
হাবীবুল্লাহ সিরাজী
যে ভেলা তিন বছরের জন্য জলচুক্তিতে ভাসানো, তাকে নিয়ে তো হাওয়া-বদলের নানা মাত্রার কথা এসে যেতেই পারে! আর সে আসার প্রথম উন্মোচন চেতনায়। চেতনা বড় কঠিন বিষয়, অস্তিত্বের এক অম্ল-ক্ষার। যার মিলমিশ মেদ ও মাংসে। সারি পিঁপড়ের কালো পা থেকে অতি সূক্ষ্ম বাদামি চোখ পর্যন্ত যার ইজারাদারি। অবলোকনের এ–প্রান্তে বৃক্ষরাজিবেষ্টিত দালান-অট্টালিকায় ভাষা-সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্র-পরিসর। যার উৎসমূলে বিরাজমান বায়ান্নর অভিঘাত। আর অপর প্রান্তে দূর্বা-তরু নিয়ে বিস্তৃত স্মৃতি-ইতিহাসে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের বিজয়-স্তম্ভ। ভাষা ও ইতিহাস, বায়ান্ন ও একাত্তর—এই অটুট বন্ধনে ২০১৯ সালের আয়োজন, গ্রন্থমেলা। শুরুতে যে তিন বছরের উল্লেখ রয়েছে তা এক স্বপ্ন-কর্মকালের অস্থায়ী সীমা।
এবারের গ্রন্থমেলা আমার জন্য যেমন অবস্থানগত আবেগের, তেমনি আবার সম্পাদনের সর্বশর্ত পূরণের। আবেগ ও পূরণের বিষয়টি যৌথভাবে পোষ মানানো দুরূহ বিধায় অতিক্রমণের পথটি কোনোমতেই দৃষ্টির আড়ালে যেতে দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়।
মাসব্যাপী একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯-এর আয়োজন পূর্ণোদ্যমে চলছে। অবকাঠামো নির্মাণকাজের সমান্তরালে চলছে অনুষ্ঠান-পরিকল্পনা। যা ঘটে আসছে এবং যা হতে পারত তার সমন্বয়ে তৈরি করা পরিকল্পনায় চমক না থাকলেও আছে মেলাবিষয়ক কিছু ধনাত্মক উদ্যোগ। যথারীতি ফেব্রুয়ারির ১ তারিখে আনুষ্ঠানিকভাবে মেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ। অনুষ্ঠানের শ্রী ও গৌরববর্ধনে যুক্ত হবেন বাংলা ভাষার অন্যতম কবি ভারতবর্ষের শঙ্খ ঘোষ এবং মিসরের অনুবাদক-সাংবাদিক মোহসেন আল-আরিশি। নিত্যদিনের অনুষ্ঠানে রয়েছে আলোচনা, কবিতাপাঠ, আবৃত্তি ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
মেলার চলাচলের পরিসরে যেমন লাগবে স্বাচ্ছন্দ্যের হাওয়া, আবার তেমনি ক্লান্তি নিবারণে মিলবে ক্ষণিক বিশ্রামের উপকরণ। শৌচাগারের অস্বস্তি যাতে সামান্যতম হলেও লাঘব হয়, তার জন্য নেওয়া হয়েছে যথাযথ ব্যবস্থা। পানীয় জল ও কফির পাশাপাশি নানা ধরনের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে থাকবে সহনীয় মূল্যের রেস্তোরাঁ। নিরাপত্তা একটি অতীব জরুরি বিষয়, সঙ্গে আছে আগুন-পানির দাপট। সার্বিকভাবে দেখভালের দায়িত্ব পালনে অবহেলার ছাড় নেই।
আর বিষয় তো বই। এই বই এবং লেখককে নিয়ে থাকবে বিশেষ আয়োজন। সারকথা, লেখক-প্রকাশক-বই-ক্রেতা যাতে করে একই রেখার অংশ হয়ে এক মাসের জ্ঞানযজ্ঞে যার যার ভূমিকা পালন করতে পারে—সে প্রচেষ্টা জারি থাকবে।
দুই.
গ্রন্থমেলা। মিলনের এ তীর্থে শিশু-কিশোর থেকে বয়োবৃদ্ধ পর্যন্ত সবার অংশগ্রহণের মধ্যে আমিও একজন। এই ‘আমি’ যখন ‘আমরা’য় পরিণত হয়, তখন বল বাড়ে। ফল পায় নতুন গুণ। গুণগত সে মাত্রায় আমরা মিলিত করি ভাষার নানাবিধ রূপ। সাহিত্য যদি বন্ধু তো বিজ্ঞান জ্ঞাতি, ভূগোল পড়শি তো ইতিহাস সহচর। আর অঙ্কভাষা নিয়ে চলে শূন্যকে মহাশূন্য করার অনন্ত প্রকল্প। বই-ই কেবল পারে প্রকল্পের সে বলটিকে নির্দিষ্ট জালে ফেলতে।
যা দেখি, যা বুঝি তাতে কোনো ছল থাকা অপরাধ। ভেলার কথা বলেছি, বলেছি তার সঙ্গে জলের চুক্তির কথা। একজীবনের অস্থির যাত্রায় বড় কঠিন বর্তমান খুঁজে পাওয়া। অতীত এমন ঘাই মারে যে ভবিষ্যৎ অসহায়। সময়বিন্দুকে তাই চাই পরম মমতায়।
আমার গ্রন্থমেলা হোক পাঠের অন্তর্নিহিত স্থল, যার ফোঁটা বা চূর্ণ দেবে মুক্ত মণ্ডলের ঠিকানা। সম্মিলনের বার্তাগুলো জড়ো করে নির্মিত হবে আনন্দসিন্ধু। ‘আমি’ বারবার ফিরে যাবো ‘আমরা’য়।
বাংলা একাডেমি ও একুশের গ্রন্থমেলা তো আমাদের ভালোবাসারই নাম।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলা একাডেমি।



