
শরীফ আস্-সাবেরের বদান্যতায় তাঁর কবিতাগ্রন্থ ‘হাঁড়িধোয়া ভালোবাসা’ হাতে পেয়ে পড়া হলো প্রায় এক নিঃশ্বাসে। এক নিঃশ্বাসে পড়ার মতো বই থেমে থেমে পড়লে অবশ্য শুধু লেখার প্রতি অবিচার করাই হয় না, পাঠক হিসেবে খেই হারিয়ে ফেলার সম্ভাবনাও থেকে যায়। তাই সে ঝুঁকি নেই নি।
কারও সাথে ব্যক্তিগত সখ্য থাকলে তাঁর লেখা নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক আলোচনা করা কঠিন। তাই সে চেষ্টায় যাচ্ছি না। কিন্তু ভালো লাগাটুকু বন্ধুদের সাথে সহভাগ না করলে গ্রন্থটির প্রতি এক ধরনের দায় থেকে যায়। মন্দ লাগা তেমন নেই। থাকলে হয়ত আলোকপাত করতাম প্রচ্ছন্নে হলেও। তাছাড়া বইয়ের প্রথমেই অনুবন্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ভীষ্মদেব চৌধুরি গ্রন্থটি নিয়ে অনুপুঙ্খ আলোচনা করেছেন। আলোচনাটি প্রাণবন্ত হলেও তা সংশ্লিষ্ট গ্রন্থের অংশ হয়ে ওঠায় প্রথার বাইরে বলে মনে হয়েছে। তবে তাঁর আলোচনা পাঠের পর অন্য আলোচনার তেমন কোনো অবকাশ থাকে না।
কবির শৈশবের সহচরী নরসিংদীর হাঁড়িধোয়া নদীর জলে সাঁতার কাটতে কাটতে সে নদীর প্রতি তাঁর যে ভালোবাসা গড়ে উঠেছিল সে ভালোবাসাই পরিবর্ধিত হয়েছে পারিপার্শ্বিকতা ও প্রকৃতির প্রতি গভীর প্রেমে। হাঁড়িধোয়ার স্রোত থেকে সে প্রেমের আগুন জ্বলেছে দয়িতার দেহমনে। গ্রন্থটিতে নানা অনুষঙ্গের কবিতা স্থান পেলেও হাঁড়িধোয়ার ভালোবাসা থেকেই তার মূল সুর উৎসারিত। সে ভালোবাসায় অতীতের স্মৃতি সতত উঁকি দিয়ে যায়:
নিটোল গোলাপ কুঁড়ি ঝরে পড়ে চৈতালি ঝড়ে
সাথিহারা দোয়েলের নীল চোখে নিদারুণ ভীতি;
অনাদরে ঝুলে থাকে দেয়ালের ধূলিমাখা ছবি,
উতলা বাতাসে দোলে ফেলে আসা অতীতের স্মৃতি।
-হাঁড়িধোয়া ভালোবাসা
গ্রন্থটি পাঠে নিবিষ্ট পাঠক হাঁড়িধোয়া ও প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা ছাড়াও নামকরণের আরেকটি সার্থকতা খুঁজে পাবেন। ছত্রে ছত্রে তাঁরা সন্ধান পাবেন প্রতিটি বিষয়ে কবির গভীর মমতা, বুকের গভীরতম প্রদেশ থেকে নিংড়ে দেওয়া ভালোবাসা; একজন মা যেমন ক্ষুধার্ত শিশুকে হাঁড়ি ধুয়ে সবটুকু খাবার তার পাতে ঢেলে দেন, ঠিক তেমন। একেবারে মমতার হাঁড়ি ধুয়ে উজাড় করে দেওয়া ভালোবাসা।
শরীফ আস্-সাবেরের প্রেমের কবিতা আবেগের ঠাসা বুননে আপ্লুত:
জারুল বনে পাতার নাচন
তোমার বুকে চাঁদের তাপ;
তোমার ভেজা ঠোঁটের আড়ে
উথলে উঠে অবুঝ পাপ
-খোঁজ
আমাদের ভালোবাসা উথল ধারায়-
বয়ে যায় অনিবার, দু’কূল ভাসায়,
কামুক হৃদয় মিছে যাতনা ছড়ায়,
স্বপনের জাল বুনে আশা নিরাশায়।
-অচিন মায়া
এতো সর্বগ্রাসী প্রেমের মধ্যেও কবি রেখে যান অমোঘ সত্যের দীর্ঘশ্বাস। বুকের ভেতর হু হু করে উঠা সে দীর্ঘশ্বাসেও আবার থাকে শেষ বিকেলের মমতা মাখা:
হারাতে চাইলে বলো হারানো কি যায়?
শরীর ফুরালে স্মৃতি থাকে পাহারায়,
হারাবে কোথায় বলো, কোন অজানায়?’
-অচিন মায়া
শরীফ আস্-সাবের কোথাও কোথাও নারী ও প্রকৃতিকে চমৎকারভাবে ব্লেন্ড করেছেন:
তমাল পাতার ফাঁকে রোদ করে লুকোচুরি খেলা,
আমার হৃদয় কাড়ে কান্তারের ধুপছায়া পথ;
রূপের মাধুরী মেখে মেয়ে এক হাঁটে এলোবেলা,
চিরল হাওয়ায় দোলে ও মেয়ের মাটিরং নথ।‘
-ভরম
তবে প্রেম ও প্রকৃতি ছাড়াও কবি পাঠকের ভাবনাকে নাড়া দিয়েছেন অন্যান্য বিষয়ের অবতারণা করেও। তাঁর কবিতায় সমকালীন সমাজের অসামঞ্জস্য এসেছে, এসেছে বঙ্গভঙ্গ-ভারতভঙ্গের প্রসঙ্গ। কোভিড মহামারির লকডাউনের সময় রচিত অন্য যে কোন সাহিত্যের মতোই কোভিডের বিভীষিকা এবং আশাবাদ কোনটিই বাদ যায়নি। এসেছে বিত্তহীন নিম্ন মধুবিত্তের জীবনযন্ত্রণা:
কাকডাকা ভোরে আমি ছুটে যাই রমনার সবুজ মায়ায়,
বটমূলে রোজকার হাঁটার সাথিরা
দেখা হলেই বলেন – ‘কেমন আছেন, ভাই?’
প্রত্যুত্তরে আমি অপ্রতিভ, নিরুত্তাপ মিথ্যা কথা বলি,
বলি- ‘ভালো, ভালো আছি বেশ!’
-মিথ্যামিথ্যি
লাশের গন্ধমাখা করোনার কালে
পৃথিবী মেতেছে এক ভয়াল খেলায়;
মরণের কিন্নরী ডাকে ইশারায়,
ঘরে থাকো তুমি এই বিষাদ বেলায়।‘
…
পৃথিবী তবেই হবে তোমার আবার
বসবে ধ্রুপদি মেলা আলোয় চাঁদের;
সব প্রাণ মিলেমিশে হবে একাকার,
এই গ্রহে ফের দেখা হবে আমাদের।‘
-ফের দেখা হবে…
আমার পৃথিবী’ কবিতায় কবি তাঁর আত্মপরিচয় আবিষ্কার করে পাঠকের সামনে নিজেকে তুলে ধরেছেন খুব সহজ ভাষায়:
এই পৃথিবীর কাদা, মাটি, জল গায়ে মেখে আমি
আমি হয়ে উঠি,
পাহাড়ের মেয়েটির সাথে মিতালি পাতিয়ে আমি
আমি হয়ে উঠি,
সাগরের লোনা স্রোতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে আমি
আমি হয়ে উঠি।‘
-আমার পৃথিবী
শরীফ আস্-সাবের ছড়াকার হিসেবে সমধিক পরিচিত। ছন্দ তাঁর সহজাত শক্তি। ‘হাঁড়িধোয়া ভালোবাসা’র প্রতিটি কবিতা তাঁর এই শক্তির প্রতিচ্ছবি। তবে ‘তুই’ কবিতায় দেখা যাবে দু’ধরনের ছন্দবিন্যাসের সমন্বয় যা পাঠকের ভাবনায় নতুন রসদ জোগাবে:
তুই কি আমায় ভালোবেসে-
বলবি মনের কথা হেসে,
পড়বি আমার বুকে এসে-
নিঝুম নিরালায়?
তুই কি আমার শুধু হবি?
তুই কি আমার সাথে যাবি-
দূরের নীলিমায়?…
যেখানে দিঘির কালো জলে-
রুপালি জোৎস্না পড়ে গলে
যেখানে মেঘের করতলে-
উড়ে যায় পাখি দলে দলে-
দখিনা হাওয়ায়;’
(প্রথম দুই অনুচ্ছেদের সাথে তৃতীয় অনুচ্ছেদের ছন্দের সমন্বয় লক্ষনীয়)
‘লকডাউন’ কবিতায় তিনি ব্যবহার করেছেন ঢাকার স্থানীয় উপভাষা, যা গ্রন্থটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা:
আমি হালায় ঢাকাই পোলা, কেঠায় আমায় বান্দে
হুদাই কিলায় হালাইছো এই লকডাইউনের ফান্দে?
শরীফ আস্-সাবেরের কবিতাগুলো সহজপাঠ্য, সহজবোধ্য অথচ আধুনিকতার মানে উত্তীর্ণ। এখানেই তার সাফল্য। তিনি শুধু কবিদের জন্য কিংবা কবিতা-পাঠকের জন্যই কবিতা লিখেননি, তিনি সাধরণ পাঠককেও কবিতার আঙ্গিনায় টেনে আনতে ব্রতী হয়েছেন। এই প্রকৃয়াটি সচরাচর খুব একটা দেখা যায় না। তাঁকে সাধুবাদ দিতেই হয়।
এই গ্রন্থের কবিতাগুলোর রচনাকাল কোভিড মহামারীর লকডাউনের সময় আর কবির ব্যক্তিজীবনে একটি মারাত্মক স্বাস্থ্য-সঙ্কটে হাসপাতালে কাটানোর সময়। এ সময়টুকুতে তিনি তাঁর ব্যস্ত জীবনের বিপরীতে নিজের সাথে একাকী সময় কাটাতে পেরেছেন যা তাঁকে আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হতে সহায়তা করেছে, আত্ম-আবিষ্কারের অনুঘটক হয়েছে। প্রকৃতি ও নারীপ্রেমের পাশাপাশি সমকালীন সমাজ তাঁর কাছে নিজের আয়না হয়ে উঠেছে। তিনি পাঠককেও উদবুদ্ধ করেছেন নিজ নিজ দর্পণের সন্ধানে।
৮০ পৃষ্ঠার ‘হাঁড়িধোয়া ভালোবাসা’ প্রকাশ করেছেন পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লিমিটেড’। নয়নাভিরাম প্রচ্ছদ এঁকেছেন রাজীব রাজু। অঙ্গসজ্জা ও অলংকরণ চমৎকার। মুদ্রণপ্রমাদ তেমন একটা চোখে পড়েনি। তবে কোনো কোনো পাঠক যতিচিহ্নের আধিক্য বোধ করতে পারেন। এতে অবশ্য প্রকাশকের ভূমিকা নেই, এই কৃতিত্ব কিংবা দায়ভার কেবলই কবির। কোনো কোনো পাঠক হয়ত ‘হাঁড়িধোয়া ভালোবাসা’য় দু’টি ভিন্ন ধারা খুঁজে পাবেন। কবি নিজেও তেমনটি ভাবলে কখনও হয়ত ধারা দুটোকে পৃথক করে দু’টি ভিন্ন গ্রন্থে রূপ দেওয়ার কথা ভাবতেও পারেন।
শরীফ আস্-সাবের তাঁর ছন্দের জাদুতে আমাদের মোহিত করে যাবেন আরও অনেকটা সময় এই কামনা রইল। তাঁর পরবর্তী গ্রন্থের প্রত্যাশায় রইলাম।



