
দুরন্ত শৈশব
জাকির হোসেন
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
ফয়েজ ভাইয়ের শৈশব ও কৈশোর কেটেছে গ্রামীণ বিচিত্র পরিবেশে। বিক্রমপুরে তাদের ছোট্ট গ্রামটির নাম ‘বাশাইলভোগ।’ ক্ষুদ্র সামন্ত পরিবারের সদস্য ছিলেন তিনি। বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের মত বিক্রমপুরের তখন হিন্দুদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য ছিল প্রবল। মুসলমানরা সেই সময় হিন্দুদের পূজা-পার্বণে অংশ নিতেন। এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি এখনও আমাদের দেশের অনেক অঞ্চলে অব্যাহত আছে। ফয়েজ ভাই স্কুলে থাকতে দুর্গাপূজা, সরস্বতী ও কালীপূজায় সহযোগিতা করেছেন। এমনকি রথযাত্রায় স্থানীয় হিন্দুদের সঙ্গে ‘টিপু সুলতান’, ‘রায় চাঁদ কেদার চাঁদ’ নাটকে অভিনয় করেছেন। বাল্যবন্ধু সুকুমার বর্ধনের বিয়েতে গিয়েছেন, বন্ধুর বৌকে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে সাতপাঁকে ঘোরাতে দেখেছেন। বিয়ে বাড়িতে পরম আনন্দে পাঠার মাংস দিয়ে ফুলকো লুচি খেয়েছেন। প্রথম যৌবনের এসব ঘটনা ফয়েজ ভাইয়ের স্মৃতিতে জীবন্ত ছিল জীবনের শেষ দিনগুলোতেও,- ‘চল্লিশ সালের আগে সাম্প্রদায়িকতার কোনও প্রভাব আমাদের আবিষ্ট করে নি। এতে মুসলমান পীর, মাওলানা প্রমুখের কার্যক্রমে কোনও বাধার সৃষ্টি হতে দেখি নি। একসময় এ দেশের হাজার হাজার বাঙালি সনাতন পরিবার মুসলিম জাগরণের পর ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন। হিন্দুদের কৌলিণ্যপ্রথা ও জাতি বিভক্তির কারণে তুলনামূলক সহজ ধর্মীয় অভিধানের জন্য এই ভূখন্ডে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। সম্ভবত আমরা তাদের সন্তান। এ কারণে আমরা তখন হিন্দু ও মুসলমানের বিভাজনটা আজকের মত মেনে নিতে পারি নি। আর্যদের ধর্ম প্রসারের চাইতে তখন দ্রুত ইসলামের নানা প্রথা এ অঞ্চলকে গ্রাস করে। এ জাতীয় একটি মিশ্র ঐতিহ্যকে নিয়েই আমরা বড় হতে থাকি।’

ফয়েজ ভাই কখনো ধর্মীয় সংস্কৃতি ও দেশজ সংস্কৃতিকে পৃথক করে দেখেন নি। এ কারণে তিনি নিজের অজান্তেই অন্য ধর্মাবলম্বীদের আসরে উপস্থিত থাকতেন। তাঁর বাল্যবন্ধু সুকুমারের বাবা ঘোড়ায় চড়ে ডাক্তারি করতেন। গ্রামাঞ্চলের কোথাও বেরুলে ডাক্তার সাহেব ফয়েজ ভাইদের বাড়িতে এসে এক কাপ চা না খেয়ে যেতেন না। কে মুসলিম আর কে হিন্দু এ কথাটি জানা থাকা সত্ত্বেও সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে ফয়েজ ভাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোন সময়ই পৃথক সত্ত্বা হিসেবে নিজেদের ভাবেন নি, ভাবতেন সবাই বাঙালি,- ‘আমার ছোটবেলাটা হিন্দু-মুসলিম বন্ধুদের নিয়েই কেটেছে। তখনকার দিনে কোনও সময়ই আমরা ধর্মকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্রিয়াকলাপের সঙ্গে সংযুক্ত করি নি। এর ফলে হিন্দু-মুসলিম উভয়েই আমরা এ অঞ্চলে সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রশ্নে সহনশীল ছিলাম।’
ফয়েজ ভাইয়ের স্মৃতিতে একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল শৈশব ও পয়লা বৈশাখ। পয়লা বৈশাখ ভোরে উঠেই বাবার কাঠের বাক্সের ওপরে চার আনার একটি করে পুঁটলি পেতেন। ভাইবোনরা সবাই এসে সেই চার আনা তাদের নিজস্ব সম্পত্তি হিসেবে নিতেন। এরপর সবাই নাশতা খেতেন। চাচাতো ভাইবোন, চাচাচাচি সবাই এ নাশতায় শরিক হতেন এবং অনেক সময় দুপুরেও খেতেন। ধোলাই করা কাপড় পরে সব ভাইবোন দালানের বারান্দায় পাটি বিছিয়ে বসতেন। নাশতায় থাকত বিচিত্র আয়োজন। শ্রী ঘোষের দই, শ্রীনগর থেকে কেনা বিন্নিধানের খই, চালের ফুলের মত বিকশিত খইপুষ্প, নতুন পাটালি গুঁড়, মুড়ি আর ধবধবে ভেজা চিঁড়া। তাঁর বাবা বসতেন একটু দূরে চেয়ার নিয়ে, মুখে সেই গুড়গুড়ি হুক্কা। হুক্কার চিলুমে একজন ফুঁ দিতেন। বাবার এই রাজসিক পর্যবেক্ষণের মধ্যে সবাই আনন্দ করে খেতেন পহেলা বৈশাখের নাশতা। চাচা-চাচিরা পাশে বসতেন। শাসন, আনন্দ, খাওয়া দাওয়া চলত একই সঙ্গে। হাত ধোয়ার পর চলত আরেক পর্বের খাওয়া। তখন আসত মুগের ডালের ভুনা খিঁচুড়ি, ভাজা আর বিরাট কৈ মাছের পাতরি। এই খাওয়ার পর মেলায়
যাওয়ার আনন্দে বাড়িময় সবাই নেচে বেড়াতেন। বছরান্তে এ নিয়মের খুব একটা হেরফের হত না। তবে একবার বৈশাখের আয়োজনে শ্রী ঘোষকে দৈ-এর বায়না দিতে ভুলে গিয়েছিলেন ফয়েজ ভাইয়ের বাবা,- ‘একবার পহেলা বৈশাখের এক সকালে মহা হইচই শুরু হয়ে গেল, খাবার মেনুতে দই নেই! কারো মনে সংশয়, কারো মনে ভয়- উপায় কী? শ্রীনগরের দই আনতে একজনকে ডাকা হল। দই ছাড়া পহেলা বৈশাখের নাশতা হবে কী করে? এমন সময় হঠাৎ শ্রী ঘোষ উপস্থিত। জীবনের গোড়া থেকেই শ্রী ঘোষের দই আমরা পহেলা বৈশাখে খাই। মাখনের মতো তার দই পাঁচসেরি পাতিলে। একটা পাতিল নামিয়ে তিনি বললেন, এবার বুঝি অগ্রিম জানানো ভুলে গেছেন, আমি ভুলি নি! আবার শ্রী ঘোষ কাঁধের ভারটা নিয়ে অন্য গ্রামের দিকে রওনা হয়ে গেলেন। আমরা তখন সবাই অবাক!’
পহেলা বৈশাখে শ্রীনগরের জমিদারদের মাঠে বিরাট মেলা বসতো। এ মেলার জন্য তিন মাস আগে থেকে সবাই প্রস্তুতি নিতেন,- ‘আমাদের কাছে মেলার স্থানীয় নাম ছিল ‘বলইয়া’। ছোটবেলায় মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল ‘হ্লাদী’। প্রত্যেক বাড়িতে একটি মাটির পুতুল হ্লাদী নিতেই হবে। হ্লাদী একটি পৃথক ধরনের চরিত্র। সে কোন ধর্মের নয়। গ্রামীণ একজন ঘোমটাহীন মহিলা বিরাট ভুঁড়ি নিয়ে অদ্ভুত একটা হাসি দিয়ে বসে আছে। সে না হিন্দু, না বৌদ্ধ, না খ্রিস্টান। সে আমাদের বাড়ির মা অথবা শাশুড়ি। তিনি শিশুদের মত হাসতেন। এটিই হচ্ছে হ্লাদীর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য। তিনি এই হাসি দিয়ে বিশ্বটাকে যেন উড়িয়ে দিয়েছেন। সেই হ্লাদী ছিল আমাদের ক্রয় লিস্টের প্রথম নাম।’
তখন শ্রীনগর আমতলার রাস্তায় ঘোড়দৌড় হত। সবাই বিকেলে দেখতে যেতেন। শ্রীনগরের সেই মেলায় বিকাল ৩টা থেকে আরম্ভ হত আকাশে ছোট ছোট রঙিন ঘুড়ির কাটাকাটি। শত শত মানুষের ভিড়ের মধ্যে চলত এই ঘুড়ির খেলা। এসব দেখার প্রবল আকাঙ্ক্ষা ছিল ফয়েজ ভাইয়ের। তিনি কিছুতেই ঘোড়দৌড় আর ঘুড়ির খেলা না দেখে বাড়ি ফিরতেন না। মেলায় গিয়ে প্রথমেই কিনতেন দুই পয়সা দিয়ে একটি ‘চরকি’। বাতাসের উল্টোদিকে ধরলে সে চরকির রঙিন ফুলগুলো ঘুরত। এ দৃশ্যে তিনি আনন্দে আত্মহারা হতেন। এরপর দুই পয়সা দিয়ে কিনতেন লোহার ছুরি। সেই ছুরি দিয়ে কাঁচা আম ছিলে খেতেন। তবে মেলায় শুধু আনন্দ ছিল না, ছিল নানারকম বিড়ম্বনা। ঘোড়দৌড় আর ঘুড়ির খেলা দেখে বাড়ি ফেরার পথে প্রায়ই কালবৈশাখী পেত। মেলায় ফয়েজ ভাইয়ের সঙ্গে যেতেন দু’জন প্রহরী। তারা সব সময় ফয়েজ ভাইকে চোখে চোখে রাখতেন, কখনই একা ছাড়তেন না। কারণ সুযোগ পেলেই পালিয়ে যেতেন।

শৈশবে ভীষণ দুরন্ত ছিলেন ফয়েজ ভাই। তাঁর এই দুরন্তপনার বিস্তার ছিল জীবনের সকল স্তরেই। কখনও তা থামে নি, বরং ক্রমেই আরও জীবন্ত ও প্রাণবন্ত হয়েছে। নিজেকে নিয়ে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি- ‘শৈশব থেকেই জীবনকে উপভোগ করার আকুতি ছিল আমার। দিবা-রাত্রি মাছ ধরেছি। বক শিকার করতে গিয়ে পুকুরঘাটে মহিলাকে আহত করেছি। ট্রেনে ঘুমাতে গিয়ে স্টেশন পার হয়ে গেছি। বিমানে চড়ার জন্য কৈশোরে যুদ্ধে গেছি। যুদ্ধে গিয়ে পরিক্ষার বয়স হারিয়েছি। সুযোগ পেলেই বাড়ি থেকে পালিয়েছি। রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে কারাগারে গেছি। কারাগারে ডাক্তারকে জুতাপেটা করে নির্জন সেলে শাস্তি ভোগ করেছি। হিমালয়ের চূড়ায় উঠব বলে দেখা করেছি তেনজিং নোরগের সঙ্গে। বিনা পাসপোর্টে ঘুরে বেরিয়েছি ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, যোগ দিয়েছি ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত আন্তজার্তিক যুব সম্মেলনে। রাজনৈতিক বিতর্ক এড়াতে পিকিং রেডিওতে চাকরি নিয়ে চলে গেছি চীনে। লক্ষ জনের মধ্যে আমি মাও সেতুংয়ের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য গেছি তিয়েন আন মেন স্কোয়ারে। মহান বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোকে দেখার জন্য গেছি কিউবায়। আর সেই আমলের সেমিজেট সুপারকোনিতে বসে ভাবতাম- প্লেনটা হাইজ্যাক হয় না কেন?’
(চলবে)
লেখক: সাংবাদিক



