
জিতল কারা
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
একটা নির্বাচন তো ২০১৮ সালের ডিসেম্বরেই হয়ে গেল। জাতীয় নির্বাচন। তাতে কে জিতল, কীভাবে জিতল তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা হয়েছে। এ নিয়ে এখনও কথা হচ্ছে। হবেও। নতুন করে রাজনীতির অঙ্গনে আর কোনো মেরুকরণ ঘটে কি-না তা এখনই বলা যাবে না। দেশের রাজনীতিতে ওই নির্বাচন কেন্দ্র করে নানারকম মেরুকরণ এর আগে আমরা লক্ষ্য করেছি। এই মেরুকরণও হয়েছে জনগণের নামে, জনগণের কল্যাণ ও মুক্তির কথা বলে। কিন্তু জনগণের কল্যাণের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধই থেকেছে। ওই নির্বাচনে যে দল বা জোটই জিতুক এটা নিশ্চিত যে, হেরে গেল জনগণ। নির্বাচন শেষে জনগণ জেনে গেল যে তারা হেরে গেছে। গণতন্ত্রে নির্বাচন অপরিহার্য অংশ। জনগণই সব ক্ষমতার উৎস- গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে এই বাক্যটি বহুলভাবে উচ্চারিত হয়ে থাকে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এর বাস্তব প্রতিফলন আমরা কতটা দেখি? বাস্তবতা হচ্ছে জনগণ হেরেই যাচ্ছে।
ঘটনাটা নতুন নয়। খুব বড়, একেবারে ঐতিহাসিক দুটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এ দেশের জনগণের আছে, একটি ১৯৪৬-এর, অপরটি ১৯৭০-এর; দুটিতেই জনগণের মনে হয়েছিল যে তারা জিতেছে, ভেবেছিল তাদের মুক্তি আসবে। কিন্তু অচিরেই দেখা গেল মুক্তি আসে নি। তারা হেরে গেছে। ছেচল্লিশের ঠিক আগে অখণ্ড বাংলায় একটা প্রায়-বিপ্লবী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, নির্বাচন দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, তাতে সাফল্য যে আসেনি তা নয়। নির্বাচন হয়েছে, বিশ্বাসযোগ্য। কিন্তু তারপরই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, একটু পরে দেশভাগ। আর ঊনসত্তরে তো একটা অভ্যুত্থানই ঘটেছিল। গ্রামের মানুষ জেগে উঠেছিল। থরথর করে কাঁপছিল সমগ্র পূর্ব পাকিস্তান। মনে হয়েছিল, বিপ্লব ঘটবে। সন্ত্রস্ত শাসকরা প্রশমন চেয়েছে, তারা নির্বাচন দিয়েছে, দ্রুতগতিতে। ওই নির্বাচনও বিশ্বাসযোগ্য ছিল। কিন্তু এবারের পরিণতি দাঁড়াল আরও ভয়ঙ্কর; দাঙ্গা নয়, সামনাসামনি যুদ্ধ। সেবার দেশ দ্বিখণ্ডিত হয়েছে, এবার রাষ্ট্র ভাঙল। কিন্তু জনগণের মুক্তি এলো না। এবারও তারা হেরে গেল। হারল যে সেটা কার কাছে? হারল ব্যবস্থার কাছে। ব্যবস্থাটা পুঁজিবাদী। ১৯৪৬-এর পরে পুঁজিবাদ বিকাশের নতুন পথ পেল, ১৯৭১-এর পরে পুঁজিবাদ তার বিকাশের পথটাকে আরও প্রশস্ত করে নিল; এখন তো তার অগ্রযাত্রা পুরোপুরি অপ্রতিহত।
কিন্তু এ রকমই কি চলবে? জনগণ কি কেবল হারতেই থাকবে? হারার কোনো শেষ থাকবে না? না; তা হবে না। জনগণ জিতবে। এই নির্বাচনে যে জিতল না এটা নিশ্চিত, আগামী দশকেও জিতবে না। কিন্তু জিতবেই জিতবে। ব্যবস্থাটা অবশ্যই বদলাবে। কবে এবং কীভাবে, প্রশ্ন শুধু সেটাই। এই আশাবাদের কারণ কী? কারণ একাধিক। প্রথম কারণ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সংখ্যা অনেক, তারাই ৯০ জন; তাদের তুলনায় সুবিধাভোগীদের সংখ্যা খুবই কম, শতকরা দশজন। হ্যাঁ, এই ৯০ জন আগেও ছিল। কিন্তু তারা আগে এতটা বিক্ষুব্ধ ছিল না। বিক্ষোভের সঙ্গে মিলেছে সচেতনতা। আর এই বিক্ষোভ ও সচেতনতা কোনো এক দেশের মানুষের নয়, এটি এখন বিশ্বময়। সারাবিশ্বের বঞ্চিত-অত্যাচারিত মানুষ পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। লড়াইটা চলছে প্রত্যেকটি দেশের অভ্যন্তরে। কোনো দেশের মানুষই সম্পদের ব্যক্তিমালিকানা আর চায় না, সামাজিক মালিকানা চায়। দমিয়ে দেওয়ার, দাবিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। চলবে। কিন্তু সে চেষ্টা সফল হবে না। নদীর ওপর বাঁধটা টিকবে না, কারণ স্রোত প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে এবং প্রবল হতেই থাকবে। বাঁধটা ভেঙে পড়বে।
আশাবাদের দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে, পুঁজিবাদী ব্যবস্থাটা এখন চরম জায়গাতে এসে পৌঁছেছে। ইতিমধ্যে সে যে ভেঙে পড়েনি তার কারণ, তার বুদ্ধিতে যত ছল ছিল, বাহুতে যত বল ছিল, কৌশল উদ্ভাবনায় যত দক্ষতা ছিল সব সে খাটিয়েছে। তার আয়ত্তে এখন যা আছে তা তলানি বটে। দিশেহারা দশাতে এখন সে কতটা যে বেপরোয়া সেটা বোঝা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের তৎপরতায়। পুঁজিবাদ এখন রাষ্ট্রকে ব্যবহার করছে মানুষের বিক্ষোভ দমনের জন্য। রাষ্ট্র পরিণত হচ্ছে ফ্যাসিবাদী শীর্ষ সন্ত্রাসী প্রতিষ্ঠানে। করতলগত মিডিয়াকে সে ব্যবহার করছে বিভ্রান্তি ও ভোগবাদিতা প্রচারের বাহন হিসেবে। ফেসবুক, ইন্টারনেট, মোবাইল ফোন ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক যোগাযোগ রক্ষার আত্মসন্তুষ্টি দানের অন্তরালে মানুষকে কেবলই পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও অসামাজিক করে তুলছে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ব্যক্তিমানুষের সব খবর ছেঁকে তুলছে গোয়েন্দাগিরির জন্য। বিশ্বযুদ্ধ লাগানোর কাজে ক্ষান্তি দিয়ে এখন সে স্থানীয় যুদ্ধের ব্যবস্থা করছে। সমানে চলছে মানুষ মারার অস্ত্রের উন্নয়ন। আর আছে নেশা। ধর্ম, বর্ণ, অন্ধ জাতীয়তাবাদ ইত্যাদির পুরনো নেশা তো রয়েছেই, যোগ হয়েছে অত্যাধুনিক নতুন নেশা, সেটা মাদকের। পুঁজিবাদ মুনাফা ছাড়া আর কিছু বোঝে না; মুনাফার প্রয়োজনে দুর্বল মানুষদের সে মজুরি-দাস বানায়। মজুরি-দাসত্ব প্রাচীন ক্রীতদাস প্রথারই আধুনিক রূপ। মানুষ থেকে থেকে ক্ষেপে ওঠে দেখে পুঁজিবাদীরা এখন চাইছে মানুষের বদলে যন্ত্রই তাদের হয়ে কাজ করুক। যন্ত্র কখনও অবাধ্য হবে না, এমনকি মজুরিও চাইবে না। কিন্তু যন্ত্রের রাজত্ব কায়েম হলে মানুষ যে আর মানুষ থাকবে না, মালিকরা নিজেরাও যন্ত্রে পরিণত হবে সে চিন্তা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। যন্ত্রকে খাটিয়ে শ্রমিককে বেকার করলে লোকের ক্রয়ক্ষমতা যে হ্রাস পাবে, সেটাও হিসাবের মধ্যে রাখে না। তবে যাই করুক শেষ রক্ষা হওয়ার নয়। বিশ্বের সর্বত্র এখন পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে মানুষের বিদ্রোহ ফুঁসে উঠছে। সব দেশেই নিজ নিজ উপায়ে মানুষ লড়ছে; লড়াইয়ের ধরনটা স্থানীয় কিন্তু লড়াইটা আন্তর্জাতিক। এটা না হয়ে উপায় নেই। কারণ পুঁজিবাদ একটা বিশ্বব্যাপী ব্যবস্থা, তার বিরুদ্ধে সংগ্রামও বিশ্বময় ঘটতে বাধ্য। পুঁজিবাদীরা আর এক থাকবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলে এখন আর কিছু নেই, ভেঙে পড়েছে; ইউরোপ ও আমেরিকা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে জি-৭ সম্মেলন শেষ হয়েছে বড় পুঁজিপতি দেশগুলোর ঝগড়াঝাঁটির মধ্য দিয়ে। নব্য পুঁজিবাদী চীন তার বিপুল জনশক্তি ও নবীন উদ্দীপনা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছে প্রতিযোগিতার বাজারে। পুঁজিবাদের পতনটা সবদিক থেকেই অনিবার্য।
বড় সত্য এটাই যে, পুঁজিবাদীদের মুনাফা-উন্মত্ততা মানুষ, মানবতা ও প্রকৃতি- সবকিছুর সঙ্গেই শত্রুতা করছে, তার দাঁত ও নখ কোনো কিছুকেই রেহাই দিচ্ছে না। ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তিগত সম্পর্ক থেকে শুরু করে ভৌগোলিক প্রকৃতির সব উপাদানকেই সে পণ্যে পরিণত করে ফেলেছে, যার দরুন কোনো কিছুই আর স্বাভাবিক থাকছে না, ক্ষতিগ্রস্ত ও বিকৃত হয়ে পড়ছে। ফলটা দাঁড়াচ্ছে এই যে, পৃথিবী নামে এই গ্রহটির অস্তিত্বই আজ বিপন্ন। মানুষ এখানে টিকতে পারবে কি-না সেটাই একটা বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। কিন্তু মানুষকে তো বাঁচতে হবে এবং তাকে মানুষের মতোই বাঁচতে হবে। বাঁচার তাগিদেই মানুষ পুঁজিবাদকে ভেঙে ফেলবে। মানুষের সভ্যতা অতীতে বহু রকমের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে; তবে বিশ্বব্যাপী অস্তিত্বের এমন সংকট আগে সে কখনও দেখেনি। কিন্তু এই সংকটও মানুষ অতিক্রম করবে বৈকি। মানুষের অসাধ্য কী?
সব মিলিয়ে যে বিষয়টা সামনে আসছে তা হলো, মানুষের ইতিহাস থেমে যাবে না; পেছনে হটে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না, সে যাবে সামনে এগিয়ে। পুঁজিবাদ তাই শেষ কথা নয়। পুঁজিবাদের বিকল্প পুঁজিবাদ হবে এমনটা সম্ভব নয়, তাকে সংশোধন করে যে খাড়া করে রাখা যাবে, এটাও হওয়ার নয়। দাস ব্যবস্থা ভেঙে যেমন সামন্ত ব্যবস্থা এসেছে, সামন্ত ব্যবস্থা ভেঙে প্রতিষ্ঠা ঘটেছে পুঁজিবাদের, ঠিক তেমনিভাবে পুঁজিবাদকে হটিয়ে দিয়ে নতুন এক ব্যবস্থাকে আসতেই হবে। এই নতুন ব্যবস্থা হবে সমাজতান্ত্রিক। সমাজতান্ত্রিক না হয়ে উপায় নেই। কারণ হাজার হাজার বছর ধরে দাস ব্যবস্থা, সামন্ত ব্যবস্থা ও পুঁজিবাদের ভেতর দিয়ে যে ব্যক্তিমালিকানার কর্তৃত্ব ছিল, সেই মালিকানাকে অক্ষুণ্ণ রেখে ইতিহাসের পক্ষে আর এগোনোর উপায় নেই। ওই ব্যবস্থা ভেঙে যা আসবে, সেটা সামাজিক মালিকানা ব্যবস্থা। সামাজিক মালিকানা ব্যবস্থায় মানুষের সৃষ্টিশীলতা অবারিত হবে, প্রাচুর্য দেখা দেবে বিশ্বজুড়ে, মানুষের সঙ্গে মানুষের এবং মানুষের সঙ্গে উৎপাদনের ও প্রকৃতির বিচ্ছিন্নতা দূর হবে। অবসান ঘটবে অভাব ও সংঘাতের, যুদ্ধ পরিণত হবে অতীত ইতিহাসে। মানুষের উৎপাদিকা শক্তিকে পুঁজিবাদীরা উন্নতির যে স্তরে নিয়ে গেছে, সেখান থেকে সে চলে যাবে উন্নততর এক স্তরে। থাকবে সৃষ্টিশীলতার বিপুল অবকাশ। প্রয়োজনের জগৎ থেকে মানুষ চলে যাবে স্বাধীনতার জগতে। এটা অনিবার্য। প্রশ্ন হলো, কবে ঘটবে, কীভাবে ঘটবে এবং কেমন করে অবধারিতকে ত্বরান্বিত করা যাবে।
জিতবে মানুষই। পুঁজিবাদের পতন অবশ্যম্ভাবী। কর্তব্যটা হচ্ছে সেই পতনকে ত্বরান্বিত করা। এ ক্ষেত্রে রণনীতি স্থির করা আছে, রণকৌশলের ক্ষেত্রেই চাই উদ্ভাবন। পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামেই রয়েছে আশা, ভরসা ও সুখ। সেই সুখ যার কথা মার্কস লিখে গেছেন তার মেয়ের হাতখাতাতে। এই সংগ্রামে বিপ্লবীদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা অত্যাবশ্যক। আমরা আওয়াজ শুনি বামপন্থিদের ঐক্য চাই। সত্যিকারের প্রয়োজনটা কিন্তু বামপন্থিদের ঐক্য নয়, বিপ্লবীদের ঐক্য। কারণ বামপন্থি মাত্রেই যে বিপ্লবী- এটা মোটেই সত্য নয়। বামপন্থিরা বিভিন্ন কিসিমের হয়ে থাকে; তারা তো এমনকি লেজুড়ও হয় বুর্জোয়াদের এবং দেখা যাচ্ছে যে, আমাদের দেশের বামপন্থিদের অনেকেই আজকাল ধর্মনিরপেক্ষতার দাবি তুলতেও ভয় পায়। অথচ কে না জানে যে, এমনকি বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যও ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে একেবারে প্রথম শর্ত। বামপন্থিদের নয়, আসলে ঐক্য প্রয়োজন সমাজবিপ্লবীদের, যাদের প্রধান পরিচয় এটা যে, তারা পুঁজিবাদের পতন চায় এবং সেই লক্ষ্যে সংগ্রাম করে। বামপন্থিরা ডানে ও বামে ঝুঁকতে পারে, ঝোঁকেও। কেউ হয় হঠকারী, কেউ সাজে উদারনৈতিক। বিপ্লবীদের জন্য কিন্তু সবরকমের বিচ্যুতিই নিষিদ্ধ। তাদের লক্ষ্য সুস্পষ্টরূপে চিহ্নিত। বিপ্লবী আন্দোলনে প্রাণবন্ততা অত্যাবশ্যক; কিন্তু সেটি থাকবে সুশৃঙ্খল, দু’পাড়ের ভেতর নদীর স্বতঃস্টম্ফূর্ত প্রবহমানতার মতো। এই যুদ্ধে আর যাই থাকুক নতি স্বীকারের কোনো জায়গা নেই।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক



