নির্বাচিত কলাম

আবজালদের আদৌ শাস্তি হবে কি?

ড. আর এম দেবনাথ
 
একজন কেরানির শতকোটি (বিলিয়ন) টাকার সম্পদ। বিশ্বাস করা যায়? না, সাধারণভাবে তা কোনোমতেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তার যে বেতন-ভাতা তা দিয়ে শত বছরেও শতকোটি টাকার মালিক হওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু গত ১৫ জানুয়ারি একটি রিপোর্ট পড়ে এ কথা বিশ্বাস করতে হয় যে, এখন সামান্য কেরানিও শতকোটি টাকার মালিক হতে পারে! এই কেরানি সাহেবের নাম আবজাল। তিনি স্বাস্থ্য খাতের একটি অফিসের কেরানি। রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তিনি ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাটের মালিক, ভবনের মালিক। রয়েছে একাধিক প্লট। তিনি বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার করেন। এ ছাড়া অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরে নাকি তার বাড়ি রয়েছে।
 
রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, আবজাল সাহেব চাকরির পাশাপাশি তৈরি পোশাকের ব্যবসা করেন। মেডিকেলের ভর্তি-বাণিজ্যই নাকি এত বিপুল টাকার মালিক করেছে তাকে। রিপোর্টটিতে তার কর্মকাণ্ডের বিস্তারিত বর্ণনা আছে। বলা হয়েছে, তার স্ত্রী সিঙ্গাপুরে থাকেন। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার সম্পত্তির খোঁজ করছে। এ প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে অনেক বিষয় চলে আসে। প্রথমেই মনে প্রশ্ন জাগে, এটা কি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা? দ্বিতীয় প্রশ্ন, দেশে এত আইন ও প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও কী করে এই ব্যক্তি এত সম্পত্তি-সম্পদের মালিক হল? রাষ্ট্রীয় নীতি কি তার অবৈধ সম্পদ আহরণে পরোক্ষভাবে সাহায্য করছে?
 
তৃতীয় প্রশ্ন, অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ লোকেরা কোথায় রাখে? দেশে না বিদেশে? দেশে একটা অত্যন্ত শক্ত আইন আছে, যার নাম ‘মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন অ্যাক্ট’। পৃথিবীর অনেক দেশেই এ আইনটি বিদ্যমান বলে জানি। এতদসত্ত্বেও কী করে আবজালের মতো লোকেরা দেশে-বিদেশে এভাবে অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলে? সর্বশেষ প্রশ্ন, এর প্রতিকার কী?
 
প্রথম প্রশ্নের আলোচনায় গেলে বলতেই হয়- এ ঘটনা নতুন কিছু নয়। ‘ওয়ান-ইলেভেনের’ সময় প্রায় প্রতিদিন খবরের কাগজে নানা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের অবৈধ সম্পদের ওপর খবর ছাপা হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে। এসব অফিসের মধ্যে গ্যাস, বিদ্যুৎ, ওয়াসা, ডেসা, মিউনিসিপ্যালিটিসহ অনেক সরকারি অফিস আছে। এমনকি আত্মস্বীকৃত অনেক অবৈধ সম্পদের মালিকও ছিল। শুধু ওই সময়ের ঘটনাই নয়, এরপরও প্রায় দিনেই খবরের কাগজে অবৈধ সম্পদের ওপর খবর ছাপা হচ্ছে। দুর্নীতি, ঘুষ, অনিয়ম, বেনিয়ম ইত্যাদির খবর নিত্যদিনের ঘটনা। এসবের মধ্যেই জানাজানি হচ্ছে নিয়মিত কে কত টাকার সম্পদ বানিয়েছে। কার কোথায় বাড়িঘর আছে। এসব এখন প্রায় প্রকাশ্যেই আলোচনা হয়। এসব দেখেশুনে মনে হয় আমাদের একশ্রেণীর কর্মচারী-কর্মকর্তা, রাজনৈতিক কর্মী, প্রভাবশালী লোকজন এবং বিভিন্ন পেশায় কর্মরত নির্বাহীরা দেশটাকে প্রাথমিক পুঁজি আহরণের ক্ষেত্র হিসেবে গণ্য করছে।
 
আমেরিকায় নাকি একসময় বলা হতো ‘এভরি ফাস্ট ডলার ইজ এ ডার্টি ডলার’। অর্থাৎ যারাই পয়সা বানিয়েছে তারা প্রথমাবস্থায় নিয়ম-কানুনের বাইরে গিয়ে তা বানিয়েছে। কারণ নিয়ম-কানুন মেনে পয়সা বানানো খুবই কঠিন একটা ব্যাপার। আমাদের পুঁজি নেই, অর্থাৎ ক্যাপিটেল নেই। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশিদের মধ্যে খুব কমজনেরই পুঁজি ছিল। এখন অনেকের পুঁজি হয়েছে। এর মধ্যে একাংশ নিশ্চিতভাবে ‘প্রাইমারি অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটেলের’ নীতি অনুসরণ করেই তা করেছে। সরকার ও রাষ্ট্র কি এক্ষেত্রে নীরব ভূমিকা পালন করেছে? এটা বলা খুবই কঠিন। সব সরকারের কাছেই দুর্নীতি দমন ছিল এক নম্বরের কাজ। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এতদসত্ত্বেও একশ্রেণীর লোক আবজালের পথ ধরে প্রচুর টাকা বানিয়েছে। শতকোটি টাকার মালিক এখন হাজার হাজার লোক। আর কোটি টাকার মালিক তো রাস্তাঘাটে পাওয়া যায়। একসময় তা ছিল না।
 
আমরা শুনেছি লাখপতি হলেই ঘরে ঘিয়ের বাতি জ্বলত। যতদিন লাখপতি ততদিন শিখা অনির্বাণের মতো ঘিয়ের বাতিটি জ্বলত। এর জন্য ‘ধন ও আঢ্য’ দুই যোগ করে একটি শব্দ হয়েছে ধনাঢ্য। ‘আঢ্য’ অনেকের পদবিও বটে। অবশ্য আজকাল শতকোটি টাকার মালিক হলেও কেউ ঘিয়ের বাতি জ্বালায় না। এটা কোনও খবর নয়। আমার ধারণা, সমাজ এখন উগ্র বাজার অর্থনীতির কবলে। সারা বিশ্ব এখন মানুষের বিচরণক্ষেত্র। আগে সমাজে আদৃত ছিল সবচেয়ে গুণী মানুষ। ফকির, সন্ন্যাসী, দরবেশ শ্রেণীর লোকেরাই ছিল সবচেয়ে সম্মানী ব্যক্তি। এখন তা নেই। এখন সমাজ অন্ধের মতো ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সম্মান করে। কোনও বাছবিচার নেই। এর জন্য মানুষ ছুটেছে ধনের সন্ধানে। যেভাবে পারা যায় ধন-সম্পত্তির মালিক হতে হবে। এতে ‘ব্রেক’ কষার কথা রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রও এ ক্ষেত্রে অপর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে। ফলে এসব অনাচার, দুর্নীতি, ঘুষ বেড়েই চলেছে।
 
অবৈধভাবে ধন-সম্পদ করার প্রবণতা রোধ হতো, যদি দেখা যেত এসব ধন-সম্পত্তি রেখে যাওয়ার কোনও উপায় নেই। আমাদের দেশে অবৈধ ধন-সম্পত্তি করাও কঠিন একটি কাজ হতো, যদি মানি লন্ডারিং প্রিভেনশন আইনটি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যেত। আইনে আছে, ব্যাংকে অবৈধভাবে অর্জিত টাকা রাখা যায় না। নির্দিষ্ট পরিমাণের টাকার মধ্যে ব্যাংকে লেনদেন করতে হয়। টাকার হিসাব ব্যাংক চায়। জমি-সম্পত্তি অবৈধ টাকায় করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের কথা আছে। বলা যায়, মোটামুটি কড়াকড়িভাবে এই আইন আমাদের দেশে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ জন্য আমরা প্রশংসিতও হচ্ছি। তবে এর ফাঁকে কিছু টাকা জমিতে, ব্যবসায় খাটানোর সুযোগ আছে। ব্যবসা ও শিল্পে টাকা খাটালে অনেক সময় তা ধরার কোনও কায়দা থাকে না। জমিতেও কিছু টাকা রাখা যায়। ফ্ল্যাট-বাড়িতেও পারা যায়। তবে এর পরিমাণ খুব বেশি নয়। এর জন্য যে কাজ বিশ্বব্যাপী হচ্ছে তা হচ্ছে ‘মানি লন্ডারিং।’
 
স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে, সব দেশেই এ আইনটি থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের পুঁজির ঘাটতি মেটানোর জন্য অবৈধভাবে অর্জিত টাকা দেশে বিনিয়োগের জন্য উৎসাহিত করে। পৃথিবীর কিছু দ্বীপদেশ আছে যারা ‘ট্যাক্স হেভেন’ হিসেবে কাজ করে। সেসব দেশে টাকার কোনও হিসাব চাওয়া হয় না, করের ঝামেলাও নেই। অতএব সারা দুনিয়ার অবৈধ টাকার মালিকরা ওইসব দেশে টাকা রাখে। ওই টাকা সংগ্রহ করে ‘ফান্ড ম্যানেজার’, ‘ইনভেস্টমেন্ট কোম্পানি’ ইত্যাদি ধরনের কোম্পানি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করে এবং অবৈধ টাকার মালিকদের লভ্যাংশ দেয়।
 
অনেক দেশ সরাসরি এ ধরনের কালো টাকাকে গ্রহণ করে। পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর এসব টাকা সাদরে গ্রহণ করে। সেজন্য বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বহু দেশের অবৈধ টাকার মালিকরা ওইসব দেশে ব্যবসা করতে পারে। বাড়িঘর কিনতে পারে। ব্যাংকে টাকা রাখতে পারে। দুবাই-আবুধাবি ইত্যাদি দেশেও একই ব্যবস্থা আছে। ইউরোপীয় দেশগুলো, আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশেও অবৈধ টাকা বিনিয়োগ করা যায়, নানা ধরনের স্কিম তাদের আছে। কানাডায় বাংলাদেশিদের ‘বেগম নগরী’ আছে। মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ সুবিধা আছে। সম্প্রতি কানাডার একটা খবর দেখলাম। সেখানকার চাকরিধারীরা বিদেশি ছাত্রদের যন্ত্রণায় ফ্ল্যাট, বাড়িঘর কিনতে পারছে না। অথচ ছাত্রদের কোনও আয় নেই। তারা ওই টাকা কোথায় পায়- এই প্রশ্ন রাখা হয়েছে বিশ্ববিখ্যাত ‘দি ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিনে। ঢাকার কাগজেও প্রায়ই খবর ছাপা হয়, বিদেশে টাকা পাচারে সাহায্য করতে লোকেরা ঢাকায় আসে। তারা বুদ্ধি-পরামর্শ দেয়। অবশ্যই এসব পাচার সম্ভব হয় হুন্ডিতে, যা অবৈধ। ইদানীং বাংলাদেশে এই কাজটি খুব সহজ হয়েছে। আমদানি-রফতানির পরিমাণ আমাদের ‘হিউজ’।
 
অবমূল্যায়ন ও অতিমূল্যায়ন করে টাকা পাচার করা একটা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ। যাদের টাকা আছে তারা অতি সহজেই ব্যবসার মাধ্যমে বিদেশে টাকা পাঠাতে পারে। আগের তুলনায় এ কাজটি এখন সহজতর। অথচ বেশ শক্ত একটি আইন দেশে চালু আছে। কিন্তু মুশকিল হচ্ছে, এই আইন কেউ মানে, কেউ মানে না। যারা পুঁজি চায় তারা বরং অবৈধ টাকাকে উৎসাহিত করে। বাংলাদেশ কিন্তু কড়াকড়িভাবে তা পালন করে। এর ফল মনে হয় আমাদের প্রতিকূলে যাচ্ছে। মানুষ টাকা দেশে রাখতে না পেরে বিদেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে। অনেকে বিদেশে ব্যবসা করছে। এসব সবারই জানা কথা। এখানে গোপন কিছু নেই। অথচ এ ঘটনা ঘটতে পারত না, যদি টাকা বিদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা না থাকত, বিদেশে বিনিয়োগের ব্যবস্থা না থাকত। বিদেশে আমাদের কোনও কোনোও ব্যবসায়ীর বিশাল কারখানা আছে, বিশাল বিশাল ব্যবসা আছে।
 
এ সমস্যার সমাধান সম্ভব। কীভাবে? টাকা বানানো হোক ঘুষ, দুর্নীতি যা ইচ্ছা করে; কিন্তু যদি সেই টাকা ভোগের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে এ ধরনের টাকা বানানো নিরুৎসাহিত হবে। একটা আইন করা যায়। ‘উত্তরাধিকার ট্যাক্স’ চালু করা যায়। আর বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবেও তোলা যায়। যেসব দেশে বাংলাদেশিরা সম্পদ করছে, সেসব দেশের সরকারের সঙ্গে কথা বলা যায়। আরও কঠোর হতে পারলে একটা জিনিস করা যায়। জাতিসংঘ কালো টাকার বিরুদ্ধে। তারা ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আমরা বলতে পারি, বিদেশে রক্ষিত বাংলাদেশিদের সম্পদ-সম্পত্তি আজ থেকে জাতীয়করণ করা হল। করে জাতিসংঘকে বলা যায় সাহায্যের জন্য। এভাবে ফিলিপাইনের মার্কোস, ইন্দোনেশিয়ার সুহার্তো, মিসরের হোসনি মোবারকের বিদেশে রক্ষিত সম্পত্তি উদ্ধার করা হয়েছে।
 
সরকার কি এই ব্যবস্থায় যাবে? অর্থমন্ত্রী বলেছেন, বিদেশে পাচারকৃত টাকা দেশে আনা হবে। তিনি ‘শাস্তির’ কথা বলছেন বলে মনে হয় না। তিনি টাকা দেশে আনতে চান। এর মধ্যে কি আবজালের টাকাও আছে, যা সিঙ্গাপুরে বিনিয়োজিত? তাহলে বিচারের ব্যবস্থা কোথায়? এসব বিষয় আমাদের স্পষ্ট করা দরকার।
 
লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension