প্রধান খবরবাংলাদেশসাহিত্য

অন্তিম শ্রদ্ধা কবি আল মাহমুদকে

বাংলা একাডেমি এবং জাতীয় প্রেস ক্লাবে শেষ শ্রদ্ধা জানানোর পর বায়তুল মোকাররম মসজিদে নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়েছে আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের। আজ শনিবার বেলা পৌনে ১২টার দিকে রাজধানীর মগবাজারের বাসভবন থেকে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে নেওয়া হয় কবির মরদেহ। সেখানে এক নিরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় শ্রদ্ধাঞ্জলি পর্ব। একাডেমির নজরুল মঞ্চে নির্মিত অস্থায়ী বেদীতে শুরুতেই বাংলা একাডেমির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানান একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী। আরও শ্রদ্ধা জানান কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন প্রমুখ।
 
শ্রদ্ধাজ্ঞাপন শেষে হাবীবুল্লা­হ সিরাজী বলেন, ৪৭-এর দেশভাগের পর বাংলা কবিতায় যারা নতুন স্বপ্নের বীজ বুনেছিলেন তাদের একজন আল মাহমুদ। তিনি বাংলা কবিতায় নতুন ধারা নির্মাণ করেছিলেন। ছিলেন বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য কবিদের একজন। ‘সোনালী কাবিন’র মতোই তাঁর কবিতা বাংলা কাব্যভুবনে সোনালী দিগন্ত। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা প্রসঙ্গ উলে­খ করে তিনি বলেন, জনগণ যখন কাউকে কবি হিসেবে মেনে নেন, রাষ্ট্রও তাকে কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
 
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বলেন, বাঙালিপনা এবং এর সঙ্গে যা কিছু মঙ্গলময় সেদিক থেকে কবি আল মাহমুদকে অবশ্যই স্মরণ করতে হবে। তৃণমূলে তাঁর জন্ম, সেই তৃণমূলেই তিনি ফিরে যাবেন- এটাই আমার কাম্য। নগর জীবনেও তিনি কবিতার মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনকে তুলে এনেছেন। তিনি পরবর্তীতে প্রজন্মের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবেন।
 
বাংলা একাডেমি থেকে আল মাহমুদের মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় প্রেস ক্লাব চত্বরে। সেখানে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে-একাংশ), ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিআইজে-একাংশ)। এ সময় বিএনপির পক্ষ থেকে দলের ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আজম খান শ্রদ্ধা জানান কবির মরদেহে।
 
আরও শ্রদ্ধা জানান- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমেদ, গীতিকবি গাজী মাজহারুল আনোয়ার, কবি আবদুল হাই সিকদার, কবি জাকির আবু জাফর, সাংবাদিক নেতা শওকত মাহমুদ প্রমুখ।
 
কবির ছেলে মীর মোহাম্মদ মনির বলেন, আব্বার ইচ্ছা ছিল শুক্রবারে যেন তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর সেই চাওয়টাই পূর্ণ হয়েছে। এ সময় তিনি তাঁর বাবার অজান্তে কোনও ভুল-ত্রুটি হলে তাঁর জন্য ক্ষামাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানান।
 
এমাজউদ্দিন আহমেদ বলেন, স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিষয়ে সবসময় সোচ্চার ছিলেন আল মাহমুদ। নিজেদের স্বার্থেই আমরা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখবো এবং বারবার তাঁর কাছে ফিরে যাব। এ সমাজ নিয়ে তাঁর দেখা স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক- এটাই আমার প্রত্যাশা।
 
গাজী মাজহারুল আনোয়ার বলেন, দেশের সংস্কৃতি অঙ্গণে আল মাহমুদের অবস্থান চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। সৃজনশীল ব্যক্তিরা চলে যান না, বেঁচে থাকেন সৃষ্টির মাধ্যমে।
 
শওকত মাহমুদ বলেন, ‘গণকণ্ঠ’-এ সাংবাদিকতা করার সময় নীপিড়িত মানুষের জন্য তাঁর লেখনী ছিল সোচ্চার।
 
প্রেস ক্লাবে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে কবি আল মাহমুদের মরদেহ নেওয়া হয় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে। সেখানে তাঁর নামাজে জানাজা সম্পন্ন হয়।
 
রোববার বাদ জোহর জানাজা শেষে কবির মরদেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মোরাইল গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।
 
কবিতার ছন্দে ধারণ করেছিলেন ভাটি বাংলার জনজীবন। আধুনিক ভাষা কাঠামোর ভেতরে আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ ঘটিয়ে আল মাহমুদ হয়ে উঠেছিলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি। ‘লোক লোকান্তরে’, ‘কালের কলস’ আর ‘সোনালী কাবিন’-এর কবি আল মাহমুদ শুক্রবার রাত ১১টার দিেক রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। তিনি পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়েসহ বহু গুণগ্রাহী ও ভক্ত রেখে গেছেন।
 
গত ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে আল মাহমুদকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় রাজধানীর ধানমণ্ডিতে ইবনে সিনা হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। ওইদিন রাত ৪টার দিকে চিকিৎসকেরা তাকে হাসপাতালেরে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করেন। শুক্রবার রাতে তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হওয়ায় তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। সেই অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
 
কবির পারিবারিক বন্ধু কবি আবিদ আজম জানান, আল মাহমুদ নিউমোনিয়াসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তিনি ইবনে সিনার অধ্যাপক ডা. মো. আবদুল হাইয়ের তত্ত্বাবধানে ছিলেন। আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা কবিতার শহরমুখী প্রবণতার মধ্যেই ভাটি বাংলার চিরায়ত জনজীবন, গ্রামীণ আবহ, নদীনির্ভর জনপদ, চরাঞ্চলের জীবনপ্রবাহ এবং নরনারীর চিরন্তন প্রেম-বিরহকে তার কবিতায় উপজীব্য করে তোলেন। আধুনিক বাংলা ভাষার প্রচলিত কাঠামোর মধ্যে স্বাভাবিক স্বতঃস্ফূর্ততায় আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ তাঁর অনন্য কীর্তি।
 
আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মৌড়াইলের মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আব্দুর রব মীর ও মা রৌশন আরা বেগম। আল মাহমুদের প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তিনি কুমিল্লার দাউকান্দির সাধনা হাই স্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। আল মাহমুদ বেড়ে উঠেছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়।
 
সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে ১৯৫৪ সালে আল মাহমুদ ঢাকায় আসেন। শুরুতে তিনি কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘কাফেলা’য় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি ‘দৈনিক মিল্লাত’ পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতার জগতে প্রবেশ করেন। ১৯৫৫ সাল কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী ‘কাফেলা’র চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধের পরে ‘দৈনিক গণকণ্ঠ’ পত্রিকার সম্পাদক হন আল মাহমুদ। সম্পাদক থাকাকালীন সরকারের বিরুদ্ধে লেখার কারণে এক বছরের জন্য কারাবরণ করতে হয় তাঁকে।
 
মুক্তিযুদ্ধের পর তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহ-পরিচালক পদে নিয়োগ দেন। ১৯৯৩ সালে পরিচালক হিসেবে শিল্পকলা একাডেমি থেকে অবসর নেন বরেণ্য এই কবি।
 
১৮ বছর বয়স থেকে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আল মাহমুদের কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত ‘সমকাল’ পত্রিকা এবং কলকাতায় কবি বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’, ‘নতুন সাহিত্য’, ‘চতুষ্কোণ’, ‘ময়ূখ’ ও ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা ও কলকাতার পাঠকদের কাছে সুপরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত হয় আল মাহমুদের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’, যেটি তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস (১৯৬৬), সোনালি কাবিন (১৯৬৬), মায়াবী পর্দা দুলে উঠো (১৯৬৯)- এভাবে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কাব্যগ্রন্থ তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে।
 
১৯৯৩ সালে বের হয় আল মাহমুদের প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে – ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি দূরগামী’, ‘দ্বিতীয় ভাঙন’, ‘উড়ালকাব্য’ ইত্যাদি। ‘কাবিলের বোন’, ‘উপমহাদেশ’, ‘ডাহুকি’, ‘আগুনের মেয়ে’, ‘চতুরঙ্গ’ ইত্যাদি তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ‘পানকৌড়ির রক্ত’সহ বেশকিছু উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ লিখে গল্পেও কিংবদন্তী হয়ে ওঠেন তিনি। এছাড়া ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ ও ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য আত্মজীবনীগ্রন্থ।
 
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি সৈয়দা নাদিরা বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। এ দম্পতির পাঁচ পুত্র ও তিন কন্যা রয়েছে। বছর কয়েক আগে সৈয়দা নাদিরা বেগম মারা যান। এরপর থেকে তিনি মগবাজারের বাসায় নিভৃতেই বসবাস করতেন।
 
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ আল মাহমুদ একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, জয় বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবীর স্মৃতি পুরস্কার, জীবনানন্দ স্মৃতি পুরস্কার, কাজী মোতাহার হোসেন সাহিত্য পুরস্কার, কবি জসীম উদ্দিন পুরস্কার, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসির উদ্দিন স্বর্ণপদকসহ বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension