যুক্তরাষ্ট্র

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ম্যারাডোনা, ৩৭ বছর পর প্রকাশ্যে সেই ছবি

ফুটবল থেকে দূরে কোথাও গেলেও ফুটবল যেন পিছু ছাড়ত না ডিয়েগো ম্যারাডোনার। মাঠে বল পায়ে তার অসাধারণ নৈপুণ্য যেমন কোটি মানুষকে মুগ্ধ করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনেও নানা মুহূর্তে বলের সঙ্গে তার সখ্যের ছবি উঠে এসেছে। এবার তেমনই এক বিরল মুহূর্ত সামনে এনেছেন তার দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত ট্রেনার ফার্নান্দো সিনিওরিনি।

১৯৮৯ সালের ১৫ নভেম্বরের কয়েকটি ছবি ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেছেন সিনিওরিনি। ছবিতে দেখা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত মার্কিন রণতরি ইউএসএস আইওয়ার ডেকে বিশাল কামানের দুটি নলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বল নিয়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা। আর্জেন্টিনার সংবাদমাধ্যম ক্লারিন জানিয়েছে, এত দিন ছবিগুলো প্রকাশ্যে আসেনি।

সিনিওরিনি ১৯৮৩ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ম্যারাডোনার ব্যক্তিগত ট্রেনার হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘ সেই সময়ে ম্যারাডোনার মাঠ ও মাঠের বাইরের জীবনের অসংখ্য মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন তিনি। ইনস্টাগ্রাম পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘সব জায়গাতেই ম্যারাডোনার সঙ্গে বল থাকতই। ১৫ নভেম্বর, ১৯৮৯।’

১৯৮৯ সালের ওই সময় ইতালির নেপলসে খেলছিলেন ম্যারাডোনা। তখন নাপোলির হয়ে দারুণ সময় কাটাচ্ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে ন্যাটোর নেপলস সদর দপ্তর থেকে তাকে ইউএসএস আইওয়া পরিদর্শনের আমন্ত্রণ জানানো হয়। ম্যারাডোনার সঙ্গে সেই সফরে যাওয়ার সুযোগ পান সিনিওরিনিও।

সিনিওরিনি জানান, রণতরিতে ম্যারাডোনাকে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। তার ভাষায়, ‘সেখানে রাষ্ট্রপ্রধানের মতোই অভ্যর্থনা পেয়েছিলেন তিনি। আমাদের সময়টা দারুণ কাটছিল।’

যুদ্ধজাহাজে গুলি ছোড়ার বিশাল দুটি নলের মাঝে দাঁড়িয়ে বল পায়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা
যুদ্ধজাহাজে গুলি ছোড়ার বিশাল দুটি নলের মাঝে দাঁড়িয়ে বল পায়ে কসরত করছেন ম্যারাডোনা

তবে সফরের একপর্যায়ে ফুটবলও হাজির হয় সেখানে। কোথা থেকে যেন একটি ফুটবল এনে দেওয়া হয় ম্যারাডোনাকে। বল হাতে পেয়েই নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে সেটি নিয়ে জাগলিং শুরু করেন তিনি।

সিনিওরিনির বর্ণনায়, ‘হঠাৎ কোথা থেকে যেন একটা বল চলে এল। বল পাওয়ামাত্রই একদম ছোটবেলার মতো নাচাতে (জাগলিং) শুরু করে দিলেন ম্যারাডোনা—যেটি আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সের ম্যাচে মধ্যবিরতিতে তিনি নিয়মিত করতেন। কিছু ভাবার সময়ই পাননি!’

ম্যারাডোনার ক্যারিয়ারের শুরুর দিকেও এমন দৃশ্য পরিচিত ছিল। আর্জেন্টিনা জুনিয়র্সে খেলার সময় ম্যাচের বিরতিতে বল নিয়ে নানা কসরত দেখিয়ে দর্শকদের আনন্দ দিতেন তিনি। রণতরির ডেকেও যেন সেই পুরোনো অভ্যাসই ফিরে এসেছিল।

ইউএসএস আইওয়া তখন অবসর নেওয়ার আগের সময় পার করছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ রণতরিগুলোর একটি ছিল এটি। ১৯৩৯ সালে নির্মাণ শুরু হওয়া আইওয়া শ্রেণির রণতরিগুলোর মধ্যে এটি ছিল প্রথম বা ‘লিড শিপ’। ১৯৮৯ সালে নেপলসে অবস্থানকালে ম্যারাডোনার সফরেই সেটি পেয়েছিল ভিন্ন এক স্মরণীয় মুহূর্ত।

ম্যারাডোনার সঙ্গে সিনিওরিনিও
ম্যারাডোনার সঙ্গে সিনিওরিনিও

সেই সফরের সময় ম্যারাডোনা ছিলেন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম বড় তারকা। ১৯৮৬ সালে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানোর পাশাপাশি নাপোলিকে জিতিয়েছিলেন ইতালিয়ান লিগ ও উয়েফা কাপ। ফলে নেপলসে তার জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে।

রণতরির ডেকে ম্যারাডোনার সেই বল-কসরতের সময় তার সঙ্গে ছিলেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সাংবাদিক অ্যাঞ্জেলো রসি। তিনি তখন নেপলস ও দক্ষিণ ইতালির অন্যতম শীর্ষ দৈনিক ইল মাতিনোতে কাজ করতেন। পরে ম্যারাডোনার ইউএসএস আইওয়া সফর নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশ করেন তিনি।

ম্যারাডোনার সঙ্গে সিনিওরিনির সম্পর্ক অবশ্য শুধু একজন ট্রেনার ও খেলোয়াড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দীর্ঘদিন কাছ থেকে দেখার কারণে কিংবদন্তির ব্যক্তিত্বের নানা দিকও জানতেন তিনি। একবার ম্যারাডোনাকে নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি ডিয়েগোর পেছনে পৃথিবীর শেষ সীমানা পর্যন্ত যেতে রাজি আছি, কিন্তু ম্যারাডোনার সঙ্গে রাস্তার মোড় পর্যন্তও যাব না।’

সিনিওরিনির ওই মন্তব্যে ম্যারাডোনার দুটি ভিন্ন সত্তার কথা উঠে আসে—একদিকে সরল, বন্ধুবৎসল ও শিশুসুলভ ডিয়েগো; অন্যদিকে খ্যাতি, প্রচারমাধ্যম ও ভক্তদের উন্মাদনার চাপে তৈরি হওয়া ম্যারাডোনা। তবে সেই দুই সত্তার মাঝেও একটি বিষয় ছিল অটুট—ফুটবলের প্রতি তার টান।

ফিদেল কাস্ত্রোর সঙ্গে সাক্ষাৎ হোক কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের রণতরি পরিদর্শন—ম্যারাডোনার জীবনের নানা স্মরণীয় মুহূর্তেই বল যেন অনিবার্য সঙ্গী হয়ে উঠত। ৩৭ বছর পর প্রকাশ্যে আসা ইউএসএস আইওয়ার এই ছবিগুলোও সেই সম্পর্কেরই আরেকটি বিরল স্মারক।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension