
মহল্লার মাস্তানের চা চক্র আর নোবেল নিয়ে বিশ্ব জুড়ে ঝড়
লুৎফুল হোসেন
ভুখাকে এক বেলা খাওয়ালে খুশি। আরেক বেলার খাবার সাথে দিয়ে দিলে আরও খুশি। কিন্তু তাকে খেটে রোজগার করে খাবারের যোগান জোটাবার জন্য কোন কাজের ব্যবস্থা করে দিন। খুব একটা মনঃপুত হবে না অধিকাংশের। অথচ কারও উপকার করতে চাইলে শেষের পথটিই সত্যিকার অর্থে কার্যকর। অবশ্য বাস্তবে আমি-আপনি চাইলেও খুব একটা বেশি ঘটাতে পারব না এটা।
আবার ধরুন বাহবা দেয়া। বেশ সহজ। কিন্তু বাহবা পাওয়ার মতন কাজটা করবার জন্য যথার্থ সহযোগিতা দেয়া। পরামর্শ-প্রশিক্ষণ দেয়া, রসদ জোগানো। এগুলো বাহবা দেবার মতন অত সহজ কাজ নয়।
পশ্চিমা বিশ্ব পুবের ভুখা-নাঙ্গা সমস্যা সঙ্কুলতায় এক বেলা খাওয়াবার মতন, একখানা জামা উপহার দেবার মতন, উপকার করবার পাশাপাশি খেটে খাবার ব্যবস্থাপনাতেও খুব একটা কম অবদান রাখে নি। হ্যাঁ, আপনারা অনেকে হয়ত বলতে চাইবেন যে জলের দরে তার নিজের জামাটা-জুতোটা-খেলনাটা বানিয়ে দেবার কাজটা। ওটুকুই তো আমাকে দিয়েছে। নিজের স্বার্থেই। আমার জন্যই কি শুধু!
এই যে প্যালেস্টাইন প্যালেস্টাইন করে তার ত্রিসীমানা ধরে ড্রাই ওয়াশে পাঠাবার কাজে মত্ত হয়ে আছে আমেরিকা-ইউরোপময় পাশ্চাত্য। সেটার সূত্রপাত কোথায়! শান্তির লক্ষ্যে ইউরোপ থেকে ইহুদিদের প্যালেস্টাইনে পাঠাবার সনদ পাশ করে নিয়েছিল কে! লিগ অব নেশনসের ইউরোপিয় মাতব্বরেরা। যারা এক সময় ইহুদিদের নিজ সীমানা ছাড়া করতে যারপরনাই মরিয়া এবং বদ্ধপরিকর ছিল। তারাই আবার সেই ইহুদিদের পুনর্বাসনে মহান মানবতাবাদীর ভূমিকায় বিশ্বের মোড়ল।
প্যালেস্টাইনী আরব মুসলিমদেরকে সন্ত্রাসী পরিচয়ে গোটা পৃথিবীতে পরিচয় করিয়ে দেবার বিষবাষ্প ছড়াতে ব্যস্ত যে আমেরিকা, সে সেটার গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে কিংবা সম্ভাব্য প্রতিরোধ নির্মূল করে নিতে আগে থেকেই প্যালেস্টাইনি যিশুর চেহারা আর লেবাসে সুচারু সম্পাদনা ঘটিয়ে তাকে একজন শ্বেতাঙ্গের অবয়বে প্রতিষ্ঠা করে নিয়েছে। ভাই, দ্বিমত করবার আগে একটু আমেরিকার গির্জাগুলো আর ঘরে ঘরে যে যিশুকে তারা সাজিয়ে রেখেছে তা দেখে আসুন। নব্য পাগান তৈরীর কারখানার সক্রিয় সাফল্যের সুবাদে আজ সাধারণ আমেরিকানদের অনেক ধর্মবিশ্বাসীর মন থেকে এ তথ্য মুছে গেছে যে, তাদের উপাস্য ঈশ্বরপুত্র, যিশু নিজেই একজন প্যালেস্টাইনি আরব ছিলেন।
হ্যাঁ। লোকে বলে তালেবানও নাকি পশ্চিমা বিশ্বেরই সৃষ্টি। যে সাদ্দামকে নিয়ে এত তোলপাড় হল দুনিয়া, সেই সাদ্দামকে সাদ্দাম বানিয়েছে তো সেই পশ্চিমা বিশ্বই। যেনতেন রকমে ঘটে যায় না এমন সব কুশলীদের নির্মাণ কিংবা বিনাশ। ওরা যেটাই করে, অনেক কসরৎ করে অনেক তেল ঘি পুড়িয়েই তা করে।
মালালা শব্দের অর্থ বলা যেতে পারে শোকার্ত। মালালা ইউসাফজাই। জন্ম ১২ জুলাই ১৯৯৭। পাকিস্তান আর আর আফগান সীমান্ত এলাকার সোয়াত শহরে, যাকে কেউ কেউ পাকিস্তানের সুইজারল্যান্ড বলে। সেখানে মাতোড়পেকাই ইউসুফজাই আর বাবা কবি ও স্কুলচালক জিয়াউদ্দীন ইউসুফজাই-এর পশতুন পরিবারে পাকিস্তানের এক শোকার্ত সময়েই তার জন্ম। মাত্র ১১ বছর বয়সে পেশোয়ার প্রেস ক্লাবে বক্তব্যের ভেতর দিয়ে শিক্ষা বিস্তারের পথ পরিভ্রমণ তার শুরু।
২০০৮। সেই সময় টেলিভিশন, গান-বাজনা, আর নারী শিক্ষা নিষিদ্ধ করতে তৎপর তালেবান সন্ত্রাসে যখন স্কুলে যাবার মতন ছেলেমেয়ে পাওয়া যাচ্ছিল না। কোন (মেয়ে) ছাত্রী তো ছিলই না। এমন সময়ে কবি জিয়াউদ্দীন স্কুল চালু করতে নিজ মেয়েকেই এগিয়ে দিলেন।
২০০৯ সালের একেবারে শুরুতেই বিবিসির উর্দু ব্লগে মালালার লেখা প্রকাশ পেতে শুরু করে। এর পর তা কেবলি এগিয়ে যেতে থাকে আরও বিস্তৃতিতে। পাশ্চাত্যের মিডিয়া জোঁকের মতন লেগে ছিল তার পেছনে। তার কাছে এমন কি পৌছে গিয়েছে বারাক ওবামার বিশেষ দূতও।
৯ অক্টোবর ২০১২ তাকে হত্যা প্রচেষ্টার পর দূর থেকে তার জন্য কিছু করার বদলে সরাসরি অন দ্য স্পট করবার সুযোগ আসলো পশ্চিমা বিশ্বের। তার চিকিৎসা, পড়াশুনা, তার জন্য বক্তৃতা তৈরি করা থেকে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী একশ’ জনের মধ্যে তার নাম এনে সর্বকনিষ্ঠ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সেলিব্রিটি হিসেবে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে পশ্চিমারা তাকে গোটা বিশ্বের সামনে।
কিন্তু লিলিপুটের দেশে একজন গালিভারকে দিয়ে কি কি উদ্ধার হতে পারে! মালালার উচ্চকিত কন্ঠ পাকিস্তানে নারী শিক্ষার সব প্রতিবন্ধকতা দূর করতে না পারলেও সঙ্কটটাকে সামনে এনে দিয়েছে সর্ব-সাধারণের বিশ্বজনীন উন্মুক্ত দৃষ্টিগোচরতায়। কিন্তু নারী শিক্ষাকে কেন্দ্র করে যে অন্ধকার বসত করে পাকিস্তানের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, তা কি করে নির্মূল হবে!
চীন ঘেঁষা, ভারত বিরোধী, কট্টর ইসলামি চিন্তা চেতনার ঝান্ডাবাহী পাকিস্তানে প্রবেশ বা অনুপ্রবেশের জন্য এরকম কোন মালালার মই চড়বার বড্ড বেশি প্রয়োজন পশ্চিমা বিশ্বের। সেই ভেট-ভেংচি শেষমেষ তাই এসে থামল নোবেল শান্তিতে। এর পট প্রস্তুতিতে অনুগত পাকিস্তান সরকার প্রথম একখানা সন্মাননা জানিয়ে যে যাত্রা শুরু করেছিল, তা পরে এক কুড়িরও বেশি সন্মাননা জুটিয়েছে তার জন্যে পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে।
অন্যদিকে কৈলাশ সত্যার্থী। জন্ম ১১ জানুয়ারী ১৯৫৭। মধ্য প্রদেশের বিদিশা শহরে কুলীন ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষটি শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করছেন এমন একটা বিষয় নিয়ে, যে পাঁকে ডুবে আছে গোটা ভারত। শিশু পাচার, শিশুশ্রম এগুলো নির্মুল হবার বাস্তব সম্ভাব্য কোনদিনে ভারত কোন কালে পৌঁছুতে পারবে কিনা সে বিষয়ে ভারতের কোন মুনি-ঋষিও সম্ভবত ঠাহর করে পূর্বাভাস দেবার সাহস দেখাবেন না। কিন্তু সত্যার্থী সেই অসম্ভবের ইতি টানবার লক্ষ্যেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বহু বছর ধরে।
ভারত সরকারকে দিয়ে কোনভাবে পুরষ্কৃত করবার নাটকটি মঞ্চস্থ করাতে সক্ষম না হলেও আধা ডজন খেতাব-পুরষ্কার আমেরিকা নিজেই দিয়েছে। তালিকায় তার সাথে আছে জার্মানি, ইটালির মতন ইউরোপিয় দেশ। অর্থাৎ পশ্চিমা বিশ্ব অনেক আগে থেকেই তাক করে ছিল। যখন সময় হবে তখন ভারতে প্রবেশের কিংবা নাক গলানোর জন্য একটা জানালা হিসেবে প্রেক্ষাপটটি গড়ে রাখা ছিল।
মালালা বা সত্যার্থী এদের কারও ব্যাক্তিগত চেষ্টা, উদ্যম, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, অবদান কোন কিছুকেই আমি একবিন্দু বিতর্কিত দৃষ্টিকোণে স্পর্শ করতে আকাঙ্ক্ষী নই। কারণ আমরা যারা তাদের সমালোচনা করব মুখে ফেনা তুলে, তাদের কারওই এমন বিষয় নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করবার মতন ন্যূনতম যোগ্যতাটুকুন নেই। মানি আর না মানি, এটাই সত্য।

তবে এটুকু অনস্বীকার্য যে এশিয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় দেশগুলোর বাজার দর বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এসব দেশে নোবেল পুরষ্কার তাই বৃষ্টির মতন ঝরছে। রাজনীতি বড়ই নচ্ছার! বানের জলের মতন কি করে কি করে যেনো সে ঠিক ঠিকই নিজ গতিপথের নিশানা খুঁজে বের করে ফেলে!
আবার পাশাপাশি এ কথাটাই নিশ্চিতভাবে সত্যি যে ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’। রবীন্দ্রনাথও তার পাশ্চাত্যের সংযোগ এবং পরিচিতি না থাকলে হয়ত কোনভাবেই নোবেল পেয়ে উঠতে সক্ষম হতেন না। আমাদের ড. ইউনুসও না। আরে ভাই তাদের চেয়ে হাজার গুণ গুণী মনীষী কেবল কোথাও থাকলেই তো হবে না, লোকে তাকে পুরষ্কৃত কিংবা তিরষ্কৃত করবার জন্য তার হদিসটুকুন তো পেতে হবে। তার কর্মকে জানার সুযোগ পেতে তো হবে! এখন সেখানে আপনি নাকটাকে পিনোকিওর মতন একটুখানি বেশি লম্বা করে গলাতে গেলে ঘিয়ের মাঝে পনিরের পঁচা গন্ধ খুঁজে বের করতেই পারেন।
বেচারা আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল কামিয়েছিলেন দেদার টাকা। কারণ তিনি তো আর যেনতেন পণ্যের বেনিয়া ছিলেন না। কামান আর যুদ্ধাস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় লোহা ইস্পাত নিয়ে ছিল তার কারবার। তার উপর জগত বিখ্যাত হয়েছিলেন মানব ও সভ্যতা বিধ্বংসী ডায়নামাইট এর আবিষ্কর্তা হিসেবে। পৃথিবীজোড়া লোকে তাকে জানত ‘মার্চেন্ট অব ডেথ’ নামে। যা তার এপিটাফে লেখা থাকুক এটা উনি কোনভাবেই চান নি।
তো নামের ওপর থেকে ওই রক্তের দাগ আর কালিমা ধুয়ে নেবার ইচ্ছাতেই তার আয়ের সিংহভাগ অর্থ নিয়ে এই নোবেল পুরষ্কারের প্রবর্তন করলেন তিনি। নোবেল সাহেব যত নোবেল উদ্দেশ্যে আর ইচ্ছায়ই এর প্রবর্তন করুক না কেন! রক্তের দাগ তো আর অত সহজেই মোছা যায় না। তাই অ্যামোনিয়া সিনথেসিস এর বিক্রিয়ার (হেবার বোস রিয়েকশন) আবিষ্কারের জন্য কিন্তু ফ্রিট্জ হেবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯১৮ সালে। এই লোকই ছিলেন আবার এমন এক সংস্থার ডিরেক্টর যারা বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস বানাতো। কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার এর অন্যতম এ জনক তাই শান্তিতে নোবেল পেয়েছিল। আবার কিসিঞ্জার, ওয়াগ্নারি মাথাই, আল গোর, বারাক ওবামারও নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেতে কোন বাধা আর থাকে না। কারণ এক দিকে অস্ত্রের হাট ও শ্যুটিং রেঞ্জ হিসেবে ব্যবহার হয় যে ফিলিস্তিন, সেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী ইয়াসির আরাফাত।
আর অন্যদিকে ফিলিস্তিনের চরম বিরোধিতাকারী ইজরায়েলের নেতা শিমন পেরেজ এবং আইজ্যাক রাবিনও একইসঙ্গে পান নোবেল শান্তি পুরষ্কার। এটা ভাই মশকরা না। সহজ হিসাব, যার বাড়ি ডাকাতি করব, মহল্লার মাস্তান তারে বিকাল বেলায় চায়ের সাথে আফিম খাইয়ে নয়তো ভরপেট ভাত খাইয়ে ভাত-ঘুমে একটুখানি আয়েশে রাখলে ব্যাপারটা সাধারণের চেয়ে ভালো হয় সব দিক থেকে। তাই না!
যা হোক, সংযোগ এবং পরিচিতি নিঃসন্দেহে এমন কোন নেতিবাচক বিষয় নয় যার জন্য এই বিশাল বৈশ্বিক খেতাব ও সন্মাননা এক বিন্দু ছোট হতে পারে। দুধের বদলে চুন-পানি দিয়ে যদি কেউ চা বানাতে চায়। তাতে তো চায়ের দোষ নেই। সেই চা খাওয়ার নাম করে যদি বাড়ি বাড়ি বেড়ানো যায়! ডাকাতি, খবরদারি, সিঁদ কাটা, আগুন দেওয়া, কুড়াল চালানো, পরের বাড়ির মেয়েকে/ছেলেকে নিয়ে পালানো – কত কি ই তো করা যায় চাইলে। মন্দ কি!
এই মায়ানমারেও ম্যালা ফায়দার গন্ধ মিলতেই পশ্চিমারা লেগেছিল সিঁদ কাটতে। সুকি পেল নোবেল। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানবতাবাদী অবস্থানের জন্য। তো নাটক শেষ তো সেই স্ক্রিপ্ট আর বাড়ে না। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা যখন গোটা বিশ্বকে ছুঁয়ে যায় তার রাক্ষুসে নখের আঁচড়ে তখন কিন্তু সুকির স্ক্রিপ্ট শাদা কাগজ। মানবতারও তো ঘুম পায়। নাকি! তাই সুকির মানবতা আজ ঘুমায়।
কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না। তেমনি নোবেল পুরষ্কার দিয়ে আর কতটুকু রক্তের দাগ মোছা যাবে! মাঝখান থেকে আমাদের ইউসুফ/সুকি/মালালা/সত্যার্থীরা সহজ সোজা পথের মধ্যে জমাট রক্তের পলেস্তারায় কেবলি পিছলে যায়।
এইসব সূত্রে প্রতি বছর নোবেল পুরষ্কার, বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল ঘোষণার সময় কথাগুলো বারবার মনে পড়ে। এ বছর শান্তিতে নোবেল পেল দুজন সত্যিকারের মনবতাবাদী মানুষ। এই যে দুজন মানুষ, একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের তরুণী, নির্যাতিতা নারী। অন্যজন দাঙ্গা-সংঘাত ও যুদ্ধ-সহিংসতার জের ধরে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ ক্ষেত্র, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার। দুজনেরই বক্তব্য এক। অপহরণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা, যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার রোধে সোচ্চার প্রতিবাদ ও ব্যবস্থা গ্রহণ। এইসব অনাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেওয়া এবং তাদেরকে সাধারণ জীবনে পুনর্বাসিত করা।
তাঁদের দু’জনের দাবি অকাট্য মানবিক। জীবন অভিজ্ঞতা বড্ড কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী। কিন্তু তাদের দু দেশেই চলমান সংঘাতের পেছনে আসলে কে বা কারা মদতদাতা! কাদের প্ররোচনায় এইসব সহিংসতা বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীতে চলমান! এটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এর গভীরে আলো ফেলাটা বড় বেশি প্রয়োজন। সাধারণ লোকে অতটা না বুঝলেও যারা অল্প বিস্তর বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতের খোঁজ-খবর রাখেন, তারা সবাই কম-বেশি জানেন কোন্ কোন্ দেশ বা পাশ্চাত্যের কোন্ কোন্ শক্তি ও পরাশক্তি পৃথিবী জুড়ে ঘটমান এমন আরও সব সহিংসতার পেছনের কারণ। পর্দার আড়াল থেকে সেইসব দেশ ও স্বার্থান্বেষীদের সামনে নিয়ে আসাটাই এখন মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ।
সেই সব শক্তি আর পরাশক্তি যে আদপে মানব সভ্যতার শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ, তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক এবং নব্য ঔপনেশিকতাবাদী স্বার্থসিদ্ধির খায়েশে, ওই তথ্য এবং ব্যাখ্যাগুলো বেশি উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। আপামর মানুষের সবার জানা প্রয়োজন। অবাক ও নিমর্ম সত্য হল এই যে, ঘুরে ফিরে সেই ডিনামাইট আবিষ্কারক আর যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসায়ি আলফ্রেড নোবেলের সখ্য-স্যাঙ্গাৎরাই অরাজকতাগুলোর পেছনের মদতদাতা। অর্থাৎ এক ভাই দুর্দশা সৃষ্টি করে তো আরেক ভাই যেন সেই দুর্দশাগ্রস্তের সেবা করার নিমিত্তে পুরষ্কার দিতে মঞ্চ সাজায়।
ব্যাপারটা আরেকভাবে ভাবলে মনে হয়, এই শান্তিতে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত দুজনের আসলে আজকে সবার আগে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ তাদের দুই দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ বাধিয়ে রাখার পেছনে অবদান রাখা বা মদত দেওয়া শক্তিদের। নইলে কি আজ ওরা বিশ্ব শান্তিতে নোবেল পাওয়ার মত এরকম বড়সর কোন পুরষ্কার পাওয়ার সুযোগ আদৌ পেত!

তবে এটুকু অনস্বীকার্য যে এশিয় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয় দেশগুলোর বাজার দর বাড়ছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এসব দেশে নোবেল পুরষ্কার তাই বৃষ্টির মতন ঝরছে। রাজনীতি বড়ই নচ্ছার! বানের জলের মতন কি করে কি করে যেনো সে ঠিক ঠিকই নিজ গতিপথের নিশানা খুঁজে বের করে ফেলে!
আবার পাশাপাশি এ কথাটাই নিশ্চিতভাবে সত্যি যে ‘ইনফরমেশন ইজ পাওয়ার’। রবীন্দ্রনাথও তার পাশ্চাত্যের সংযোগ এবং পরিচিতি না থাকলে হয়ত কোনভাবেই নোবেল পেয়ে উঠতে সক্ষম হতেন না। আমাদের ড. ইউনুসও না। আরে ভাই তাদের চেয়ে হাজার গুণ গুণী মনীষী কেবল কোথাও থাকলেই তো হবে না, লোকে তাকে পুরষ্কৃত কিংবা তিরষ্কৃত করবার জন্য তার হদিসটুকুন তো পেতে হবে। তার কর্মকে জানার সুযোগ পেতে তো হবে! এখন সেখানে আপনি নাকটাকে পিনোকিওর মতন একটুখানি বেশি লম্বা করে গলাতে গেলে ঘিয়ের মাঝে পনিরের পঁচা গন্ধ খুঁজে বের করতেই পারেন।
বেচারা আলফ্রেড বার্নহার্ড নোবেল কামিয়েছিলেন দেদার টাকা। কারণ তিনি তো আর যেনতেন পণ্যের বেনিয়া ছিলেন না। কামান আর যুদ্ধাস্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় লোহা ইস্পাত নিয়ে ছিল তার কারবার। তার উপর জগত বিখ্যাত হয়েছিলেন মানব ও সভ্যতা বিধ্বংসী ডায়নামাইট এর আবিষ্কর্তা হিসেবে। পৃথিবীজোড়া লোকে তাকে জানত ‘মার্চেন্ট অব ডেথ’ নামে। যা তার এপিটাফে লেখা থাকুক এটা উনি কোনভাবেই চান নি।
তো নামের ওপর থেকে ওই রক্তের দাগ আর কালিমা ধুয়ে নেবার ইচ্ছাতেই তার আয়ের সিংহভাগ অর্থ নিয়ে এই নোবেল পুরষ্কারের প্রবর্তন করলেন তিনি। নোবেল সাহেব যত নোবেল উদ্দেশ্যে আর ইচ্ছায়ই এর প্রবর্তন করুক না কেন! রক্তের দাগ তো আর অত সহজেই মোছা যায় না। তাই অ্যামোনিয়া সিনথেসিস এর বিক্রিয়ার (হেবার বোস রিয়েকশন) আবিষ্কারের জন্য কিন্তু ফ্রিট্জ হেবার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ১৯১৮ সালে। এই লোকই ছিলেন আবার এমন এক সংস্থার ডিরেক্টর যারা বিষাক্ত ক্লোরিন গ্যাস বানাতো। কেমিক্যাল ওয়ারফেয়ার এর অন্যতম এ জনক তাই শান্তিতে নোবেল পেয়েছিল। আবার কিসিঞ্জার, ওয়াগ্নারি মাথাই, আল গোর, বারাক ওবামারও নোবেল শান্তি পুরষ্কার পেতে কোন বাধা আর থাকে না। কারণ এক দিকে অস্ত্রের হাট ও শ্যুটিং রেঞ্জ হিসেবে ব্যবহার হয় যে ফিলিস্তিন, সেই ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী ইয়াসির আরাফাত।
আর অন্যদিকে ফিলিস্তিনের চরম বিরোধিতাকারী ইজরায়েলের নেতা শিমন পেরেজ এবং আইজ্যাক রাবিনও একইসঙ্গে পান নোবেল শান্তি পুরষ্কার। এটা ভাই মশকরা না। সহজ হিসাব, যার বাড়ি ডাকাতি করব, মহল্লার মাস্তান তারে বিকাল বেলায় চায়ের সাথে আফিম খাইয়ে নয়তো ভরপেট ভাত খাইয়ে ভাত-ঘুমে একটুখানি আয়েশে রাখলে ব্যাপারটা সাধারণের চেয়ে ভালো হয় সব দিক থেকে। তাই না!
যা হোক, সংযোগ এবং পরিচিতি নিঃসন্দেহে এমন কোন নেতিবাচক বিষয় নয় যার জন্য এই বিশাল বৈশ্বিক খেতাব ও সন্মাননা এক বিন্দু ছোট হতে পারে। দুধের বদলে চুন-পানি দিয়ে যদি কেউ চা বানাতে চায়। তাতে তো চায়ের দোষ নেই। সেই চা খাওয়ার নাম করে যদি বাড়ি বাড়ি বেড়ানো যায়! ডাকাতি, খবরদারি, সিঁদ কাটা, আগুন দেওয়া, কুড়াল চালানো, পরের বাড়ির মেয়েকে/ছেলেকে নিয়ে পালানো – কত কি ই তো করা যায় চাইলে। মন্দ কি!
এই মায়ানমারেও ম্যালা ফায়দার গন্ধ মিলতেই পশ্চিমারা লেগেছিল সিঁদ কাটতে। সুকি পেল নোবেল। স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে মানবতাবাদী অবস্থানের জন্য। তো নাটক শেষ তো সেই স্ক্রিপ্ট আর বাড়ে না। তাই রোহিঙ্গা সমস্যা যখন গোটা বিশ্বকে ছুঁয়ে যায় তার রাক্ষুসে নখের আঁচড়ে তখন কিন্তু সুকির স্ক্রিপ্ট শাদা কাগজ। মানবতারও তো ঘুম পায়। নাকি! তাই সুকির মানবতা আজ ঘুমায়।
কয়লা ধুইলে যেমন ময়লা যায় না। তেমনি নোবেল পুরষ্কার দিয়ে আর কতটুকু রক্তের দাগ মোছা যাবে! মাঝখান থেকে আমাদের ইউসুফ/সুকি/মালালা/সত্যার্থীরা সহজ সোজা পথের মধ্যে জমাট রক্তের পলেস্তারায় কেবলি পিছলে যায়।
এইসব সূত্রে প্রতি বছর নোবেল পুরষ্কার, বিশেষ করে শান্তিতে নোবেল ঘোষণার সময় কথাগুলো বারবার মনে পড়ে। এ বছর শান্তিতে নোবেল পেল দুজন সত্যিকারের মনবতাবাদী মানুষ। এই যে দুজন মানুষ, একজন যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকের তরুণী, নির্যাতিতা নারী। অন্যজন দাঙ্গা-সংঘাত ও যুদ্ধ-সহিংসতার জের ধরে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ ক্ষেত্র, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর নিবেদিত প্রাণ ডাক্তার। দুজনেরই বক্তব্য এক। অপহরণ ও নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করা, যুদ্ধ বা সামরিক সংঘাতে ধর্ষণকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার রোধে সোচ্চার প্রতিবাদ ও ব্যবস্থা গ্রহণ। এইসব অনাচারের শিকার ভুক্তভোগীদের শারীরিক ও মানসিক চিকিৎসা দেওয়া এবং তাদেরকে সাধারণ জীবনে পুনর্বাসিত করা।
তাঁদের দু’জনের দাবি অকাট্য মানবিক। জীবন অভিজ্ঞতা বড্ড কঠিন ও নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী। কিন্তু তাদের দু দেশেই চলমান সংঘাতের পেছনে আসলে কে বা কারা মদতদাতা! কাদের প্ররোচনায় এইসব সহিংসতা বছরের পর বছর ধরে পৃথিবীতে চলমান! এটাই হল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এর গভীরে আলো ফেলাটা বড় বেশি প্রয়োজন। সাধারণ লোকে অতটা না বুঝলেও যারা অল্প বিস্তর বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিতের খোঁজ-খবর রাখেন, তারা সবাই কম-বেশি জানেন কোন্ কোন্ দেশ বা পাশ্চাত্যের কোন্ কোন্ শক্তি ও পরাশক্তি পৃথিবী জুড়ে ঘটমান এমন আরও সব সহিংসতার পেছনের কারণ। পর্দার আড়াল থেকে সেইসব দেশ ও স্বার্থান্বেষীদের সামনে নিয়ে আসাটাই এখন মানব সভ্যতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় কাজ।
সেই সব শক্তি আর পরাশক্তি যে আদপে মানব সভ্যতার শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ, তাদের নিজেদের অর্থনৈতিক এবং নব্য ঔপনেশিকতাবাদী স্বার্থসিদ্ধির খায়েশে, ওই তথ্য এবং ব্যাখ্যাগুলো বেশি উচ্চারিত হওয়া প্রয়োজন। আপামর মানুষের সবার জানা প্রয়োজন। অবাক ও নিমর্ম সত্য হল এই যে, ঘুরে ফিরে সেই ডিনামাইট আবিষ্কারক আর যুদ্ধাস্ত্রের ব্যবসায়ি আলফ্রেড নোবেলের সখ্য-স্যাঙ্গাৎরাই অরাজকতাগুলোর পেছনের মদতদাতা। অর্থাৎ এক ভাই দুর্দশা সৃষ্টি করে তো আরেক ভাই যেন সেই দুর্দশাগ্রস্তের সেবা করার নিমিত্তে পুরষ্কার দিতে মঞ্চ সাজায়।
ব্যাপারটা আরেকভাবে ভাবলে মনে হয়, এই শান্তিতে নোবেল পুরষ্কারপ্রাপ্ত দুজনের আসলে আজকে সবার আগে ধন্যবাদ দেওয়া উচিৎ তাদের দুই দেশে যুদ্ধ বিগ্রহ বাধিয়ে রাখার পেছনে অবদান রাখা বা মদত দেওয়া শক্তিদের। নইলে কি আজ ওরা বিশ্ব শান্তিতে নোবেল পাওয়ার মত এরকম বড়সর কোন পুরষ্কার পাওয়ার সুযোগ আদৌ পেত!
নাদিয়া মুরাদ বাসি তাহা। ১৯৯৩ সালে ইরাকের সিনজারের এক নিরিবিলি গ্রাম কোজোতে কৃষক পরিবারে জন্ম নাদিয়ার (স্থানীয় উচ্চারণে নাদি)। ইয়াজিদি পরিবারে জন্মটাই সম্ভবত তার অপরাধ এবং ইসলামিক স্টেট (আইএস) এর সহিংসতার নির্মম শিকার নাদি। মা এবং তার মর্যাদা সবচেয়ে গুরুত্ব পাওয়া নাদির স্বপ্ন ছিলো সে একদিন হয় ইতিহাসের শিক্ষক হবে নয়ত হবে একজন বিউটিশিয়ান যার নিজস্ব একটা বিউটি সেলুন থাকবে। তার সমস্ত স্বপ্ন হাওয়ায় মিলিয়ে যায় ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট আইএস মিলিট্যান্টরা উত্তর-পশ্চিম ইরাকে তাদের এলাকায় হামলা চালিয়ে নির্বিচার গণহত্যা শুরু করলে। আইএস এর ক্লিঞ্জিং অপারেশনের বারো দিনের মাথায়, ১৫ আগস্ট আইএস জঙ্গীরা আরও অনেক নারীর সাথে তাকেও বন্দী করে নিয়ে যায়। তার আগে তার আপন ও সৎ নয় ভাইয়ের মধ্যে ছয় জনকেই কতল করে তারা। হত্যা করে তার মাকেও। যৌনদাসী হবার মত বয়স পেরিয়ে গেছে এমন নারীদের হত্যা করে বাকি সব নারীকে তারা বন্দী করে নিয়ে যায়। এদের সবার ভাগ্যে একই নিয়তি জোটে, যৌনদাসী হওয়া।
আইএসদের ঘাঁটি মসুলে এক ক্যাম্প থেকে অন্য ক্যাম্প, এক হাত থেকে অন্য হাতে কেনাবেচায় এসব যৌনদাসীদের জীবন যায়। পালাবার চেষ্টা করে লাভ নেই। ধরা পড়তেই হবে। ধরা পড়লে সেখানে যতজন আছে প্রত্যেকে তাকে ধর্ষণ করবে এর শাস্তি স্বরূপ। যাকে জিহাদের অংশ বলছে তথাকথিত আইএস জঙ্গীরা। হাত বদল হয়ে শেষ যে লোকটার কাছে বিক্রি হয়েছিল সে, তার কাছ থেকে আবার বিক্রি হবার দিন গুণছে যখন, তখনই একদিন তালাবদ্ধ না করে লোকটার বাইরে যাওয়ার সুযোগে নাদি পালিয়ে সেখানকার এক বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় খোঁজে। যারা সৌভাগ্যক্রমে ছিল সুন্নি এক পরিবার। যারা প্রাণ বাজি রেখে তাকে আশ্রয় দেয় এবং সেই পরিবারের ছেলেটা তাকে গোপনে মুসলের বাইরে এক আশ্রয় শিবিরে পৌঁছে দেয়।
তিন মাস বন্দী জীবন থেকে পালিয়ে সে ফিরে আসে সে বছর নভেম্বরে। আশ্রয় শিবিরে একটা কনটেইনারের মধ্যে যখন তার জীবন কাটছে তখনই এক সাক্ষাৎকার গ্রহণকারীর নজরে পড়ে সে। তারপর থেকে সে তার মতন আইএসের বন্দীত্ব আর নির্যাতনের শিকার বিধ্বস্ত নারীদের মনস্তাত্বিক সহায়তা, মনোবল সংযোগ এবং সামাজিক জীবনে পুনর্বাসিত হবার জন্যে সহায়তা দেবার কাজ করে যেতে থাকে। তাকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা।
‘নাদিয়াজ ইনিশিয়েটিভ’ নামে কাজ করে যেতে থাকে নাদিয়া মুরাদ। একে একে সে অর্জন করতে থাকে নানান স্বীকৃতি ও পুরষ্কার। আজ যখন নাদিয়া শান্তিতে নোবেল পেল তখন তার বয়স পঁচিশের সীমানাও ডিঙায় নি। হ্যাঁ, তাঁর নির্মম নির্যাতনের শিকার হবার অভিজ্ঞতাটি কিন্তু হাজার বছরের মানব সভ্যতারই নিদর্শন। আমরা যা অতীতে নির্মূল করতে পারি নি, আজ তা আরও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।
এবার বিশ্ব শান্তিতে নোবেল প্রাপ্ত অন্য জন হলেন জীবন্ত কিংবদন্তী ও অত্যাশ্চর্য এক মানুষ। কতজন জানে তাঁর সব গল্প আর অবাক জীবন গাঁথা, জানা নেই। তিনি, প্রসূতি ও স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ডেনিস মুকওয়েজ। ১ এপ্রিল ১৯৫৫ তে তৎকালীন জায়ার বা বর্তমানের ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর বুকাভু শহরে এক পেনটেকোস্টাল মন্ত্রী ও তার গৃহবধূ স্ত্রীর নয় সন্তানের তৃতীয় জন হলেন এই মুকওয়েজ। বাবাকে জীবনভর যে সমস্ত মানুষের মর্মান্তিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর পর প্রার্থনা করতে দেখতেন তাদের আত্মার শান্তি কামনা করে। সেইসব মানুষদের দুর্ভোগের মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাবার এক অদম্য স্পৃহা থেকে তাঁর ইচ্ছা হয় চিকিৎসা শাস্ত্রে পড়াশোনা করবার।
সবচেয়ে বেশি তাড়া করতো তাকে শিশু ও প্রসূতি মৃত্যুর নির্মমতা। মানুষের জন্মকে ঘিরে কতখানি বেদনা বা বিমর্ষতা থাকতে পারে তা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত আফ্রিকার মা ও শিশুদের না দেখলে ধারণা করা সম্ভব হবে না সাধারণ মানুষের। তাদের কারওই বলতে গেলে কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে যাবার এবং ন্যূনতম চিকিৎসা সুবিধা পাবার সুযোগ ছিল না। অথচ রোজ রোজ এমন মা ও শিশুর মৃত্যু ছিল সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের মতো সাধারণ এক নৈমিত্তিক ঘটনা যেন!
প্রথম কঙ্গো যুদ্ধের পর থেকেই জাতি-গোত্র-গোষ্ঠী ভিত্তিক সংঘাত এবং ক্ষমতার লড়াইকে ঘিরে আফ্রিকান দেশগুলোর সাংঘর্ষিক নৈমিত্তিকতার জের ধরে জোর ব্যবহার হতে থাকে যৌন সহিংসতা। গণধর্ষণের শিকার হতে থাকে শত শত নারী। এই মুকাওয়েজ তাঁর আগের কর্মস্থল লেমেরা হাসপাতাল ছেড়ে নিজে যখন পানজি হাসপাতাল দেন ১৯৯৯ সালে তখন ভয়াবহ অবস্থা কঙ্গোর। সেই স্থাপনের পর থেকে এই পর্যন্ত পঁচাশি হাজার জননেন্দ্রিয় মেরামতি চিকিৎসা করেছে হাসপাতালটি।
২০১২ সালে মুকওয়েজের প্রকাশিত বই ‘পানজি’ এবং জাতিসংঘে দেওয়া তার বক্তৃতায় কঙ্গো এবং আফ্রিকান সংঘাত নিয়ে বলতে গিয়ে যুদ্ধ-বিগ্রহ ও ক্ষমতার জন্যে সৃষ্ট সংঘাতের জের ধরে সংঘটিত গণধর্ষণের প্রসঙ্গ তুলে এ বিষয়ে কঙ্গো সরকারের যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণে অক্ষমতার সমালোচনা করেন। কঠোর সমালোচনামূলক এ বক্তব্যে তিনি অন্যান্য আফ্রিকান দেশ এবং সচেতন বিশ্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং দোষারোপ করেন। তাঁর লেখা বইটি এবং তার জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তব্যে যুদ্ধ-বিগ্রহে ও সামরিক সংঘাতে যৌন সংঘাতকে বা ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করতে কার্যকরি পদক্ষেপ নেবার আহ্বান জানিয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে জোরালো অনুরোধ জানান। সেই সাথে কঙ্গোয় সংঘটিত গণধর্ষণের ভয়াবহ চিত্রকেও তুলে ধরেন। এ ঘৃণ্য অপরাধকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা রোধ করে এর ইতি ঘটাতে সবাইকে সোচ্চার হতে আবেদন জানান।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ এবং জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তৃতার মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও সত্য উন্মোচনের জের হিসেবে তার উপর নেমে আসে হুমকি ও প্রাণনাশের চেষ্টার মতই ভয়াবহ বিপদ। ২০১২ সালের ২৫ অক্টোবর চারজন সশস্ত্র সন্ত্রাসী তাঁর বাড়িতে গিয়ে মেয়েকে জিম্মি করে অপেক্ষা করছিল তাঁর ফিরে আসার। ফিরে আসবার সাথে সাথে তাঁর রক্ষীরা সন্ত্রাসীদের উপর চড়াও হলে সন্ত্রাসীরা তাঁকে লক্ষ্য করে এলোপাথারি গুলি ছুঁড়তে থাকে। সৌভাগ্যক্রমে সময়মত মাটিতে শুয়ে পড়ে নিজেকে রক্ষা করতে সচেষ্ট হলে তিনি বেঁচে যান। এ ঘটনার পর নিজ ও পরিবারের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়ার বাস্তবতা বিবেচনায় মুকওয়েজ ইউরোপে গিয়ে আত্মগোপন করে থাকেন। কিন্তু এর ফলে তার পানজি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা চরমভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিদিন শল্য চিকিৎসার জন্য আগত অগণিত দুর্দশাগ্রস্ত নারী মুকওয়েজের জাদুকরি হাতের কল্যাণে সুস্থ্য হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ বঞ্চিত হতে থাকে।
আড়াই মাসের মধ্যে মুকওয়েজকে ফিরে আসতে হয় তাঁর নিজের হাসপাতালের হাল ধরতে। ভীষণ প্রাণস্পর্শী তাঁর এই ফিরে আসার গল্প। তাঁর অগণিত রোগী এবং তাদের আত্মীয় পরিজনরা তাদের ফসলের জমি থেকে আনারস আর পেঁয়াজ বিক্রি করা পয়সা জমিয়ে তাকে ইউরোপের অজ্ঞাতবাস থেক ফিরতি প্লেনের টিকেট কেটে দেয়। ১৪ জানিয়ারি ২০১৩ কাভুমু বিমানবন্দরে মুকওয়েজ যখন এসে নামেন তখন তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল এক অভুতপূর্ব বিস্ময়। বিমানবন্দর থেকে তার পানজি আসার পথে কুড়ি মাইল রাস্তার দুই পাশে ভীড় করে দাঁড়িয়ে সম্বর্ধনা জানিয়ে আনন্দ উল্লাস করেছে তার রোগী ও স্বজনরা। ফের শুরু হয় তাঁর অসম্ভবকে সম্ভব করা সব অপারেশন।
মানবতার সেবায় জীবনভর এক ধ্যানমগ্নতায় কাটানো এই মানুষটি সম্মাননা ও পুরষ্কার পেয়েছেন অন্তত অর্ধশতটি। ইউএন প্রাইজ ইন দ্য ফিল্ড অব হিউম্যান রাইটস, শাখারভ প্রাইজ, লেজিওঁ অব অনার, ওয়ালেনবার্গ মেডাল, ক্লিনটন গ্লোবাল সিটিজেন এওয়ার্ড, হিলারি ক্লিনটন রোয়ার্ড, আফ্রিকান অব দ্য ইয়ার ২০০৯, সিউল পিস প্রাইজ, সিভিল কারেজ প্রাইজ, ফোর ফ্রিডম এওয়ার্ড, টাইম হান্ড্রেড, রাইট লাইভলিহুড এওয়ার্ড, গুলবেঙ্কিয়ান প্রাইজ থেকে সদ্য পাওয়া বিশ্ব শান্তিতে নোবেল কত কি সেই সম্মাননার ঝুলিতে।
যদিও মানুষের ভালোবাসার চেয়ে বড় পুরষ্কার ও সম্মাননা এসবের কোনটিই নয়। খুব নিশ্চিত মহান ব্রত নিয়ে এই অগ্রযাত্রা তাঁকে আরও আরও অর্জনের দিকে নিয়ে যাবে, যা নিশ্চিতভাবে মানবতার পক্ষে অবদান রেখে যাবে। স্যালুট এই বিশ্বসেরা রেপ ভিকটিম ডাক্তার, জাদুকরি শল্যচিকিৎসককে।
সবশেষে বিষয়টা দাঁড়াল এই যে, মানি আর না মানি, নিও কলোনিয়ালিজমের নতুন অবয়বটি মিডিয়ার মারকুটে সন্ত্রাসের চেহারায়ই আজ বিশ্বে দৃশ্যমান। সেই মিডিয়ায় নিউজ বার্গার, গসিপ পিৎজা, প্রপাগান্ডা স্যান্ডুইচ এসব মজাদার রেসিপির বানানো খবর খাওয়াবার জন্য তকমা আটা বিক্রয়যোগ্য কিছু শেফের তো দরকার অবশ্যই আছে।
সেই প্রয়োজন মেটাতেই যেন মাস্টারশেফ আর নোবেল গলাগলি করে আজ বিপণনের তিন পায়ে দৌড় দিচ্ছে। সুগার কোটেড মেনুফ্যাকচার্ড ট্রুথ আমরাই কিনে নিচ্ছি আপন উদ্যমে। কখনও আন্তর্জাতিক সংস্থার বান্ধব হাতের আড়ালে, কখনও মেডেল-ট্রফি-মালার মোড়কে, কখনও মানবাধিকারের সোল এজেন্টদের ডিস্কাউন্টেড রেটে মানবাধিকারের হোলসেল প্যাকেজে।
লেখকঃ কবি ও কথাকার।



