
মুবিন খানের গল্পগ্রন্থ ‘গল্পরা’ হাতে পেয়েছিলাম তাঁরই বদান্যতায়। এই বইয়ের মাধ্যমেই তাঁর গল্পের সাথে পরিচিত হলাম। ছোট বড় সাতটি গল্পে সাজানো হয়েছে গ্রন্থটি। লেখক নিজেই গল্পগুলোর চরিত্র নির্ণয় করেছেন ‘রূপকল্পগল্প’ হিসেবে। বলেছেন ‘সবটাই শতভাগ কাল্পনিক’। গ্রন্থের উপক্রমণিকায় সাধারণত এধরনের কথা উল্লেখ করা পাঠকের কাছে বাহুল্য মনে হতে পারে। কিন্তু উৎসুক পাঠক বুঝে নেবেন আসলে গল্পগুলো কাল্পনিক কিছু নয়।। বাস্তবতার সাথে সাথে যেটুকু রঙ মেশালে তা সংবাদ কিংবা কোনো ঘটনার ধারা বর্ণনা না হয়ে সফল গল্প হয়ে ওঠে, ঠিক সেটুকু রঙই মেশানো হয়েছে, খাঁটি সোনার সাথে খানিক খাঁদ মিশিয়ে যেমন তৈরি করা হয় দৃষ্টিনন্দন অলংকার। লেখক খুবই বুদ্ধিমত্তার (কেউ কেউ চতুরতারও বলতে পারেন) সাথে সব চরিত্র কাল্পনিক এমন একটা ধুম্রজাল সৃষ্টি করে পাঠকের মধ্যে একটা সন্দেহ আর ঔৎসুক্যের দোলচাল সৃষ্টি করেছেন শুরুতেই, পাঠক তখনও গল্পগুলোতে প্রবেশই করেন নি।
মুবিন খানের গল্পে পঁচিশে মার্চের কালরাত এসেছে ফ্ল্যাশব্যাক হিসেবে নয়, এসেছে ঘটমান বর্তমান হিসেবে। অন্যান্য গল্পের পটভূমি সমকালীন। সমকালীর রাজনীতির ছায়া, সামাজিক চালচিত্র ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভণ্ডামির কথাচিত্র উঠে এসেছে গল্পগুলোতে। কখনও রূপক, কখনও হিউমার আবার কখনও বা অতিপ্রাকৃত কাহিনিতে ভর করে গল্পগুলো এগিয়ে গেছে। প্রতিটি গল্পেই রয়েছে এক বা একাধিক বার্তা। তার অধিকাংশই সামাজিক-রাজনৈতিক বার্তা প্রকাশ্যে কিংবা প্রচ্ছন্নে। পড়তে গিয়ে ষাট, সত্তর কিংবা আশির দশকের অগ্রসর চিন্তার কিশোর যুবাদের কথা মনে হবে আর সমকালীন রাজনীতি ও সামাজিক অবস্থার প্রতি একটা হা-পিত্যেস অনুভব হবে, বেরিয়ে যাবে দীর্ঘশ্বাস। তারপরও গল্পগুলো গল্পই রয়ে গেছে। রাজনীতি কিংবা সমাজ-দর্পণের গুরুপাঠ হয়ে ওঠে নি।
তবে কোথাও কোথাও গল্পের চেয়ে রাজনীতি কিংবা রাষ্ট্র-পাঠ যে বড় হয়ে ওঠে নি তেমনটিও নয়। ‘ঈশপ সাহেবের গল্প’ তেমন একটি। রূপকল্পগল্প বলা হলেও পাঠকের মনে হতে পারে গল্পকার পাঠককে তাঁর দৃষ্টি দিয়ে রাষ্ট্রপরিচালনার সমকালীন প্রথা দেখিয়েছেন। যারা ভিন্ন দৃষ্টির পাঠক তারা হয়ত গল্পটি দেখবেন অন্যভাবে। তবে ২০২২ এর বাংলাদেশে এই গল্পটিকে একটি সাহসী গল্প বলতেই হবে।
‘প্রাগৈতিহাসিক’ গল্পটি হিউমার-আশ্রয়ী। নামের মধ্যেও বিদ্রূপ আছে। গল্পে একটি বিমান দুর্ঘটনার পর গণমাধ্যমের কর্মী ও বোদ্ধা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাক্টিভিস্টদের প্রদর্শনকামী মানসিকতা ও জাগতিক লাভালাভের হিসাব চিত্রিত হয়েছে। বিমান দুর্ঘটনার মতো একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা থেকেও একশ্রেণির মানুষের মুনাফাসন্ধানী মানসিকতা যে কেমন প্রহসনের জন্ম দিতে পারে এই গল্পে তা ফুটে উঠেছে অত্যন্ত সুচারুভাবে। ‘লেইসফিতাঅলা’ আরেকটি রূপকধর্মী গল্প। এই গল্পের প্রথম দিকে লেখক একটি এক্সপেরিমেন্ট করেছেন বলে মনে হয়েছে। তেমনটি হলে তিনি সেই এক্সপেরিমেন্টে উতরে গেছেন বলা যায়। গল্পের প্রথম অংশের সচেতনপাঠ একটি কবিতার খসড়া মনে হতে পারে। আর যদি লেখার ধরণটি অবচেতনেই এমন হয়ে থাকে তবে বলতে হবে তা হচ্ছে এই গল্পের অনৈচ্ছিক অলংকরণ।
‘লালসালু’ গল্পের নামেই পাঠক থমকে যাবেন। গল্পের ভেতরে প্রবেশ করে তার মনে হবে এত দেখি সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর ‘লালসালু’র হালনাগাদ। কিন্তু একটু অগ্রসর হলেই তিনি বুঝতে পারবেন এর মৌলিকত্বটুকু। আদি ‘লালসালু’র ছায়ায় লেখা হলেও এই গল্পটি অতিপ্রাকৃত আঙ্গিকে লেখা। শেষ দিকে আবার রয়েছে আচমকা টুইস্ট। পাঠকের তখন আবার আগের পৃষ্ঠাগুলোতে ফিরে যাওয়ার অভিপ্রায় জন্মাবে। কোনো কোনো পাঠক একটু ধাঁধায়ও পড়বেন। গল্পটি এখানেই অনন্য।
এই গ্রন্থের সবচেয়ে বাস্তবতা-আশ্রয়ী গল্পের নাম ‘একটি বানানো গল্প’। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে যাঁরা শাহবাগে সমবেত হয়েছিল সেসব উত্তাল দিনগুলোতে তাঁদের জন্য এই গল্পটি আবশ্যিক পাঠ। গল্পের শেষে তাদের মধ্যে একটি শংকা এবং বিভীষিকা ভর করবে। নিছক গল্পকারের কল্পনা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এমনটি যে ঘটে নি সে নিশ্চয়তা দেওয়া যাবে কি? ফাঁসির যে আসামীকে দাফন করা হয়েছিল সে শবটি আসলে কার? শুধু কি তাদের আদর্শিক প্রত্যাবর্তনই সম্ভব, শারীরিক নয়? রক্ত হিম করা এক গল্প।
শেষ গল্প ‘যজ্ঞ’ আক্ষরিক অর্থেই পঁচিশে মার্চের কালরাতে ধংসযজ্ঞের কথাচিত্র। ফ্ল্যাশব্যাক নয়, ঘটমান বর্তমান আর পুরাঘটিত বর্তমানে বর্ণিত। সে রাতের বিভীষিকা এই ক্যানভাসে বিস্তৃত হয়েছে তার আগের কিছু অনুসঙ্গসহ। তবে অনুসন্ধানী পাঠকের কাছে কিছু বিষয়ে খটকা লাগা বিচিত্র নয়। গল্পের মূল চরিত্র হাকিম কিংবা মতিন খেটেখাওয়া মানুষ কিংবা ছিঁচকে অপরাধী হলে তারা তো সে উত্তাল দিনগুলোর প্রভাবের বাইরের কেউ না। তারা মার্চে এসে তাদের চারপাশে কি ঘটছে, কেন ঘটছে বা কি ঘটতে যাচ্ছে সে বিষয়ের প্রায় অজ্ঞ এটা মেনে নিতে অনেকেরই কষ্ট হবে। ঘটনার শেষভাগে এসে দেখা যাবে কয়েকজন পলায়নরত অপরাধী একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। সে অপরাধীদের একজন আবার ভিকটিমের পূর্বপরিচিত তারই রিক্সাচালক। ঘটনাটি যে একেবারেই অবাস্তব কিংবা এমন কিছু সে রাতে কোথাও ঘটে নি এমনটি হয়ত শতভাগ নিশ্চয়তা দিয়ে বলা যাবে না। কিন্তু পসিবিলিটি আর প্রোবাবিলিটির নিক্তিতে ইম্পসিবল না হলেও এই গল্পের কাহিনী কতটুকু প্রোবাবল তা নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। তবে যেহেতু ‘ফ্যাক্টস আর স্ট্রেঞ্জার দ্যান ফিকশন’ এবং যেহেতু গল্পকার ‘শতভাগ কাল্পনিক’ (ফিকশনের বেলায় তো এটাই ইমপ্লাইড ফ্যাক্ট) বলে আগেই দায়মুক্তি নিয়েছেন তাই এই গল্পের কাহিনী নিয়ে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগই বা কোথায়?
প্রচ্ছদ, বাঁধাই ও অঙ্গসজ্জা এক কথায় চমৎকার। মুদ্রণপ্রমাদ তেমন একটা চোখে পড়েনি (১৮তম পৃষ্ঠায় ‘কুর্দি’র বদলে ‘উর্দি’ হবে কি?)।
২০২২ সালের একুশের গ্রন্থমেলায় বইটি প্রকাশ করেছেন অনুস্বর পাবলিকেশনস্। মুদ্রিত মূল্য ২৬০ টাকা। পাওয়া যাবে রচয়িতা প্রকাশনি, বাতিঘর, অনন্যা ও মুক্তধারা নিউইয়র্কে। এছাড়া বাতিঘর ও রকমারি অনলাইন থেকেও সংগ্রহ করা যাবে।
‘গল্পরা’র বহুল প্রচার ও বহুলপাঠ কামনা করি। মুবিন খানের প্রতি শুভেচ্ছা। তাঁর আরও গল্প পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।



