মুক্তি সমষ্টির বাইরে ঘটে না
বাংলা আমাদের রাষ্ট্রভাষা, বাংলা যাদের মাতৃভাষা পৃথিবীতে আজ তাদের সংখ্যা ২৫ কোটি, সেই হিসাবে বাংলা এখন চতুর্থ স্থানে। বাংলায় রয়েছে উৎকৃষ্ট সাহিত্য। অন্তরায়টা কোথায়? বলা হবে অভাব আছে সদিচ্ছার। কিন্তু কার ইচ্ছার কথা বলা হচ্ছে? ব্যক্তির, নাকি প্রতিষ্ঠানের? ব্যক্তির বা প্রতিষ্ঠানের সদিচ্ছা কিন্তু অনেক আগেও দেখা গেছে, এখনো যে দেখা যায় না তা নয়, তবে তাতে কাজ হয় নি, বাংলা চলে নি। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলা প্রচলনের আগ্রহের ব্যাপারে খবর পাওয়া যায়; রাজনারায়ণ বসু জাতীয় গৌরব সম্পাদনী সভা নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে নিয়ম চালু করা হয়েছিল যে, কথাবার্তা সব বাংলায় হবে; কেবল তাই নয়, অভ্যাসবশত কেউ যদি ইংরেজি ব্যবহার করেন তবে প্রতি বাক্যের জন্য তাকে এক পয়সা হারে জরিমানা দিতে হবে। বলাবাহুল্য এক পয়সা তখন অনেক পয়সা বৈকি। কিন্তু ওই প্রচেষ্টায় তেমন জোর ছিল না, কেননা এটা সীমাবদ্ধ ছিল গুটিকয়েক ভদ্রলোকদের ভেতর, যারা নিজেদের কেবল বাঙালি নয়, একই সঙ্গে বাঙালি ও হিন্দু মনে করতেন, কখনো কখনো হিন্দু পরিচয়টিই বরং বড় হয়ে উঠত। ঠিক উল্টো কাজ অবশ্য করতে আগ্রহী ছিলেন নবাব আবদুল লতিফের অনুসারীরা; তারা বাংলা নয়, উর্দু চালু করতে উৎসাহী ছিলেন; তবে পরস্পরবিরোধী দুই দলের মধ্যে মানসিকতার দিক থেকে এক জায়গায় ঐক্য ছিল। সেটা হলো ‘ছোটলোক’দের কাছ থেকে দূরে থাকা এবং নিজেদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে উচ্চে তুলে ধরা।
কিন্তু রাজনারায়ণদের বাংলা ভাষা এবং আবদুল লতিফদের উর্দু ভাষা চালু করার সদিচ্ছা এ দু’য়ের কোনোটাই যে সফল হয় নি তার মূল কারণ ছিল একটাই। রাষ্ট্রক্ষমতার বিরূপতা। রাষ্ট্র চায় নি স্থানীয় ভাষা চলুক, তাই প্রচলনের উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র তো চায় বাংলা চলুক, তাহলে চলছে না কেন? জবাবটা সোজা, রাষ্ট্র বলে বটে যে সে চায়, কিন্তু আসলে চায় না, চাইলে বাংলা চলত। কেন চায় না? এ রাষ্ট্র তো বাঙালির রাষ্ট্র। তাহলে? জবাব হলো এই যে, এই রাষ্ট্র বাঙালিরা প্রতিষ্ঠা করেছে ঠিকই, কিন্তু এটি এখনো জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হয় নি। রাষ্ট্র রয়ে গেছে সেই আগের মতোই। এবং এই রাষ্ট্রের কর্তা যারা তারা চায় না বাংলা চলুক, যে জন্য বাংলার এমন কোণঠাসা দশা। এখানে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক।
রাজার ভাষা আর প্রজার ভাষা যে এক হয় না তার প্রমাণ তো আমাদের ইতিহাসেই রয়ে গেছে। বাংলা চিরকালই ছিল প্রজার ভাষা, রাজার ভাষা ছিল ভিন্ন- সংস্কৃত, ফার্সি ও ইংরেজি। এখন অবশ্য রাজা নেই, কিন্তু শাসক শ্রেণি তো আছে; তারা জনগণ থেকে নিজেদের আলাদা মনে করে, সেই যে তাদের দূরত্ব তার প্রকাশ নানাভাবে ঘটে। ধনসম্পদ, ক্ষমতা, শিক্ষা, পাহারাদার, পোশাক-পরিচ্ছদ, আহারবিহারসহ বহু ক্ষেত্রে শাসকরা জনগণ থেকে আলাদা, আলাদা তারা ভাষাতেও। তারা ইংরেজিই পছন্দ করে, কেননা ওই ভাষা ব্যবহার করলে তারা যে বাংলাদেশের মানুষ হয়েও সাধারণ মানুষ নয় সেটা প্রকাশ পায়। তাছাড়া বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি হচ্ছে বিশ্ব পুঁজিবাদের আজ্ঞাবহ, ওই পুঁজিবাদের রাষ্ট্র ভাষা হচ্ছে ইংরেজি; সেটা একটা বড় কারণ যে জন্য শাসক শ্রেণি ইংরেজি ভক্ত।
ব্যাপারটা তাই স্পষ্ট। বাংলা ভাষার শত্রু অন্য কেউ নয়- শত্রু হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি এবং তাদের সাম্রাজ্যবাদী প্রভু। জনগণের ভাষা এখানে ততটাই অসহায় জনগণ নিজেরা যতটা দুর্দশার ভেতর পতিত। ভাষার লড়াইটা আসলেই একটা রাজনৈতিক লড়াই, আগেও ছিল, এখনো রয়েছে। এদেশে বাংলা তখনই সর্বস্তরে ও সর্বপর্যায়ে চালু হবে যখন এ রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্রে পরিণত হবে, তার আগে নয়। ভাষা প্রচলনের চেষ্টাকে তাই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে, এর বাইরের কাজগুলো হবে সংস্কারমূলক, তাতে অর্জন কিছু ঘটলেও তা বিস্তৃত হবে না, তাদের ধরে রাখাও সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশে এখন যে ধরনের ইসলামি জঙ্গি তৎপরতা চলছে তার সঙ্গেও বাংলার অপ্রচলন সরাসরি জড়িত। জঙ্গিদের প্রায় সবাই মাদ্রাসায় শিক্ষিত, অর্থাৎ বাংলা ভাষার শিক্ষা ও ঐতিহ্য থেকে বঞ্চিত। অপরদিকে ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষার যে বিস্তার সেটাও কিন্তু খড়ে-ঠাসা কৃত্রিম মানুষ তৈরি করছে। সুস্থ ও স্বাভাবিক মানুষ সৃষ্টির জন্য মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া ছাড়া কোনো উপায়ই নেই।
মোটকথা, আমরা কিছুতেই সুস্থ ও স্বাভাবিক হতে পারব না, এগোতেও পারব না সামনের দিকে, যদি না বাংলার প্রচলন ঘটাতে পারি। বিশ্বায়নের সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আমাদের দাঁড়াবার জায়গাটাও কিন্তু ওই মাতৃভাষার চর্চাই। ওইখানে দাঁড়িয়েই আমাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক হওয়া সম্ভব। যে-বৃক্ষের শিকড় দুর্বল সে কী করে আকাশের দিকে বেড়ে উঠবে, তার পক্ষে তো টিকে থাকাটাই অসম্ভব।
২.
এখন এটা আর মোটেই অস্পষ্ট নয় যে, বাংলাদেশের অসংখ্য সমস্যার ভেতর প্রধানটি হচ্ছে দেশের শাসক শ্রেণি। সবকিছু এরাই করে এবং যা কিছু করে তার বেশিরভাগই জনগণের জন্য ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এই শাসক শ্রেণির নানা অংশ ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ রয়েছে, এখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আছে, মানুষ আছে নানা ধরনের, আর এদের সবাই যে ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত মন্দস্বভাবের তাও নয়, তবে শ্রেণি হিসেবে শাসকরা অখণ্ড বটে এবং এদের সমষ্টিগত চরিত্র হচ্ছে জনবিরোধী। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, আজকের দিনে আমাদের দেশে প্রধান দ্বন্দ্বটা হচ্ছে শাসকদের সঙ্গে জনগণের দ্বন্দ্ব।
শাসক শ্রেণিতে ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, সাবেক ও বর্তমান আমলা, বিত্তবান পেশাজীবী, সবাই আছে; এবং শ্রেণিটি যে আনকোরা নতুন তাও নয়। ব্রিটিশ শাসনের কালে এর বিকাশের শুরু, পাকিস্তান আমলে সে অনুকূল আলো-হাওয়া পেয়েছে, আর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীনভাবে বিস্ময়কর গতিতে বেড়েছে, ফুলেছে ও ফেঁপেছে। এদের মূল কাজ উৎপাদন নয়। এমনকি উৎপাদনে উৎসাহ দানও নয়, মূল কাজ হচ্ছে লুণ্ঠন। সে-কারণে দেশে রাজনীতি বলতে এখন যা দাঁড়িয়েছে তা হলো ক্ষমতা ও সম্পদ নিয়ে এই শ্রেণির বিভিন্ন অংশের ভেতর নির্লজ্জ কাড়াকাড়ি।
এর বিপরীতে জনগণের কাজটা সম্পূর্ণ আলাদা। তারা উৎপাদন করে এবং মুক্তি চায়। জনগণের মুক্তি দরকার শাসক শ্রেণির নিষ্পেষণের কব্জা থেকে। সেই লক্ষ্যে তাদের সংগ্রাম দীর্ঘদিনের। মুক্তির সেই সংগ্রামটা আজো চলছে; ইতোমধ্যে জনগণের কারণে যত কিছু অর্জন ঘটেছে তা শাসক শ্রেণি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে।
একাত্তরের যুদ্ধের কথা আমরা বারবার স্মরণ করি, করা উচিতও বটে। সেই যুদ্ধে দেশের সব শ্রেণির মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল। তখন সবাই ছিল সবার মিত্র; কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়া মাত্র চিত্রটা বদলে গেছে। রাজনৈতিকভাবে বিত্তবানেরাই নেতৃত্বে ছিল, যুদ্ধের পরে তারা আরো বিত্তবান হওয়ার জন্য উন্মুত্ত হয়ে উঠেছে। সমষ্টির স্বার্থকে সবিক্রমে পদদলিত করে নিজের নিজের স্বার্থ উদ্ধারে তৎপর হয়েছে। তাদের লালসা, অপচয় ও ভোগবাদিতা দেশের আবহাওয়াকে বিষাক্ত করে ছেড়েছে। তাদের চাপ ও দৃষ্টান্তে ক্রমাবনতি ঘটেছে দেশপ্রেমের।
কিন্তু এর মধ্যেও মানুষ রুখে দাঁড়াচ্ছে। বিদ্যুতের দাবিতে কানসাটের প্রান্তিক মানুষরা অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। তারা নিজেরাই বেরিয়ে এসেছে, যেমন এসেছিল একাত্তরে, কারো ঘোষণা বা ডাক শোনার জন্য অপেক্ষা করে নি। পানি ও বিদ্যুতের অভাবে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ অভ্যুত্থান ঘটিয়েছে রাজধানীর কাছে, ডেমরাতে। বিদ্রোহ ঘটেছে ঢাকা ও আশপাশের তৈরি পোশাক শিল্পের কারখানায়। এসব কারখানাতে দাসপ্রথা বিদ্যমান। শ্রমিকের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে মালিক পক্ষ নিকৃষ্টতম নিষ্পেষণ চালায়, শ্রমিকের জীবনীশক্তি নিঃশেষ করে দিয়ে নিজেরা বিলাসী জীবনযাপন করে। আটঘণ্টা শ্রমদিবসের দাবিতে আমেরিকায় শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেছে, প্রাণও দিয়েছে; সেই দাবি আদায় করতে গিয়ে বাংলাদেশি শ্রমিকরা আবার প্রাণ দিল। দেশের শাসক শ্রেণি তৈরি পোশাক-শ্রমিকদের দুর্দশার খোঁজ রাখে না, তারা শ্রমিক বিদ্রোহের কারণ বোঝে না, কেবল ষড়যন্ত্র দেখতে পায়।
আত্মস্বার্থ উদ্ধারে কবলিত ও সম্পূর্ণরূপে দেশপ্রেমবিবর্জিত এই শাসক শ্রেণি কেবল যে শোষণ করে তা নয়, তারা দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়ার ব্যাপারেও পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত থাকে। আমাদের অত্যন্ত সীমিত গ্যাস, তেল ও কয়লার সঞ্চয় বিদেশিদের হাতে তুলে দিতে এরা ভীষণভাবে আগ্রহী। একমাত্র সমুদ্র বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ বিদেশিরা নিয়ে নিক এটাও তাদের ইচ্ছা। তথাকথিত বিদেশি বিনিয়োগকে এরা প্রাণপণে ডাকাডাকি করে, কিন্তু দেশের ভেতর পুঁজি গড়ে উঠুক, বিনিয়োগের জন্য অত্যাবশ্যকীয় অবকাঠামো ও পরিবেশ তৈরি হোক এটা চায় না। চালু কলকারখানাকে বন্ধ করে দিয়ে এরা জমি ও যন্ত্রপাতি লুটপাট করে নেয়।
শাসক শ্রেণি নির্বাচন নিয়ে খুবই ব্যস্ত। সেটা স্বাভাবিক। কিন্তু তথাকথিত সুশীল সমাজকেও যখন দেখি সৎ ও যোগ্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোথায় পাওয়া যাবে, কীভাবে নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে এসব নিয়ে অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হতে- তখন নতুন করে বোঝা যায় যে এই সুশীল সমাজও ওই শাসক শ্রেণিরই অংশ। জনগণ কিন্তু ঠিকই জানে যে, নির্বাচন হচ্ছে শাসকদের ভেতর ক্ষমতা নিয়ে অমীমাংশেয় ঝগড়ার নবনব উন্মোচন। অভিজ্ঞতাই তাদেরকে বলে দেয় যে নির্বাচন তাদেরকে মুক্তি দেবে না; শাসক শ্রেণিকে তাদের অপকর্ম অব্যাহত রাখার ব্যাপারে বৈধতা দেবে মাত্র।
জনগণ চায় মুক্তি। নির্বাচন এখন এক ধরনের পঞ্চবার্ষিকী তামাশাও বটে, এতে ঢাকঢোল বাজে, টাকার স্রোত বইতে থাকে, চারদিকে একটা উৎসবের আমেজ আসে, মানুষ তাতে অংশ নেয় না, এছাড়া জনগণের ভোটেরও প্রয়োজন পড়ে না। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনায়াসে নির্বাচিত হয়ে যায়। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে জনগণ জানে এবং বুঝেও যে, যারা নির্বাচিত হবে তারা তাদের আপনজন নয়; জানে যে এরা টাকা ঢালছে আরো টাকা করার আশায়।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, মুক্তির জন্য প্রয়োজন হলো আন্দোলনের; যে আন্দোলন শাসক শ্রেণিকে পরাভূত করে রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করবে। ওই আন্দোলনকে বেগবান করার ব্যাপারে আমরা কে কী ভূমিকা নিচ্ছি, এ প্রশ্নটা খুবই জরুরি। দোষারোপ, ক্ষোভ, বিক্ষোভ, হতাশা কোনো কিছুই আন্দোলনের বিকল্প নয়। ব্যক্তির মুক্তি কখনোই সমষ্টির মুক্তির বাইরে ঘটে না, উপায় নেই ঘটবার।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



