নদীর চোরা পানিতে লুকিয়ে রাখা তরমুজ। তাবৎ দুনিয়ার টগবগে গরমের বিপরীতে যেন ওই একটাই আরাম শীতলতা। আমি স্মৃতিবিভ্রমে তরমুজ দেখি, নকশাবোনা, গাঢ় আর হালকা সবুজের প্যাটার্ন। এইচডি মুভির মতন হাই রেজুলেশনে দেখি। ছেলেটার মুখ দেখি, ঘাম, ক্লান্ত কিন্তু কী টগবগে উত্তেজনা সেখানে!

তোমাদের বাড়ি থেকে অনেকগুলো পাহাড় দূরে আমাদের বাড়ি। সন্ধ্যার আবির রঙ তোমার বাড়ি থেকে আমার পাড়ায় আসতে জিরোয় গুণে গুণে ছত্রিশবার। সূর্যের আলো যখন আমার বাগানের সাদা পাথরে চিকচিক করে, তখন তুমি হয়ত ঠাণ্ডা হাওয়া থেকে কাপড় বাঁচাতে ত্রস্ত পায়ে ঘর বারান্দা করছ। একগোছা কাপড় হাতে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হঠাৎ থামলে কি? তোমার টানা বারান্দার পশ্চিমে যে বড় পাহাড়টা, তার উপরের একপায়ে দাড়িয়ে থাকা টাওয়ার কি মনে করালো সেইসব ঝড়ের সময়? মনে আছে, ডিসকানেকটেড কলের পরেই যেন মনে পড়ত আসল গল্পটাই তো করা হলো না?

ও, জানো? আমার সেই গোপন হাঁটাপথে, সেদিন গিয়ে দেখি শ্যাওলা জমে গেছে। মিইনিসিপ্যালটির ঝোপঝাড় পরিষ্কার অভিযানে বাস্তুছাড়া হয়েছে বনমোরগ। কী এক আক্রোশে তাকিয়েছিল আমার দিকে। মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে আমি নিদারুণ লজ্জিত হলাম। আধখাওয়া সসেজ ছুঁড়ে দিয়ে কোনোরকমে প্রায়শ্চিত্ত করার চেষ্টা করি। পাপবোধ বাড়ে আরও। প্রসেসড ফুডে স্পয়েল্ড করাকে পাপজ্ঞান করি। অথচ দেখ, তোমাকে কত হরহামেশাই কষ্ট দেই; পাপবোধহীন, প্রায়শ্চিত্তহীন।

তোমাকে ভাবি। কাপড় নিয়ে ঘরে ফিরেছ ততক্ষণে? মনে হয়, ঝুপ করে নেমে আসা সন্ধ্যার মতোই নিবিড় তুমি। চুপচাপ বুনো। বুকে ঝুপ করে চেপে বসা প্রবল অনুভূতি। বললে, ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে পশ্চিমের পাহাড় থেকে। আধপড়া বই নিয়ে গুটিসুটি মেরে ঢুকে যাবে কি লেপের ভিতর? সাথে কফি নিও? শোন, আমার এখানেও সূর্য লুকায়, ফিকে হয় আবির আলো। তুমি তবু কেন বসে থাকো, কী খুঁজে ফেরো প্রাণপণ? কী? দক্ষিণ হাওয়া? ঝড়ো শূন্যতা? হয়ত সে তোমার অস্তিত্বের মধ্যেই আছে! দেখো না, তুমি কিচ্ছু দেখো না; ছুঁয়ে দেখো না নিজের অস্তিত্ব। সে গায় গান- একা গুনগুন, শোন না তুমি কিছুই! কেউ কেউ পাহাড়ের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ারের মতো স্থানু হয়ে অপেক্ষা করে রোজ। তার কাছে আসে চলে সে মাতাল হাওয়া, মিশে যায় বুকে। বুকেমুখে, মুখেবুকে সে কী তুমুল গল্প চলে, জানো না, তুমি তো তখন গভীর ঘুমে।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension