প্রবাস

মার্কিন কংগ্রেসে কনিষ্ঠতম সদস্য হবার পথে আলেক্সান্দ্রিয়া করটেজ

রূপসী বাংলা প্রবাস ডেস্ক: ‘দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচনে আমেরিকায় পরিবর্তনের যে ঢেউ প্রতিফলিত হয়েছে, তাকে আরো বেগবান করতে প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনায় উজ্জীবিত প্রাথীদের বিপুল বিজয় দিতে ৬ নভেম্বরের নির্বাচনে ব্যালটযুদ্ধে অবতীর্ণ হবার বিকল্প নেই। যে চেতনা আর মূল্যবোধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আমেরিকা, তাকে সমুন্নত রাখতেও অভিবাসী সমাজের দায়িত্বও অপরিসীম। কারণ, নানাভাবে আজ অভিবাসীরাও আক্রান্ত। অথচ এই আমেরিকা-কে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদানে অভিবাসীদের অবদানও কম নয়। বিবেকসম্পন্ন মানুষেরা এখনও অকপটে স্বীকার করেন যে, আমেরিকার অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে অভিবাসীদের মেধা আর শ্রম বিশেষ ভ’মিকা রাখছে’-এমন অভিমত পোষণ করেছেন আলেক্সান্দ্রিয়া ওকাসিয়ো-করটেজ।

মার্কিন কংগ্রেসের নি¤œকক্ষে ডেমক্র্যাটিক ককাসের চেয়ারম্যান এবং কংগ্রেসনাল বাংলাদেশ ককাসের চেয়ার যোসেফ ক্রাউলিকে ২৬ জুনের প্রাইমারিতে ধরাশায়ী করেছেন তৃণমূলের এই ডেমক্র্যাট এবং ৬ নভেম্বরের নির্বাচনে তিনি কংগ্রেসের কনিষ্ঠতম সদস্য হবার পথে। কারণ, নিউইয়র্কের চতুর্দশতম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট (জ্যাকসন হাইটস থেকে ব্রঙ্কসের অংশবিশেষ) এর সিংহভাগ ভোটার হলেন ডেমক্র্যাট। এর অর্ধেকেরও বেশী অভিবাসী-ভোটার অর্থাৎ ল্যাটিনো, হিসপ্যানিক, এশিয়ান এবং আফ্রিকান। শ্বেতাঙ্গ ভোটারের হার মাত্র ৪৬%। যোসেফ ক্রাউলি এই এলাকায় ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে প্রথম কংগ্রেসম্যান হন এবং এখন পর্যন্ত দায়িত্বে রয়েছেন। এর আগে নিউইয়র্ক স্টেট এ্যাসেম্বলীতে ছিলেন একই এলাকার নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে ১৯৮৬ সাল থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত। অর্থাৎ ক্রমান্বয়ে যোসেফ ক্রাউলি এ এলাকার জন্যে মহীরুহ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছিল। এবারের নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে তিনি কংগ্রেসের স্পিকার হবার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু তৃণমূলের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটার অবিশ্বাস্য এক পরিণতির শিকার হতে হয়েছে ক্রাউলিকে। এর আগে খুব কম সময়েই তাকে দলীয় প্রাইমারিতে অবতীর্ণ হতে হয় বলে নিজের জনপ্রিয়তা সম্পর্কে সঠিক ধারণা ছিল না। পর্তোরিকান মা-বাবার সন্তান আলেক্সান্দ্রিয়া করটেজ যোসেফ ক্রাউলির সেই চোরাবালির অহংবোধকে তছনছ করে দিয়েছেন। ডেমক্র্যাটরা ক্রাউলিকে আস্থাকুড়ে নিক্ষেপ করেছেন ব্যালট যুদ্ধে। অধিকার বঞ্চিত মানুষদের ভরসাস্থলে পরিণত হয়েছেন ২৯ বছর বয়েসী করটেজ।

রোববার সকালে কুইন্সের ফরেস্ট হিল্্স-এ বড় একটি এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ের ব্যাকইয়ার্ডে মনোরম পরিবেশে করটেজের মতোই উদীয়মান এবং তৃণমূলের সংগঠকরা জড়ো হন। ছিল না কোন ব্যানার অথবা পোস্টার। এমনকি মঞ্চের ব্যবস্থাও ছিল না। প্রায় সকলেই এসেছিলেন প্রাত:রাশের বিভিন্ন আইটেমসহ। সর্বশেষ সংযোজন ঘটিয়েছেন করটেজের ‘বাঙালি মা’ মাজেদা এ উদ্দিন। করটেজ যখন ৮/৯ মাসে, সে সময়ে তার মা-বাবা ব্রঙ্কসের পার্কচেস্টার এলাকায় থাকতেন। করটেজকে স্ট্রলারে বসিয়ে পার্শ্ববর্তী দোকানে যেতেন মা-বাবা। সে সময়েই ফুটফুটে করটেজের হাসিমাখা মুখ আকৃষ্ট করে সে সময়ের তরুনী-বধূ এবং একই এলাকার বাসিন্দা মাজেদাকে। মাজেদা করটেজকে কোলে নেন এবং এক পর্যায়ে প্রায় সময়ই মাজেদার সাথেই করটেজের সময় কাটে। করটেজ বড় হয়ে সে সব স্মৃতি ভুলেননি। মাজেদার মত করটেজও তৃণমূলের ডেমক্র্যাট হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন গত কয়েক বছর থেকেই। সে সুবাদে শিশু-শৈশবের সে সব স্মৃতি ঝালাইয়ের মধ্য দিয়ে মাজেদা এখন করটেজের ‘বাঙালি মা’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। অনাড়ম্বর এ অনুষ্ঠানেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। জন্মদিনের আমেজে কেক কাটার সময় মাজেদাকে কাছে টেনে তার হাতেই কেক গ্রহণ করলেন করটেজ। সে এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য মানুষের কল্যাণে ব্রত নিয়ে দিন-রাত ব্যস্ত থাকা দুই প্রজন্মের দুই রমনীর মধ্যে। উপস্থিত সকলে গভীর শ্রদ্ধায় উপভোগ করেন করটেজের এমন মহানুভবতা। এ সময় মাজেদার সাথে ছিলেন বাংলাদেশী-আমেরিকান ডেমক্র্যাট ও মূলধারার ব্যবসায়ী আকতার হোসেন বাদল, আমেরিকা-বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশনের নেতা ফাহাদ সোলায়মান এবং সমাজকর্মী রাশিদা মুন। উল্লেখ্য, বাংলাদেশী এসব নেতা আগে থেকেই করটেজের পাশে রয়েছেন অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে। এর আগে করটেজ তার নির্বাচনী ক্যাম্পেইনের (২৬ জুনের প্রাইমারির আগে) স্মৃতিচারণকালে মাজেদার প্রসঙ্গ সবিস্তারে উল্লেখ করেন। সে সময় বিবৃত হয় বাঙালিদের জেগে উঠার কথা এবং সর্বোপরি বর্তমানে ট্রাম্প প্রশাসনের অ-আমেরিকান কর্মকান্ডে কীভাবে তারা টিকে রয়েছেন, সে কথাও বাদ যায়নি। করটেজের কাছে এ সংবাদদাতার প্রশ্ন ছিল, ‘যোসেফ ক্রাউলির নাম এখনও ব্যালটে রয়েছে ‘ওয়ার্কিং ফ্যামিলি পার্টি’র প্রার্থী হিসেবে। এ নিয়ে তিনি কিছু বলতে চান কিনা’-জবাব স্পষ্ট, ‘আমি শুধু ভোটারদের অনুরোধ জানাচ্ছি আমেরিকান নীতি-নৈতিকতা জাগ্রত রাখার স্বার্থে মধ্যবর্তী নির্বাচনে আরো দ্বিগুণ উৎসাহে ভোট কেন্দ্রে যেতে হবে। ব্যালটে আমার পাশে আরো ৩ জনের নাম থাকবে। এর একজন হচ্ছেন ‘ওয়ার্কিং ফ্যামিলি পার্টি’র যোসেফ ক্রাউলি, রিপাবলিকান পার্টির এ্যান্থনী পাপাস এবং কঞ্জারভেটিভ পার্টির এলিজাবেথ পেরী। সুতরাং বিজয়ের যুদ্ধ এখনও থামেনি। আমাদের চ’ড়ান্ত বিজয় অর্জনে ৬ নভেম্বরের ভোটের দিন পর্যন্ত কাজ করতে হবে। ভোটারের দ্বারে দ্বারে যেতে হবে। তাদের মধ্যে সৃষ্ট জাগরণকে জাগ্রত রাখতে হবে।’

স্বল্প আয়ের কঠোর পরিশ্রমী তথা অভিবাসী শ্রমিকদের প্রসঙ্গে করটেজ বলেন, ট্রাম্পের কারণে গোটা অভিবাসী সমাজেই শুধু নয়, আমেরিকানদের মধ্যেও অস্বস্তি বিরাজ করছে। সুযোগ-সুবিধা হরন করা হচ্ছে খেটে খাওয়া মানুষদের। যোসেফ ক্রাউলির নামোল্লেখ না করে করটেজ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, ‘অনেক প্রার্থী কর্পোরেশনের মোটা অর্থ পেয়ে তাদের স্বার্থে কংগ্রেসে কাজের অঙ্গিকার করেছেন। আমি কর্পোরেশনের চাঁদা নেইনি। আমি ৫/১০ ডলার করে পাচ্ছি খেটে খাওয়া মেহনতি মানুষের কাছে থেকে, স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রীর টিফিনের অর্থ থেকে।’

করটেজ এ সময় বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, অকারণ যুদ্ধের জন্যে ব্যয় বৃদ্ধি ঘটেছে। ঘাটতির পরিমাণ ৭৭৯ বিলিয়ন ডলারে উঠেছে। বাজেটের এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে হেল্্থকেয়ার, মেডিকেইড এবং দারিদ্রসীমার নীচে বসবাসরকারিদের সুযোগ-সুবিধা কর্তন করা হচ্ছে। এ ধরনের নেতৃত্বের অবসান ঘটাতে হবে কংগ্রেসে তৃণমূলের কর্মীদের সংখ্যা বাড়িয়ে। সামাজিক অশান্তি দূর করতেও চাই তৃণমূলের প্রতিনিধি। করটেজ বলেন, ডেমক্র্যাট এবং রিপাবলিকান প্রাইমারিতে ৫০ জনের অধিক নারী জয়ী হয়েছেন। এর মধ্যে দুই মুসলিম নারীও আছেন, যাদের নির্বাচনী প্রচারণায় আমাকেও যেতে হচ্ছে। এর একজন ফিলিস্তিনী রাশিদা তাইয়্যেব, ডেমক্র্যাটিক প্রাইমারিতে জয়ী হয়েছেন মিশিগান থেকে। আরেকজন মিনেসোটায়, সোমালিয়া বংশোদ্ভ’ত ইলহান ওমর। উভয়ের বিজয়ের সম্ভাবনা প্রবল। তাই মধবর্তী নির্বাচনের পর কংগ্রেসে এই প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তি ঘটতে যাচ্ছে। এভাবেই মার্কিন রাজনীতি আর প্রশাসনে চেহারায় পরিবর্তন আসছে, যার ঢেউ সমগ্র আমেরিকাকে এগিয়ে নেয়ার পথ সুগম করবে। কারণ, আমরা সকলেই অধিকার-বঞ্চিত পরিবারের সদস্য হিসেবে ক্যাপিটল হিলে যেতে চাচ্ছি।

বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে বক্তৃতার সময় আশপাশের ভবনের লোকজন জানালা পথে হাত নেড়ে করটেজকে সমর্থন জানান। ৬ মাসের শিশু কোলে এক ব্যক্তি পাশের বাসা থেকে চলেই এলেন করটেজের কাছে। আর কিছুক্ষণ পরপরই পাশ দিয়ে অতিক্রম করছে রেলগাড়ি। সে শব্দের মাঝেও করটেজের কন্ঠ উচ্চকিত। ‘থামলে চলবে না। সকল বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করেই নবউদ্যমে এগিয়ে যেতে হবে আমেরিকার মূল্যবোধ আর চেতনাকে সবকিছুর উর্দ্ধে স্থান দিতে’-উল্লেখ করেন করটেজ।  অপর এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন রাজনীতিতে উদিয়মান এই তারকা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মান-সম্মানের স্বার্থে ট্রাম্পকে ইমপিচের বিলে ভোট দিতে দ্বিধা করবো না।

প্রাইমারিতে অবতীর্ণ হবার পর ভোট প্রার্থনার স্মৃতিচারণকালে করটেজ বলেন, ‘মানুষের বাসায় বসেছি। ৪/৫ জন হলেই ভেবেছি আমি ঘুরে দাঁড়াতে পারছি। অনেকের বেডরুমে গেছি। কেউ কেউ বিস্ময় প্রকাশ করেছেন যে, ক্রাউলির মত বিশাল এক ব্যক্তিত্বের বিপক্ষে আমি কোনভাবেই যোগ্য হতে পারি না। কিন্তু এক পর্যায়ে প্রায় সকলেই অনুধাবনে সক্ষম হন যে, ক্রাউলিকে তারা কখনোই চোখে দেখেননি, কাছে পাওয়া দূরের কথা। নিজেদের সমস্যার কথাও অবহিত করতে পারেননি জনপ্রতিনিধির কাছে। এই যে দু:খবোধ, আপসোস-সবকিছু এক পর্যায়ে জেগে উঠেছে প্রার্থী বাছাই তথা প্রাইমারি নির্বাচনে।

করটেজের জন্যে অনাড়ম্বর এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ‘কুইন্স সলিডারিটি কোয়ালিশন’ নামক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। এর যৌথ নেতৃত্বে রয়েছেন মাজেদা এ উদ্দিন এবং এটর্নী ইথেন ফেল্ডার। তারা উভয়ে উপস্থিত সকলের প্রতি আহবান জানান, মধ্যবর্তী নির্বাচনে করটেজকে বিপুল বিজয় প্রদানের মধ্য দিয়ে যোসেফ ক্রাউলির মত অন্তসারশূন্য নেতৃত্ব সরিয়ে দেয়ার জন্য। ডেমক্র্যাট কর্তৃক ধিকৃত হবার পরও যোসেফ ক্রাউলি অপর একটি সংখ্যালঘু রাজনৈতিক দলের ব্যানারে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হবার ঘটনায় সকলে বিস্ময় প্রকাশ করেন।

প্রাণের সাথে প্রাণ মিলিয়ে ব্যতিক্রমী এ আয়োজনে তৃণমূলের সংগঠকদের মধ্যে আরো ছিলেন লাফ্রেক সিটি টিনেন্ট এসোসিয়েশনের সিলভিয়া এম মারটিন, উইমেন এ্যাকশন গ্রুপের সংগঠক এলিসন আবুলআফিয়া, শ্রমিক সংগঠন-১১৯৯ এর কাউন্সেল জে জেফি, কর্ণেল ওয়ার্কার ইন্সটিটিউটের লেবার লিডার কিম কুক, সিডব্লিউএ লোকাল এর রাজনীতি বিষয়ক পরিচালক জস ও’ম্যালি প্রমুখ।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension