
গণতন্ত্র ভোটের জন্য, ভাষার জন্য
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মাতৃভাষা মাতৃভূমির চেয়েও অধিক সত্য এবং জরুরি। কেননা, মাতৃভাষা সব সময় সঙ্গে থাকে, মাতৃভূমি যা থাকে না। ওই সঙ্গে থাকাটা মানিব্যাগ, পাসপোর্ট বা মোবাইল ফোনের মতো নয়, বরং নিজের চেহারার মতো; বদলালেও মৌলিকভাবে বদলায় না। মাতৃভাষাকে বলব কি অনুভূতির ব্যাপার? হ্যাঁ, বলা যাবে। কিন্তু সেই সঙ্গে যোগ করতে হবে এই কথাটাও যে, মাতৃভাষা আমাদের ঠিকানা, আশ্রয়, আত্মপরিচয় এবং গৌরব। ওই ভাষাতে গচ্ছিত রয়েছে ইতিহাস ও ঐতিহ্য। এ ভাষা একই সঙ্গে ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত; এখানে এসে ব্যক্তি মিলিত হয় অপরের সঙ্গে, পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি এক কাতারে এসে যায়, হাত ধরাধরি করে দাঁড়ায়। মাতৃভাষা থেকে যারা বঞ্চিত তারা সত্যি দুর্ভাগা। কেননা, তারা মাতৃস্নেহ থেকে বঞ্চিত। কিন্তু আমাদের মাতৃভাষা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মতোই কোণঠাসা। সেখানে প্রতিফলন ঘটেছে মায়ের মুখচ্ছবির। মলিন ও বিষণ্ণ। এই দুর্দশার প্রধান কারণ পরাধীনতা। দীর্ঘস্থায়ী পরাধীনতা একটি জাতিকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তার নিদর্শন বাঙালি জাতির ইতিহাসে বেশ উজ্জ্বল রূপেই প্রকাশিত। বিদেশি শাসকরা এসেছে, এসে দেশকে শোষণ করেছে। সেই শোষণের কুফল দেখা গেছে বৈষয়িক ও আদর্শিক উভয় ক্ষেত্রে। বৈষয়িকভাবে দেশের অর্থনীতি পঙ্গু হয়ে পড়েছে। এখন আমরা স্বাধীন হয়েছি বটে, কিন্তু সেই যে অভাব তৈরি হয়েছিল, তা থেকে মুক্তি পাই নি। আদর্শিক পীড়নটাও কম ছিল না। মেরুদণ্ড দুর্বল হয়েছে এবং একদিকে পরমুখাপেক্ষিতা, অন্যদিকে হীনম্মন্যতা দেখা দিয়েছে। এই যে অর্থনৈতিক ও আদর্শিক কারণে নত হয়ে পড়া, সেটাই ঐতিহাসিক কারণ আমাদের মলিনতা ও দুর্দশার। আমাদের মাতৃভাষার কোণঠাসা দশা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়; একটা ধারাবাহিক ব্যাপার বটে।
বিদেশি শোষকরা খালি হাতে আসে নি, সঙ্গে করে নিজেদের মাতৃভাষা নিয়ে এসেছিল। যেমনটা করার কথা, তা-ই তারা করেছে। নিজেদের ভাষাকে রাজভাষা করেছে। দখলদারিত্বের সেটাও একটা পদ্ধতি বটে। এই কাজে বিশেষ দক্ষতা দেখিয়েছে সর্বশেষ যে শাসক ছিল সেই ইংরেজরা। তারা বিস্তর অভিজ্ঞতা ও প্রচুর বুদ্ধি নিয়ে এসেছিল। দখলদারিত্বকে চিরস্থায়ী করার পরিকল্পনায় তারা আইন-আদালত, সেনাবাহিনী ও পুলিশ, ব্যবসা-বাণিজ্য, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসন- এ সবকিছু চাপিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে আপাতনিরীহ কিন্তু ভেতরে ভয়ঙ্কর যে আধিপত্যটি প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেটা ভাষার। ভাষার সাহায্যে মন-মানসিকতায় উপনিবেশ স্থাপন করেছে, যে ঔপনিবেশিকতা তাদের প্রকাশ্য প্রস্থানের পরও কায়েম রয়েছে। তাদের রাষ্ট্র ভাঙল, নতুন রাষ্ট্রকেও অর্থাৎ পাকিস্তানকেও ভাঙতে হলো, তারপর সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আমরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছি; এসব পতন-উত্থানে শাসক বদলেছে অবশ্যই, কিন্তু রাষ্ট্রের মূল চরিত্রে পরিবর্তন ঘটেছে; বলা যাবে না। আইন-কানুন, আমলাতন্ত্র, বিভিন্ন বাহিনীর কার্যকলাপ সবকিছুই চলছে ইংরেজের প্রতিষ্ঠিত সেই জনবিচ্ছিন্ন ও পীড়নমূলক ধারায়। রাষ্ট্রভাষা বদলেছে। এটা একটা বড় অর্জন। কিন্তু রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও রাষ্ট্রের ভাষা বাংলা হয় নি। সমাজেও সেই পুরনো ইংরেজি ভাষার যতটা মর্যাদা, বাংলার ততটা নয়। অন্য প্রমাণ দরকার হয় না, রাজধানীতে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের সঙ্গে মফস্বলের বাংলা মাধ্যমিক স্কুলের তুলনা করলেই হাঁড়ির খবর জানা হয়ে যায়। ভাষা তো কোনো যন্ত্র নয়, মন্ত্রও নয়। ভাষা হচ্ছে সংস্কৃতির জীবন্ত উপাদান। ভাষার ভেতর চিন্তা-চেতনা, ইতিহাস-ঐতিহ্য-দৃষ্টিভঙ্গি সবকিছুই গোপনে সংরক্ষিত থাকে।
রাষ্ট্র যে ধরনের প্রতিষ্ঠান, তাতে তাকে পিতাই বলতে হয়। পুরোপুরি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ব্যাপারটা ভিন্ন, কিন্তু তেমন রাষ্ট্র বাস্তবে পাওয়া খুবই কঠিন। সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে এক ধরনের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, বলা যায়। কেননা, গণতন্ত্রের যে মূল ভিত্তি মানুষে মানুষে অধিকার ও সুযোগের সাম্য, তা সেখানে স্বীকৃতি পেয়েছিল এবং নাগরিকদের মৌলিক মানবাধিকারও অর্জিত হয়েছিল। কিন্তু ওই বিশ্বেও আমলাতন্ত্র ছিল, যে আমলাতন্ত্রই মূল কারণ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের। রাষ্ট্রকে পিতা ভাবলে সমাজকে মাতা ভাবা যায়। সমাজ নাগরিকদের আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়। কিন্তু সমাজ তো স্বাধীন নয়। সে তো রাষ্ট্রের অধীনে থাকে। শাসিত অর্থাৎ শোষিত হয়। এবং রাষ্ট্র ও তার কর্তাদের যে আদর্শ তা চাপিয়ে দেওয়া হয় সমাজের ওপর। বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাস এর প্রমাণে আকীর্ণ। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি এখন কেবল ইংরেজি নয়, হিন্দিরও অধীনে বটে। বিদেশে যে বাঙালিরা রয়েছে, তারা বাঙালি পরিচয় নিয়ে গর্ব করবে- এমন উপাদান বাংলাদেশে পাচ্ছে না। আর পশ্চিমবঙ্গ তো একটা প্রদেশমাত্র। এদিকে বাংলাদেশে বাংলা যে ইংরেজির চাপে পিছু ক্রমে হটবে, এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইংরেজি ভাষা বাঙালিরা আগেও শিখেছে, সেই ব্রিটিশ আমলে খুব করে শিখতে চেয়েছে। কিন্তু তখন একটা সত্য সে জানত- সে পরাধীন। এখন সে নিজেকে স্বাধীন বলে মনে করে, ব্যাপারটাতে তার জন্য তাই কোনো গল্গানি নেই, বরং গৌরব রয়েছে। পুঁজিবাদ এখন বিশ্বায়নের মূর্তি ধারণ করছে। এই বিশ্বায়ন সমগ্র বিশ্বকে এক করে দেবে। অর্থাৎ কোনো বৈচিত্র্য রাখবে না। ইউনেস্কোর হিসাব বলছে, বিশ্বে পাঁচ হাজার ভাষা চালু ছিল। কমে এখন হয়েছে অর্ধেক এবং যেভাবে বিলুপ্ত হচ্ছে, সে ধারা অব্যাহত থাকলে এই শতাব্দীতে এই অর্ধেকের শতকরা ৯০ ভাগ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
মাতৃভাষার উপযোগিতার কথা কেউ অস্বীকার করে না। যোগাযোগ, ঐক্য, শিক্ষা- সর্বক্ষেত্রেই মাতৃভাষা সর্বোত্তম। মাতার স্নেহ এই ভাষাতেই পাওয়া সম্ভব। কোনো যোগাযোগই মাতৃভাষার মাধ্যমে যে যোগাযোগ, তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। মাতৃভাষা চলে যায় অনেক গভীরে, কথা বলে বহু মাত্রায়। মাতৃভাষার সাহায্যে পারস্পরিক আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে যে ঐক্য গড়ে তোলা সম্ভব, সেটা কর্তৃত্বকামী বহিরাগত ভাষার ভেতর দিয়ে কখনও সম্ভব নয়। আর সে শিক্ষা তো অবশ্যই খণ্ডিত শিক্ষা, যা মাতৃভাষাকে ব্যবহার করে না। সেই ১৯৪৭ সালে সৈয়দ মুজতবা আলী তার ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ প্রবন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- ‘পৃথিবীর কোন শিক্ষিত সভ্য দেশ মাতৃভাষা ছাড়া অন্য মাধ্যমে শিক্ষা নিচ্ছে? ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, চীন, জাপান, রুশ, মিসর, ইরাক, তুর্কী, ইরান এমন কোন দেশ আছে, যেখানকার লোক মাতৃভাষাকে অবমাননা করে আপন দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে?’ মাতৃভাষা হচ্ছে প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক। সব সন্তানকে সে সমান মনে করে, ধর্ম ও বর্ণ মানে না, ডিঙ্গিয়ে যেতে চায় শ্রেণিকে। বাংলা ভাষা ওই কাজগুলো করতে পারল না। এ দেশে বারবার মন্বন্তর দেখা দিয়েছে; আর সেসব ভয়ঙ্কর ঘটনায় পুরুষের তুলনায় নারী কম করে হলেও দ্বিগুণ কষ্ট সহ্য করেছে। পুরুষ পালিয়ে গেছে অন্যত্র, মেয়েরা যেতে পারে নি, মারা পড়েছে ভিটাবাড়িতে; সাহস করে যারা পথে বের হয়েছে তারা বাঘ-ভাল্লুকের চেয়েও ভয়ঙ্কর সব পুরুষের হাতে পড়ে যারপরনাই নিগৃহীত হয়েছে।
বাংলাদেশে এখনও অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষের সংখ্যা প্রচুর। যারা অক্ষর চেনে তারা বই পড়ে না। যারা উচ্চশিক্ষিত তারা বাংলা ভাষার চর্চায় আগ্রহী নয়। ওদিকে পিতৃতান্ত্রিকতার দরুন বাংলা ভাষার নিজের মধ্যেও কতগুলো বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে, যেগুলো মোটেই গৌরবজনক নয়। যেমন সংস্কৃতবাহুল্য। সেটা এক সময়ে প্রবল ছিল, এখন অত প্রবল না হলেও রয়েছে বৈকি। এবং ভাষাকে জনজীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করার ব্যাপারে ওই সংস্কৃতবাহুল্যের যে ভূমিকা ছিল তা বাংলা ভাষার প্রবহমানতাকে খর্ব করার ক্ষেত্রেও কার্যকর ছিল। অন্যপক্ষের পিতৃতান্ত্রিকরা আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে শোধ নিতে চেয়েছে; কেউ কেউ বলে বসেছে, বাংলা তাদের ভাষাই নয়। প্রকৃত সত্য হলো, বাংলা হচ্ছে জনগণের ভাষা, মায়ের ভাষা; দুই পক্ষের আক্রমণের মাঝখানে পড়ে সে বিব্রত হয়েছে। মুখের ভাষার কাছাকাছি যে থাকবে, সেটাও তার জন্য সহজ হয় নি। বিদ্যমান সংস্কৃতিতে যেহেতু সৃষ্টিশীলতার অভাব, তাই এ-ভাষায় আড়ম্বর বেশি, অর্থের তুলনায়। পিতারা যে শ্রেণি বিভাজন সৃষ্টি করেছেন তার প্রতিক্রিয়াতে সর্বনামে আপনি, তুমি, তুই এসেছে। সর্বনামের সঙ্গে ক্রিয়াতেও পরিবর্তন ঘটানো বাধ্যতামূলক হয়েছে।
বাংলা ব্যাকরণে স্ত্রী-পুরুষের যে ভেদহীনতা তাকে সাম্যবাদিতার নিদর্শন মনে হতে পারে। কিন্তু সে ধারণা ভ্রান্ত। কেননা, এটা আসলে পুরুষের একাধিপত্যের প্রমাণ। মেয়েদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব স্বীকারই করা হচ্ছে না; সামাজিক ব্যাকরণে মেয়েদের মর্যাদা না থাকলে ভাষার ব্যাকরণে তা আসবে কোথা থেকে। দেখা যাবে বাংলা অভিধানে ‘পতি’র ছড়াছড়ি; সভাপতি, দলপতি, নৃপতি, সমাজপতি- এসব নাম থেকে বোঝা যায়, ওইসব পদে মেয়েদের প্রবেশাধিকার ছিল না। ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে- বড় প্রশ্ন সেটাই। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছিল পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্র এবং কর্তৃত্বকামী নেতৃত্ব উভয়ের বিরুদ্ধে। ভাষার মধ্যে যে সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা ও সম্ভাবনা বিদ্যমান তাকেই বিকশিত করতে চেয়েছিল ওই আন্দোলন। পারে নি নিশ্চয়ই, থেমে গেছে এক জায়গায় এসে। যার পরিচয় দেখি আমরা যেমন নারীর অবরুদ্ধ দশায় এবং অর্থনীতির বন্ধ্যত্বে, তেমনি দেখি বাংলা ভাষার কোণঠাসা অবস্থায়। গণতন্ত্রের সংগ্রাম কেবল ভোটের জন্য নয়, ভাষার জন্যও। একুশে ফেব্রুয়ারি যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে, তার পেছনে পৃথিবীবাসীর বাংলা ভাষাপ্রীতি নেই অবশ্যই, কিন্তু মাতৃভাষাপ্রীতি যে রয়েছে- তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই। ওই প্রীতি সংকীর্ণতার ছবি নয়, আন্তর্জাতিকতার ছবি বটে। বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বায়ন এক নয়, আসলে পরস্পরবিরুদ্ধ; বিশ্বায়নকে প্রত্যাখ্যান না করলে আন্তর্জাতিকতা গড়ে উঠবে না- মনে নয়, অর্থনীতিতেও নয়।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্নেষক



