যুক্তরাষ্ট্র

হোয়াইট হাউস বনাম সংবাদমাধ্যম: ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে আদালতে তিন শীর্ষ মিডিয়া

CNN, MS NOW ও Politico-র প্রবেশাধিকার বন্ধের পর First Amendment মামলা; প্রেসিডেন্টের টিভি পুল কভারেজ স্থগিত ABC, CBS, Fox News ও NBC-র

হোসনেআরা চৌধুরী: — হোয়াইট হাউস ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের সংঘাত এবার সরাসরি আদালতে গড়িয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন CNN, MS NOW এবং Politico-র সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশাধিকার বন্ধ করার পর তিন সংবাদমাধ্যম ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। মামলায় তারা অভিযোগ করেছে, এই সিদ্ধান্ত তাদের First Amendment-এর সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং Fifth Amendment-এর যথাযথ প্রক্রিয়ার অধিকার লঙ্ঘন করেছে।

তিন প্রতিষ্ঠান দ্রুত আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে তাদের সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহালের আবেদন করেছে। মামলার শুনানি বুধবার ওয়াশিংটন ডিসিতে হওয়ার কথা। মামলাটি এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নিতে নিউইয়র্কে রয়েছেন।

প্রবেশাধিকার নিয়ে মুখোমুখি দুই পক্ষ

ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবাদমাধ্যমগুলোর অভিযোগ, তাদের রিপোর্টিং নিয়ে প্রেসিডেন্টের অসন্তোষের কারণেই এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। তিন প্রতিষ্ঠান বলছে, সরকারের সমালোচনামূলক বা অপছন্দের সংবাদ প্রকাশের কারণে কোনো সংবাদমাধ্যমকে শাস্তি দেওয়া সাংবিধানিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের বক্তব্য, প্রেসিডেন্টের কর্মস্থলের নির্দিষ্ট এলাকায় সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার স্বয়ংক্রিয় সাংবিধানিক অধিকার নয়। প্রশাসন দাবি করছে, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং হোয়াইট হাউসের সীমিত প্রবেশাধিকার—দুটি পৃথক বিষয়।

ট্রাম্প প্রকাশ্যে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোকে “ফেক নিউজ” হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষেধাজ্ঞার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে বলেছেন, হোয়াইট হাউস এমন সংবাদমাধ্যমকে বিশেষ প্রবেশাধিকার দিতে বাধ্য নয়, যাদের কাভারেজ প্রশাসনের দৃষ্টিতে পক্ষপাতদুষ্ট।

টিভি প্রেস পুলে নজিরবিহীন অচলাবস্থা

এই বিরোধের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়েছে হোয়াইট হাউসের টেলিভিশন প্রেস পুলে। CNN, ABC, CBS, Fox News ও NBC পালাক্রমে প্রেসিডেন্টের সরকারি কর্মসূচির ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ফুটেজ অন্যান্য সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ভাগ করে থাকে।

সোমবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিউইয়র্ক সফর ও জাতিসংঘের কর্মসূচির টিভি পুল কভারেজের দায়িত্ব ছিল CNN-এর। কিন্তু CNN-কে দায়িত্ব পালনের সুযোগ না দেওয়ার পর অন্য চার প্রধান নেটওয়ার্কও প্রেসিডেন্টের নির্ধারিত টিভি পুল কভারেজ স্থগিত করে। ফলে ট্রাম্পের জাতিসংঘ সফরের জন্য কোনো বিকল্প টিভি পুলও রাখা হয়নি।

এটি প্রেসিডেন্টের নিয়মিত টেলিভিশন কাভারেজ ব্যবস্থায় একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে। সাধারণত পুল ব্যবস্থার মাধ্যমে একটি নেটওয়ার্ক প্রেসিডেন্টের অনুষ্ঠানের ভিডিও ধারণ করে এবং সেই ফুটেজ অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো ব্যবহার করে।

নিউইয়র্কে ট্রাম্পের জাতিসংঘ সফরেও প্রভাব

ওয়াশিংটনে শুরু হওয়া এই সংঘাতের প্রভাব এবার নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মঞ্চেও পৌঁছেছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশনে অংশ নিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিউইয়র্কে রয়েছেন। তাঁর ভাষণ ও বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক ঘিরে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক আগ্রহের মধ্যেই টিভি পুল কভারেজ বন্ধ হয়ে যায়।

ফলে জাতিসংঘে প্রেসিডেন্টের গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচির ভিডিও কাভারেজ নিয়ে সংবাদমাধ্যমের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—সরকারি অনুষ্ঠানের স্বাধীন সংবাদ কাভারেজে প্রশাসনের ভূমিকা কতটা হওয়া উচিত এবং সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে।

হোয়াইট হাউসের নিজস্ব মিডিয়া ফিড

এই পরিস্থিতির মধ্যেই হোয়াইট হাউস নিজস্ব ভিডিও স্ট্রিমিং ব্যবস্থা “Trump TV” চালু করেছে। এতে প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও প্রশাসনের নির্বাচিত কর্মকাণ্ডের ভিডিও সরাসরি প্রচার করা হচ্ছে।

সমালোচকেরা বলছেন, সরকারি নিয়ন্ত্রিত ভিডিও ফিড সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন কাভারেজের বিকল্প হতে পারে না। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এটিকে জনগণের কাছে সরাসরি প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

আদালতের রায়ের দিকে নজর

মামলাটি এখন ফেডারেল আদালতের সামনে। বিচারক টিমোথি কেলি বুধবার নিষেধাজ্ঞা নিয়ে জরুরি শুনানি করবেন। এর আগে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে CNN-এর সাংবাদিক জিম অ্যাকোস্টার প্রেস পাস প্রত্যাহারের ঘটনায়ও একই বিচারক হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অস্থায়ী আদেশ দিয়েছিলেন।

বর্তমান মামলায় আদালতকে মূলত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বিবেচনা করতে হবে—সরকার কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে কি না এবং সেই সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত বিষয়বস্তু বা দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত হলে তা First Amendment-এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় কি না।

এদিকে মামলার ফলাফল শুধু CNN, MS NOW ও Politico-র জন্য নয়; হোয়াইট হাউস ও সংবাদমাধ্যমের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক এবং প্রেসিডেন্টের কর্মকাণ্ড কাভার করার প্রচলিত ব্যবস্থার ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসের দরজা নিয়ে আইনি লড়াই, নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মঞ্চে ট্রাম্পের গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সফর—আর মাঝখানে প্রশ্ন একটাই: প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের দূরত্ব কতটা প্রশাসন নির্ধারণ করতে পারে?

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension