
আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তি উদযাপন
‘রাজনৈতিক তোষামোদী মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা হারায়’
আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তি উদযাপনে উপলক্ষে নিউইয়র্কে সেমিনার এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়েছে গত ২৯ সেপ্টেম্বর (মঙ্গলবার) উডসাইডস্থ গুলশান ট্যারেস মিলনায়তনে। সেমিনারে আলোচনার বিষয় ছিল-“বিশ্বব্যাপী মিডিয়া অস্তিত্ব সংকটে”। আলেচানা সভায় বক্তারা বাংলাদেশের মিডিয়া, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত সাংবাদিকদের কর্মজীবন এবং বিশ্বব্যাপী মিডিয়ার গতি-প্রকৃতি ও কৌশল বদলে যাওয়া নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের মিডিয়ার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে বলেন, রাজনৈতিক তোষামোদী মিডিয়ার গ্রহণযোগ্যতা হারায়। মূলধারার মিডিয়াকে তথ্য প্রকাশে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার কথা উল্লেখ করেন তারা। প্রযুক্তি ও স্যোসাল মিডিয়ার সঙ্গে প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে আপোষহীন ও অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর মিডিয়াকে জোরালো ভূমিকা রাখার কথা বক্তারা অভিমত প্রকাশ করেন।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন আমেরিকা-বাংলাদেশি প্রেসক্লাবের সভাপতি শওকত ওসমান রচি এবং সেমিনার সঞ্চালনা করেন ক্লাবের সাবেক সভাপতি দর্পণ কবীর। অনুষ্ঠানে অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন ওয়াশিংটনস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেসমিনিষ্টার গোলাম মোর্তূজা, নিউইয়র্কস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কন্সাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক, প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমদ। এছাড়া আলোচ্য বিষয়ের ওপর প্যানেল আলোচক হিসাবে আলোচনা করেন প্রবীণ সাংবাদিক সাঈদ তারেক, মঈনুদ্দীন নাসের, বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডাঃ ওয়াজেদ এ খান, জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক রতন তালুকদার, প্রথম আলো উত্তর আমেরিকা পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী ও প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক ও ক্লাবের সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ সাঈদ, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক শোয়েব আহমেদ ভূঁইয়া। অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মজুমদার ও শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রেসক্লাবের কোষাধ্যক্ষ মল্লিকা খান মুনা, সহ-সভাপতি মোহাম্মদ মনজুরুল হক ও সহ-সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক। দেড়যুগ পূর্তি উপলক্ষে স্মরণিকা ‘আলোকবর্তিকা’র মোড়ক উন্মোচন করার সময় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন স্মরণিকাটির সম্পাদক তোফাজ্জল লিটন এবং সবশেষে সভাপতির ভাষণ দেন শওকত ওসমান রচি।
অনুষ্ঠানে সেমিনার পর্ব শেষ হলে কেক কেটে প্রেসক্লাবের ১৮ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়। এ ছাড়া দেড় যুগ পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা ‘আলোকবর্তিকা’র মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
এরপর এই প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে কণ্ঠশিল্পী এম. এ. সোয়েব ও অভিনেত্রী মৌসুমীকে বিশেষ সম্মাননা ক্রেষ্ট প্রদান করা হয়। বরেণ্য কণ্ঠশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায় এম. এ. সোয়েবকে এবং প্রেসমিনিষ্টার গোলাম মোর্তূজা এবং কন্সাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক চিত্রনায়িকা মৌসুমীর হাতে ক্রেষ্ট তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে আগতদের ক্লাবের পক্ষ থেকে গোলাপ দিয়ে শুভেচ্ছা জানানো হয়। অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন এম. এ. সোয়েব এবং টিনা রাসেল।
অনুষ্ঠানে কমিউনিটির সুধীজন, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী এবং ক্লাবের সদস্যরা সপরিবারে উপস্থিত ছিলেন।
সেমিনারে মানবজমিন পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরীর ‘কেমন আছে বাংলাদেশি মিডিয়া’ লেখা পাঠ করেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক দর্পণ কবীর। এই লেখার ওপর আলোচনা করেন বক্তারা। প্রবীণ সাংবাদিক মনজুর আহমেদ বলেন, মিডিয়ায় অপপ্রচার বা মিথ্যা সংবাদ বা সত্য আড়াল করার চেষ্টা হলে মানুষের কাছে স্যোসাল মিডিয়া বা অন্য কিছু ঢুকবেই। মিডিয়া নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের সংবাদ লেখা জানতে হবে, পড়তে হবে। দিনদিন মনে হচ্ছে সংবাদ লেখার সাংবাদিকের সংখ্যা কমে যাচ্ছে। ক্যামেরা বা মাইকের সামনে দু’এক কথা বলার সাংবাদিকতাই দেখা যাচ্ছে বেশি।
বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেসমিনিষ্টার গোলাম মোর্তূজা বলেছেন, বাংলাদেশের মিডিয়ার বিপযয়ের জন্য মিডিয়ার সম্পাদক এবং মালিকরাই দায়ী। রাজনৈতিক তোষামোদীল কারণে মিডিয়া জনমানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। আমরা বিগত দিনে ফ্যসিবাদ সরকারের তোষামোদ দেখেছি। কিন্তু সাধারণ মানুষ একটা সময় ঐ মিডিয়াগুলোকে প্রত্যাখান করেছে। তিনি আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার মিডিয়া সংবাদ প্রকাশে মিথ্যাচার করছে না। ইরান বা ইরাক যুদ্ধের সংবাদ তারা প্রকাশ করেছে এবং পাঠকের আস্থা ধরে রেখেছে। এ কারণে তারা পাঠক বিপযয়ের মুখে পড়েনি। বাংলাদেশে এমনটা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, নিউইয়র্কে বাংলা মিডিয়ার সাংবাদিকরা ভূমিকা রাখতে পারেন। এই সুযোগ এখানে রয়েছে। তারাই বাংলাদেশে যে কোন ঘটনা বা সত্য তথ্য প্রকাশ করে মূলধারার সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালন করতে পারেন বলে মনে করি।
কন্সাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, সঠিক তথ্য বা বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতাই সকল মানুষ জানতে চায়, শুনতে চায় বা দেখতে চায়। দলীয় পত্রিকার সংবাদ দলীয় সমর্থকরা যদি পছন্দ করত তাহলে বিভিন্ন সময়ে দলীয় পত্রিকাগুলোর প্রচার সংখ্যা বেশি-এমনটা দেখা যেত। তা দেখা যায়নি। তিনি আরো বলেন, নতুন যে কোন মাধ্যমকে স্বীকার করতে হবে, প্রতিযোগিতা করতে হবে। এখন স্যোসাল মিডিয়ার যুগ। সকলে দৃষ্টি রাখি ওখানে। মিডিয়াগুলোকে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হলে তাদের দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার বিকল্প নেই। তিনি মিডিয়ায় ভুল সংবাদ পরিবেশন হলে এরজন্য ভুল স্বীকার করার কথা উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে এমনটা দেখা যায় না। ভুল স্বীকার করাও মিডিয়ার দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
প্রবীণ সাংবাদিক সাঈদ তারেক বলেন, বাংলাদেশের ৬০ বা ৭০ দশকের সাংবাদিকতা এখন নেই। সাংবাদিকতার চরিত্র ও সজ্ঞা বদলে গেছে। স্যোসাল মিডিয়ার যুগে মিডিয়াগুলোকে চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। আমাদের দেশের মিডিয়াগুলোতে সংকট চলছে। অনেক মিডিয়ার সাংবাদিকরা ঠিক মত বেতনই পাচ্ছেন না। এই সংকটও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চাকে ব্যাহত করছে।
বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ডাক্তার ওয়াজেদ এ খান বলেন, বিশ্বব্যাপী মিডিয়ার সংকট চলছে। পাঠকের মনস্তাস্তিক পরিবর্তনও হয়েছে। স্যোসাল মিডিয়া বা এআই এর উত্থান প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়াকে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। স্যোসাল মিডিয়ায় তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ নেই এবং যে কেউ যা ইচ্ছা লিখে দিতে পারছে। অসত্য তথ্যগুলোর অসত্য বলা বা প্রমাণ করার কাজ মূলধারার মিডিয়ার। এখানে একটা লড়াই চলছে। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ দেখেছি মিডিয়ায়। সঠিক সংবাদ বা অনুসন্ধানী সংবাদ দেখছি না। এর চেষ্টা বা প্রতিযোগিতাও দেখছি না।
সাংবাদিক নেতা মঈনুদ্দীন নাসের বলেছেন, সাংবাদিকদের আগে সৎ হতে হবে। সাংবাদিকতায় সততা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আগে এই সততাকে মূল্যায়ন করতে দেখেছি। এখন কী দেখছি? উল্টো। জুলাই বিপ্লবের পর দেশে একজন সাংবাদিক সাংবাদিক গ্রেপ্তার হবার পর জানতে পারলাম তার ব্যাংক একাউন্টে ৪৪ কোটি টাকা আছে। একজন সাংবাদিক এতো টাকার মালিক কীভাবে হলেন? আমরা কোথায় আছি?
প্রভাষক শোয়েব আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, সাংবাদিকরা চাটুকার হয়ে গেলে সৎ সাংবাদিকতা আশা করা যায় না। তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, একটি দেশের অর্থনীতির উন্নতি না হলে এর প্রভাব মিডিয়াতেও পড়ে। সমাজের পরিবর্তন হয় না। তিনি বলেন, ৬৬ সালে সিংগাপুর স্বাধীন হয়ে অর্থনীতিতে কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি তলানীতে।
প্রবাস পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ সাঈদ বলেন, প্রবাসে আমরা বাংলা মিডিয়ার মাধ্যমে কমিউনিটি বিনির্মাণের কাজ করে যাচ্ছি। বাংলাদেশের সংবাদ প্রকাশ করে সেতুবন্ধনেরও কাজ করছি। এই প্রবাসেও মিডিয়া সংকটে ভুগছে। পাঠক কমে যাচ্ছে। পত্রিকার প্রকাশনাও কমে যাচ্ছে।
প্রথম আলো উত্তর আমেরিকার সম্পাদক ইব্রাহিম চৌধুরী বলেন,মিডিয়ার সংকট আছে—এ নিয়ে সন্দেহ নেই। এ সংকট সবসময়েই ছিল নানা অভিধায়।
এখন সংকটের জন্য এআইকে বা প্রযুক্তিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করালে আসল সমস্যাটা আড়ালেই থেকে যায়।
প্রযুক্তি বদলেছে। পাঠক বদলেছে। মানুষের খবর পড়ার, দেখার, শোনার অভ্যাস বদলেছে। মিডিয়ার ব্যবসায়িক মডেল বদলেছে। —মিডিয়ার সংজ্ঞাটাই বদলে গেছে।
জন্মভূমি পত্রিকার সম্পাদক রতন তালুকদার বলেন, মিডিয়ায় সমস্যা আগেও ছিল, আছে এবং থাকবে। আমাদের সতর্ক থাকা উচিত যেন মিডিয়ায় মিথ্যা তথ্য পরিবেশিত না হয়।
ছবি
































