
কেন কবিতা
বলা হয়ে থাকে মহামতি আলেকজান্ডার সবসময় তাঁর বালিশের নীচে একখণ্ড ইলিয়াড রাখতেন। গ্রীক এবং ট্রোজানদের দশ বছর ব্যাপী মহাযুদ্ধের মহাকাব্য হচ্ছে হোমারের ইলিয়াড। হোমার এবং হোমারের কাল নিয়ে বিতর্ক এখনও বহমান, কিন্তু ইলিয়াড সব বিতর্কের উর্দ্ধে। এখানেই ইলিয়েডের সার্থকতা।
গ্রীক মিথলজি বলতে আমরা যেটা বুঝি, তার বুনিয়াদ রচনা করেছিলেন আর এক গ্রীক কবি হেসিয়ড তাঁর থিয়গনি কাব্য গ্রন্থে। প্রাচীন গ্রীক দর্শন থেকে শুরু করে আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতায় হোমার এবং হেসিয়ড এখনও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
ফিরে আসি ভারতবর্ষে। দূর্ধর্ষ ডাকাত রত্নাকর কীভাবে বাল্মীকি হয়ে গেল আমরা তা জানি। সহস্র বছরের সাধনার পর তাঁর হাত থেকে বেরিয়ে এলো অমর মহাকাব্য রামায়ণ। সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে রামায়ণ ধর্মগ্রন্থের মতোই পবিত্র। আর রামায়ণের সার্বজনীন স্বাদ আস্বাদনে এখানেই সমস্যা। গ্রীক পুরাণের জিউস এখন অচল, তার নামে এখন আর তর্পন দেওয়া হয় না পৃথিবীর কোথাও; কিন্তু রামায়ণ ও মহাভারতের মহাদেব এখনও একটি জীবন্ত ধর্মের জীবন্ত প্রাণপুরুষ। তবুও বাল্মীকিকে আমরা আমাদের আদি কবি হিসাবেই জানি।
মানুষের মনের ভাব সুন্দর ও সংক্ষিপ্ত শব্দের মাধ্যমে, ছন্দবদ্ধ আকারে প্রকাশ করার নাম কবিতা। আমরা যখন মহাকবি মধুসূদনের কবিতা উদ্ধৃতি করি,—‘এ কী কথা শুনি আজ মন্থরার মুখে’…তখন আর বেশি কিছু ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন পড়ে না; আমরা বুঝে যাই কী এবং কেন; এটাই কবিতার গুণাবলী ও শক্তি।
কবিতা সম্পর্কিত সবচেয়ে পুরাতন অভিযোগ হচ্ছে—‘এখন আর মানুষ কবিতা পড়ে না’—অথচ এখনও আমরা বর্ষা অথবা বসন্তে, জোছনা অথবা অমাবস্যায় ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশ করতে দ্বারস্থ হই কবিতার। আমরা দ্বারস্থ হই রবীন্দ্রনাথ আর জীবনানন্দ দাশের।
কবিতা আমাদের স্বপ্ন দেখায়; আমাদের নিয়ে যায় সেই কল্পলোকে যেখানে আমাদের শারীরীক উপস্থিতি অসম্ভব। তাই তো যখন পত্র লেখার প্রচলন ছিল না, ছিল না কোনো ডাকবাহক, তখন অলকা নগরে যক্ষপ্রিয়ার কাছে যক্ষের বিরহ বার্তা বয়ে নিয়ে গিয়েছিল ‘মেঘদূত’—কবি কালিদাসের অমর কাব্য। যদিও আদি যুগে চীন এবং ভারতে দূত হিসাবে মেঘের ব্যবহার ছিল একটি বহুল ব্যবহৃত বিষয়; কিন্তু কালিদাসের মেঘদূত কালোত্তির্ণ। যেমন কালোত্তির্ণ গ্যাটের ফাউস্ট। গ্যাটের সময়ে জার্মান এবং ইংরাজী সাহিত্যে ‘ফাউস্ট’ ছিল একটি বহুল চর্চিত চরিত্র; অনেক কবি-সাহিত্যিক ফাউস্টের অনেক ছবি এঁকেছেন, কিন্তু গ্যাটের ফাউস্ট চিরায়ত।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কবি কেন কবিতা লেখেন? কবিতা লিখলেই বা কী? না লিখলেই বা কী? প্রথমত কবি কবিতা লেখেন তার ব্যক্তিগত আবেগ থেকে, ভাল লাগা, ভালবাসা থেকে; সুন্দর কিছু সৃষ্টির উদ্দেশ্যে। কিন্তু যখন একজন কবি’র আবেগ সাধারণ পাঠকের মধ্যে সঞ্চারিত হয় তখন-ই কেবল সেটা কবিতা। তাই যখন আমরা আবৃত্তি করি—‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়
হয়তো মানুষ নয়—হয়তো বা শঙ্খচিল শালিকের বেশে,
হয়তো ভোরের কাক হয়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে
কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়।’—তখন এটা কেবল কবি জীবনানন্দ দাশের নয়, আমাদের সকলের প্রাণের কথা; এটা সর্বজনীন ঘরে ফেরার আকুতি। আবার কবি যখন বলেন,—‘সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে; ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল;’—তখন আমরা দেখি উপমার উতকৃষ্ট উদাহরণ। উপমা হচ্ছে কবিতার সৌন্দর্য, পারস্পরিক দুইটি বিষয়ের মেলবন্ধন। এক কথায় উপমা হচ্ছে সুন্দরের সাথে সুন্দরের তুলনা।
যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হয়েছে কবিতা; পরিবর্তিত হয়েছে কবিতার রূপ-রস-গন্ধ, তবুও কবিতা টিকে আছে স্বমহিমায়। সামন্ততন্ত্রের স্হবিরতার যুগে কবিতা ছিল সরোবরের মতো সুন্দর, কিন্তু শৃঙ্খলিত। আবার পুঁজিবাদের বিকাশের যুগে কবিতা হয়ে ওঠে ব্যক্তিস্বাধীনতা ও স্বতন্ত্রবোধের মূর্ত প্রতীক; স্রোতস্বিনী নদীর মতো স্বাধীন ও সৌন্দর্যময়। আধুনিক যুগের কবিতা বিষয় ও ব্যাপকতায় বিশাল। আমাদের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে কবিতা যেমন পরাধীন জাতি-কে উদ্ভুদ্ধ করেছিল স্বাধীনতার সংগ্রামে, তেমনি তার ভাষা ছিল অস্ত্রের মতো শাণিত। কবিতার কোনো বিকল্প নাই—কবিতার বিকল্প কবিতা নিজেই।



