ভারত

দলিত তরুণকে বিয়ে করায় ক্ষোভে মেয়ের ‘শেষকৃত্য’ করল পরিবার

ভারতের বিহারের পূর্ণিয়ায় ভিন্ন জাতের দলিত এক যুবককে বিয়ে করেন ১৮ বছরের এক তরুণী। আর এতে ক্ষুব্ধ হয়ে মেয়ের প্রতীকী শেষকৃত্য করেছে তাঁর পরিবার। ওই তরুণী প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে আদালতে বিয়ে করার পর পরিবার এমন ঘটনা ঘটিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, পরিবারটি মেয়ের ছবি লাগানো একটি প্রতিকৃতি তৈরি করে। এরপর সেটি নিয়ে এলাকায় শোকযাত্রা বের করে এবং তরুণী স্থানীয় আদালতে নিজের পছন্দের পুরুষকে বিয়ে করার কথা স্বীকার করার পর তাঁর প্রতীকী শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। গত মঙ্গলবার পূর্ণিয়ার টাউন থানা এলাকার ছাপায় গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

রিয়া নামে ওই তরুণী কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। অভিযোগ অনুযায়ী, গত ৮ সেপ্টেম্বর ২৪ বছর বয়সী মীনাল কুমারের সঙ্গে পালিয়ে যান তিনি। পরে আদালতে তাদের বিয়ে হয়। এরপর রিয়ার বাবা মনোজ কুমার গোস্বামী মারাঙ্গা থানায় গিয়ে নিখোঁজের অভিযোগ করেন। তাঁর আশঙ্কা ছিল, মেয়েকে অপহরণ করা হয়েছে।

গ্রামবাসীদের ভাষ্য, রিয়া ও মীনালের মধ্যে প্রায় তিন বছর ধরে সম্পর্ক ছিল। তাদের বাড়ি পরস্পরের থেকে মাত্র প্রায় ১০০ মিটার দূরে। রিয়া কলেজে যাতায়াতের সময় প্রথমে দুজনের দেখা হয়। পরে ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে দেখা করা ও কথাবার্তা শুরু হয়। দুই দিন আগে পুলিশ দিল্লি থেকে রিয়াকে উদ্ধার করে বলে জানা গেছে। এরপর তাঁকে আদালতে হাজির করা হয় এবং সেখানে তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করা হয়।

আদালতে রিয়া মীনালের পক্ষ নিয়ে জানান, তিনি নিজের ইচ্ছায় তাঁকে বিয়ে করেছেন। এ কথা জানার পর তাঁর বাবা গভীরভাবে ক্ষুব্ধ হন। এরপর তিনি প্রতীকী শেষকৃত্যের মাধ্যমে মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করার সিদ্ধান্ত নেন। গত সোমবার রাত থেকেই এই অস্বাভাবিক অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি শুরু হয়।

গ্রামবাসীর মতে, পরিবারের সদস্যরা রিয়ার একটি প্রতিকৃতি তৈরি করেন এবং তাঁর সংবলিত একটি পোস্টারও বানান। পরদিন সকালে ওই শোকযাত্রায় অংশ নিতে গ্রামবাসীদের ডাকা হয়। এরপর বাড়ি থেকে খাটিয়ায় করে রিয়ার প্রতিকৃতি বের করা হয়। সেটি নিয়ে গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় শোকযাত্রা করা হয়। এ সময় লোকজন হিন্দুদের শেষকৃত্যে ব্যবহৃত ‘রাম নাম সাত্যা হ্যায়’ ধ্বনি দেন। পরে মনোজ প্রতীকীভাবে ওই প্রতিকৃতির দাহ করেন।

পরিবারটি আরও জানিয়েছে, মৃত্যুর পর প্রচলিত বিভিন্ন আচারও তারা পালন করবে। এর মধ্যে ১০ম থেকে ১৩ তম দিনের মধ্যে শ্রাদ্ধ ও পিণ্ডদানের মতো আনুষ্ঠানিকতা করার কথাও রয়েছে। মনোজ জানান, তিনি এরই মধ্যে রিয়ার বিয়ে ভাগলপুরের এক যুবকের সঙ্গে ঠিক করেছিলেন। ওই যুবক পেশায় সরকারি শিক্ষক। তাঁর দাবি, ৬ লাখ রুপিতে বিয়ের সম্বন্ধ চূড়ান্ত করা হয়েছিল এবং আগামী নভেম্বর মাসে বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল।

মনোজ বলেন, ‘আমরা বিয়ের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছিলাম। এর মধ্যে আমার মেয়ে পালিয়ে গিয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে করেছে। এখন আমি অন্য পরিবারের কাছে কী বলব? কীভাবে তাদের সামনে মুখ দেখাব?’ মনোজ আরও বলেন, ‘আমি মেয়েকে পড়াশোনা করিয়েছি, মানুষ করেছি, আর সে আমাদের মাথা নিচু করে দিয়েছে। ঈশ্বর যেন কারও এমন মেয়ে না দেন। এখন আমরা কারও সামনে মুখ দেখানোর অবস্থায় নেই।’ পরিবারের পক্ষ থেকে এখন বলা হয়েছে, রিয়া তাদের কাছে ‘মৃত’ এবং তাঁর সঙ্গে আর কোনো সম্পর্ক রাখা হবে না।

গ্রামের বাসিন্দা অবধেশ কুমার জানান, এর আগে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন। দুই পক্ষকে ডেকে একটি বৈঠকও করা হয়েছিল। সেখানে সামাজিকভাবে বিষয়টির সমাধান করার জন্য তাদের বলা হয়। অবধেশ বলেন, ‘আমরা আগে একটি বৈঠক করেছিলাম এবং দুই পক্ষকেই ডেকেছিলাম। আমরা বলেছিলাম, সামাজিকভাবে বিষয়টির সমাধান করতে। আমরা তাদের বলেছিলাম, আগে যেমন ছিল তেমনভাবেই থাকুক এবং দুজনকে আলাদা করে দেওয়া হোক। কিন্তু তা হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, এমন পদক্ষেপ নিলে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা তরুণীদের বোঝাতেই সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে সতর্ক করতে চাওয়া হয়েছিল।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension