উপন্যাসসাহিত্য

তবুও ভ্যালেন্তিনা (শেষ পর্ব)

তাহমিদ হাসান


[পূর্ব প্রকাশের পর ]

ভ্যালেন্তিনা, তুমি সিগারেট টানতে থাকো, আমি আসছি।

এই কথা বলে হাসান বারের ভিতরে গিয়ে সান্দ্রাকে দুইটা বিয়ার দিতে বলে ওয়াশ রুমে যায় ফ্রেশ হবার জন্য। টয়লেটে প্যান্টের চেইন খুলে হাসান ক্রিয়া-কর্ম করতে থাকে, আর ভাবতে থাকে বিষণ্নতার কবি জীবনানন্দ দাশ যার সবচেয়ে প্রিয়, যার বান্ধবী অবসাদে ভোগার রাজকীয় রোগে আক্রান্ত, বিষণ্নতায় ভোগা তো তাকেই মানায়। মাথার চুলে, চোখেমুখে ভালো করে পানি ছিটিয়ে হাসান বাইরে এসে দেখে ভ্যালেন্তিনার চোখে জল; সান্দ্রা বিয়ার দিয়ে গেছে আগেই, কিন্তু বিয়ারে হাত না দিয়ে চুপ করে বসে আছে সে। নারীদের এই এক মধুর মারণাস্ত্র, যে অস্ত্রের হাত থেকে বাঁচার উপায় আজও আবিস্কার করতে পারেনি কোন বৈজ্ঞানিক। গভীর ভালোবাসায় দুই হাত দিয়ে ভ্যালেন্তিনার চোখের জল মুছিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে হাসান বলে, আমরা সময়ের সন্তান, ভ্যালেন্তিনা। মহাকালের কাছে আমাদের জীবন খুব ক্ষুদ্র একটা মুহূর্ত মাত্র, এমন কী ঐ সৈকতের বালু কণার চাইতেও ক্ষুদ্র। তোমার আগেও তোমার মতো চোখের জল ভাসিয়েছে অনেকে, তোমার পরেও ভাসাবে অনেকে। অতএব দুঃখ করো না ভ্যালেন্তিনা, সময়কে উপভোগ করো, অ্যান্ড টেক ইট ইজি।

কিন্তু কেন, কার জন্যে ভ্যালেন্তিনার এই চোখের জল? হাসান নিজেকে প্রশ্ন করে। এটা কি মৌরিচ্ছিও? হতে পারে! কারণ, সে-ই তো অ্যালেনার পিতা, ভ্যালেন্তিনার প্রথম প্রেম। তবে হাসানের সাথে যে প্রেম এটা কী শুধুই সময়ের দাবি? কোন কি আবেগ নেই এখানে? প্রশ্ন প্রচুর, অথচ কোন উত্তরই হাসানের জানা নেই। ভ্যালেন্তিনার মনের খবর কীভাবে জানবে হাসান; যেখানে নিজের মনের খবরই সে জানে না। এতোদিন পর হাসান অনুভব করে, হয়ত সে ত্রিভুজ প্রেমের ত্রিমাত্রিক শিকার। মনের দ্বিধা-দন্ধ মনে চাপা রোখে ভ্যালেন্তিনার গ্লাসে বিয়ার ঢেলে দেয় হাসান।

বিয়ার শেষ করে হাসান বলে, চলো ভ্যালেন্তিনা, বিচে যাই।

সান্দ্রাকে বিল মিটিয়ে হাত ধরাধরি করে তারা বিচের দিকে হাঁটতে থাকে। আবাসিক বিল্ডিং-ব্লক পেরিয়ে বিচের রাস্তায় উঠতেই হাসানের গায়ে পরশ বুলিয়ে দেয় সাগরের হিমেল হাওয়া; বিশাল একটা চাঁদ হেসে ওঠে হাসানকে দেখে, মুহূর্তে হাসানের মন ভালো হয়ে যায়।

চলো ভ্যালেন্তিনা, চাঁদের সুধা পান করার আগে আমরা পেটের ক্ষুধা নিবারণ করি।

তোমাকে বোঝা খুব কঠিন।

আজ আমার হৃদয় উন্মুক্ত করে দেবো। তুমি ইচ্ছে মতো পড়ে নিও, যা পড়তে চাও।

হাসান, রহস্য করো না।

ঠিক আছে, চলো ডিনার করি।

দুজনে ভালো একটা রেস্টুরেন্টে গিয়ে বসে। প্রথম প্রথম ভ্যালেন্তিনা সংকোচ করতো, কিন্তু এখন সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সন্ধ্যায় বের হলে ঘরে ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হয়ে যায়, তাই ডিনারটা ভ্যালেন্তিনাকে নিয়ে বাইরে সেরে ফেলে হাসান। ভ্যালেন্তিনা জানে খরচ নিয়ে হাসানের কোন মাথা ব্যথা নেই; কারণ টাকার কোন সমস্যা নেই হাসানের। ইতিমধ্যে হাসানের ব্যবসা সম্পর্কে সেও সবকিছু জেনেছে; এটা নিয়ে তারও কোন সমস্যা নেই; বরং সে চায় হাসানকে সাহায্য করতে, যদিও হাসানের তা প্রয়োজন নেই।

সৈকতের উপরেই রেস্টুরেন্ট; যারা সূর্যস্নান করতে আসে তাদের পদচারণায় সারাদিন ব্যস্ত থাকে, আর রাতে থাকে রোমান্টিক পরিবেশ। সৈকতের দিকে খোলা বারান্দায় ফাঁকা ফাঁকা করে টেবিল বসানো, এটা শুধু সামারের সন্ধ্যাগুলো উপভোগ করার ইতালিয়ান পরিবেশনা। চাঁদের রূপালী আলোয় সাগরের বহু দূর পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, খুবই রোমান্টিক একটা পরিবেশ। বারান্দার একটা টেবিলে বসে মেনু নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে তারা, যদিও মেনু দুজনেরই প্রায় মুখস্ত; কারণ, প্রায়ই এখানে ওরা ডিনার করে। হাসান ঠিক করে টুনা মাছের পিজ্জা, আর ভ্যালেন্তিনা অক্টোপাসের পাস্তা খেতে চায় (অক্টোপাস ছোট ছোট করে কেটে পাস্তার সাথে মিশিয়ে রান্না করা); এটা ভ্যালেন্তিনার প্রিয় একটা খাবার। অর্ডার দিয়ে কোক পান করতে করতে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে হাসান ভাবতে থাকে কী আনন্দেই না সে আছে এখানে ভ্যালেন্তিনার সাথে। অথচ এই সাগরের অন্য পারে (লিবিয়ার বেনগাজি, অথবা অন্য কোন শহরে) চোখে স্বপ্ন আর জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে কতো মানুষ অপেক্ষায় আছে এই সাগর পাড়ি দেবার জন্য। কেউ খুঁজে পাবে কূলের ঠিকানা, আর কেউ এই সাগরে হারিয়ে যাবে চিরকালের মতো। যারা আজ অপেক্ষায় আছে হাসান তাদের না চিনলেও, সে এখানে বসেই অনুভব করতে পারছে তাদের আত্মার অনিশ্চিত আকাঙ্খা। কারণ, সে পেরিয়ে এসেছে এইসব পাতা ঝরা বিষণ্ন দিনগুলি। কে অপেক্ষায় আছে, হাসান সেটা জানে না, কিন্তু এটা জানে, কেউ না কেউ অবশ্যই অপেক্ষায় আছে। তার স্বপ্নগুলো, তার কষ্টগুলো, তার নিঃশ্বাসের ওঠা-নামা এই এতো দূরে বসেও হাসান অনুভব করতে পারছে।

গরম গরম পিজ্জা ও পাস্তা দিয়ে গেছে ওয়েটার মেয়েটি। টুনা মাছের পিজ্জা হাসানের খুব প্রিয়, আর একটা বিয়ার পান করার পর সব কিছুই ভালো লাগে তার।

শুরু করো, ভ্যালেন্তিনা।

ধন্যবাদ হাসান, বনো আপেতিতো (তোমার খাবার সুস্বাদু হোক)।

খেতে খেতে হাসান ভাবে, কাল সকালে ভ্যালেন্তিনাকে নিয়ে বের হতে হবে; অ্যালেনার জন্য কিছু কিনতে হবে। অতএব কাল সন্ধ্যার ভিতরে যতটুকু পারা যায় সিডি বিক্রি করে ফেলতে হবে; অনেক সিডি জমা হয়ে আছে। এদিকে আবার আন্দ্রেয়াকে পঞ্চাশ হাজার ইউরো দিতে হবে; কী একটা প্রয়োজনে লাগবে ওর। হাসান হিসাব করে পঞ্চাশ হাজার ইউরোতে কতো টাকা হবে? প্রায় পঞ্চাশ লাখ টাকা। ইউরো কোন সমস্যা নয়, তার কাছে আছে; কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, যে করেই হোক আগামীকাল কিছু সিডি তাকে কমাতেই হবে।খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে সোজা বিচে নেমে যায় ওরা; ভ্যালেন্তিনা খুব খুশি, আজকের পাস্তাটা ভীষণ মজা লেগেছে তার কাছে। বিচের বার থেকে দুইটা বিয়ার নেয় হাসান; রাস্তার উপরে ভ্রাম্যমান দোকানের তুলনায় এখানে দাম দ্বিগুন, তবুও এখান থেকেই নেয় হাসান। বিচ থেকে উঠে আবার রাস্তায় যেতে ইচ্ছে করে না তার। বারের সামনে একটা ডি জে’র মঞ্চ, এই মঞ্চ ঘিরে সবাই গোল হয়ে শুয়ে বসে সঙ্গিত উপভোগ করছে।

এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, অন্য হাতে বিয়ারের বোতল; ভ্যালেন্তিনার নরম বুকে মাথা রেখে বিশাল চাঁদটার দিকে তাকিয়ে হাসান শুয়ে আছে। চাঁদটা ততটাই বড়, যতোটা বড় হওয়া সম্ভব; এবং সাগরের উপরে ভাসতে থাকা চাঁদটাকে দেখে মনে হচ্ছে, এই বুঝি সাগরে ডুবে যাবে! সিগারেটে টান দিয়ে হাসান ভাবেআচ্ছা, ইট, কাঁঠ, পাথরের আবর্জনায় পূর্ণ কোলকাতা শহরে বসে কবি জীবনানন্দ দাশ কি এই চাঁদটাকে এভাবে উপভোগ করতে পারতেন? ফেলে আসা ধানসিড়ি নদী, ধানের ক্ষেত, আঁকা-বাঁকা মেঠো পথ, হিজল-তমাল-ডুমুরের গাছ গুলোর জন্য কি কবি’র মন হাহাকার করে উঠতো? পায়ের নিচে সর্পিণীর মতো ট্রাম লাইন, মাথার উপরে কাকের বাসার মতো বিদ্যুতের তারের এই জঙ্গল ফেলে কবি’র মন কি ছুটে যেতো শৈশবের বরিশালে? যেমন এই আলো ঝলমলে জোছনা রাতে সমুদ্র সৈকতে ভ্যালেন্তিনার বুকে মাথা রেখে হাসান হারিয়ে যায় ফেলে আসা ছোট্ট মফস্বল শহরটার বুক চিরে বয়ে যাওয়া খালের ঘোলা জলে, আর সেই রাস্তাটায়, যেটার শেষ মাথায় একটা নির্জন বাড়িতে তার প্রতিক্ষার প্রহর গুনছে তার মা। জীবনানন্দ দাশের প্রতিটি কবিতার, প্রতিটি বাক্যের মাঝে বিষণ্ন দুপুরের একটা অদ্ভুত অলসতা আবিস্কার করে হাসান; যেটা তার মনের কথা বলে, যেটা সে হৃদয় দিয়ে অনুভব করে, কিন্তু ব্যাখ্যা করে বলতে পারে না। তারকারাও মরে যায়, আমাদের ভালোবাসারও মৃত্যু হবে একদিন। এই বোধ শুধু কাজ করে কবি’র হৃদয় থেকে হাসানের হৃদয়ে।

বিয়ারে চুমুক দেয় হাসান, হঠাৎ একটা শীতল অনুভূতি তার সমস্ত শরীরে বিদ্যুতের মতো ছড়িয়ে পড়ে। বহু পুরাতন একটা আকাঙ্খা, বলা যায় দিবাস্বপ্ন এভাবে যে হুবহু বাস্তবে পরিণত হতে পারে তা কল্পনাও করেনি সে। মনে পড়ে কপোতাক্ষ নদের তীরে বন্ধুদের সাথে কাটানো মদিরাময় জোছনা রাতগুলোর কথা।পান-পাত্র হাতে চাঁদের দিকে তাকিয়ে সে ভাবতোআহা! ইতালির সমুদ্র সৈকতে যদি প্রেমিকার বুকে মাথা রেখে এমন জোছনা উপভোগ করতে পারতামএক হাতে বিয়ারের বোতল, অন্য হাতে জ্বলন্ত সিগারেট, আর চাঁদের দিকে তাকিয়ে আছে সে, তবে বুঝি জীবনটা সার্থক হয়ে যেতোএই তো সেই রাত, আর এই তো সেই স্বপ্নের হুবহু বাস্তবায়ন। বিশ্বাস হচ্ছে না হাসানের, এটা স্বপ্ন, নাকি বাস্তব? এটাও কি সম্ভব? এই চাঁদটাই তো সে-দিন কপোতাক্ষ নদের তীরে হাসানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসেছিল। ভ্যালেন্তিনার বুক থেকে উঠে আবার বিয়ারে চুমুক দেয় সে; গলাটা শুকিয়ে গেছে, এবং স্বপ্নের ঘোর এখনও কাটেনি।

কী হয়েছে হাসান, উঠে বসলে যে?

কিছু না, তোমার কষ্ট হচ্ছে বোধহয়!

মোটেও না, আমার ভালোই লাগছিল।

আমি ভাবছিলাম তোমার কষ্ট হচ্ছে।

একটা সিগারেট ধরিয়ে দেবে!

হাসান একটা সিগারেট ধরিয়ে ভ্যালেন্তিনার হাতে দেয়। এতক্ষণ হাসান ভ্যালেন্তিনার বুকে মাথা রেখে সিগারেট টানছিল, আর এখন ভ্যালেন্তিনা হাসানের কোলে মাথা রেখে পরম শান্তিতে সিগারেট টানছে। হাসান একবার চাঁদের দিকে তাকায়, একবার ভ্যালেন্তিনার দিকে; দুটোই সুন্দর। ভ্যালেন্তিনার মাথায় হাত বোলাতে থাকে হাসান।

হাসান।

বলো।

চলো, আমরা বিয়ে করে ফেলি।

হাসান আন্দাজ করে, কোথা থেকে এলো ভ্যালেন্তিনার এই অফুরন্ত আবেগ? হয়ত স্বর্গীয় চাঁদ, অথবা মদিরার মায়াবী প্রভাব; আগামীকাল সকালে যেটা কেটে যাবে; আর ওর বাবা বেচেঁ থাকতে বিয়ে তো কোনদিন সম্ভব না। তাই কোন উত্তর না দিয়ে হাসান শুধু হাসে।

কী ব্যাপার, হাসছ কেন? কিছু বলো।

ভ্যালেন্তিনা, চাঁদের গায়ে আমরা আমাদের নাম লিখে দিয়েছি; সাদা কাগজে নাম লিখে আর কী হবে বলো! কাগজ একদিন হারিয়ে যাবে; কিন্তু এই রূপসী চাঁদ তো হারাবার নয়।

আমার প্রিয় ভার্জিল, আমি জানি, তুমি বাবার ব্যবহারে বিরক্ত। কিন্তু কী করব বলো, বাবা আমাকে তোমার সম্পর্কে অনেক ভয় দেখায়।

তোমাকে কিছুই করতে হবে না, তোমার বাবা যেটা বলে, তোমার সেটাই করা উচিত।

আর তুমি?

আমি হয়ত বা দেশেও চলে যেতে পারি। কী করব আমি জানি না, ভ্যালেন্তিনা।

আমাকে ছেড়ে তুমি চলে যেতে পারবে?

জানি না, ভ্যালেন্তিনা বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়- এটা বাংলা উপন্যাসের একটা বিখ্যাত সংলাপ।

তোমাদের উপন্যাসিক অনেক নিষ্ঠুর।

হতে পারে! কিন্তু এটাই বাস্তব।

হাসান, তোমার শূন্যতা আমি সহ্য করতে পারব না।

ভ্যালেন্তিনা, পৃথিবীও শূন্যতা পছন্দ করে না। প্রাকৃতিক নিয়মে সব শূন্যতা পূরণ হয়ে যায়।

তুমি আজ আমায় কষ্ট দিতে চাও?

আমার দেবীকে আমি কীভাবে কষ্ট দেবো। আমার প্রার্থনা (গ্রীক পূরাণে যে ভাবে দেবীদের প্রতি তর্পণ দেওয়া হতো, সেই ভাবে সৈকতের বালুতে কিছু বিয়ার ঢেলে দিয়ে), আমার মদিরার তর্পণ সব তোমার উদ্দেশ্যে, তোমাকেই ঘিরে প্রিয়তমা।
ভ্যালেন্তিনা উঠে হাসানকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিয়ে বলে, তাহলে আর আমাকে ছেড়ে যাবার কথা বলবে না; হেঁয়ালি করেও না।

ঠিক আছে, ভ্যালেন্তিনা।

চাঁদ এখন অনেক নিচে নেমে গেছে; মনে হচ্ছে আর একটু নামলেই সাগরের জলে ডুবে যাবে, অথবা সাগরের ঢেউ চাঁদের গায়ে লাগতে পারে। রূপালী জোছনা, সাগরের নোনা জলে রূপালী বন্যা হয়ে ভেসে যাচ্ছে; মায়াময় এক অপার্থিব দৃশ্য। ছবির মতো এই দৃশ্য দেখে হাসানের চোখ দুটো পাথর হয়ে যায়। মনে মনে গাইতে থাকে‘ও চাঁদ, সামলে রাখো জোছনাকে’দুই হাত তুলে চাঁদের কাছে প্রার্থনা করে, ওগো চাঁদ, তুমি ডুবে যেওনা, তুমি ডুবে গেলে, আমিও যে ডুবে যাব। হাসানের মনে পড়ে, ঠিক এমনই এক জোছনা ভরা রাতে পোল্যান্ডের জঙ্গল পার হবার কথা। তখন কিন্তু সে মনে-প্রাণে চেয়েছিল, চাঁদ যেন ডুবে যায়, কারণ, তা না হলে চাঁদের আলোয় বর্ডার পুলিশের হাতে তারা ধরা পড়ে যেতে পারতো। আজ সেই একই চাঁদ, কিন্তু কামনার কী ভীষণ বৈপরীত্য। একেই বুঝি বলে মানুষের মন!

তবুও ভূমধ্যসাগর তীরে ভ্যালেন্তিনার বুকে মাথা রেখে জোছনা রাতের এই পান উৎসব, জাগতিক সকল পাওয়া না পাওয়ার উর্দ্ধে নিয়ে যায় হাসানকে।জীবনের হিসাব মেলাতে যাওয়া এখন অর্থহীন, সময়ের অপচয় মাত্র। হিসাবের সংখ্যাগুলো সব শূন্যে মিলিয়ে যায়, থাকে শুধু মাথার উপরে হাসতে থাকা মায়াবী চাঁদ, আর বুকের ভিতরে মুখ ঘষতে থাকা রূপসী ভ্যালেন্তিনা। যতদিন এই চাঁদের আলো ফিরে ফিরে আসবে, ততদিন ফিরে ফিরে আসবে ভ্যালেন্তিনা, আর তার শরীরের এই মিষ্টি সুবাস।

অনেক রাত হয়েছে ভ্যালেন্তিনা, চলো উঠি।

আর একটু বসি হাসান, খুব ভালো লাগছে।

ঠিক আছে।

হাসান, তুমি না থাকলে আমি এতো দিনে পাগল হয়ে যেতাম।

ধন্যবাদ ভ্যালেন্তিনা, খুশি হলাম, তোমার কাজে লাগতে পেরেছি বলে।

হাসান, অ্যালেনাকে নিয়ে কাল কোথায় আসবো?

সিনিওরে রবের্তোর বারে, আমি তোমাদের জন্য অপেক্ষা করব।

হাসান, অ্যালেনা যা বায়না করবে তুমি কিন্তু তা কিনে দিতে পারবে না; আগেই বলে দিলাম।

কাল আসোই না, তারপর দেখা যাবে।

তুমি কিন্তু আদর দিয়ে দিয়ে অ্যালেনাকে মাথায় ওঠাচ্ছো। জানো, বাবার কাছে ও তোমার অনেক প্রশংসা করে।

যাক, কেউ তো আমার প্রশংসা করে, মানুষ হিসাবে আমি এতোটা খারাপ নই, কী বলো?
না হাসান, তুমি খুবই খারাপ (ভ্যালেন্তিনা হাসতে থাকে)।

হ্যাঁ, আমি তো খারাপই। তোমার বাবা তো পারলে আমাকে গুলি করে দেয়।

হাসান আবার? বাবা যাই করুক তার মেয়ে তো তোমাকে ভালোবাসে।

এই জন্যেই তো তোমার বাবার সব অপমান আমি নীরবে হজম করি।

ওহ, বেচারা হাসান।

ভ্যালেন্তিনা হাসানকে জড়িয়ে ধরে, চঞ্চল চাতক পাখির মতো তার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট জোড়া হাসানের ঠোঁটে কামনার তৃষ্ণা মেটায়। রাত প্রায় দুইটা সৈকতের প্রাণের মেলা ভাঙতে শুরু করেছে। রাতের নীরবতার সাথে বাড়তে থাকে রাতের গাঢ? অন্ধকার; আর এই আঁধারের বুক চিরে জন্ম নেবে জীবনের নতুন স্পন্দন। ডি জে’র মঞ্চ থেকে ভেসে আসছে ইতালিয়ান সঙ্গীতের বিখ্যাত জুটি মিনা ও সেলেনতানো’র রোমান্টিক গান আকুয়া এ সালের (জল ও লবন) মধুর সুর। হাসানের হাত ধরে ভ্যালেন্তিনা আকুয়া এ সালে গাইতে গাইতে বাসার পথে রওনা দেয়, অনিচ্ছা সত্ত্বেও।

বহুদিন পর রাতে একটা দুশ্চিন্তামুক্ত গভীর ঘুম দেয় হাসান, অবশ্য রাত না বলে সকাল বলাই ভালো। কারণ, শুতে শুতে প্রায় ভোর হয়ে গিয়েছিল। সকালে গোসল করে তরতাজা হয়ে, সিনিওর রবের্তোর বারে গিয়ে করনেত্তো (এক প্রকার ছোট মিষ্টি রুটি) ও কফি পান করে নাস্তা শেষ করে, সিগারেট ধরিয়ে ভ্যালেন্তিনার জন্য অপেক্ষা করতে থাকে হাসান। কিছুক্ষণ পরে পিছন থেকে অ্যালেনা এসে হাসানকে জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলে, বন জোর্নো, হাসান।

হাসান সাথে সাথে অ্যালেনাকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করে বলে, বন কমপ্লে আন্নো, অ্যালেনা (শুভ জন্মদিন, অ্যালেনা)।

আবার আদুরে গলায় অ্যালেনা বলে, গ্রাচ্চে।

অ্যালেনার পিছন পিছন ভ্যালেন্তিনা ঢোকে; সিনিওর রবের্তো অ্যালেনাকে আদর করে। ভ্যালেন্তিনার জন্য কফি এবং অ্যালেনার জন্য আইসক্রিম অর্ডার দেয় হাসান। কফি পান করতে করতে কোথায় যাওয়া যায় তাই নিয়ে দুজনে আলাপ করে।

হাসান, কোথায় যাব?

চলো, ইউনাইটেড কালারে যাই (এটা ইতালির জামা-কাপড়ের একটা বিখ্যাত ব্রান্ড)।

হাসান, ওখানে তো সবকিছুর দাম বেশি।

সমস্যা নাই, কিন্তু ওখানে বাচ্চাদের ভালো ভালো জামা-কাপড় পাওয়া যায়, আমি দেখেছি।

ঠিক আছে, চলো।

ভ্যালেন্তিনা ইতস্তত করতে থাকে।

ইউনাইটেড কালার থেকে অ্যালেনার জন্য সুন্দর একটা ফ্রক কেনে হাসান; লাল কাপড়ের উপরে সাদা কাজ করা, জামাটা ভ্যালেন্তিনারও খুব পছন্দ হয়েছে। অ্যালেনার আব্দার অনুযায়ী বড় একটা টেডি বিয়ার কিনে অ্যালেনার হাতে দিয়ে হাসান বলে, অ্যালেনা, এটা তোমার জন্মদিনের উপহার।

টেডি বিয়ারটা হাতে নিয়ে হাসানকে ধন্যবাদ দেয় অ্যালেনা, সে খুব খুশি হয়েছে। কেনাকাটা শেষে একটা বারে গিয়ে বসে ওরা, হালকা নাসতা, আর এল্যেনার জন্য জুস অর্ডার করে হাসান।

হাসান, অ্যালেনার জন্মদিন উপলক্ষে বাবা আজ সন্ধ্যায় আমাদের পিজ্জা খেতে নিয়ে যাবে, আর কাল সকালে আমরা এক সপ্তাহের জন্য নাপলি যাব, দাদা বাড়ি।

হঠাৎ?

হ্যাঁ, হাসান। আমার এক চাচার বিয়ে; তাই এই উপলক্ষে কিছুদিন দাদা বাড়ি ঘুরে আসা হবে।

তুমি ছাড়া আমার তো সময় কাটবে না, ভ্যালেন্তিনা।

হাসান, এক সপ্তাহ মাত্র। দেখতে দেখতে কেটে যাবে। আর তোমাকে ছাড়া আমারও তো খারাপ লাগবে।

তবুও ভ্যালেন্তিনা। তুমি ছাড়া দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজনী।

হাসান, তুমি কিন্তু বার আমিগোসে গিয়ে বেশি বিয়ার পান করবে না। এই কয়টা দিন মন দিয়ে ব্যবসা করবে। আমি আসার পর আমরা অনেক মজা করব।

ঠিক আছে, মহারানী। তোমার কথা মতোই কাজ হবে। এই কয় দিন আমি শুধু পানি পান করব।

হাসান, আমি কিন্তু মজা করছি না, আমাকে চিন্তায় ফেলো না।

ভ্যালেন্তিনা, আমি তোমার প্রতিক্ষায় থাকবো।

হাসান, বার আমিগোসে গিয়ে সান্দ্রার সঙ্গে বেশি গল্প করবে না; তুমি যদি আমাকে কষ্ট দাও, আমি কিন্তু মরে যাব।

ভ্যালেন্তিনা, তুমি টেনশন করো না; আমার হৃদয়ে শুধু তোমার নাম লেখা আছে। ওখানে অন্য কোন নাম লেখার কোন জায়গা নেই।

তোমার কাছে আমার অনেক কিছু পাওনা আছে, বুঝেছো জনাব! ফিরে আসলে সবকিছু আমি আদায় করে নেবো; মনে থাকে যেন।
অবশ্যই, ভ্যালেন্তিনা।তোমার পাওনা আমি তোমাকে সুদ আসলে মিটিয়ে দেবো।

হাসান, এবার আমরা উঠি?

ঠিক আছে, ভ্যালেন্তিনা। চলো তোমার বাসা পর্যন্ত পৌছে দেই।

চলো।

চৌদ্দ

প্রন্ত।

প্রন্ত। তুমি কি হাসান?
হ্যাঁ, সিনিওরা।

আমি ভ্যালেন্তিনার মা বলছি।

বন জোরনো, সিনিওরা।

বন জোরনো, হাসান। তোমাকে একটা কথা বলার জন্য ফোন দিয়েছি; কিন্তু কীভাবে বলবো বুঝতে পারছি না।

বলো মা, সমস্যা নাই।

হাসান, ভ্যালেন্তিনা আর বেঁচে নেই।

হাসান তার নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলো না। সাতদিনের কথা বলে ভ্যালেন্তিনা দাদা বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিল, কিন্তু দুই সপ্তাহ পার হলেও ভ্যালেন্তিনার কোন ফোন না পেয়ে হাসান অস্থিরতায় ভুগছিল। কয়েকদিন অবশ্য ভ্যালেন্তিনার বাসার ল্যান্ড ফোনে রিং দিয়েছিল, কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করেনি; তাই হাসান ধরে নিয়েছিল ভ্যালেন্তিনা এখনও ফেরেনি। অথচ এতদিন পরে ফিরলো, কিন্তু এভাবে!
মা, কীভাবে, কী হয়েছিল ভ্যালেন্তিনার?

হার্ট অ্যাটাক, রাতে খাবার পর স্টোক করেছিল। আমরা সঙ্গে সঙ্গে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিলাম; কিন্তু বাঁচাতে পারিনি।

কবে হলো?

আজ পাঁচ দিন, আমাদের আসতে দেরি হলো এই জন্যে। সব আনুষ্ঠানিকতা মিটিয়ে আমরা গতকাল রাতে এসেছি।

অ্যালেনা কেমন আছে?

ভালো, কিন্তু মাকে না পেয়ে কাঁদছে।

আমি কি সন্ধ্যায় অ্যালেনাকে দেখতে আসতে পারি?

অবশ্যই হাসান, তুমি আসলে সত্যি খুশি হবো।

ঠিক আছে মা, সন্ধ্যায় দেখা হবে।

সকালের নাস্তা শেষে সবাই কফি খাবার আয়োজন করছিল। তিনজন বাদে সব রুমমেট কাজে বের হয়ে গেছে, বাকীরা কফি খেয়ে বের হবে। হাসান সব সময় শেষে বের হয়; তার গন্তব্য সিনিওরে রবের্তোর বার। ঘরের সবাই হাসানের কথোপকথন শুনেছে, তাই সবাই মিলে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে। হাসান ঘামতে শুরু করেছে, আবার শীতও লাগছে; তার কেমন লাগছে বলে ঠিক বোঝাতে পারছে না সে।

সুমন ভাই, আজ আমার সাথে থাকেন; আমার খারাপ লাগছে।

সুমন ভাই এর বাড়ি বরিশাল, হাসানের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্ক।

ঠিক আছে, হাসান ভাই। আজ আমি আপনার সাথে থাকি, আর আপনাকে এখন একা রাখা ঠিক হবে না।

কফি শেষ করে সুমন ছাড়া বাকী দুজন কাজে চলে যায়, হাসান নিজেও আজ কোথাও যাবে না; কিসের ব্যবসা, কেন ব্যবসা? তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না এখন। হাসানের বুকের ভিতরটা খালি খালি লাগছে।

ভ্যালেন্তিনা আর মাথার চুল ঝাঁকিয় হেঁটে আসবে না, হাসানের কথা শুনে হাসিতে ফেটে পড়বে না, আনন্দে হাসানের বুকে মুখ রাখবে না, আর কোন দিন হাসানকে শাসন করবে না, এটা কীভাবে মেনে নেওয়া সম্ভব! ভ্যালেন্তিনা ছাড়া সব কিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে হাসানের।

হাসান ভাই, কী হয়েছিল ভ্যালেন্তিনার?

ভ্যালেন্তিনার মা বলছে, গত পাঁচদিন আগে হার্ট অ্যাটাকে ভ্যালেন্তিনা মারা গেছে।

ভাই, আপনার দুর্ভাগ্য; এতো অল্প বয়সে এতো সুন্দরী একটা মেয়ে মারা গেল। রাস্তা-ঘাটে ভ্যালেন্তিনার সাথে দেখা হলে আমাদের সাথে খুব আন্তরিক ব্যবহার করতো; ওর ভিতরে কোন অহংকার দেখিনি কোনদিন। ভ্যালেন্তিনাকে তো আমরা ভাবি বলে ডাকতাম, আর এই ডাকে ও খুব মজা পেতো।

সুমন ভাই, আমি কী করব, আমি বুঝতে পারছি না। সব সময় আমার কপালে কেন দুঃখ লেখা হয়?

ভাই, শান্ত হোন। ভেঙে পড়লে তো চলবে না। ভ্যালেন্তিনা নেই সত্যি, কিন্তু জীবন তো থেমে থাকবে না।

ভাই, ভ্যালেন্তিনা কিন্তু যেতে চায়নি, সবাই যাচ্ছে বলে সেও অনিচ্ছা সত্বেও গিয়েছে।

আপনি কি ওদের বাসায় দেখা করতে যাবেন?

হ্যাঁ , আমাকে যেতেই হবে।

আপনি না বলেন, ভ্যালেন্তিনার বাবা আপনাকে পছন্দ করে না, যদি আবার ওর বাবা আপনাকে কিছু করে?

কী আর করবে? কী আর ছিনিয়ে নেবে আমার কাছ থেকে? যা ছিল তা তো আর নেই; আমি এখন নিঃস্ব, আর একজন নিঃস্ব মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার মতো কিছু থাকে না। আমি তো কোন অন্যায় করিনি; আমি তো শুধু ভ্যালেন্তিনাকে ভালোবেসেছিলাম; আমি কেন ভয় পাবো? আমি সিনিওরে ভিসকন্তির মুখোমুখি দাঁড়াতে চাই। সন্ধ্যায় আমি ভ্য্যালেন্তিনাদের বাসায় যাব।

ঠিক আছে, আপনি যখন যাবেন, আমিও আপনার সাথে যাব। আমি বাসার নিচে আপনার জন্য অপেক্ষা করব।

এক তোড়া ফুল এবং অ্যালেনার জন্য চকোলেট ও কেক নিয়ে সন্ধ্যায় ভ্যালেন্তিনাদের দরজায় কড়া নাড়ে হাসান। তার মনের মধ্যে চলছে সামুদ্রীক ঘুর্ণিঝড়, কিন্তু বাহিরে সে শান্ত ও শীতল। ভ্যালেন্তিনার মা দরজা খুলে দিয়ে সৌজন্য বিনিময় শেষে ভিতরে আসার অনুরোধ করে হাসানকে। ড্রইংরুমে বসেছে হাসান; ভ্যালেন্তিনার সাথে আগেও কয়েক বার এখানে এসেছিল সে, তখন হাসানের কাছে বাসাটা মনে হতো, ইতালিয়ান আভিজাত্যের ছন্দময় ফুলের বাগান; অথচ এখন ভ্যালেন্তিনাহীন এ ভূবন যেন শ্মশানের শোকগাথা। ভ্যালেন্তিনার রুম থেকে অ্যালেনা এসে হাসানের কোলে ঝাপিয়ে পড়ে। হাসান অ্যালেনাকে জড়িয়ে ধরে আদর করে, হাতে তুলে দেয় চকোলেট ও কেক। হাসানকে ধন্যবাদ জানিয়ে ভ্যালেন্তিনার বড় বোন রোসেত্তির সাথে ভিতরে চলে যায় অ্যালেনা।

মা, তোমাকে সান্ত্বনা দেবার মতো ভাষা আমার জানা নেই। আমি দুঃখিত। ভ্যালেন্তিনার আত্মার প্রতি শান্তি বর্ষিত হোক।
ধন্যবাদ, হাসান। আমি জানি ভ্যালেন্তিনা তোমাকে ভালোবাসতো, তোমাকে পেয়ে ও সব দুঃখ ভুলে গিয়েছিল। ও তো সব সময় হাসি-খুশী থাকত।

মা, আমি কি ভ্যালেন্তিনার কবরে ফুল দিয়ে আসতে পারি? যদি অনুমতি দাও, এবং ঠিকানাটা আমায় দাও!

হ্যাঁ, হাসান। তুমি অবশ্যই যেতে পারো। ভ্যালেন্তিনার আত্মার শান্তির জন্য এটা আমার করা উচিত। এবং আমি এটা অবশ্যই করব।

ঠিক আছে, তবে ঠিকানাটা আমায় একটু লিখে দাও।

তুমি চিনতে পারবে?

মা, ভ্যালেন্তিনার সমাধী পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাক, আমি চিনে নেবো; আর নাপলি তো বেশি দূরে নয়।

হাসান, তোমাকে অনেক আগেই আমার ডাকা উচিত ছিল। আমার দূর্ভাগ্য, আমি তোমাকে ডাকিনি।

মা, নিয়তির উপরে আমাদের কারো কোন হাত নেই।

ভ্যালেন্তিনার মায়ের চোখে দল, হাসানও অশ্রু ধরে রাখতে পারে না; তার চোখ ভিজে গেছে। সিনিওরে ভিসকন্তি ঘর থেকে বাহির হয়ে এসেছেন। হাসান উঠে দাঁড়িয়ে উনাকে অভিবাদন জানিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। সিনিওরে ভিসকন্তি হাসানকে বুকে জড়িয়ে ধরেন; হাসান যেটা আশা করেনি কল্পনাও করেনি, সেটাই ঘটে গেল।

হাসান, তোমাকে আমি বুঝতে পারিনি; তোমার সাথে আমি অনেক অন্যায় করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দিও।

কান্না ভেজা কন্ঠে হাসানকে বললেন তিনি। হাসানের মুখে কোন ভাষা নেই। এই মুহূর্তের আবেগ প্রকাশ করার জন্য পৃথিবীতে কোন ভাষা সৃষ্টি হয়নি, একমাত্র চোখের জল ছাড়া। সিনিওরে ভিসকন্তির বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো হাসান। এটা তার সারা জীবনের জমানো কান্না, সাথে সদ্য ভ্যালেন্তিনাকে হারাবার শোক; সব মিলিয়ে আবেগের বাঁধ ভেঙে গেছে হাসানের। ছোটবেলা বাবা মারা যাবার পরে পিতার মতো আর কোন পুরুষের বুকে মাথা রেখে কাঁদেনি হাসান; আজ যেন সে খুঁজে পেয়েছে সেই কাঙ্খিত স্নেহের পরশ। কিন্তু কী আশ্চর্য, কিছুদিন আগেও যে ভ্যালেন্তিনাকে কেন্দ্র করে দুজন মানুষের মধ্যে ছিল চরম বৈরিতার মনোভাব; অথচ এখন সেই ভ্যালেন্তিনার অবর্তমানে ভ্যালেন্তিনার শোকে তারাই কাঁদছে অবুঝ বালকের মতো পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে। সত্যি কী অদ্ভুত এই মানুষের মন!

নাপলি শহরের শেষ প্রান্তের পাহাড়ের পাদদেশে নিরিবিলি এলাকায় একটি পারিবারিক কবরস্তান। এখানে যারা শুয়ে আছেন তাঁরা অধিকাংশ ভিসকন্তি; বোঝাই যায় ভিসকন্তি এখানে পরিচিত এবং প্রভাবশালী পরিবার। সেপ্টেম্বর শেষ হতে চলেছে, প্রকৃতিতে শুরু হয়েছে পরিবর্তনের পালা। ভূমধ্যসাগরের নোনা হাওয়া শেষের যাত্রা শুরু করেছে; উত্তরের আল্পস্ থেকে ভেসে আসছে শীতের আগমন বার্তা। পাথরে বাঁধানো কবরস্তানের সরু পথ ভরে গেছে ম্যাপলের বিবর্ণ ঝরা পাতায়। এখানে কোন শব্দ নেই, কোলাহল নেই, নেই মানুষের ব্যস্ততা; সময় এখানে স্থির। নিঃশব্দে ঝরা পাতার আর্তনাদ মাড়িয়ে একটি সমাধির সামনে এসে দাঁড়িয়েছে হাসানগাব্রিয়েলা ভিসকন্তি ভ্যালেন্তিনালেখা সমাধি ফলকে; স্পস্ট অক্ষরগুলো এখনও জীবন্ত। অথচ সময়ের আবরণ ধীরে ধীরে একদিন মুছে দেবে নাম, স্মৃতিচিহ্ন। অতি যত্নে ভ্যালেন্তিনার প্রিয় বিভিন্ন রঙের এক গোছা টিউলিপ ভ্যালেন্তিনার পায়ের কাছে রেখে দেয় হাসান; তার অগোচরে গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা চোখের জল গড়িয়ে পড়ে ভ্যালেন্তিনার পায়ে।

গতকাল রাতে ঘুম হয়নি হাসানের, সে সারারাত জেগে ছিল। ভোরের প্রথম ট্রেন ধরে নাপলি নেমে, একটা ট্যাক্সিতে করে এই কবরস্তানে এসেছে সে। এখন সকাল দশটা, কেউ নেই কবরস্তানে, হাসান ছাড়া। হাসান চারিদিকে তাকিয়ে দেখে, স্বর্গীয় সবুজ ঘাসের শয্যায় ঘুমিয়ে আছে মৃত মানুষেরা; তার ধারণা পাহাড়ের উপর থেকে নিশ্চই সাগর দেখা যাবে। শরতের বিষণ্ন বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর হাসানের মনের গভীরে চলছে ভিসুভিয়াসের বিপুল আলোড়ন। ভ্যালেন্তিনাকে কিছু বলতে চায় সে, কিন্তু কী বলবে কিছু বুঝতে পারছে না; নির্বাক কণ্ঠে কোন শব্দ নেই, নেই শোক অথবা শান্তির সরল উচ্চারণএ-সবের মানে কী? কোথায় দাঁড়িয়ে আছে হাসান? এই নিপুন নিঃসঙ্গতার মাঝে তবে কী সে পৃথিবীর শেষ প্রেমিক? কিন্তু তার প্রেমিকা কোথায়? শত শত মৃত মানুষের ভীড়ে, এখানে আরও দুজন মৃত মানুষ রয়েছে; একজন মাটির তলায়, অন্যজন দাঁড়িয়ে আছে মাটির উপরে। হাসান এখন কিছুটা হলেও অনুভব করছে আমাদের আদি পিতা আদমের বিরহ-বেদনা।

ট্রেন ছুটে চলেছে রোমের পথে। জানালার পাশে একটা আসনে বসে বাহিরে তাকিয়ে আছে হাসান; কিন্তু কী সে দেখছে, সে কিছুই জানে না, শুধু তাকিয়ে আছে। কারণ সে তার চোখ দুটো রেখে এসেছে কবরস্তানে, ভ্যালেন্তিনার সমাধির পাশে। কীভাবে সে কবরস্তান থেকে এসেছে, কীভাবে স্টেশনে এসে রোমের টিকিট কেটে ট্রেনে বসেছে, কিছুই তার মনে নেই; বজ্রাহত পাখির মতো ছটফট করছে সে। ট্রেনের গতির সাথে পাল্লা দিয়ে তার চোখের সামনে থেকে ভেসে যাচ্ছে গত নয়টি বছর ধরে অবিরাম ছুটে চলার স্বপ্নময় সোনালি দিনগুলোপোল্যান্ডের জোছনাময় জঙ্গল, নিঃশব্দে বরফ পড়া জার্মানের বিষণ্ন বিকেল, নির্জন আল্পসের চূড়ায় মেঘেদের সাথে মধুর মিতালী, অস্টিয়া! আহা, অস্টিয়ার সমুদ্র সৈকতে ভ্যালেন্তিনার ভালোবাসা। না, এটা ঠিক নয়; সব পথের গন্তব্য রোম নয়। হাসানের পথ নাপলিতে গিয়ে শেষ হয়েছে। যদিও সে এখন রোমেই ফিরছে, কিন্তু ইতিমধ্যে মনস্হির করে ফেলেছে হাসানযে শহরে ভ্যালেন্তিনা নেই, সেই শূন্য শহর হাসানকে কিছুই দিতে পারবে না, বেদনা ছাড়া। মনে পড়ে জুলিয়েটের বাড়ির সেই দেয়ালের কথা; সেখানে হাসানের নামের পাশের জায়গাটা খালি পড়ে আছে। কিছু নেই সেখানে, আছে শুধু শূন্যতা। অতএব দেশে ফিরে যাবে হাসান।

উদভ্রান্ত হাসান যখন ঘরে ফেরে, তখন রাত দশটা। হাসানকে দেখে তার রুমমেটদের উৎকণ্ঠা কেটে যায়, সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গোসল করে শরীরের ক্লান্তি ঝেড়ে চুপচাপ খেতে বসে হাসান। কাল থেকে শুরু হবে তার নতুন লড়াই, নতুন জীবন। আন্দ্রেয়ার সাথে হিসাব মেটাতে হবে, দেশে যাবার জন্যে পুলিশের অনুমতি নিতে হবে; উকিলের মাধ্যমে রোম ট্রাইবুনালে দরখাস্ত করতে হবে। পুলিশ কি দেশে ফেরার অনুমতি দেবে? হাসানের ধারণা অবশ্যই দেবে; সে যাতে দেশে ফিরে যায় সেই জন্যেই তো এই মানসিক চাপ। একদিনেই হাসানের স্বপ্ন-সাধ তছনছ হয়ে গেছে। এটাকে ছন্দ-পতন বলা ভুল হবে, কারণ, ছন্দ-পতন হলে ছন্দে ফেরার একটা সম্ভাবনা থাকে; কিন্তু এখানে কোন সম্ভাবনা নেই; সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, ধ্বংস হয়ে গেছে। জীবন একবার যা নিয়ে যায়, তা আর ফেরত দেয় না; কখনই না।

চাও, সান্দ্রা।

চাও, হাসান। দোভে ছেই (তুমি কোথায়)?

আ রোমা (রোমে)।

পেরকে (কেন)?

চে কলকজা দি ফারে (একটা কাজ আছে)।

কোয়ান্দো ভিয়ানি আ অস্টিয়া (অস্টিয়াতে কখন আসবে)?

আ সিয়েরা (সন্ধ্যায়)।

আজ আমার ছুটি, সন্ধ্যায় কি আমাদের দেখা হতে পারে?

বার আমিগোসে?

না, বিচে; অথবা অন্য কোথাও।

সান্দ্রা, আমি ক্লান্ত, আমার আর বলার কিছু নাই।

হাসান, আমি সব শুনেছি। ভ্যালেন্তিনীর জন্য আমি দুঃখিত। তবু আমি তোমার সাথে দেখা করতে চাই।

সান্দ্রা, ভালোবাসার যে ভায়োলিন ভেঙে গেছে সেটাতে আর তো কোন সুর উঠবে না।

তবুও আমি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চাই। বলো, কোথায় অপেক্ষা করব?

ঠিক আছে, বিচের ম্যাকডোনাল্ডসে। আমার আসতে রাত আটটা বাজতে পারে।

ইও তি আসপেত্তো (আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করব)।

গ্রাচ্চে, সান্দা, সি ভেদিয়ামো (ধন্যবাদ সান্দ্রা, দেখা হবে)।

সি ভেদিয়ামো, চাও হাসান।

গত এক সপ্তাহ ধরে ব্যস্ত সময় পার করছে হাসান; উকিলের চেম্বার ও রোম ট্রাইবুনালে ছুটতে ছুটতে সে ক্লান্ত, তবে যতোটা না শারীরীক, তার চাইতে বেশি মানসিক। এই ব্যস্ততার মাঝে বার আমিগোস ও সান্দ্রার কথা হাসানের মনেই ছিল না; তাই সান্দ্রার ফোন পেয়ে অবাকই হয়েছে সে। কিন্তু কি বলবে সান্দ্রা? দেখা করতে চাইছে কেন? বেচারী সান্দ্রা! তাকে দেবার মতো আর কিছুই অবশিষ্ট নেই হাসানের কাছে। জীবনের পরিত্যক্ত ক্যানভাসে নিয়তি আবার কোন্ রং লাগাতে চাইছে? তাকে নিয়ে নিয়তি আবার কোন্ পাশা খেলতে চায়? সে আর নিয়তির পাশা খেলার গুটি হতে চায় না; তাকে নিয়ে নিয়তির যে পরিকল্পনাই থাক না কেনতার পরিকল্পনা, সে দেশে যাবে, মায়ের কাছে। দেশে ফেরার বিমানের টিকিট এবং পাসপোর্ট তার জ্যাকেটের পকেটে। উকিলের মাধ্যমে আবেদন করে রোম ট্রাইবুনাল থেকে পাসপোর্ট ফেরত পেয়েছে হাসান; বিনিময়ে গ্রিন কার্ড রিনিউ করতে দেবার রশিদ জমা দিতে হয়েছে ট্রাইবুনালে। অতএব দেশে গেলে আর ইতালিতে ফেরত আসতে পারবে না সে; তবুও পাসপোর্ট হাতে পেয়ে হাসানের মনে হলো, তার বুকে চেপে বসা বহুদিনের পুরাতন একটা পাথর নেমে গেছে; এখন নির্ভার লাগছে তার। বেদনার বিষণ্ন কারাগার থেকে মুক্তির স্বাদ পাচ্ছে হাসান; তবে কি এতোদিন ভ্যালেন্তিনার ভালোবাসার কারাগারে বন্দি ছিল সে? মুক্তির আনন্দ এবং হারাবার বেদনা যুগপৎ ঘিরে ধরেছে তাকে। আগে কোন কাজে যতবার রোমে যেতো, ফেরার সময় ভ্যালেন্তিনার জন্য কিছু না কিছু নিয়ে ফিরতো; এবং অস্টিয়ায় ফেরার জন্য ছিল ভীষণ ব্যাকুলতা। কিন্তু এখন আর সেই ফেরার ব্যাকুলতা নেই; যদিও সান্দ্রা অপেক্ষা করছে তার জন্যে।

চাও, সান্দ্রা।

চাও, হাসান।

বলো কী খাবে?

হাসান, কিছু খেতে ইচ্ছা করছে না।

সান্দ্রা, সারাদিন অনেক ছোটাছুটি করে এসেছি। আমার ক্ষিদে পেয়েছে, চলো কিছু খাই।

ঠিক আছে, তুমি যা বলো।

দুইটা বিগ ম্যাক (ডবল বার্গার), আর কোক নিয়ে সান্দ্রার পাশে এসে বসে হাসান। রোমের কাজ মিটিয়ে

সোজা সান্দ্রার সাথে দেখা করতে এসেছে সে, এখনও বাসায়ও যায়নি।

বনো আপেতিতো, সান্দ্রা।

গ্রাচ্চে, হাসান।

তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে, সান্দ্রা।

ভদ্রতা দেখানোর জন্য ধন্যবাদ, হাসান। এতোদিন তুমি বারে আসনি কেন?

সান্দ্রা, আমার অনেক কাজ ছিল, আর আমিগোসে যেতে ইচ্ছা করেনি।

ওখানে ভ্যালেন্তিনার কথা মনে পড়বে তাই?

হয়ত বা, সান্দ্রা।

জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো তো বুদ্ধিমানের কাজ নয়, হাসান।

সান্দ্রা, আমি সত্যি জানি না, এখন আমার কী করা উচিত।

আমাকে একটা বিয়ার অফার করতে পারো।

আমার সঙ্গে মজা করছো, সান্দ্রা।

না, আমি সত্যি তোমার সাথে বিয়ার পান করতে চাই, ভ্যালেন্তিনার মতো।

ঠিক আছে, সান্দ্রা। চলো, যাবার আগে তোমার ইচ্ছাও পূর্ণ করে যাই।

কোথায় যাবে হাসান?

সান্দ্রা, আমি দেশে চলে যাব।

না গেলে হয় না!

না, সান্দ্রা।

তবে কি আমি আবার দেরি করে ফেললাম?

না, সান্দ্রা। এটাই আমাদের নিয়তি। ভ্যালেন্তিনা চেয়েছিল মৌরিচ্ছিওকে, কিন্তু পায়নি; আমি চেয়েছিলাম ভ্যালেন্তিনাকে, আমিও পাইনি; আর তুমিও আমাকে ধরে রাখতে পারবে না।

গ্রীষ্মের সেই জমজমাট আড্ডা আর নেই সৈকতে; এখনও মানুষের ভীড় আছে, বিচে ডি জে’র মঞ্চও আছে; তবুও নীরবে বেজে চলেছে মেলা শেষের বিদায়ের বেদনার সুর। সান্দ্রাকে নিয়ে হাসান ডি জে মঞ্চের কাছে বসেছে, যেখানে সে গতমাসে বসেছিল ভ্যালেন্তিনাকে নিয়ে। সময়ের ব্যবধান সামান্যই, কিন্তু আবেগের ব্যবধান সীমাহীন। দুজনার মুখে কোন কথা নেই, নীরবে বিয়ার পান করে চলেছে তারা; শীতল হাওয়ার মাঝে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে, কিন্তু তারা যেন বসে আছে সম্পূর্ণ দুই ভুবনে। হাসানের মনে হচ্ছে, সাগরও ভ্যালেন্তিনার শোকে ম্রিয়মাণ।

হাসান, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম ভ্যালেন্তিনা তোমাকে ভালোবেসে ভুল করেছে; কিন্তু এখন দেখছি খুব কম মেয়েই আছে ওর মতো ভাগ্যবতী।

তুমি খুব ভালো মেয়ে, সান্দ্রা।

হাসান, আমার মনে হয়, আমরা সঠিক মানুষ খুঁজে পাই ঠিকই, কিন্তু ভুল সময়ে। কিন্তু হাসান, দেশে গিয়ে ভ্যালেন্তিনার কথা, আমার কথা কি তুমি ভুলে যাবে?

না সান্দ্রা, তোমাদের আমি ভুলবো না। আর তুমি হলে আমার ও ভ্যালেন্তিনার ভালোবাসার সাক্ষী; তোমাকে ভুলবো কীভাবে?
হাসান, তোমাকে কিন্তু সবাই প্রথমে ভুল বুঝেছিল; এমন কী ভ্যালেন্তিনাও।

আমি জানি সান্দ্রা। ভ্যালেন্তিনার বাবার তো ধারণা ছিল আমি ইতালিয়ান পাসপোর্টের জন্য ভ্যালেন্তিনাকে ভালোবেসেছিলাম।

ইতিমধ্যে বিয়ার শেষ হয়ে গেছে, সিগারেটও। হাসান বিচের বার থেকে এক প্যাকেট সিগারেট ও দুইটি বিয়ার নিয়ে এসেছে। সান্দ্রা বিচের বালি নিয়ে আনমনে খেলা করছিল, যেন অবুঝ বালিকা। নিয়তির কী নিষ্ঠুর পরিহাস, ভালোবাসার ভীষণ কাঙাল দুজন যুবক-যুবতী বসে আছে মুখোমুখি; অথচ তাদের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে এক অদৃশ্য দেয়ালএ যেন সাগরের অপার জলের মাঝে তৃষ্ণার হাহাকার। সান্দ্রার হাতে একটা বিয়ার দিয়ে তার পাশে বসে হাসান।

সিগারেট ধরাবে, সান্দ্রা?

দাও।

সান্দ্রাকে একটা সিগারেট দিয়ে, নিজেও একটা ধরায় হাসান; সিগারেট টানতে টানতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নক্ষত্রে ভরে গেছে রাতের আকাশ, তিল পরিমান জায়গা খালি নেই। কোটি কোটি বছর আগে যে সব নক্ষত্র মরে গিয়েছিল, তারাও ফিরে এসেছে, সাথে আছে সপ্তর্ষিমণ্ডলী, হাসানের প্রিয় তারকাপুঞ্জ। আজ রাতে সবাই একসাথে এসেছে ভ্যালেন্তিনার শোকে হাসানকে সমবেদনা জানাতে।

হাসান, আকাশে কী দেখছো?

সান্দ্রা, মানুষ যুগে যুগে তার হারানো প্রিয়জনদের খুঁজে নেয় আকাশের তারার মাঝে। প্রাচীন গ্রীকরা খুঁজেছে তাদের মতো, আর আমরা প্রাচীন ভারতীয়রা

খুঁজেছি আমাদের মতো। ঐ দেখ সাতটি তারার সমাহার, ইংরাজীতে যাকে বলে গ্রেট বিয়ার; আমরা ঐ তারকাপুঞ্জকে বলি সপ্তর্ষিমণ্ডলী। দেখতে পাচ্ছ সান্দ্রা?

হ্যাঁ, হাসান।

প্রাচীন ভারতীয় পূরাণ অনুযায়ী সাতজন ঋষির নামে নাম তাদের। লেজের তিনটা তারার মাঝের তারকাটার নাম ঋষী বশিষ্ঠ, আর তার পাশে ছোট একটা তারা দেখতে পাচ্ছ?

হ্যাঁ।

ওটা হচ্ছে ঋষী বশিষ্ঠের স্ত্রী অরুন্ধতী। কিন্তু তোমাকে সাক্ষী রেখে আজ থেকে আমি ঐ তারার নতুন নাম দিলাম‘ভ্যালেন্তিনা’। আমি আমৃত্যু ঐ তারার মাঝে খুঁজে নেবো আমার ভ্যালেন্তিনাকে।

হাসান, তুমি এতো ভালোবেসেছো ভ্যালেন্তিনাকে। আমার আর কোন দুঃখ নেই। তোমাদের দুজনের মাঝে আমি আর বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে চাই না। আমি আমৃত্যু ঐ তারকাকে দেখবো ঈর্ষা ও ভালোবাসার চোখে।

সান্দ্রা, কাছে থেকেও কিন্তু দূরত্ব বাড়ে, আবার দূরে গেলেও কিন্তু হৃদয়ের কাছে থাকা যায়।

হাসান, আজ থেকে আমি ভ্যালেন্তিনার পাশের তারকাটার নাম রাখলাম‘হাসান’। তোমাকে আমি কখনই চোখের আড়াল করব না।

ধন্যবাদ, সান্দ্রা। অনেক রাত হয়েছে, চলো, তোমাকে বাসায় পৌঁছিয়ে দিয়ে আসি।

ধন্যবাদ, হাসান। আমি বাসে চলে যেতে পারব।

তাহলে আমি তোমাকে বাসে উঠিয়ে দেই।

চলো।

সান্দ্রাকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে নিঃসঙ্গ হাসান গভীর রাতে নির্জন রাস্তায় সিগারেট টানতে টানতে হেঁটে যাচ্ছে। এতোক্ষণ সে কোথায় ছিল, এবং এখন সে কোথায় যাচ্ছে, কোন ব্যাপারেই তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই; সে যেন এই পৃথিবীর নতুন কোন আগন্তুক। সে শুধু ভাবছে, আগে সে যখন মাঝে মাঝে ভ্যালেন্তিনার বাড়ির সামনে ভ্যালেন্তিনার জন্য অপেক্ষা করতো, তখন ভ্যালেন্তিনাহীন রাস্তাটাকে মনে হতো নীরব-নিষ্প্রাণ। কিন্তু যখন মাথার চুল ঝাকাতে ঝাকাতে ভ্যালেন্তিনা হেঁটে আসতোহাসানের মনে হতো ভীষণ জোয়ার এসেছে মরা নদীতে; রাস্তায় মানুষের কোলাহল, গাড়ির আওয়াজ ফিরে আসতো; এক কথায় প্রাণ ফিরে আসতো রাস্তায়, আর প্রাণ ফিরে পেতো হাসান, ভ্যালেন্তিনাকে দেখা মাত্রই। ‘কিন্তু এখন ভ্যালেন্তিনাকে ছাড়া সে থাকবে কীভাবে? ’ নিজেকে প্রশ্ন করে সে, এবং উত্তরও নিজেই দেয়’জীবন একটা বহতা নদীর মতো; দু’কূল ছাপিয়ে যেমন জোয়ার আসে, তেমনি আবার ভাটা এসে নিঃস্ব করে দিয়ে যায়।’ হতাশায় ডুবে গিয়ে হাসান আবার নিজেকে প্রশ্ন করে‘জীবন এতো জটিল কেন? ’ তবে এর উত্তর হাসানের জানা নেই।

অক্টোবর মাস। রাতে ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে; দীর্ঘ নয় বছরের হিসাবের খোলা খাতা বন্ধ করে দিয়েছে হাসান। কারো সাথে কোন দেনা-পাওনা নেই। বহুদিন পরে আজ একা বাহির হয়েছে হাসান; শেষ বার সে দেখে নিতে চায় তার প্রাণের সমুদ্র সৈকত। এই সৈকত জুড়ে জড়িয়ে আছে তার অসীম আবেগ, আর আকাঙ্খা, সাথে ভ্যালেন্তিনার সোনালি স্মৃতি। এই গ্রীষ্মের সন্ধ্যায় এখানে শুয়ে ছিল ভ্যালেন্তিনা, কিন্তু এখন সে নেই; আগামী গ্রীষ্মে হাসানও থাকবে না। মাতাল হবার জন্য হাসান কোনদিন বিয়ার পান করেনি; বিয়ার পান করে কোনদিন মাতালও হয়নি সে।; কিন্তু আজ ভীষণ মাতাল হতে ইচ্ছা করছে তার। একটা বিয়ার শেষ করে, আর একটা বিয়ার নিয়ে সৈকতে নেমেছে হাসান। সাগরের খুব কাছে গিয়ে আকাশের দিকে দু’হাত তুলে হাসান চিৎকার করে আবৃত্তি করে‘জানি তবু জানি নারীর হৃদয় প্রেম-শিশু-গৃহ নয় সবখানি’হে নিয়তি, দেখ, আমাকে নিয়ে কী নিষ্ঠুর তোমার রসিকতা। সাগরের সমস্ত জল যেন আজ জমেছে হাসানের চোখে; তার এই নীরব অশ্রুপাত দেখার কেউ নেই, শুধু রাতের তারা, আর সাগরের ঢেউ ছাড়া।

পনেরো

লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি এয়ারপোর্ট। ফুমিচিনো, রোম। ফুমিচিনো সমুদ্র সৈকতের পাশে রোমের আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর। এটা লিদো দ্যা অস্টিয়ার পাশে অবস্হিত। দূরত্ব খুব বেশী হলে বিশ কিলোমিটার। সকাল সকাল এয়ারপোর্টে পৌঁছে গেছে হাসান। সবকিছু ঠিকই আছে, তবুও মনের ভিতরের অস্বস্তিটা কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। একটাই শুধু দুশ্চিন্তা, যদি শেষ মুহূর্তে পুলিশ তাকে দেশে যেতে না দেয়?

লাগেজ কার্গোতে দিয়ে বিমানে ওঠার অপেক্ষায় বসে আছে হাসান। এখন পুলিশ যদি তাকে দেশে যেতে না দেয়, তবে লাগেজ কি ফেরত পাবে সে? বসে বসে এটাই ভাবছে হাসান; বহু বছর আগে অবৈধ ভাবে বর্ডার পার হবার পুরানো টেনশন আবার ফিরে এসেছে। এখন অপেক্ষা একটাইবিমানে ওঠা। লাউড স্পিকারে ঘোষণা শুনে সবার সঙ্গে বিমানে ওঠে হাসান। বিমানের কোন ডিলে নেই; ঠিক সময়, অর্থাৎ সকাল দশটায় ছাড়বে। জানালার পাশে নির্দিষ্ট আসনে বসে দোয়া-দরুদ পড়তে থাকে হাসান (বিপদে পড়লে সব সময় যেমন পড়ে)। বিমান বালার ঘোষণা অনুযায়ী সিট বেল্ট বেঁধে নেয় সে।

ভূমধ্যসাগরের সুনীল জলরাশির উপর বিশাল দুটি ডানা মেলে পাখির মতো উড়ছে বিমানটি। জানালা দিয়ে নিচে তাকিয়ে দেখছে হাসান; সৈকত এবং দিগন্ত রেখা আস্তে আস্তে দূরে সরে যাচ্ছে; সেই সাথে স্মৃতিগুলো, ভ্যালেন্তিনা, জোছনা রাতের রূপালী বন্যা, সৈকতের কোলাহল এখন সব অতীত।

আগামী গ্রীষ্মে এই সৈকতে আবার বসবে প্রাণের মেলা, বার আমিগোসের বিয়ারের গ্লাসগুলো আবার ভরে যাবে তরল স্বপ্নে, সাগরের বুকে আবার ভেসে উঠবে মায়াবী চাঁদ; ভ্যালেন্তিনার মতো কোন এক যুবতী, হাসানের মতো কোন এক যুবকের বাত ধরে হেঁটে যাবে জোছনা রাতে সাগরের তীর ধরে। সাগর সৈকতে হাসান, আর ভ্যালেন্তিনার শূন্যতা পূর্ণ হয়ে যাবে নতুন প্রাণের স্পন্দনে। হাসান নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, দুঃখ করো না হাসান, সর্বনাশ হয়ে যাবে।

ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্ট, জার্মানি। দুই ঘন্টার যাত্রা বিরতি। বিমানের সবাই নেমে গেছে, এয়ারপোর্টের ডিউটি ফ্রি শপে কেনাকাটা করার জন্যে; বিমানেই বসে আছে হাসান, নামতে ইচ্ছা হচ্ছে না তার। মনে মনে ভাবে হাসান, এটাই শেষ; এখান থেকে টেক অফ করলে আর কোন চিন্তা নেই। আবার বিমান বালার ঘোষণা শুনে ছিট বেল্ট বেঁধে নেয় সে। বিমান টেক অফ করেছে, এয়ারপোর্ট আস্তে আস্তে দূরে সরে যেতে থাকে। ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরটি ছোট হতে হতে এক সময় মেঘের আড়ালে হারিয় যায়। আর ঠিক তখন, নয় বছর আগে ঢাকা বিমান বন্দর থেকে মস্কোর উদ্দেশ্যে অ্যারোফ্লোতের টেক অফ করার কথাটা মনে পড়ে যায় হাসানের।

জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর এবং ঢাকা শহর দৃষ্টিসীমা থেকে হারিয়ে গেলে হাসান মনে মনে বলেছিল, যাক বাবা, বাঁচা গেল; এবার একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক। এখন আবার সেই কথার পুনরাবৃত্তি করে, ছিটে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে হাসান। মুহূর্তে ভ্যালেন্তিনার শরীরের মিষ্টি গন্ধটা ফিরে এসে তাকে জড়িয়ে ধরে এলোমেলো করে দেয়; প্রাণভরে সে অনুভব করে ভ্যালেন্তিনার ভালোবাসা। নিজের অজান্তে তার বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে ক্ষমাহীন দীর্ঘশ্বাস; অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নেয় সে। নিয়তির পাশা খেলায় পরাজিত হাসান আকাশের সীমাহীন শূন্যতায় ভাসতে ভাসতে প্রিয় কবি’র ভাষায় নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, ‘প্রেম ধীরে মুছে যায়, নক্ষত্রেরও একদিন মরে যেতে হয়, হয় নাকি? ’

সমাপ্ত

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension