নিউ ইয়র্কযুক্তরাষ্ট্র

বিচারকের সামনে একা শিশু, ঝুলছে ভবিষ্যৎ

আইনজীবী ছাড়াই বহিষ্কারের মামলায় লড়ছে হাজারো অভিবাসী শিশু; মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

শাহ্ জে. চৌধুরী : যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালতের একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা আবারও সামনে এসেছে। বহিষ্কারের (ডিপোর্টেশন) মামলায় হাজারো অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী শিশুকে কোনো আইনজীবীর সহায়তা ছাড়াই বিচারকের সামনে দাঁড়াতে হচ্ছে। আদালতের কাঠগড়ায় তারা একাই নিজেদের পরিচয়, আশ্রয়ের আবেদন এবং দেশে ফিরে গেলে কী ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে—এসব বিষয় ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইন বিশ্বের অন্যতম জটিল আইনি ব্যবস্থাগুলোর একটি, যা অনেক প্রাপ্তবয়স্কের পক্ষেও বোঝা কঠিন।

সাম্প্রতিক এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শিশুদের জন্য আইনি সহায়তা কর্মসূচির পরিধি সংকুচিত হওয়া এবং নীতিগত পরিবর্তনের ফলে অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক অভিবাসী আদালতে কোনো আইনি প্রতিনিধিত্ব পাচ্ছে না। ফলে বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেরাই আইনি প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য হচ্ছে। শিশুদের অনেকেই ইংরেজি ভাষায় দক্ষ নয়; অনেকেই নিজ দেশে সহিংসতা, নির্যাতন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, গ্যাং-সহিংসতা কিংবা পারিবারিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নিতে এসেছে। কিন্তু আদালতে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা প্রায়ই অনুপস্থিত।

অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একজন আইনজীবী ছাড়া আশ্রয়ের আবেদন, বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি বা বহিষ্কার স্থগিতের মতো আইনি অধিকার সম্পর্কে শিশুদের পক্ষে যথাযথভাবে যুক্তি উপস্থাপন করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে একটি ছোট আইনি ভুল বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উপস্থাপনে ব্যর্থতা শিশুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিতে পারে।

শিশু অধিকার ও অভিবাসন নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, আদালতে আইনি প্রতিনিধিত্ব পাওয়া শিশুদের আশ্রয় বা অন্য ধরনের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। অন্যদিকে, আইনজীবী ছাড়া আদালতে হাজির হওয়া শিশুরা প্রায়ই জটিল প্রক্রিয়ার মধ্যে হারিয়ে যায় এবং নিজেদের অধিকার সম্পর্কেও অজ্ঞ থেকে যায়। তাদের মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক বা আইনি সমস্যা নয়; এটি শিশু অধিকার ও মানবিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে অভিবাসীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে। মামলার জট, সীমিত জনবল এবং নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের ওপর। আদালতের প্রতিটি শুনানি তাদের জন্য হয়ে উঠছে অনিশ্চয়তা, ভয় এবং ভবিষ্যৎ হারানোর আশঙ্কায় ভরা এক কঠিন পরীক্ষা।

মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কোনো শিশুকে আইনজীবী ছাড়া বহিষ্কারের মামলায় একা লড়তে বাধ্য করা ন্যায্য বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা ফেডারেল সরকারের প্রতি শিশু অভিবাসীদের জন্য আইনি সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, পর্যাপ্ত অর্থায়ন নিশ্চিত এবং আদালতে তাদের যথাযথ আইনি প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, একটি দেশের বিচারব্যবস্থার মানবিকতা পরিমাপ করা যায় সবচেয়ে দুর্বল ও অসহায় মানুষের প্রতি তার আচরণে। আর সেই পরীক্ষায় আজ যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আদালতে একা দাঁড়িয়ে থাকা হাজারো শিশুর মুখই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় প্রশ্নচিহ্ন।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension