মুক্তমত

অনু হোসেন শেষ পর্যন্ত চলেই গেলেন

সাইফুজ্জামান

অনু হোসেন প্রাবন্ধিক, গবেষক। গভীর অনুসন্ধান, তত্ত্বতালাশ ও বিস্তারে বর্ণনায় তার মতো পারঙ্গম মানুষ হাতেগোনা। হুট করে এই পৃথিবীর রৌদ্র ছায়া ছেড়ে ৩১ জানুয়ারি ২০১৯ তারিখ অনন্তলোকে প্রবেশ করলেন। স্নিগ্ধ ব্যক্তিত্ব, পুরোদস্তুর গোছানো ও হৃদয়কাড়া ব্যবহার আজও চোখে লেগে আছে, হৃদয়ে জমা রয়েছে।

অনু হোসেন ভোরের কাগজে সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সময় তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সাল, তারিখ মনে নেই। কবিতা, প্রবন্ধ তার কাছে পৌঁছুলে বানান শুদ্ধ করে ও বাক্য বিন্যাসে ভুলত্রুটি সম্পাদনা করে প্রকাশযোগ্য করে তুলতেন। বইমেলা এলে বইপত্তর ঘেঁটে খাঁটি বইটি সংগ্রহ করে নিজে পড়তেন, অন্যকে পড়ার পরামর্শ দিতেন। তিনি ছিলেন জহুরী মানুষ। তাঁর অনুরোধে অনেক ফরমায়েশী রচনা লিখেছি।

অনু হোসেন ১৯৬৫ সালের ১১ মার্চ মুন্সীগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন এবং এ বিভাগ থেকে ‘বাংলাদেশের কবিতায় লোকসংস্কৃতি (১৯৪৭-৯৬)’ বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দীর্ঘদিন দৈনিক ভোরের কাগজ, যুগান্তর এবং ডেসটিনি পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন।

২০১০ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে যোগদান করেন এবং মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত একাডেমির গবেষণা, সংকলন এবং অভিধান ও বিশ্বকোষ বিভাগে উপপরিচালক পদে কর্মরত ছিলেন।

তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশের কবিতা প্রসঙ্গে: ১৯৪৭-৯৬, শিল্পের চতুষ্কোণ, বাংলাদেশের কবিতা : লোকসংস্কৃতির নন্দনতত্ত্ব, বোধ ও বাতি, শিল্পের তরঙ্গ অন্তরঙ্গ, জীবনী: আবদুল মান্নান সৈয়দ।

তাঁর সম্পাদিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে: আবদুল মান্নান সৈয়দ রচনাবলি, উপন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর টুনটুনির গল্প, গল্পমালা, জ্যোতির্ময়: সৈয়দ আকরম হোসেন সংবর্ধনাগ্রন্থ, অভিবাদন শহীদ কাদরী, সংস্কৃতি সাধক সন্জীদা খাতুন (যৌথ), সমকালে রবীন্দ্রনাথ : সমকাল পত্রিকায় রবীন্দ্রচর্চা এবং Bangla Academy English-Bangla Dictionary: Revised & Enlarged Edition (যৌথ)।

অনু হোসেন ভোরের কাগজ থেকে যুগান্তর হয়ে বাংলা একাডেমিতে স্থির হয়েছিলেন। সম্ভবত শেষ কাজ ছিল গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের রচনাবলী সম্পাদনায় যুক্ত থাকা। নিভে যাচ্ছে যখন একে একে সব দেউটি তখন গবেষণায় নিজে জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠেছিলেন। শান্ত, সৌম্য ও পরিচ্ছন্নতা ছিল তাঁর চরিত্রের ভূষণ। ধীরস্থিরভাবে অনেকটা পথ তিনি হেঁটেছেন। সরকার আমিন, ওবায়েদ আকাশ, মুজিব ইরম, শোয়াইব জিবরান ও সাইমন জাকারিয়ার মতো প্রজ্ঞাবান মানুষের নাম তাঁর বন্ধু তালিকায় ছিল। হাস্যরস, কৌতুক ও গভীর জ্ঞানের আড্ডায় তিনি ছিলেন মধ্যমণি। পোশাক, ঘড়ি, সেলফোন ও কম্পিউটার দামি ব্র্যান্ডের ব্যবহার করতেন। আধুনিক প্রযুক্তিতে তাঁর আগ্রহ ছিল ঈর্ষণীয়। বিস্তর পড়তেন। লিখতেন কম। নির্জনতার শব্দ অনুভবে মগ্নতা তাঁর ছিল স্বভাবগত। জীবনানন্দ দাশের এই বাংলা ভালোবেসে পুড়েছেন। দগ্ধ হয়ে নিজেই নিজেকে অতিক্রম করেছেন। ব্যস্ত ছিলেন সম্পাদনা ও গবেষণায়।

দীর্ঘদিন ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন, ভারতে কেমো নিতে গিয়েছিলেন। আত্মপ্রত্যয়ী এই মানুষটি জীবনকে জয় করার অভিযানে ছিলেন অগ্রবর্তী। রবীন্দ্রনাথ ছিল তাঁর ধ্যান, জ্ঞান। রবীন্দ্রনাথের ওপর গবেষণামূলক রচনা নিয়ে সর্বশেষ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। মিরপুরের ডেল্টা ক্যান্সার হাসপাতালে যখন অপারেশন চলছিল তখন তিনি তাঁর রচিত বইটি দেখতে চেয়েছিলেন। জনকের আনন্দ নবজাতকের মুখ দেখায়। অপারেশনের পর অনু হোসেনের বন্ধুরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন অনু অসুখ জয় করে ফিরে আসবে, আবার লিখবে দুই হাতে। আস্তে ধীরে বিকল হয়ে যাচ্ছিল তার দেহের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের প্রয়োজনীয় অংশসমূহ। সবাইকে কাঁদিয়ে অনু চলে গেলেন। তাঁর এই চলে যাওয়া অপূরণীয় ক্ষতি। আজও বইমেলায় যাই। বাংলা একাডেমিতে ঢুকি, তাঁর মুখ ভেসে ওঠে। মনে হয় তিনি হেসে উঠবেন, কথা বলবেন।

গবেষণাক্ষেত্রে তাঁর গুরু ছিলেন সৈয়দ আকরম হোসেন। গুরুর পথ ধরে অনু হোসেন পাড়ি দিয়েছেন। ব্যক্তিগত ক্ষতি আমাদের হলো তাঁর এই চলে যাওয়ায়। বেশ কিছু সময় আমাদের থমকে থাকতে হবে। সাহিত্য, সংস্কৃতি ও শিল্পভাবনায় তিনি নতুন পথের দিশা দিয়েছিলেন।

প্রাচীন থেকে আধুনিক সাহিত্য, শিল্পকলার বহুদিক তাঁর গবেষণায় উঠে এসেছিল। বইমেলা চলছে। আসছে জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই স্বপ্নভঙ্গের যাত্রা পথে অনু হোসেন আলোকস্তম্ভ। তাঁকে বারবার মনে পড়ে। মনে হয় তিনি সজোরে হেসে নতুন বই পড়ার আনন্দ প্রকাশ করবেন।

কোনও কিছু পড়তে গিয়ে থমকে গেলে জিজ্ঞাসা করতাম অনু হোসেনকে। তিনি বিস্তারে জানাতেন। এই মানুষটি হারিয়ে গেলেন আমাদের সমাজ থেকে। হৃদয়ে থাকবেন অনু হোসেন। মৃত্যু এক অমোঘ বন্ধু তাঁকে আলিঙ্গন করেছে। তিনি যেখানে আছেন শান্তিতে থাকুন। বিদায় অনু হোসেন। আপনার চলে যাওয়ার পর আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ছন্দপতন হয়েছে; মন খারাপ করা কোনও বিকেলে আজও নিত্য আপনার রচিত গ্রন্থপাঠে উজ্জীবিত হই। অনু হোসেন গবেষণায় নিমগ্ন ছিলেন। তিনি নিজের ভেতরকার শুভ্রতা এই কলঙ্কিত সময়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। অন্যদের ভেতর আগুন দেখলে তিনি তা জ্বালিয়ে দিতেন। অনু হোসেনের অগ্রন্থিত রচনা গ্রন্থিত করা জরুরি।

একজন অনু হোসেনের সৃষ্টি গ্রন্থ আমাদের সম্পদ। এই সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি। অনু হোসেন তাঁর সারা জীবন ব্যয় করেছেন অন্যের সম্পদ রক্ষণাবেক্ষণে। স্ত্রী আফসানা ফেরদৌস, পুত্র পূর্ণ প্রমিত নিয়ে তার এক আনন্দ পরিবার ছিল, সে কথা আমাদের সবার জানা। দূর থেকে অনু সব দেখছেন। আমরা যেন তাঁর স্বজনদের খবর রাখি আর যেন পড়ি তার গ্রন্থ। তাতেই তিনি অনন্তলোক থেকে শান্তি পাবেন। বিদায় অনু হোসেন, ভালো থাকবেন অনু। আপনি ভালো থাকুন। হৃদয় উজাড় করা ভালোবাসা ও অশ্রু দিয়ে আপনাকে আমরা স্মরণ করব।

প্রিয় বইমেলা, অধ্যাপকবৃন্দ, সতীর্থরা সবাই আপনাকে খুঁজে ফিরবে। ঘুরতে গিয়ে মনে হয় আপনি হেসে বলবেন ‘সব ভালো তো?’ তিনি একসময় সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। চারদিকে তাঁর অনুরাগী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। খুব সহজে কিংবা অন্তরঙ্গ কাজযুক্ত থাকার কারণে তার বিশেষ পরিচিতি তৈরি হয়েছিল। তাঁর কাছ থেকে কাজ শিখেছে অনেকে। অনু হোসেন অনেককে জীবন চিনতে সাহায্য করেছেন। তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের এই সময়ে তাঁর মতো দিশারীর আজ বড় প্রয়োজন। অনু সবাইকে শূন্য করে দিয়ে চলে গেলেন অনন্তে।

অনু বিস্তর কাজ করেছেন। পরিকল্পনা ছিল আরও করার। তাঁর যোগ্য অনুসারীরা তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবেন এই-ই প্রত্যাশা। অনু হোসেন রুটিন মেনে কাজ করতেন। ঘুমোনো ও অন্যান্য প্রাত্যহিকতার বাইরে যার মাথায় ঘুরত নানা রকম পরিকল্পনা। চলে গেলেন তিনি অসময়ে। তার শূন্যস্থান পূর্ণ হওয়ার নয়। অনু হোসেন সদা জাগ্রত থাকবেন আমাদের স্মৃতিতে।

লেখক: লেখক ও গবেষক; উপকীপার, জাতীয় জাদুঘর।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension