
বিক্ষোভের মুখে ভোটার তালিকা নিয়ে নতুন পদক্ষেপ ভারতের নির্বাচন কমিশনের
১৭ রাজ্যে ভোটার তালিকা সংশোধন, রাজনৈতিক দলগুলো পাবে সার্চযোগ্য PDF • ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
হোসনেআরা চৌধুরী :
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision—SIR) নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক ও বিরোধীদের ধারাবাহিক প্রতিবাদের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন (ECI)। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৭টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন (Special Summary Revision—SSR) পরিচালনা করা হবে। পাশাপাশি, স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোকে ভোটার তালিকার খসড়া ও চূড়ান্ত সংস্করণ অনুসন্ধানযোগ্য PDF ফরম্যাটে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম India Today-এর ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিরোধী দলগুলোর দীর্ঘদিনের দাবির সঙ্গে সম্পর্কিত এই পদক্ষেপগুলো এসেছে SIR প্রক্রিয়া নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের মধ্যে। তবে সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি রাজনৈতিক চাপের ফল কি না, সে বিষয়ে কমিশনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য দেওয়া হয়নি।
ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে বিতর্ক
ভারতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিপুলসংখ্যক নাম বাদ পড়া নিয়ে রাজনৈতিক উত্তেজনা বেড়েছে। বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং তালিকা সংশোধনের পদ্ধতিতে আরও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুসারে বাদ পড়া নামগুলোর মধ্যে মৃত ব্যক্তি, অন্যত্র স্থানান্তরিত ভোটার এবং যাঁদের খুঁজে পাওয়া যায়নি—এমন ব্যক্তিদের রেকর্ড রয়েছে। কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকা নির্ভুল করার উদ্দেশ্যেই এসব রেকর্ড যাচাই করা হয়েছে। তবে বিরোধীরা এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী নেতারা ভোটার তালিকায় কথিত অনিয়মের অভিযোগ তুলে কমিশনের কাছে জবাবদিহি দাবি করেছেন। বিরোধীদের একাংশ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগও দাবি করছে।
অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, মৃত, স্থানান্তরিত ও খুঁজে পাওয়া যায়নি এমন ভোটারদের রেকর্ড যাচাই করা নির্বাচনী তালিকা হালনাগাদের অংশ। ভুলবশত নাম বাদ পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ভোটারদের প্রযোজ্য নিয়ম অনুসারে পুনরায় নাম অন্তর্ভুক্তির আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।
১৭ রাজ্যে নতুন করে ভোটার তালিকা সংশোধন
কমিশনের ঘোষিত বিশেষ সংক্ষিপ্ত সংশোধন বা SSR হলো ভোটার তালিকা হালনাগাদের নিয়মিত প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে নতুন যোগ্য ভোটারদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা, বিদ্যমান ভোটারদের ব্যক্তিগত তথ্য সংশোধন করা এবং তালিকার ভুলত্রুটি পর্যালোচনা করা হয়।
বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা SIR-এর সঙ্গে SSR-এর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। SIR তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত যাচাইপ্রক্রিয়া, যেখানে আগের ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্য মেলানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নথি যাচাইয়ের বিষয় থাকতে পারে। অন্যদিকে, SSR মূলত নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তি ও বিদ্যমান তথ্য হালনাগাদের নিয়মিত কার্যক্রম।
India Today-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, SIR কার্যক্রমের কারণে নিয়মিত SSR প্রক্রিয়া স্থগিত থাকায় নতুন ভোটারদের তালিকাভুক্তির সুযোগ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে ১৮ বছর পূর্ণ করা তরুণদের ভোটার হিসেবে নিবন্ধনের বিষয়টি আলোচনায় আসে।
নতুন ঘোষণার মাধ্যমে কমিশন আবার নিয়মিত সংশোধন কার্যক্রম চালু করছে। তবে এই পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে SIR-এ বাদ পড়া প্রত্যেক ব্যক্তির নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোটার তালিকায় ফিরে আসবে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী আবেদন ও যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
রাজনৈতিক দলগুলোকে সার্চযোগ্য PDF
কমিশনের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো, স্বীকৃত রাজনৈতিক দলগুলোকে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের খসড়া ও চূড়ান্ত ভোটার তালিকার মুদ্রিত কপির পাশাপাশি অনুসন্ধানযোগ্য PDF দেওয়া হবে। ডিজিটাল কপিতে ভোটারদের ছবি থাকবে না। পাশাপাশি, তালিকায় সংযোজন, বিয়োজন ও সংশোধনের তথ্যও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সরবরাহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এতদিন কমিশনের সরবরাহ করা অনেক ডিজিটাল ভোটার তালিকা ছিল স্ক্যান করা ছবির সমন্বয়ে তৈরি PDF। ফলে নির্দিষ্ট নাম খোঁজা, একাধিক এন্ট্রি তুলনা করা কিংবা তালিকার তথ্য বিশ্লেষণ করা কঠিন হতো। নতুন ফরম্যাটে সরাসরি নাম অনুসন্ধান এবং তথ্য পর্যালোচনা করা তুলনামূলক সহজ হবে।
কংগ্রেস ২০১৮ সাল থেকেই অনুসন্ধানযোগ্য ভোটার তালিকার দাবি জানিয়ে আসছে। ওই সময় মধ্যপ্রদেশের নির্বাচনের আগে কংগ্রেস নেতা কমল নাথ এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। তখন নির্বাচন কমিশন গোপনীয়তা এবং ভোটারদের তথ্যের অপব্যবহারের আশঙ্কা তুলে ধরে এই দাবির বিরোধিতা করেছিল।
২০২৫ সালে রাহুল গান্ধী তাঁর ‘ভোট চুরি’ প্রচারের সময় বিষয়টি আবার সামনে আনেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, শুধু স্ক্যান করা PDF থাকলে ভোটার তালিকায় সম্ভাব্য পুনরাবৃত্তি বা অনিয়ম শনাক্ত করা কঠিন হয়।
এখন কমিশনের সিদ্ধান্তের ফলে রাজনৈতিক দলগুলো ভোটার তালিকার তথ্য আরও সহজে পরীক্ষা করতে পারবে। তবে অনুসন্ধানযোগ্য PDF সরবরাহ করলেই অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হবে, এমন নয়। কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে তা যাচাই ও প্রমাণের জন্য পৃথক প্রক্রিয়া প্রয়োজন হবে।
সুপ্রিম কোর্টেও গড়িয়েছে বিরোধ
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিরোধ শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য ও বিক্ষোভের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টেও গড়িয়েছে।
১৫ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাহুল গান্ধী ও আরও ১২ জন বিরোধী নেতার আবেদনের পর সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাব চেয়েছে। আবেদনে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়ার স্বাধীন নিরীক্ষা, নাম বাদ দেওয়ার আগে যথাযথ নোটিশ ও শুনানির সুযোগ এবং চলমান সংশোধন প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার অন্তর্বর্তী নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
আদালত আবেদনকারীদের অভিযোগের বিষয়ে জবাব চেয়েছে। এটিকে অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত রায় হিসেবে দেখা যাবে না।
রাজনৈতিক উত্তেজনা অব্যাহত
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্কের মধ্যে দিল্লিসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP) আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে দিল্লিতে ঘোষিত বিক্ষোভের আগে পুলিশ আটক করে। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছিলেন। মুম্বাই, বেঙ্গালুরু ও পাটনাতেও প্রতিবাদের খবর পাওয়া গেছে।
বিজেপি বিরোধীদের প্রতিবাদকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে। অন্যদিকে, বিরোধীরা বলছে, ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার সুরক্ষিত রাখা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অপরিহার্য।
এখন নজর বাস্তবায়নের দিকে
ভারতের নির্বাচন কমিশনের নতুন সিদ্ধান্ত ভোটার তালিকা যাচাই ও রাজনৈতিক দলগুলোর তথ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই পদক্ষেপ বিরোধীদের অসন্তোষ কতটা কমাবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর আপিল ও পুনর্নিবন্ধনের সুযোগ নিশ্চিত করা, নতুন যোগ্য ভোটারদের অন্তর্ভুক্ত করা এবং সংশোধনের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা বজায় রাখা। এসব ক্ষেত্রে কমিশনের কার্যক্রম ও আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।



