কবিতাসাহিত্য

একটি নিঃসঙ্গ ধুলিকণা বিন্দুর কথা

রোকসানা পারভীন


নিকষ কালো অন্ধকারের মধ্যে ঐ যে নীল উজ্জ্বল এক বিন্দু দেখতে পাচ্ছো সেটা কি বলতে পারবে? যদি বলতে পারো তাহলে তোমাদের সকলের অহমিকা, দম্ভ, কিছুটা হলেও কমবে।
কি বলতে পারছো না তো? তাহলে বলি এই আলোকিত ধূলিকণা বিন্দুটি হচ্ছি আমি;
তোমাদের পৃথিবী নামক গ্রহ, তোমাদের আবাসস্থল। মহাজাগতিক অন্ধকারে ভেসে বেড়ানো নিতান্তই ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর নিঃসঙ্গ একটি বিন্দু আমি।

তোমাদের নিরহংকারী, বিনয়ী হওয়ার জন্য মহাবিশ্বের যোজন যোজন আলোকবর্ষ দূর থেকে
এই ছবির থেকে আর ভালো কোনও উদাহরণ নেই এবং হতেও পারে না।

ক্ষুদ্র ধূলিকণা এই আমার বাসিন্দা হয়েও তোমরা কতই না বড়াই করো, করো অহংকার;
যা দেখে বিস্ময়ে বিস্মিত আমি অহরহ।

মহাকালের আদি থেকে আজ পর্যন্ত কত শত মনীষী, সাধু-সন্ন্যাসী, ভিন্ন ভিন্ন ধর্ম, রাজা-মহারাজাধিরাজ,
ভ্রমণকারী, আবিষ্কারক, দেশ নেতানেত্রী, দুর্নীতিবাজ, কত শত মতবাদ, সভ্যতার নির্মাতা ও ধ্বংসকারী, নায়ক-নায়িকা, ভালো মানুষ, মন্দ মানুষ, আসছে যাচ্ছে এই আমার বুকেই।

এই ক্ষুদ্র আমার কোনও ক্ষুদ্র অংশ জয়ের জন্য,
ধর্মের জন্য কত কত রক্তের হোলিখেলা করেছিলে এবং করে চলেছ নিয়তই।
বিভৎসতা, জঘন্য জিঘাংসা তোমাদের থামছেই না
ক্ষণিকের সুখের জন্য ক্ষণিকের প্রভু সাজার জন্য কত কত জীবন নিয়েও রক্তের পিপাসা মিটছে না
মানুষ নামক রক্তচোষা বাদুর তোমাদের।

আমি দেখি পুঁজিবাদ সমাজে ধনতান্ত্রিক দেশগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে চায়,
আমার সারা বুক জুড়ে বশে আনতে চায় তাদের হাতের মুঠোয়।
জীবননাশক জীবাণু তৈরি করে দেশে দেশে ছড়িয়ে দেদারছে করছে প্রাণনাশ।
কত শত মাইন, হাইড্রোজেন বোমা মেরে আমার বুকটা করছো ঝাঁঝরা, করছ ক্ষতবিক্ষত, রক্তাক্ত।
আমার বুক চিড়েই বের করে আনছো হীরা, জহরত, মুল্যবান সম্পদ।
তাহলে আমাকে রক্ষা করার দায় কি বর্তায় না তোমাদের?
আমি মুখ বুজে, দাঁত কামড়ে সব সহ্য করি
আমারও চোখে জল আসে, আমারও কষ্ট হয়
তবে নিজের জন্য খুব কষ্ট অনুভব করি না
কষ্ট অনুভব করি তোমাদের মুর্খামী, অজ্ঞতা দেখে।

তোমরা যারা প্রভু সাজতে চাও, দাম্ভিকতার গহীনে নিমজ্জিত হয়ে বেমালুম ভুলে গেছ যে,
ক্ষুদ্রতর ধূলিকণা এই আমারও একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন;
যার একটি মাত্র কথা, ‘কুন ফা ইয়াকুন -হও এবং হয়ে যাও’ বললেই সব নিমিষেই ধংস হয়ে যাবে
তখন কোথায় থাকবে তোমাদের অহংকার?

এই অচিন্তনীয় , অগম মহাজাগতিক বিশ্বব্রক্ষ্মাণ্ডে আমার মাঝে দৈবাত ধংসাত্বক কিছু ঘটলে
এমন কোনও গ্রহ বা নক্ষত্র নেই যেখান থেকে তোমাদের উত্তরণের জন্য কেউ এগিয়ে আসবে বা তোমরা আমাকে ছেড়ে অন্য কোনও গ্রহে যেতে পারবে।

তোমাদের সকলের জন্য আমি এক উত্তম শিক্ষা,
যা দেখে তোমরা হতে পারো একে অন্যের প্রতি সদয়, সমবেদী, সহৃদয়।
একটা ক্ষুদ্রতর ধূলিকণার বাসিন্দা হয়েও কেন এত দম্ভ, কেন এত অহংকার তোমাদের?

কত শত সাগর, মহাসাগর, পাহাড় পর্বত, সারাবিশ্ব নিয়েও আমি অতি ক্ষুদ্র ধূলিকণা,
সেই আমি একটা মহাজাগতিক ফুঁয়ের মাধ্যমে মিলিয়ে যেতে পারি অতলে যে কোনও সময়,
আর সেই তোমরা, যার নিজেদেরই কোনও অস্তিত্ব নেই
অথচ সেই তোমরাই দেদারসে করে যাও আস্ফালন, দাম্ভিকতা!
তোমরা সজ্ঞানে ফিরবে কবে বলতে পারো?

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension