যুক্তরাষ্ট্র

মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের শোচনীয় পরাজয় বাণিজ্যিক অংশীদারদের পাল্টা চাপ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বলা হচ্ছে, এর মধ্য দিয়ে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের ভরাডুবি দেশটির কিছু বাণিজ্যিক অংশীদারকে তার আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে উৎসাহিত করতে পারে। তবে ট্রাম্পের ক্ষমতার শেষ দুই বছরে তাকে ক্ষুব্ধ করা থেকে বিরত থাকতে অংশীদারদের সতর্কতার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।

মঙ্গলবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদ উভয় কক্ষেই সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এসব নীতির মধ্যে রয়েছে তার আরোপ করা শুল্ক, যা ইরান যুদ্ধের পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী বলে মনে করা হচ্ছে।

এতে অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীন চলমান আলোচনায় বাড়তি সুবিধা পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া এশিয়ার মিত্রদেশগুলো শত শত কোটি ডলারের বিনিয়োগ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নেও ধীরগতি দেখাতে পারে। অন্যদিকে, বাণিজ্য নিয়ে অমীমাংসিত বিষয়গুলোতে ইউরোপ আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য পরিস্থিতি পেতে পারে।

তবে কিছু বাণিজ্যিক অংশীদার এখনো সামনে কঠিন পরিস্থিতির আশঙ্কা করছে। বিশ্ববাণিজ্যকে ওলটপালট করে দেওয়া শুল্কনীতির বিষয়ে ভোটারদের রায় মেনে নেওয়ার কোনো লক্ষণ ট্রাম্পের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বাণিজ্যবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান বার্নড ল্যাঙ্গ বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের সংরক্ষণবাদী নীতি রাতারাতি উধাও হয়ে যাবে না।”

তিনি আরও বলেন, “দুর্বল হয়ে পড়া ট্রাম্প আরও আগ্রাসী হয়ে উঠতে পারেন। ক্ষমতার শেষ পর্যায়ে থাকা নেতা দ্রুতই ক্ষুব্ধ নেতায় পরিণত হতে পারেন।”

গেটওয়ে হাউস থিংকট্যাংকের বিশিষ্ট ফেলো ও ভারতের সাবেক কূটনীতিক রাজীব ভাটিয়া বলেন, “ডেমোক্র্যাটদের বিজয়ের অর্থ এই নয় যে ট্রাম্প কোনো দেশের প্রতি আরও নমনীয় হয়ে উঠবেন।”

মিত্রদের স্বস্তির আশা

যেসব দেশ নীরবে কিছুটা স্বস্তিদায়ক পরিস্থিতির আশা করছে, তাদের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের এশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা। ট্রাম্পকে সন্তুষ্ট করার জন্য করা চুক্তির আওতায় জাপান যুক্তরাষ্ট্রে ৫৫০ বিলিয়ন ডলার এবং দক্ষিণ কোরিয়া ৩৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

সিউলের সোগাং ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক হিও ইউন বলেন, এখন দেশগুলো এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে কম চাপ অনুভব করতে পারে। তার ভাষায়, “ডেমোক্র্যাটদের ধারণা মিত্রদেশগুলোর ওপর এসব বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল।”

তবে টোকিওর সোফিয়া ইউনিভার্সিটির মার্কিন রাজনীতি বিষয়ের অধ্যাপক কাজুহিরো মায়েশিমা বলেন, মিত্রদেশগুলোর পক্ষে সহজে এসব প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসা সম্ভব হবে না।

তিনি বলেন, “শুল্কের বিষয়টি এখনো শেষ হয়নি। জাপানের প্রতিক্রিয়া ধীর হলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের দাবি আবারও সামনে আসতে পারে।”

যেসব দেশ বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলে ট্রাম্প মনে করেন, সেসব দেশের মধ্যে তার ক্ষোভের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়া।

অতি সম্প্রতি আলাস্কায় একটি বড় গ্যাস পাইপলাইন প্রকল্পে অর্থায়নে সম্মত হওয়ার বিষয়ে ট্রাম্পের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে সিউল। কোরিয়া ন্যাশনাল ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ের অধ্যাপক বান কিল-জু বলেন, এ ধরনের প্রকল্প নিয়ে কংগ্রেসের নজরদারি সিউলকে সেগুলো পর্যালোচনার জন্য আরও সময় দিতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, কংগ্রেসের গঠন বদলালেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন, কংগ্রেস ও অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক বিষয় নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাবে তারা।

ইউরোপের সামনে বিরোধের আশঙ্কা, ভারতের লক্ষ্য এখনো চুক্তি

ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক উত্তেজনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কমেছে। একাধিক চুক্তির ফলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের বড় ধরনের প্রভাব এখন পর্যন্ত সীমিত রাখা সম্ভব হয়েছে।

তবে কিছু বিষয়ে বিরোধের আশঙ্কা রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর ওপর ডিজিটাল সেবা কর আরোপকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনা। ইউরোপীয় উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এয়ারবাসকে সরকারি তহবিল থেকে ৩ বিলিয়ন ইউরো ঋণ দেওয়ার বিষয়টিও বিরোধের কারণ হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখনো বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল দেশটিকে অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের কৌশল নিতে উৎসাহিত করতে পারে।

ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী চলতি মাসের শুরুতে বলেছিলেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপের খসড়া তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে তিনি আবারও স্পষ্ট করেছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রপ্তানিকারক দেশগুলোর তুলনায় সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল নয়াদিল্লি চুক্তির পথে এগোবে।

নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার উপায় খুঁজতে পারে বেইজিং

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী চীন। দেশটি ট্রাম্পের সঙ্গে একটি বাণিজ্যিক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার উপায় খুঁজতে পারে বেইজিং। তবে কংগ্রেসের কড়া নজরদারির কারণে ট্রাম্পকে নিজেদের পক্ষে আনাও চীনের জন্য কঠিন হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার করিনা ইকোনমিক অ্যাডভাইজরির অর্থনীতিবিদ শল এসলেক চীনের নেতা শি জিনপিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “শি বুঝতে পারবেন, এই নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের কর্তৃত্ব অনেকটাই দুর্বল করে দিয়েছে। আর তিনি নিঃসন্দেহে সেই পরিস্থিতিকে কাজে লাগানোর উপায় নিয়ে ভাববেন।”

নাটিক্সিসের এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিবিদ অ্যালিসিয়া গার্সিয়া-হেরেরো বলেন, “বেইজিংয়ের সঙ্গে চুক্তির ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পকে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেবে না।”

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension