প্রবাস

কেমন গেল প্রবাসে স্বজন হারানোদের ঈদ?

করোনা মহামারী একটি বছর মানুষের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে। শুধু বছর কেড়ে নিয়েই করোনা শান্ত ছিল না। কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য মানুষের জীবন। এখনো বিশ্বে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যায় এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আক্রান্তের দিক থেকেও রয়েছে শীর্ষে। যুক্তরাষ্ট্রে করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এখনো পুরোপুরি থামেনি মৃত্যুর মিছিল। তবে মৃত্যু এবং সংক্রমণ অনেক কমেছে। করোনা এখন নিয়ন্ত্রণে এবং নিম্নমুখী।

করোনা অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গেল বছরটি ছিল ভয়ঙ্কর। মানুষ মৃত্যুর বছর। আতঙ্কের বছর, ঘরে বন্দী থাকার বছর, লাশের মিছিলের বছর, বেওয়ারিশ লাশ দাফনের বছর, স্বজনহারাদের বছর। সদাজাগ্রত নিউ ইয়র্ক সিটিকে ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত করার বছর। পার্ক এবং হোটেলগুলোকে হাসপাতাল বানানোর বছর। সারাক্ষণ অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের বছর। স্বামী হারানোর বছর, স্ত্রী স্বামী হারানোর বছর, সন্তান হারানোর বছর, বাবা-মা হারানোর বছর, পরিবারকে তছনছ করার বছর, সাজানো সংসারকে ধ্বংস স্রোতে ভাসিয়ে নেয়ার বছর, হৃদয় ভাঙার বছর, ভালোবাসায় বিচ্ছেদের বছর, এবং সর্বোপরি কান্নার বছর।

অন্যান্য কমিউনিটির সাথে মৃত্যুর মিছিলে বাংলাদেশিদের সারিটিও ছিল বেশ লম্বা। কমিউনিটির অনেক পরিচিত মুখ হারিয়ে গেছে। করোনায় বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রায় এক হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। চলে গেছেন বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি কামাল আহমেদ, সহ সভাপতি আব্দুল খালেক খায়ের, কার্যকরি সদস্য বাকির আজাদ, চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি আব্দুল হাই জিয়া, সাংবাদিক স্বপন হাই, ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বিদ্যুৎ দাস, গিয়াস উদ্দিনসহ আরো অনেকে।

করোনায় স্বজন হারিয়েছেন যারা, কেমন গেল তাদের ঈদ? আজকে আমরা তাদের কথাই তুলে ধরব। তারা জানিয়েছেন, এবারে তাদের পরিবারে ঈদ আনন্দ ছিল না। ভিন্ন এক পরিবেশে তারা ঈদ করেছেন। স্বজন হারানোর শোক এখনো তারা কাটিয়ে উঠতে পারেন নি। কমিউনিটিতে অনেক সংগঠন রয়েছে, আবার অনেকে ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা করছেন। এর মধ্যে কিছু রয়েছে লোক দেখানো। কিন্তু বাস্তবে যারা স্বজন হারিয়েছেন, তাদের খবর রেখেছেন ক’জন? চলুন, জানা যাক স্বজন হারানো কয়েকজনের পরিবারের কথা।

কামাল আহমেদ। বাংলাদেশ সোসাইটির সভাপতি এবং প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটির মানবতার অভিভাবক। মানবদরদী কামাল আহমেদও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুর শোক এখনো প্রবাসে বাংলাদেশি কমিউনিটি কাটিয়ে উঠতে পারে নি। কামাল আহমেদের আত্মীয় ফারুক চৌধুরী জানান, কামাল আহমেদ ছাড়া তাদের পরিবার বলতে গেলে শূন্য। এবারের ঈদে তাদের কোনো আনন্দ ছিল না। ঈদের যে খুশি তা পরিবারে ছিল না। কামাল আহমেদ থাকতে অন্যরকম ঈদ হতো। প্রতি বছর তিনি পরিবারের সবাইকে একত্রিত করতেন। পুরো পরিবার একসঙ্গে ঈদ আনন্দ কাটাতেন। কামাল আহমেদ নেই বলে পরিবারের গেট টুগেদারও হয় নি। ঈদের খুশি অনুভব করতে পারে নি কেউ। কামাল আহমেদের মেয়েটি সারাদিন বাসাতেই ছিল। কোথাও বের হয় নি। এখনো বাবার শোক কাটিয়ে উঠতে পারে নি। ছেলেটি একবার ফারুক চৌধুরীর বাসায় এসেছিল। তার চেহারা আর চোখ যেন কামাল আহমেদকে খুঁজছিল। খুব বিষণ্ণ ছিল। ফারুক চৌধুরী জানান, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে কামাল আহমেদ সানি সাইডে একটি বাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু সে বাড়িতে তিনি উঠতে পারে নি। তার আগেই তিনি তাদের ছেড়ে চলে গেলেন। কামাল আহমেদের মৃত্যুর দু’মাস পর তার পরিবার সে বাড়িতে ওঠে। সে স্মৃতিও পরিবারকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ঈদের দিনে কমিউনিটির অনেকেই ফোন করেছেন, খবর নিয়েছেন। যার মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ সোসাইটির সাবেক সভাপতি আজমল হোসেন কুনু, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য আজিমুর রহমান বোরহান এবং বাংলাদেশ সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক রুহুল আমিন সিদ্দিকী।

আব্দুল খালেক খায়ের। বাংলাদেশ সোসাইটির সহ-সভাপতি, ব্যবসায়ী। ভালো মানুষ ও দানবীর হিসেবে পরিচিত পরোপকারী আব্দুল খালেক খায়েরও করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মরহুম আব্দুল খালেক খায়ের যেখানে মানুষের বিপদ দেখতেন, সেখানেই ছুটে যেতেন। তাছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দু’হাতে দান করতেন। নিজের একটি বাড়িতে মসজিদ করেছেন, বাংলাদেশে তার গ্রামের বাড়ির সম্পত্তিও এতিমখানায় দান করেছেন। নানা গুণের অধিকারী আব্দুল খালেক খায়েরের ছোট মেয়েজামাই কোমল বলেন, তাদের জন্যে এবারের ঈদটি ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম। ঈদের নামাজ পড়েই তারা বাবার কবর জিয়ারত করতে চলে যান। ঈদের আনন্দ আনন্দ তাদের পরিবারে ছিল না। বাবার স্মৃতি মনে পড়ছিল। প্রতি বছর বাবা থাকতেন প্রধান ব্যক্তি হিসেবে। তিনিই সব কিছু ব্যবস্থা করতেন, এবারই প্রথম ব্যতিক্রম ঘটল। বাবার অভাব সকলে প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছেন।

মোহাম্মদ হক মানিক। সবাইকে মানিক নামেই চিনতেন। থাকতেন জ্যাকসন হাইটসে। এবার করোনায় মৃত্যুর মিছিলে অনেক বাঙালির সাথে তিনিও যোগ দিয়েছেন। আছেন তার স্ত্রী লায়লাতুল ফেরদৌস, এক ছেলে ও এক মেয়ে। লায়লাতুল ফেরদৌস জানালেন তাদের বিবর্ণ ঈদের কথা। সন্তানদের কথা চিন্তা করে তিনি মানসিকভাবে শক্ত থাকার ভান করেন। কিন্তু সন্তানদের মুখের দিকে তাকালে আর সহ্য করতে পারেন না। তিনি বলেন, এবারে কোথাও ঈদের আনন্দ ছিল না। প্রতি বছর তারা একসঙ্গে ঈদের নামাজে যেতেন। গেল বছর রোজার ঈদে নামাজে যাওয়া হয় নি। কোরবানির ঈদে ছেলেকে নিয়ে মানিক গিয়েছিলেন। লায়লাতুল ফেরদৌস প্রতি ঈদে নিজেই বাবা-ছেলেকে একই রকমের পাঞ্জাবি কিনে দিতেন। সে পাঞ্জাবি পরে তারা নামাজে যেত। এবার আমার ছেলে মন খারাপ করে সকাল থেকে বিছানায় ছিল। লায়লাতুল ফেরদৌসের বাবা জোর করে ঈদের নামাজে নিয়ে যান। নামাজ শেষে ফিরে ছেলে আবার বিছানায়। সারাদিন প্রায় কিছুই খায় নি। তিনি জানান, কমিউনিটির কেউ তাদের খবর নেয় নি। তবে মানিকের কয়েকজন বন্ধু সারাক্ষণ তাদের পাশে রয়েছেন। সবসময় সহযোগিতা করছেন।

জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক জেড চৌধুরী জুয়েল। কমিউনিটির অত্যন্ত পরিচিত মুখ এবং মানব কল্যাণে নিবেদিত ও সজ্জন মানুষ হিসেবে পরিচিত। জেড চৌধুরী জুয়েলের একমাত্র ছেলে জিমাম চৌধুরীও হ্যার্ট অ্যাটাকে যান। জেড চৌধুরী জুয়েল জানান, এ বছর তাদের পরিবারে ঈদ আনন্দ ছিল না। ছেলে জিমামের কথা মনে পড়ছিল। ছেলের ছয় বছর বয়স থেকেই তাকে সাথে করে ঈদের নামাজে যেতেন। এবার ছেলে নেই।

ব্যবসায়ী আব্দুল হাই জিয়া। প্রবাসের অন্যতম আঞ্চলিক সংগঠন চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি ছিলেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তার মৃত্যুশোক এখনো তার পরিবার কাটিয়ে উঠতে পারে নি। তার স্ত্রী সাঈদা জিয়া এখনো জিয়ার মৃত্যু মেনে নিতে পারেন নি। তাদের পরিবারে কোনো ঈদ আনন্দ ছিল না। ঈদের পরদিন তার বাসায় দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। সেই দোয়া মাহফিলে বিপাসহ কমিউনিটির লোকজন অংশগ্রহণ করেন।

বাকির আজাদ। বাংলাদেশ সোসাইটির কার্যকরি কমিটির সদস্য এবং বৃহত্তর কুমিল্লা সমিতির সাবেক সভাপতি ছিলেন। শতকষ্টের মাঝেও তার মুখে হাসিটা যেন লেগেই থাকত। েরমানুষকে আপন করে নেয়ার অসাধারণ দক্ষতা ছিলো তার। নিউ ইয়র্কে যখন করোনার তাণ্ডব চলছিল, বাকির আজাদ লোকজনকে ফোন করে বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করেছেন, অনেকের বাসায় জিনিসপত্র পৌঁছে দিয়েছেন। অনেককেই মেসেজ করে বলেছেন, কোনো কিছুর প্রয়োজন হলে যেন তাকে জানায়। অবশেষে করোনাতেই তার মৃত্যু হলো। বাকির আজাদের দুই সন্তান বাবার অভাব ভুলে ঈদ করার চেষ্টা করেছেন। পারেন নি। এভাবে কমিউনিটির আরো অনেকই চলে গেছেন। তাদের সবার ঈদ ছিল আনন্দহীন ঈদ।❐

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension