
মানুষের মানচিত্র- পাঁচ
জাকির হোসেন
বিনা পাসপোর্ট ইউরোপ ভ্রমণ
দুঃসাহস ছিল ফয়েজ ভাইয়ের নিত্যসঙ্গী। বিনা পাসপোর্টে ইউরোপ ভ্রমণ তাঁর জীবনের অন্যতম দুঃসাহসিক অভিযান। ১৯৫৪ সালের অক্টোবর মাসে ফয়েজ ভাই বিনা পাসপোর্টে ইউরোপে যান এবং নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে ভিয়েনা বিশ্ব যুব সম্মেলনে যোগ দেন। এ কাহিনী অনেকেই জানেন। ফয়েজ ভাই নিজেই বলেছেন অনেকের কাছে। সোভিয়েত রাশিয়ার উদ্যোগে আয়োজিত এই যুব সম্মেলনে বিশ্বের ৬১টি দেশের প্রতিনিধি যোগ দেন। সেই সম্মেলনে ফয়েজ ভাইয়ের গোপন নাম ছিল ‘করিম শাহানী।’ ইরান থেকে আন্ডারগ্রাউন্ডে ১৮ জন এ সম্মেলনে যোগ দেন। মেক্সিকো থেকে আসেন ৬ জন। এভাবে সম্মেলনে প্রায় ৭০ ডেলিগেট এসেছিলেন বেআইনি পথে বিনা পাসপোর্টে।
প্রকৃতপক্ষে কমিউনিস্ট পার্টিই ফয়েজ ভাইকে ভিয়েনা সম্মেলনে যাওয়ার সমর্থন জুগিয়েছিল। তখন দেশের রাজনীতিতে বিরাজ করছিল একটি জটিল পরিস্থিতি। ১৯৫৪ সালের ৩০ মে ইস্কান্দার মির্জা যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙে দেন। ওই দিন রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ১২ রাজনীতিককে কারাগারে নেওয়া হয় এবং প্রদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা একে ফজলুল হককে কেএম দাস লেনে নিজ বাড়িতে নজরবন্দি করা হয়। এসব কিছু মিলিয়ে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন ফয়েজ ভাই ছিলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে। পার্টি থেকে তাঁর ওপর দায়িত্ব পড়ে সপ্তাহে দুদিন একটি বিশেষ সেলের জন্য চাল, ডাল ইত্যাদি সরবরাহের। ফয়েজ ভাই নির্দিষ্ট সন্ধ্যাগুলোতে একটি থলিতে চাল, ডাল ও তরিতরকারি নিয়ে ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের একটি রাস্তায় রাত ৮টা থেকে অপেক্ষা করতেন। যুবলীগ সেক্রেটারি ইমাদুল্লাহ ও মোহাম্মদ সুলতান ওই রাস্তা থেকে সরবরাহ নিয়ে যেতেন।
একদিন ওই দুজন সাইকেলে করে চাল-ডাল নেওয়ার সময় ফয়েজ ভাইকে একটি চিঠি দিয়ে যান। সেই চিঠিতে তাঁকে ভিয়েনা সম্মেলনে যোগ দিতে বলা হয়। ’৫৪-এর অক্টোবরে ফয়েজ ভাই ঢাকা থেকে ভিয়েনার পথে যাত্রা শুরু করেন। এ খবর পার্টি ছাড়া আর কেউ জানতো না। সম্মেলন শেষে ফেরার পথে লন্ডন গিয়ে সাক্ষাত পান মজলুম জনমানুষের নেতা মওলানা ভাসানীর। জরুরি অবস্থা জারির পর ইস্কান্দার মির্জা ঘোষণা দিয়েছিলেন ভাসানী যদি দেশে ফেরেন তবে বিমান বন্দরেই তাকে গুলি করে শেষ করে দেওয়া হবে। ফয়েজ ভাই মওলানা ভাসানীর সঙ্গেই ছিলেন। প্রথমে লন্ডনে পরে কোলকাতায়। ভাসানীকে নির্বাসনে রাখে এমন ক্ষমতা ইস্কান্দার মির্জার ছিল না। ভাসানী দেশে ফিরে এলেন, ফয়েজ ভাইও আসেন তাঁর সঙ্গে। দেশের ফেরার কয়েকদিন পর সরকারি কর্তৃপক্ষ ফয়েজ ভাইকে তলব করে। তাঁর বিরুদ্ধে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্টদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ভিয়েনায় যুবসম্মেলনে যোগ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। ফয়েজ ভাই সরকারি কর্তৃপক্ষকে পাসপোর্ট দেখিয়ে বলেন, দেশ ছেড়ে তিনি কোথাও যান নি। তাঁর পাসপোর্টর এর প্রমাণ। ফলে ওই যাত্রায় প্রশাসন ফয়েজ ভাইয়ের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে নি।
ফয়েজ বিনা পাসপোর্টে কিভাবে ভিয়েনা গেলেন এবং ফিরেই বা এলেন কিভাবে, একথা অনেকবার জিজ্ঞাসা করেছি। উত্তরে ফয়েজ ভাই রহস্যময় হাসি দিয়ে বলতেন, ‘আমাকে কিভাবে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট যুবসমাজ লন্ডন, ব্রাসেলস ও চেকপ্রজাতন্ত্র হয়ে ভিয়েনা নিয়ে গেল এর পরিপূর্ণ ইতিহাস বলার সময় এখনও হয় নি। কোনও শক্তিশালী পার্টির সহযোগিতা থাকলে আন্তর্জাতিকভাবে প্রকাশ্যে অথচ গুপ্ত পথে যে কোনও সাহসী যুবকের পক্ষে বিনা পাসপোর্টে যে কোনও দেশে যাওয়া সম্ভব। আমি সেই সম্ভবের পথেই ভিয়েনা গিয়েছিলাম।’
২৫ মার্চ ও মুক্তিযুদ্ধ
মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি ফয়েজ ভাই অনেক আগেই নিয়েছিলেন।ঘটনাক্রমে ২৫ মার্চ রাত ১১টায় ‘স্বরাজ’ অফিস থেকে বের হন। শহরের রাস্তায় তখন কোনও জনমানব নেই, এমনকি কোনও রিকশাওয়ালাও নেই। গোটা শহর জুড়ে নেমেছে শ্মশানের নিরবতা।ফয়েজ ভাই বাধ্য হয়েই আশ্রয় নেন প্রেসক্লাবে। দোতলায় এক দারোয়ান তাঁকে তালাবন্দি করে রাখেন। চারদিকে ঘোরতর অন্ধকার। ১১টার পর তুমুল গোলাগুলির শব্দ ফয়েজ ভাইকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তোপখানা রোডের আলোকিত রাস্তায় শত শত সৈন্য আসতে দেখেন। তাদের সঙ্গে ছিল রাইফেল, বাজুকা ও ট্যাংক। এই তোপখানা রোডকে তারা করেছিল দ্বিতীয় রুট। এই রাস্তা দিয়েই গুলিস্তান হয়ে পুরানা ঢাকায় প্রবেশ করে। পাকিস্তানি বাহিনী রাত ১১টার দিকে পুরানা ঢাকার নয়াবাজার এলাকা থেকে আক্রমণ শুরু করে,-‘আমি তখন ভীত ও সন্ত্রস্ত। গভীর রাতে পুরানা ঢাকা থেকে ভেসে আসছিল আজানের ধ্বনি। শহরবাসী জানাচ্ছিল তারা মুসলমান, তাদের যেন হত্যা করা না হয়। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী এসব কোনও কিছুই তোয়াক্কা করে নি। তারা ওই রাতে পুরান ঢাকায় নির্বিচার মানুষ হত্যা করে। তাদের বর্বরতা থেকে নারী, শিশু, বৃদ্ধ, হিন্দু, মুসলমান কেউই রেহাই পায় নি।’
প্রেসক্লাবে ২৫ মার্চ রাতের বেলায় ফয়েজ ভাই পুলিশ ব্যারাকে গোলাবর্ষণ ও অগ্নিকান্ড দেখতে পান। তা ছাড়া পিলখানায় বিডিআর ও সৈন্যদের যে লড়াই হচ্ছিল তাও অগ্নি-সংযোগের কারণে দেখতে পান।রাত ১টার পর একটি ট্যাংক প্রেসক্লাবের বাম দিকে চামেলি হাউসে প্রবেশ করে। এই ট্যাংকের সামনে বড় করে লেখা ছিল-২৪। চামেলি হাউস থেকেই ট্যাংকের গোলা আসতে থাকে প্রেসক্লাবের দিকে। সেগুলো রুমের পশ্চিম দিকে এসে পড়ছিল। প্রথম গোলাতেই দেয়ালের ইটের চাংকে ফয়েজ ভাই আহত হয়ে ফ্লোরে পড়ে যান। একপর্যায়ে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘক্ষণ অজ্ঞান ছিলেন। ভোর ৬টার দিকে জ্ঞান ফিরে আসে। তখন বাইরে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন। বাইরে তখনও ভোর। রুমের পেছনের দিকের দরজা দিয়ে নেমে ক্লাবের ডাইনিংয়ে শুয়ে পড়েন। বাহুর জমাট রক্তে ফ্লোর ভিজে যায়। আশ্রয়ের জন্য পেছন দিয়ে বেরিয়ে পাশের পুকুর পাড়ের টং ঘরে যান। ২৬ মার্চ সকাল ৮টার দিকে টং ঘরের লোকেরা তাঁকে সচিবালয়ের পেছন দিকের একটি গাছে তুলে দেন। সেই গাছ বেয়ে ফয়েজ ভাই সচিবালয়ের ভেতরে ঢোকেন। সেদিন সচিবালয় ৪৭ জন সশস্ত্র পুলিশের পাহারায় ছিল। তারা ফয়েজ ভাইকে ১৩ তলা ভবনের ছয়তলায় আশ্রয় দেয়। ২৬ মার্চ ছয়তলার একটি রুমে সিপাহিদের সঙ্গে ছিলেন। সেখানে সানি নামের এক তরুণ তাঁর সঙ্গে থাকত। ২৭ মার্চ সকাল ৯টায় কারফিউ প্রত্যাহার হয়। তখন ফয়েজ ভাই অন্য সবার সঙ্গে সচিবালয়ের প্রথম গেট দিয়ে বেরিয়ে আসেন।
এরপর সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিতে আগরতলার ট্রেনিং ক্যাম্পে যান। দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে বাধাগ্রস্ত হন।এরপর তিনি পার্টির সহযোগিতায় কলকাতায় যান এবং আবারও সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। দ্বিতীয় দফায় ব্যর্থ হওয়ারপর কেবিনেটের অনুরোধে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে’ যোগদান করেন এবং সেখানে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ওপর ‘পর্যবেক্ষকের দৃষ্টিতে’ শেষদিন পর্যন্ত লেখেন। এর পাশাপাশি তিনি কেলকাতা থেকে বাংলাদেশে এসে মুক্তাঞ্চলের ওপর রিপোর্ট করতেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে ফয়েজ ফয়েজ ভাইয়ের অবদান যে কোনও বিচারের অনেক বড়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনেও সক্রিয় ভূমিকা ছিল তাঁর। একুশে ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলার সমাবেশে যোগ দিয়েছিলেন। যোগ দিয়েছিলেন ১৪৪ ধারা ভাঙ্গার মিছিলে। পুলিশের গোলাগুলির মাঝে পড়েছিলেন, আহত হয়েছিলেন টিয়ারসেলের আঘাতে। তখন ফয়েজ ভাই দৈনিক সংবাদে কাজ করতেন। এ নিয়ে বিস্তারিত লিখেছিলেন ওই পত্রিকায়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বরাবরই সরব ছিলেন ফয়েজ ভাই। তথাপি ‘নিরাপত্তা’র অজুহাতে ফয়েজ ভাইয়ের মৃতদেহ শহীদ মিনারের নেয়া হয়নি- এ বড় দুঃখের।
(চলবে)
লেখক: সাংবাদিক



