মুক্তমত

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগদান

জাকির হোসেন

 

দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় ফয়েজ ভাই ক্লাস নাইনে পড়েন। ’৪৫ সালের গোড়ার দিকে বাড়ি থেকে পালিয়ে ঢাকায় আসেন এবং জানেন বিশ্বযুদ্ধের জন্য লোক রিক্রুট করা হচ্ছে। পরদিন ভোরে কাউকে না জানিয়ে তিনি বনানী চলে যান। আগেই জেনেছিলেন, বনানীর জঙ্গলে সিঙ্গাপুরে পশ্চাৎপসারণকারী ব্রিটিশ সৈন্যরা ঢাকার দিকে আসছে। তারা আসামের মণিপুর আর ঢাকার বানানীতে জঙ্গলের মধ্যে ক্যাম্প স্থাপন করেছে। ঢাকার ফুলবাড়িয়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চড়ে তিনি বনানী যান। জঙ্গলের ভেতরে এই ক্যাম্পে ফয়েজ ভাই তরুণ ইঞ্জিনিয়ার কাম পাইলট হিসেবে শিক্ষানবিসের কাজ পান। কাজের আনন্দে ও বেতনের লোভে বাড়ির সঙ্গে কোনও সংযোগ রাখেন নি। কয়েক মাস পর ’৪৫ সালের আগস্ট মাসে যুদ্ধ থেমে যায়। ফয়েজ ভাইয়ের চাকরির অধিকর্তা অ্যাপেলপি হাসিমুখে জানান আজ থেকে সবার ছুটি। অবশিষ্ট বেতন এবং একটি সার্টিফিকেট দিয়ে তিনি সবাইকে বিদায় দেন।

চাকরি শেষে ছয় মাস পর ফয়েজ ভাই মুন্সীগঞ্জে বড় বোনের বাসায় যান। তাদের সবার ধারণা ফয়েজ ভাই  মারা গেছেন। যু্দ্ধে যাওয়ার কারণে সেবার তাঁর মেট্রিক পরিক্ষার একটি বছর নষ্ট হয়। এভাবে ফয়েজ ভাই বাড়ি থেকে তিন-চারবার পালিয়ে গেছেন,- ‘একবার পালিয়ে গিয়ে বড় ভাইয়ের সঙ্গে বিহারের রাচির অন্তর্ভুক্ত এক ক্ষুদ্র করদ রাজ্যে বাস করেছিলাম। গভীর জঙ্গলে শঙ্খ নদীর পারে ছিল আমাদের বাসা। আমার ভাই ছিলেন ডিএসপি। সেখানে আমি রোজ সন্ধ্যায় সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা খাসিয়াদের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলে বসবাস করতাম। রাঁচি থেকে ট্রেনে যাওয়ার পরে হাঁটা ছাড়া আর কোনও পথ নেই। সেই স্টেশন থেকে আমি বড় ভাইয়ের দেওয়া ঘোড়ায় চড়ে আঠারো মাইল পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়েছিলাম।’

আন্ডার গরাউন্ড এবং কারা কাহিনী

আন্ডারগ্রাউন্ডের জীবন একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের জীবনযাত্রা। না জেলে, না মুক্ত। এ জাতীয় মানুষ বেঁচে থেকেও জীবিত থাকেন না। এরা ছায়ার মতো জীবন্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান। এসব ফেরারি পুলিশের কাছে মহাশত্রু হিসেবে গণ্য হন। ফয়েজ ভাইয়ের জীবনও দীর্ঘদিন কেটেছে আন্ডারগ্রাউন্ডে।

’৫৮ সালের আগস্ট মাসে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করে ক্ষমতা দখল করে নেয়। ফয়েজ ভাই তখন কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত। ফলে সেই সময় তিনি আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে যান। এমতাবসস্থায় সরকারবিরোধী একটি কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে ঢাকার স্বামীবাগে কবি সিকান্দার আবু জাফরের বাসায় আসেন। এখানে রাত ১২টা পর্যন্ত মিটিং করে আশ্রয় নেন প্রেসক্লাবে। এখান থেকে ভোর ৪টায় পুলিশ ফয়েজ ভাইকে গ্রেফতার করে। সেই অভিযানে পুলিশ এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহুসংখ্যক কমিউনিস্ট নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছিল।এর মাধ্যমে ফয়েজ ভাইয়ের জীবনে শুরু হয় দীর্ঘ নির্যাতন ও কারাভোগের কাহিনী। গ্রেফতারের সাত দিন পর তাঁকে ইন্টারোগেশনের জন্য লালবাগে নেওয়া হয়। একই সময় আরও তিনজন কমিউনিস্টকে লালবাগের ইন্টেলিজেন্স অফিসে তিনদিন করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। প্রথমে সরদার ফজলুল করিমকে ঢাকা কারাগার থেকে লালবাগে নেওয়া হয়। তারপর শহীদুল্লাহ কায়সারকে একইভাবে লালবাগে নিয়ে প্রশ্ন করা হয়। তৃতীয় ব্যক্তি হচ্ছেন ফয়েজ ভাই। চতুর্থ ব্যক্তি হচ্ছেন ময়মনসিংহের তরুণ কমিউনিস্ট আর এম সাঈদ। এই চারজনের মধ্যে সাঈদকে আইবি কঠোরভাবে শারীরিক যন্ত্রণা দিয়ে কথা বের করার চেষ্টা করে। তাঁকে ইলেকট্রিক শক দেওয়া হয়। কিন্তু কোনও গোপন তথ্য না পেয়ে স্ট্রেচারে করে সাঈদকে আবার ঢাকা কারাগারে প্রেরণ করে। নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে সাঈদ কারাগারে মারা যান। পুলিশ একইভাবে ফয়েজ ভাইকেও কারাগারে নির্মম নির্যাতন করে। কারাগারের নৃশংসতা চলে নির্জন ঘোর অন্ধকারে। এর সঙ্গে সভ্যজগতের কোনও সম্পর্ক নেই। রাষ্ট্রের রাজনৈতিক নিপীড়নের কাহিনী বড়ই মর্মান্তিক, করুণ এবং কল্পনাতীত। ফয়েজ ভাইয়ের জীবনেও এ রকম ঘটনা জেলে প্রায়ই নেমে এসেছে।

প্রথমবার কারাগারে যখন ফয়েজ ভাইয়ের একবছর পূর্তি হয়, তখন সহবন্দীদের আনন্দের সঙ্গে বললেন, ‘জেলে আজ আমার এক বছর পূর্ণ হল। তখন আমার পাশ দিয়ে গোসল করতে যাচ্ছিলেন বৃদ্ধ নগেন দা। তিনি বললেন, ফয়েজ আজ তোমাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। উত্তরে আমি বলি, দাদা, আমার জেলে আজ এক বছর পূর্ণ হলো। আপনার কত বছর হলো নগেন দা? তিনি হাসতে হাসতে বলেন, মাত্র তিন দশমিক ২ ডিকেডস্ (বত্রিশ বছর)।বলেই নগেন দা তেল মাখতে মাখতে গোসল করতে চলে গেলেন।’

জেলের এমনতর বহু ঘটনা  ঘটেছে। কারাগারের সব দিক বলতে গেলে একটি পুস্তক হয়ে যাবে।

একবার ফয়েজ ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ২৬ নম্বর সেলে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু  ফয়েজ ভাইয়ের কয়েকটি পাণ্ডুলিপি বালিশের ভেতর লুকিয়ে জেল গেটের বাইরে নিয়ে আসেন। সেই পাণ্ডুলিপির একটি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পায়। যে ‘রিমঝিম’ বইটি বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছিল, সেই পান্ডুলিপিটিই বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তির সময় বাইরে নিয়ে এসেছিলেন। ফয়েজ ভাইয়ের কারাজীবনের অনেক স্মৃতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত  উজ্জ্বল ছিল।কোনও কোনও স্মৃতি তাকে সর্বদা আচ্ছন্ন করে রাখত। যেমন জেলে ডা. মকবুলের কাহিনী, হৃদয়বান এক সিভিল সার্জনের উদ্যোগ, যিনি জেলের সব সিকিউরিটি প্রিজনারদের মেডিকেল ডায়েট দিয়েছিলেন। ফলে বহুসংখ্যক রাজবন্দি বিভিন্ন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করে। এই ডাক্তার ১৯৬১ সালে ঢাকার সিভিল সার্জন ছিলেন এবং তিনি সাবেক মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনের জামাতা।

জেল ডাক্তারকে জুতা পেটা

ঢাকা জেলের চিকিৎসক ছিলেন ডা. মকবুল। তিনি নিয়মিত আসতেন না। কারও অসুখ হলে চিকিৎসা করতেন না। একবার ওই ডাক্তারের বিরুদ্ধে ফয়েজ ভাই সিভিল সার্জনের কাছে অভিযোগ করেন যে তার বন্ধু দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ বিনোদ দাসগুপ্ত বহুদিন ধরে চিকিৎসা পান না। সিভিল সার্জন জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে ওষুধ খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, যা বাইরে থেকে কিনতে হবে। লোকাল ডা. মকবুলকে সিভিল সার্জন দ্রুত ওষুধ সরবরাহ করতে বলেন। কিন্তু ১৫ দিন অতিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও ডা. মকবুল বিনোদ দা-কে কোনও ওষুধ দেন নি।

এ অবস্থায় ফয়েজ ভাই অসহায়ত্ব বোধ করেন। নিয়ম অনুযায়ী এক মঙ্গলবার ডা. মকবুল ২ নম্বর ওয়ার্ডে আসেন। এ ওয়ার্ডে ফয়েজ ভাইসহ মোট ১৪ জন ছিলেন। ফয়েজ ভাই আকস্মিকভাবে মকবুল ডাক্তারের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন এবং বন্ধু বিনোদ দাশগুপ্তকে ওষুধ না দেওয়ায় ডাক্তারের কাছে কৈফিয়ত চান। ডা. মকবুল এর উত্তর না দিয়ে বরং ধমকের সুরে কথা বলেন। এতে ফয়েজ ভাই আরও ক্রুদ্ধ হন এবং জেলখানায় তৈরি স্যান্ডেল দিয়ে মকবুল ডাক্তারকে পেটাতে শুরু করেন। এমতাবস্থায় ডা. মকবুল স্থেটিস্কোপ ফেলে পালিয়ে যাওয়ার জন্য দৌড় দেন ওয়ার্ডের গেটের দিকে। শহীদুল্লাহ কায়সার ও সন্তোষ গুপ্ত তখন ফয়েজ ভাইকে জড়িয়ে ধরে রাখেন আর মোহাম্মদ সুলতান প্রহরারত পুলিশের হাত থেকে বাঁশিটি ছিনিয়ে নেন, যাতে পুলিশ পাগলা ঘণ্টির জন্য অন্য পুলিশদের ডাকতে না পারে। কিছুক্ষণ পর কারাগারে এক ধরনের স্তব্ধতা ফিরে আসে। ডা. মকবুল পালিয়ে যায় জেল হাসপাতালে।

ডা. মকবুল পরে আইজির কাছে চিঠি লেখেন যে, ফয়েজ ভাই তাকে হত্যার চেষ্টা করেছিলেন। একদিন পর জেল গেটেই ফয়েজ ভাইয়ের বিচার হয়। কর্তৃপক্ষ তাঁর বিচারের জন্য বাইরের আদালতেও সোপর্দ করতে পারতেন। কিন্তু ফয়েজ ভাইয়ের  বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষী দিত না। এ জন্য জেল কোড অনুযায়ী ফয়েজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে চরম শাস্তির ব্যবস্থা করেন। একে কোনও বিবেচনাতেই বিচার বলা যায় না। কারণ ফয়েজ ভাইয়ের কোনও বক্তব্য শোনা হয় নি। এই বিচারে ফয়েজ ভাইয়ের শাস্তি হয় ছয় মাসের নির্জন কারাবাস, রাখা হয় একটি ফাঁসির সেলে (ওল্ড ২০ নম্বর সেল)। এখানে ছয় মাস তাঁর কোনও ইন্টারভিউ হয় নি, কোনও চিঠিপত্র ও পত্রিকা দেওয়া হয় নি। ফাঁসির সেলটি ছিল কবরের মতো অন্ধকার ও সঙ্কীর্ণ। নাজির জমাদার ও একটি বিড়াল ছাড়া সেখানে আর কোনও প্রাণী ছিল না…

লেখক: সাংবাদিক

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension