
স্থগিত ঢাকা উত্তর নির্বাচন : দায় সরকার ও নির্বাচন কমিশনের
রুহিন হোসেন প্রিন্স :
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন অনিশ্চিত হয়ে পড়লো। প্রথমে শোনা গেলো আদালত এই নির্বাচন বিষয়ে ৩ মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছে। এখন খবর বেরুলো স্থগিতাদেশ হয়েছে ৬ মাসের জন্য। অর্থাৎ এ বছরের শেষে জাতীয় নির্বাচন হলে তার প্রক্রিয়ার মধ্যে এ নির্বাচনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। আর এর আগে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের জন্য উদ্যোগী ভূমিকা নেবে, এমনটি মনে হয় না।
নানা বিবেচনায় ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন’র মেয়র নির্বাচন ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই কর্পোরেশনের মেয়র জনাব আনিসুল হকের আকস্মিক মৃত্যুকে উপ-নির্বাচন সামনে চলে আসে। দেশের মানুষ অপেক্ষা করছেন একটা সুষ্ঠু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য। প্রশ্ন হলো ঐ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সরকার ও নির্বাচন কমিশন কী ভূমিকা নেবে? সব দল কি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে? জনগণ কি ভোট দিতে পারবে? ঐ ভোট অনুযায়ী কি আগামী সরকার গঠন হবে?
এসব প্রশ্নের সরল উত্তর সাধারণ মানুষের কাছে নেই। তবে শঙ্কা আছে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন যত জোরেই সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা বলুক না কেন জনগণ প্রতিটি ঘটনার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত হতে চায় সুষ্ঠু নির্বাচনের বিষয়ে। ঢাকার নির্বাচন নিয়ে তাই শঙ্কা ছিল, সম্ভাবনাও ছিল।
শংকা হলো; যদি নির্বাচনে সরকারি দলের প্রার্থী পরাজিত হয়, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে এর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, সেটি বুঝে সরকার কি এই দায় নেওয়ার দিকে যাবে?
নির্বাচন কমিশন যদি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে না করতে পারে, তাহলে জাতীয় নির্বাচনে এই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশনের কি গ্রহণযোগ্যতা থাকবে?
আর সম্ভাবনা ছিল : অন্তত জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে এই নির্বাচন সম্পন্ন করতে পারলে সরকার ও নির্বাচন কমিশন তাদের গ্রহণযোগ্যতা ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনেক প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কার করতে পারতো।
এই নির্বাচনের কার্যক্রমের শুরুতে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ, আইনবিদ, রাজনীতিক, সকলেই আইনি জটিলতার কথা বলে আসছিলেন। নির্বাচন কমিশন এটিকে গুরুত্ব দেয় নি। বরং ‘সমস্যা নেই’ ধরনের সহজ সরল কথা বলে নির্বাচনী কার্যক্রমে এগুতে থাকলো কমিশন। নির্বাচনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করলেন, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সাথে যুক্ত হওয়া ভাটারা ইউনিয়ন পরিষদ ও বেরাইদ ইউনিয়ন পরিষদ’র চেয়ারম্যান। এদের একজন আওয়ামী লীগ ও অন্যজন বিএনপি নেতা।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও নির্বাচন কমিশন এই আইনি জটিলতার কথা জেনেও আইনি সমাধান না করে নির্বাচনের পথে এগিয়েছে, দ্রুত তফসিল ঘোষণা করেছে। আবার রিট দায়েরের খবর জানার পরও নির্বাচন কমিশনের কোনো প্রতিনিধি শুনানিতে অংশ নেন নি। বরং শুধুমাত্র গণমাধ্যমে আদালতের আদেশ জানার পর দ্রুত নির্বাচনী তফসিল স্থগিত করেছে।
অতীত অভিজ্ঞতা বলে, সরকার বা অন্য সব সংস্থা কোনো বিষয়ে দৃঢ় হলে অ্যাটর্নি জেনারেল সাহেব নিজেই সরকারি শুনানিতে যেতে উদ্যোগী হন। সংশ্লিষ্ট সংস্থার আইনজীবীদের তৎপরতা থাকে। এরপর আদালতের রায় পক্ষে না এলে ঐ রায় স্থগিত-এর জন্য আরও উচ্চ আদালতে ছুটে যান। এবার এসব তৎপরতা দেখা গেলো না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হলো, আদালতের স্থগিতাদেশে সরকার ও নির্বাচন কমিশন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।
আর স্থানীয় সরকারের নির্বাচন হিসেবে এই নির্বাচন যেমন গুরুত্বপূর্ণ, একইভাবে জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনের গুরুত্বও আগেই বলা হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও আইনবিদেরা বলছেন, এই নির্বাচনের ক্ষেত্রে আইনি জটিলতাগুলো সমাধান যোগ্য। এগুলো সমাধান করেই নির্বাচনে যাওয়া যেত।
নির্বাচন কমিশনের হাতে সময় আছে, এখনও এসব জটিলতা দূর করার পদক্ষেপ নিয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করানোর উদ্যোগ দেশবাসী দেখতে চায়। অবস্থাদৃষ্টে দেখা যাচ্ছে, সরকার জাতীয় নির্বাচনের আগে আর এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় এগুতে চায় না। অন্যদিকে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের আগে, নানা অভ্যন্তরীণ জটিলতা আর বাড়াতে চায় না। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নতুন সংকটে পড়ে শক্তি ক্ষয় করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রশ্নে নতুন নতুন প্রশ্নের জন্ম দিতে চায় না।
এসব মিলিয়ে এই নির্বাচনে আর বড় দলগুলোর আগ্রহ যে নেই, তা নির্বাচন স্থগিত হওয়ার পরের ঘটনাবলিই বলে দেয়।
সিপিবিসহ বামপন্থিদের সংগ্রাম বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে ‘মুক্ত মানবের মুক্ত সমাজ’ সমাজতন্ত্র-সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য শ্রমজীবী মেহনতী মানুষের স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা, তাদের সংগঠিত করে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ট হওয়া।
এরই অংশ হিসেবে নির্বাচনী সংগ্রামে আমরা অংশ নেই। নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মানুষের স্বার্থে কাজ করা এবং স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার উদাহরণও সৃষ্টি করতে চাই আমরা।
ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের উপনির্বাচনকে সামনে রেখে তাই দেশের বামপন্থি-প্রগতিশীল শক্তির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির হয়। বিগত মেয়র নির্বাচনে বামপন্থিরা অংশ নিলেও প্রার্থী ছিল ২ জন। অভিন্ন বক্তব্য দেওয়া যায় নি। এজন্য বামপন্থি প্রগতিশীল দলগুলোর কর্মী, সমর্থক, শুভাকাঙ্ক্ষী মহল কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো এবার আকাঙ্ক্ষা ছিল একক প্রার্থীর।
দেশে দ্বি-দলীয় ধারার বাইরে বাম গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির বিকল্প শক্তি সমাবেশের জন্য এই দলগুলোকে এক কাতারে দেখতে চায় দেশের সচেতন মানুষ। সম্প্রতি সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বামমোর্চা সেই ঐক্যের পথে অনেক দূর এগিয়েছে। ৫ দফা আশু কর্মসূচি প্রণয়ন করেছে। নানা ইস্যুতে একসাথে রাজপথে দাঁড়িয়ে আন্দোলন সংগ্রাম করেছে। দেশবাসীর সামনে বিকল্প ঘোষণা ও কর্মসূচি তুলে ধরতে ঐ কর্মসূচি প্রণয়ন করে ঐক্যকে আরও দৃঢ়তর করার প্রচেষ্টা চলছে।
এরই মধ্যে এই নির্বাচন বামপন্থি-প্রগতিশীলদের সামনে এক সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে আসে। প্রশ্ন আসে একক প্রার্থী দেওয়ার, ঢাকাকে বসবাসযোগ্য করার কর্মসূচি হাজির করার। ঢাকার নির্বাচনে বড় দলগুলোর ব্যবসায়ী প্রার্থীর বিপরীতে রাজনৈতিক প্রার্থী সামনে আনা। আর দেশবাসীর সামনে দ্বি-দলীয় ধারার বিপরীতে নীতিনিষ্ঠ অবস্থান থেকে বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার বক্তব্য হাজির করা। এর মধ্য দিয়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বামপন্থি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে নির্বাচনী সংগ্রাম এগুবে এমন দৃষ্টান্ত দলীয় কর্মী-সমর্থক ও দেশবাসীর সামনে হাজির করা।
বিগত নির্বাচনে এই আসনে সিপিবি’র প্রার্থী ছিল। দলগতভাবে সিপিবির সামনে সুযোগ আসে এবারেও প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার। এবারের নির্বাচনে প্রার্থীর থাকবে দলীয় মার্কা। তাই পার্টির নির্বাচনী প্রতীক ‘কাস্তে’ প্রচারেরও সুযোগ ছিল। যা আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদেরও প্রচারে সহায়তা করতো। সংশ্লিষ্ট জেলা কমিটি প্রার্থী নির্দিষ্ট করে মাঠে প্রচারে নামে। কিন্তু সিপিবির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় ‘একক প্রার্থী’, ‘বাম প্রগতিশীল শক্তির ঐক্য দৃঢ় করা’, ‘দেশবাসীর সামনে বিকল্প রাজনীতি ও শক্তি সমাবেশ তুলে ধরা’। এসব বিবেচনা সামনে রেখে সিপিবি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। সিপিবি-বাসদ এর সমর্থিত সিপিবির প্রার্থীর বিপরীতে গণতান্ত্রিক বামমোর্চার প্রস্তাবিত প্রার্থীকে সিপিবি-বাসদ- গণতান্ত্রিক বামমোর্চার প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করে। অপরাপর সকল শক্তিকে নিয়ে নির্বাচনী সংগ্রাম দৃঢ় করার সিদ্ধান্ত নিয়ে মাঠেও নামা হয়।
এরই মধ্যে নির্বাচন স্থগিতাদেশ এর খবর আসে। এই খবরে উদ্বেগ প্রকাশ করে সিপিবি-বাসদ ও গণতান্ত্রিক বামমোর্চার যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ‘নতুন যে ইউনিয়নগুলোকে সিটি কর্পোরেশন এর সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তাদের নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের মর্যাদা কী হবে, তাদের ভোটাধিকার কী হবে। এসবের আইনি মীমাংসা না করেই ঐ অঞ্চলগুলোকে তাড়াহুড়া করে নির্বাচনের আগে সিটি করপোরেশনের আওতায় নেওয়া হয়েছে। এই অবিবেচক কার্যকলাপের কারণে পুরো ঢাকা উত্তরবাসী নির্বাচনে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। জনগণ মনে করে সরকারের যোগসাজশে নির্বাচন কমিশন এই কাজ করেছে। এর মধ্য দিয়ে সরকারকে তারা পিঠ বাঁচানোর সুযোগ করে দিল।’ সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধি ছাড়া একটি শহর চলতে পারে না। সরকার দেশবাসীর এই অধিকার কেড়ে নিয়ে প্রশাসক দিয়ে নগর পরিচালনার ফন্দি এটেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আদালতের প্রতি আবেদন জানিয়ে বলা হয়, নতুন ভোটার তালিকা ও ওয়ার্ড অন্তর্ভুক্তির আইনি জটিলতার ও আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে যেন জনগণের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়–সেদিকে নজর রাখাও আদালতের দায়িত্ব। সরকারের অ্যাটর্নি জেনারেল এর অফিস ও নির্বাচন কমিশনকে উচ্চ আদালতে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে সমস্যার সমাধান ও নির্বাচনের পুনঃতফসিল ঘোষণারও দাবি জানান হয়।
২০১৪ এর ভোটারবিহীন নির্বাচনে নির্বাচিত দাবিদার এমন একটা সরকার দেশ চালাচ্ছে, যার নৈতিক ভিত্তি নেই। নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসমূহ বিপর্যস্ত। পুলিশ-প্রশাসনসহ সব কিছুকে ব্যবহার করে জবাবদিহিতাহীন একটা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। দুর্নীতি, লুটপাট, নৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন এর ভাবনা যেন অস্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচন নির্ভর করছে সরকারের ইচ্ছা আর চাওয়া, না চাওয়াতে। তাই জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সংগ্রাম গণতন্ত্রের সংগ্রামের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া বাম প্রগতিশীলদের অন্যতম কর্তব্য।
নির্বাচনী সংগ্রামে অংশ নেওয়ার সময় নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকারের সমতার কথার সাথে সাথে আমরা ভোটে দাঁড়ানোর সমতার কথাও তুলে ধরেছি। টাকা, পেশী শক্তি, সাম্প্রদায়িক-আঞ্চলিক প্রচার প্রচারণা আর প্রশাসনিক কারসাজি থেকে নির্বাচন ব্যবস্থাকে মুক্ত করতে নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবিকে সামনে আনাও জরুরি।
ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়র পদে প্রার্থী হতে ফরম তুলতে ভোটার তালিকার সিডি কিনতেই লাগে ২৭ হাজার টাকা। এটা বাধ্যতামূলক। ভোটারের তালিকা দেখতে, ঐ টি প্রিন্ট করতেই যাবে কয়েক লক্ষ টাকা। আর মনোনয়ন জমা দিতে জমানতই লাগবে ১ লক্ষ টাকা। এটি অব্যাহত থাকলে সাধারণ ভাল মানুষ প্রার্থী হবে কী করে? এই বন্দিদশা থেকে নির্বাচনকে মুক্ত করার সংগ্রাম জোরদার করেই আমাদের নির্বাচনী সংগ্রামে এগুতে হবে।
লেখক : সম্পাদক, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি



