নির্বাচিত কলাম

একুশ পৃথিবীর সব জাতির ভাষা চেতনার দিন

সেলিনা হোসেন

ইদানীং যে প্রশ্নটি প্রায়শই আলোচিত সমালোচিত তা হচ্ছে- বাংলা ভাষার যথেচ্ছ ও বিকৃত ব্যবহার। বাংলা ভাষাকে নানাভাবে লাঞ্ছিতকরণের ভেতরই যেন এক ধরনের তৃপ্তি। ইলেক্ট্রনিক গণমাধ্যম, এফএম রেডিওতে যে বাংলা ভাষার ব্যবহার তা সত্যি মর্মপীড়াদায়ক।
কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, এইসব নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আমরা সারা বছর কেন চুপচাপ থাকি, নীরব থাকি? শুধু ফেব্রুয়ারি মাস এলেই এইসব নিয়ে সরব হয়ে উঠি এবং শেষ পর্যন্ত যা ঘটার তাই ঘটে- একুশে ফেব্রুয়ারি চলে গেলেই আমরা সব বিস্মৃত হই! নীরব হয়ে যাই!!
একুশের চেতনা কি তাহলে মেকি, কৃত্রিম একটা আবেগ মাত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের কাছে? ‘একুশে’ কি আজ শুধু এক আনুষ্ঠানিকতারই নামান্তর? একুশের মাস তো আমাদের অর্জনের মাস। এই অর্জনকে সামনে রেখে আর বাকি এগারো মাস ধরে আমরা যে কাজগুলো করণীয় তা করি না কেন? না ব্যক্তির অবস্থানের জায়গা থেকে, না প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানের জায়গা থেকে।
দেশের অফিস-আদালতে, রাস্তা-ঘাটে, দোকানপাটে, যানবাহনে এমনকি বাসাবাড়িতে পর্যন্ত যে-সমস্ত নামফলক (সাইন বোর্ড) আমরা দেখি তার সিংহভাগই ইংরেজিতে। বাংলা ভাষায় যেসব নামফলক দেখা যায় সেগুলোতেও বানান ভুলের ছড়াছড়ি- এসবই আমাদের ভাষা ব্যবহারের দায়বদ্ধতার অভাবকেই নির্দেশ করে।
প্রতিদিনই আমরা এইসব নাম ফলকগুলো দেখি এবং লজ্জাও পাই কিন্তু তা সত্ত্বেও সচেতন হই না। শুধু ইংরেজি নয়, যে কোনও ভাষায়ই এগুলো লেখা যেতে পারে। লেখাটা দোষণীয়ও নয় কিন্তু আমরা যা করছি সেটা দোষণীয়।
যেমন আমরা প্রথমত, ইংরেজিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে মাতৃভাষাকে পরিত্যাগ করছি, ইংরেজির পাশাপাশি একই নামফলকে যদি বাংলা ব্যবহারও করা হয় তবে দেখা যায় সে বাংলাটা গৌন রূপে জায়গা পাচ্ছে। অর্থাৎ যেন না-পারতে তাকে স্থান দেয়া হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, আমরা যা করছি তা তো আরও দোষণীয় এ জন্য যে, সেই ইংরেজিটাও শুদ্ধ রূপে লিখছি না।
এতে করে কাকের ময়ূরপুচ্ছ ধারণের মত ব্যক্তি যেমন তার মান বাড়াতে গিয়ে মান খোয়াচ্ছেন; তেমনই জাতি হিসেবে আমাদের সম্মান খোয়াতে হচ্ছে বলে আমি মনে করি। অন্য ভাষার অশুদ্ধ ব্যবহারে, অন্য ভাষার অমর্যাদা করার কারণে সে ভাষার লোকদের কাছে আমরা ছোট হয়ে যাচ্ছি।
আমি শুনেছি, সিটি কর্পোরেশন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামফলকগুলো কত ফুট, কত ইঞ্চি, কত গজ হবে তার জন্য লাইসেন্স ফি-এর সঙ্গে একটা ফিও আদায় করে থাকে। এই নামফলকের আকার-আকৃতির জন্য ফি আদায়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা যদি নামফলক শুদ্ধকরণের জন্য একটা দায়িত্ব পালন করত তাহলে সেটা আমাদের এই লজ্জা থেকে উদ্ধার করতে পারত।
তারা একটা নিয়ম করতে পারে- যে কোনও দোকান বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামফলকটি কেমন হবে তার নমুনা নিয়ে, তাতে বাংলাকে প্রাধান্য দিয়ে, অন্য ভাষায় কি কি লেখা হবে তার বিস্তারিত নিয়ে সেগুলোর ভাষাগত শুদ্ধতা নিশ্চিত করে অনুমতি প্রদান করবে।
এ কাজের জন্য তারা নিজেরা একটি বিভাগ করতে পারে কিংবা এটি তারা বাংলা একাডেমিকে অনুরোধ করে করিয়ে নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমিও এ কাজে জনস্বার্থে সহযোগিতা প্রদানের প্রয়োজনে আলাদা একটি বিভাগ খুলে দায়িত্বশীলদের সুপারিশের ভিত্তিতে নির্ভুল নামফলকের অনুমতি বা অনুমোদন দিতে পারে।
এ রকম একটা উদ্যোগ নেয়া জরুরি। বিষয়টি নিয়ে আমি অনেক দিন ভেবেছি। কীভাবে এটি কার্যকর করা যায় এ রকম প্রশ্ন-জিজ্ঞাসা আমার মনে হয় অনেকের ভাবনাতেই আসে, কিন্তু ফেব্রুয়ারি মাস পেরুলেই আমরা এসব প্রসঙ্গ শিকেয় তুলে রাখি। বাকি এগারো মাস আমরা আর এসব নিয়ে ভাবাভাবির মধ্যে থাকি না। ফলে বছরের পর বছর পরিস্থিতি একই থাকে।
আমার মনে হয়, এ ব্যাপারে গণমাধ্যমগুলোরও দায়িত্ব নেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে এখন এই দায়িত্বটা যে, শুদ্ধ ভাষায় বলব এবং নির্ভুল লিখব- এটি নিয়ে সচেতনতা তৈরির কাজ- তাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাহলে এই বিকৃতি ও নৈরাজ্য কমবে। আমরা আর নিজেদেরকেও প্রশ্নবিদ্ধ করব না যে, আমরা আমাদের ভাষার এই দুর্দশাকে সামনে রেখে কেমন করে দিন কাটাচ্ছি!
ব্যক্তির নিজস্ব অবস্থান থেকেও কেউ যদি উদ্যোগী হন শুদ্ধ বলা শুদ্ধ লেখার চেতনায় তাহলেও হাজার হাজার মানুষের অংশগ্রহণে আমরা একটা বড় কাজ সম্পন্ন করতে সক্ষম হব- ভাষার জন্য, একুশের জন্য, দেশের জন্য।
আরেকটি বিষয় একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আর শুধুমাত্র বাঙালি জাতির গর্ব গৌরবের বিষয় নয়- একুশ আজ সারা পৃথিবীর সমস্ত জাতির ভাষা চেতনার দিন। এই গৌরবকে আমরা আরও গৌরবান্বিত করতে সক্ষম হব যদি আমরা আমাদের দেশের সবগুলো নৃ-গোষ্ঠির ভাষা ও সংস্কৃতিকে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে সংরক্ষণ ও সম্মান জানাতে পারি। বাংলাদেশের সবগুলো ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভাষা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে একুশের এই মাসব্যাপী আয়োজনের মধ্যে স্থান করে দিতে হবে। তাদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের মধ্য দিয়ে আমাদের ভাষাকে যেমন সমৃদ্ধ করতে হবে তেমন তাদেরকেও এগিয়ে আনতে হবে। এটা আমাদের দায়িত্ব- এটাও একুশের চেতনা। আর এই চেতনাতেই একুশের গৌরব।
লেখক: কথাসাহিত্যিক
Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension