সম্পাদকীয়

ব্যাংকিং খাতে অনিয়মে তৎপরতা প্রশংসনীয়

নির্বাচনের ইশতেহারে ব্যাংক জালিয়াতি-অনিয়ম রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর এ ক্ষেত্রে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংককে চিঠি দেয়া হয়েছে।
 
ভোটের পরের সপ্তাহেই নিজেদের দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দেয়া আমাদের দেশের ক্ষেত্রে নজিরবিহীন ইতিবাচক পদক্ষেপ, তাতে সন্দেহ নেই। তবে কেবল চিঠি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলেই চলবে না, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে কিনা, তা মনিটরিংয়ের উদ্যোগও থাকতে হবে।
 
 
কারণ যে কোনো ক্ষেত্রে হুটহাট সিদ্ধান্ত নেয়ার পর অদৃশ্য ইঙ্গিতে তা থমকে যাওয়ার নজির দেশে নিতান্ত কম নয়। আমরা আশা করব, সরকার অর্থনীতির স্বার্থে, দেশের সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ নেবে।
 
বর্তমান সরকারের ভূমিদস বিজয়ের মধ্য দিয়ে বড় দায়িত্ব কাঁধে এসেছে, বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে জনগণের প্রতি দেয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। ব্যাংক জালিয়াতি রোধে দেয়া চিঠি সে ইঙ্গিতবাহী হলেও মনে রাখতে হবে ব্যাংকের অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে সরকারের দায় রয়েছে।
 
২০০৯ সালে যেখানে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তা বেড়ে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা হওয়া থেকেই বিষয়টি স্পষ্ট।
 
সরকারের সদিচ্ছা থাকলে অনিয়ম-দুর্নীতি করে কোনো খাতের কেউ যে পার পাবে না, তা বলাই বাহুল্য। কিন্তু বড় বড় ঋণখেলাপিরা যে সরকারের প্রভাবশালীদের ছত্রছায়াতেই প্রশ্রয় পাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়। বেসিক ব্যাংককে পঙ্গু করে দেয়া থেকে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন ব্যাংকের পুঁজি খেয়ে ফেলার পেছনের কারিগরদের কেউই কিন্তু অচেনা নয়।
 
ফলে চিঠি দিয়ে জালিয়াতি অনিয়ম বন্ধের উদ্যোগ নেয়ার তাগাদা দেয়া যেন লোক দেখানো না হয়ে আন্তরিক হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।
 
বিশষজ্ঞদের সঙ্গে একমত হয়ে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যাংক জালিয়াতি-অনিয়ম রোধের চিঠি দেয়ার পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে সবার আগে। তাহলে তারা অপরাধী যে পরিচয়ধারীই হোক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে।
 
দুর্ভাগ্যের বিষয়, নিয়ন্ত্রক সংস্থাটিকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেয়া তো হয়নি, এমনকি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম দেখাশোনা ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার জন্য স্বাধীন একটি কমিশন গঠনের দাবিকেও আমলে নেয়া হয়নি। নতুন সরকার যেহেতু প্রথমেই ব্যাংকিং খাতের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে বলেছে, তারা এজন্য প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে বলেও আমরা আশাবাদী।
 
বাংলাদেশ ব্যাংকে দেয়া চিঠিতে জালিয়াতি এবং অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ব্যাংক কর্মকর্তা, কর্মচারী ও ঋণ গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলার পাশাপাশি ব্যাংকিং কার্যক্রম তথা ঋণ দেয়া ও লেনদেনে দক্ষতার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এছাড়া সেবা সম্প্রসারণ ও দায়বদ্ধতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে।
 
এছাড়া ঋণ অনুমোদন ও অর্থছাড়ে দক্ষতা এবং গ্রাহকের প্রতি ব্যাংকের দায়বদ্ধতার সঙ্গে ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো সম্প্রসারণ, লেনদেনে ডিজিটালাইজেশন বাড়ানোসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। যদি এসব নির্দেশনা আন্তরিকতার সঙ্গে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয় অনুসরণ করে তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন আসবেই।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension