
বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ কমেছে লোডশেডিং: প্রধানমন্ত্রীর দূরদর্শী সিদ্ধান্ত, জ্বালানিমন্ত্রীর প্রচেষ্টা
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট পরিস্থিতি ক্রমেই উন্নতি হচ্ছে। বিদ্যুতের লোডশেডিং কমছে।
বাড়ছে গ্যাস সরবরাহ। এতে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরছে ভোক্তা-উদ্যোক্তা পর্যায়ে। জ্বালানি খাতে বৈশ্বিক নানা কারণে তৈরি হওয়া একটি জটিল সমস্যা দৃঢ় মনোবলের সঙ্গে মোকাবেলা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তারই দূরদর্শী সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনায় পুরো পরিস্থিতিকে অনুকূলে নিয়ে আসতে নিরলসভাবে কাজ করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটকে অগ্রাধিকার দিয়ে খোদ প্রধানমন্ত্রী তা সার্বক্ষণিক তদারকি করছেন। আর মন্ত্রণালয়ের শীর্ষে থেকে তার সুফল সরাসরি ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছে দিতে দক্ষতার সঙ্গে পুরো বিষয়টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী। এখন তিনি পরিস্থিতিকে টেকসই করতে কাজ করছেন আর দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানো ও বিকল্প জ্বালানি উৎস তৈরির পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ায় জোর মনোযোগ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সংস্থা পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রবিবার সারা দেশে দুপুর ২টায় লোডশেডিং ছিল ১৭৪ মেগাওয়াট এবং সকাল ১১টায় লোডশেডিং ছিল মাত্র ৭২ মেগাওয়াট।
১১টার দিকে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৪৫২ মেগাওয়াট এবং সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৩৮০ মেগাওয়াট। দুপুর ২টার সময় বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ১৭ মেগাওয়াট এবং তখন সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৯২৬ মেগাওয়াট। এর আগের দিন শনিবার ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৫৬৮ মেগাওয়াট। অথচ মাত্র ১০ দিন আগেও দিনের বিভিন্ন সময়ে সর্বোচ্চ দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছিল।
একইভাবে বেড়েছে গ্যাস সরবরাহ।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রবিবার দুপুর ২টায় জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল দুই হাজার ৬১৯ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি)। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল এক হাজার ১৬ মিলিয়ন ঘনফুট। অথচ এলএনজি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্নের কারণে দুই সপ্তাহ আগেও জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ প্রায় দুই হাজার ২০০ এমএমসিএফডিতে নেমে এসেছিল। এতে শিল্প-কারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র সংকট দেখা দেয়।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি সংকটের এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশনা ও হস্তক্ষেপে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি উৎসর সন্ধান এবং সরবরাহ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী জ্বালানি মন্ত্রণালয়, পেট্রোবাংলা, বিপিডিবিসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু।
জ্বালানিমন্ত্রী গতকাল রবিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘শিগগিরই জ্বালানি সংকট কেটে যাবে। আগামীতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে জ্বালানি সরবরাহে সমস্যা থাকবে না।’ তিনি বলেন, ‘ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বিকল্প উৎস খুঁজতে কিছুটা সময় লেগেছে। আবার জ্বালানি কেনা হলেও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার কারণে তা দেশে আনা সম্ভব হয়নি। এখন সঠিকভাবে জ্বালানি আসছে।’
ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘জনগণ আস্থা রেখে সরকারকে ভোট দিয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ ও দুর্ঘটনার কারণে কিছুটা দেরি হয়েছে। এখন জ্বালানি আমদানি করা সম্ভব হয়েছে এবং সরবরাহের শিডিউলও ঠিক করা হয়েছে। আগামীতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটলে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ঠিকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, জনগণের কষ্ট লাঘবে সরকার বিকল্প উৎস খুঁজে বের করেছে। বেশি দাম দিয়ে গ্যাস আনা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে বিষয়টিতে হস্তক্ষেপ করেছেন বলেই দ্রুত সমাধান সম্ভব হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সবাই টিম হিসেবে কাজ করেছে।
সংকট সামাল দিতে একসঙ্গে একাধিক উদ্যোগ : সরকারের নেওয়া কর্মপরিকল্পনায় তাৎক্ষণিক, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি—তিন ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি উৎস থেকে এলএনজি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় উচ্চমূল্যে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে এনে শিল্পে সরবরাহ, মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানি এবং মালয়েশিয়া থেকে আইএসও পদ্ধতিতে গ্যাস আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন গ্যাসের উৎস খোঁজার পাশাপাশি পুরনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়াতেও জোর দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া নয়; দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়িয়ে ধীরে ধীরে ব্যয়বহুল আমদানিনির্ভরতা কমানো। একই সঙ্গে শিল্পের উৎপাদন সচল রাখা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে স্থিতিশীলতা আনা।
১,৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস বৃদ্ধির লক্ষ্য : বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী যে শুধু সাময়িক সংকট মোকাবেলায় মনোযোগ দিয়েছেন, তা নয়; তিনি বরং সামগ্রিক টেকসই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছেন। গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধানে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। তার পরিকল্পনা অনুযায়ী পেট্রোবাংলার ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভার কর্মসূচি পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলে ২০৩০ সালের মধ্যে দৈনিক প্রায় এক হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনফুট অতিরিক্ত গ্যাস উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান নিশ্চিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ হচ্ছে।
এ বিষয়ে পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) প্রকৌশলী মো. শোয়েব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে ১৫০টি কূপের কর্মসূচির পাশাপাশি নতুন গ্যাসের সন্ধানে ব্যাপক অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে। সাইসমিক জরিপের মাধ্যমে সম্ভাবনাময় কাঠামো শনাক্ত করে দ্রুত অনুসন্ধান কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’
শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়াতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বকেয়া বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের মাধ্যমে কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সরকার বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (বিপিডিবি) ছয় হাজার কোটি টাকা সুদমুক্ত ঋণ দিয়েছে। এই অর্থ দিয়ে ফার্নেস অয়েল কেনা হচ্ছে। তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো বর্তমানে তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই গ্যাস শিল্পে সরবরাহের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে জ্বালানিসংকট মোকাবেলায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগের সঙ্গে আর্থিক চাপও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ এবং এলএনজি সরবরাহ সংকটের কারণে বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে। দেশের বাজারে তুলনামূলক কম দামে জ্বালানি বিক্রি ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর লোকসান ও ভর্তুকির চাপ বাড়ছে। গত সাড়ে ছয় মাসে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) লোকসান হয়েছে ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা। সম্প্রতি জ্বালানি তেলের দাম লিটারে ২০ টাকা বাড়ানোর পরও ডিজেলে বড় ধরনের লোকসান হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।



