নির্বাচিত কলামমুক্তমত

ইলিশ: সংস্কৃতি, কূটনীতি ও রাজনীতি

দাউদ হায়দার


পাবনা শহর থেকে হিরতলার দূরত্ব ৬-৭ মাইল। বড়ো দুলাভাই মোহাম্মদ সিরাজউদ্দীনের বাড়ি। পদ্মা-ঘেঁষে। গেছি বারতিনেক, টমটমে। হরিতলায় কয়েকঘর মাঝির বাস। হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে। হরিহর আত্মা।
যেহেতু দুলাভাইয়ের শ্যালক, দুই মাঝির খায়েস, হরিতলার ভাষায়: ‘শালাক মাঝ গাঙে লিয়ে যায়ে, মরদ ইলসে খাওয়াবোনে।’ শুনে আত্মারাম খাঁচা। দুলাভাইয়ের অভয়: ‘যা। সাঁতার ত জানিস।’ তার মানে, নৌকা ডুবে গেলেও সাঁতরে ডাঙায় ফিরতে পারবো। গন্ধ পেলুম অ্যাডভেঞ্চারের।

দুই মাঝি বয়সে ঢের বড়ো। সোয়ারি যখন, বয়স নিয়ে ঘিলু খামচানি নেই। ইয়ারদোস্ত যেন, কথাবার্তায়। ষোড়শীর বিয়ে হলে ময়মুরুব্বিও রাখঢাক করে না। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে আছে।

দুই মাঝির কাছেই শোনা, এলাকাভিত্তিক নদী বিক্রি হয়। নিলামে ওঠে। কথোপকথন নিম্নলিখিত: ‘হরিতলা থেকে নাজিরপুর পোরজোনতো আমরা খরিদ করেছি। পাকশীর ড্যান ভেড়ামারা আরেক ব্যাটা। বোশাখের শ্যাসে দামের উঠানামা। বরসার হালহকিকতের উর্পে ইলসের ব্যবসা।’ শুনলুম, ইলিশের চরিত্র ‘হারামির চৌবাচ্চা’। কী রকম? ‘ক্ষণে ক্ষণে চারিত্র্য পাল্টায়। ডিম ছাড়ার যন্যি উজানে যায় পোরখমে। ছাড়ে (ছেড়ে) ঝাঁকে ফেরে। ৯৯ ভাগই বেটি ইলসে। ব্যাটা ইলসে থাকে পেছনে। দাবড়ায়। ব্যাটা ইলসে শতকরা অ্যাকটা ধরা পড়ে।’

বাংলার মাছ নিয়ে (মৎস্য পুরাণ নয়) একজন গবেষকের রচনায় পড়েছিলুম ইলিশ খাওয়ার কালচার শুরু মূলত পদ্মাকুলের বেদের মারফত। নিম্নশ্রেণি থেকে জমিদার ঘরে। অতঃপর জামাইষষ্ঠীতে আপ্যায়ন। কালচার থেকে রিচুয়াল।

ইলিশ কালচার পূর্ব বাংলারই। বিশেষত পদ্মার দুই পারের জনমনিষ্যির। গঙ্গা-যমুনা অঞ্চলের হাভাতের কাছে খুব কদর পায় না। না পেলেও ইলিশ আদিখ্যেতার কমতি নেই। যেমন নেই বাঁকুড়ায় বা রাঢ় অঞ্চলে।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাসুলিবাঁকের উপকথায় নানা ঘটনার সম্মিলনে জমাট, ইলিশের কোনো প্রসঙ্গ নেই। রবীন্দ্রনাথ পদ্মার বোটে দিনের পর দিন ভ্রামাণিক লিখছেন ‘ছিন্নপত্র’ বহু কথা আছে, ইলিশের আস্বাদ পাননি? ইলিশে মোহিত হননি? জীবনানন্দ বরিশালের। বহু নদনদী। ইলিশ ছিল না। উল্লিখিত হয়নি কোনো কবিতায়।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কাহিনি বেছে নেন পূর্ববঙ্গের পদ্মা। কুবের, হোসেন আলি গঙ্গা-যমুনা-দামোদরের নয়। সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত পূর্ববঙ্গের নন, কবিকল্পনায় ‘ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি’ চমৎকার ছপকল্প। বুদ্ধদেব বসু ইলিশপ্রেমী। শৈশব-যৌবন পদ্মাপাড়ে। ইলিশ নিয়ে কবিতা ছাড়াও প্রসঙ্গক্রমে লিখেছেন। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ফরিদপুরের, পদ্মা তাঁর অস্থিমজ্জায়। কলকাতার গড়িয়াহাটের বাজারে গিয়ে পৌনে দুই কিলো, দুই কিলোর ইলিশ খুঁজতেন। এবং ইলিশ হতে হবে পদ্মার।

ভারতীয় চলচ্চিত্রকারদের মধ্যে মৃণাল সেন বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবে ‘ঘরোয়া’। যোগ দিয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তিনি ফরিদপুরের। কৈশোরে পদ্মায় দাপাদাপি করেছেন। একবার ওর সঙ্গে উসুলোগিশার গার্টেন এলাকায় হাঁটছিলুম, পড়ন্ত বিকেল, এক তরুণীকে দেখিয়ে বললেন :‘চকচকে রূপালি ইলিশ।’ নিশ্চয় ফরিদপুরের পদ্মার ইলিশস্মৃতি মনে পড়ছিল।
আসাম-ত্রিপুরা-পশ্চিমবঙ্গে ছাড়া (এবং এইসব অঞ্চলের মানুষ, যারা পূর্ববঙ্গর আদিবাসী) ভারতের অন্যান্য প্রদেশে ইলিশপ্রীতি নেই। মিয়ানমারের, অন্ধ্রপ্রদেশের ইলিশ ইদানীং উত্তর আমেরিকা-ইউরোপের নানা দেশে। ওজনও বেশি। দাম কম। প্যাকেটে লেখা থাকে না। কিন্তু ৭/৮শ’ গ্রামের প্যাকেটে ‘চাঁদপুরের ইলিশ’। দাম প্রায় দ্বিগুণ। তাও পাওয়া যায় না।
ইলিশ নিয়ে বাংলাদেশ, ভারত নতুনতর রাজনীতি। মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের এক উপদেষ্টা ঘোষণা করেন, ‘ভারতে ইলিশ দেওয়া হবে না’। তার বক্তব্য, আগে বাংলাদেশের মানুষ। খাক। কেউ না করেনি। তার কথায় খুশি অনেকে।

অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থবিষয়ক উপদেষ্টা ঝিম ধরলেন কয়েকদিন। বুঝলেন ইলিশ রাজনীতির বাড়াবাড়ি। জানালেন ভারতে ইলিশ যাবে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়। চালান গেল প্রায় তিন হাজার টন। কলকাতাসহ হাওড়ায়, ত্রিপুরা, আসামে। যেহেতু বৈদেশিক মুদ্রা, লাভ কম নয়।

মূল বিষয়, অর্থনীতি। ডিপ্লোমাসি। ইলিশের আরেক নাম চকচকে রূপালি। দেখলেই চিত্ত চঞ্চল। বাঙালির। অবাঙালির রসনায় লালা ঝরবে। না। গোটা ভারতে বাঙালির সংখ্যা কত? তাও আবার পূর্ববঙ্গ বাঙালির?

মনে পড়ছে ইলিশ ডিপ্লোমাসির নাটক। এরশাদের সময়কাল। আছি অন্নদাশঙ্কর রায়ের ফ্ল্যাটে, বালিগঞ্জে। নিত্যদিনের বাজারের দায়িত্ব। ব্রেকফাস্টের পর বেরুবো। সকাল ৮টা। ফর্দে লেখা কি কি সওদা। হঠাৎ কলিং বেল। পরিচালক অর্ধেন্দু মাইতি জানতে চান কার সঙ্গে দেখা করতে চান। কী উদ্দেশ্যে। জেনে বলেন, দাদুর কাছে এসেছেন। বললুম, হবে না।
শুনতে নারাজ। কী সব কথা গেলুম। দেখি, বাংলাদেশ উপ-দূতাবাসের একজন। পরিচিত, সালাম দিয়ে বললেন, ‘এই প্যাকেট পাঠিয়েছেন’।

কি আছে প্যাকেটে? উত্তর: ইলিশ মাছ। হাতে নিয়ে দেখলুম প্রায় চার কেজি।

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ক্ষমতাসীন হয়ে বছর দুয়েক পরে ইলিশ ডিপ্লোমাসি শুরু করেন। পশ্চিমবঙ্গের নামি শিল্পী সাহিত্যিক রাজনীতিক মন্ত্রীদের ইলিশ পাঠান। মুখ্যমন্ত্রীর জন্যে চারটি। মন্ত্রীদের ভাগে তিনটি। অন্নদাশঙ্কর, সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেন, সুচিত্রা সেনের জন্য দুটি। পত্রিকার জন্যে দুটি।

মানিকদাকে (সত্যজিৎ রায়) ফোন করলুম, বললেন, ‘পদ্মার চকচকে ইলিশ। মঙ্কু (বিজয়া রায়) রান্না করবেন।’ ইলিশ ডিপ্লোমাসির নব অধ্যায়।

সেই ট্রাডিশন এখনও নানা কসরতে। হোক তা বাংলাদেশের রাজনীতির কাহিল বাতাসে। ইলিশ চকচকে রূপসী। কে বাচে রূপসীবিনা?

লেখক: কবি

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension