মুক্তমত

নিরাপদ সড়ক চাই

মুবিন খান

 

এক.

দেয়াল ভরা খালি গালাগালি। ভদ্রলোকেদের ভাষায় যে এত চমৎকার চমৎকার গালাগালি তৈরি হইয়া আছে সেইটা আমার অবগতর তালিকায় ছিল না।

প্রধানমন্ত্রী স্কুলে পড়া আন্দোলনরত বাচ্চাদের ‘বোঝানোর’ দায়িত্ব ছাত্রলীগকে দিছিলেন। পুলিশরে দেন নাই। ছাত্রলীগের ছেলেরা স্কুল বালকদের মত অবাধ্য না। তারা কথাবার্তা শোনে। প্রধানমন্ত্রীর কথাও শুনছে।

ছেলেমেয়েরা অবাধ্য হইলে তাদের শাসন করতে হয়। দরকার পড়লে মাইর ধইরও করা লাগে। ইউরোপ আমেরিকায় বাচ্চাদের মাইর ধইর করা নিষেধ আছে। বাংলাদেশে নিষেধ নাই। উল্টা বাংলাদেশে বাচ্চাদের মাইরা ছাল তুইলা ফেলার চল আছে। আমি ছোটবেলায় দেখছি বাপ মায়েরা শিক্ষকের হাতে বাচ্চারে তুইলা দিয়া বলত, ‘এই বাচ্চা আপনার। লেখাপড়া না করলে আপনি মারবেন ধরবেন, যা ইচ্ছা করবেন, আমার কিছু বলার নাই।’

শিক্ষক তখন কুঁতকুঁতা চোখে লোল ফালাইতে ফালাইতে বাচ্চার দিকে এমনভাবে তাকাইত যে সেই বাচ্চার হার্টের রোগী হওয়ার নিশ্চয়তা তৈরি হইত। তার ওপর বড়রা বলতেন গুরুজনেরা শাসনের নাম কইরা শরীলের যেখানে যেখানে মাইর ধইর করবে, শরীলের সেইসব জায়গাগুলা নাকি বেহেশতে চইলা যাবে। আমরা টুকরা টাকরা হইয়া বেহেশতে যাইতে রাজি হইতাম না।

দেখা যাইতেছে এই অভিজ্ঞতা খালি আমাদের একলারই ছিল না। স্কুলের বালকদের ‘বোঝাতে থাকা’, শিক্ষা দিতে থাকা ছাত্রলীগের ছেলেদেরও ছিল। তারা স্কুল বালকদের শরীলের টুকরা টাকরা বেহেশতে পাঠাইতে রাজি না।

দুই.

জিয়াভাই সিলেট গেলেন মাজার জিয়ারত করতে। বাসে করেই গেলেন। ফিরছিলেনও বাসে করেই। নৈশকোচ। পথে আরেকটা বাস পেছন থেকে এসে অতিক্রম করতে চাইল। এই বাসের চালকের ইগোতে লাগল। সে পেছনের বাসটাকে তার বাসকে অতিক্রম করতে দিতে রাজি হল না। বাসের গতি বাড়িয়ে দিল।

দুটা বাস পাশাপাশি চলার মত যথেষ্ট প্রশস্ত নয় আমাদের হাইওয়ে গুলো। চলতে গেলে চাপাচাপি হয়। বাসের গায়ে গা লেগে যায়। কিছু দূর গিয়ে রাস্তা বাঁক নিতে শুরু করতেই জিয়া ভাইদের বাসটির চাকা রাস্তা থেকে সরে গেল। বাস নিয়ন্ত্রণ হারালো। গড়িয়ে পড়ল রাস্তার পাশের ঢালে। গতির কারণে ডিগবাজি খেতে খেতে এগুতে লাগল। কৌটায় মুড়ি মাখাতে যেভাবে ঝাঁকানো হয়, বাসটিও তার ভেতরের মানুষগুলোকে সেভাবে ঝাঁকাতে লাগল। তারপর আছড়ে পড়ল একটা ক্ষেতে।

জিয়া ভাইয়ের সঙ্গে থাকা ছেলেটা ভোর বেলাতেই বাসায় হাজির। আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম। আমার পাশে রায়হান। পাশের ঘরে দিপালী। দিপালীকে জড়িয়ে ঘুমিয়ে সাড়ে তিন বছরের রেজোয়ান।

আমাদের ঘুমের মধ্যেই জিয়া ভাই প্রাণ হারালেন।

আমাদের ঘুমের মাঝেই আমার বোনটা বিধবা হল।

আমরা ঘুমিয়ে থাকতে থাকতেই দুটা বাচ্চা তাদের পিতা হারালো।

আপনারা কেউ সদ্য বিধবা হয়ে যাওয়া বোন দেখেছেন?

আপনারা কেউ সদ্য পিতা হারানো শিশু দেখেছেন?

আমি দেখেছি।

মৃত্যু সংবাদ পেয়ে কিছুক্ষণেই বাড়ি ভরে উঠল স্বজন আর প্রতিবেশীতে। তারা সান্ত্বনা দেয়। তারা অদৃষ্টর কাঁধে দায় চাপায়। তারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মত বলে, ‘আল্লার মাল আল্লায় নিছে!’

ইস্! কি নিদারুণ কৌতুক!

কেউ বলে না, বাসের মালিক একটা অযোগ্য চালক নিয়োগ দিয়েছিল বলেই আমার বোনটা বিধবা হল। কেউ বলেনি, বাসের চালক দায়িত্ববোধহীন ছিল বলেই  দুটা বাচ্চা তাদের পিতা হারালো।

রেজোয়ান বারবার আমার কাছে তার বাবাকে দেখতে চাইছিল। আমি রেজোয়ানকে কোলে তুলে মসজিদের কাছে খাটিয়ায় শুইয়ে রাখা সাদা কাফনে ঢাকা জিয়াভাইয়ের কাছে নিয়ে গিয়েছিলাম। সাদা কাফন সরিয়ে জিয়াভাইয়ের মুখটা উন্মোচন করতেই রেজোয়ান আর্তনাদ করে উঠেছিল। কাঁদো কাঁদো আধো আধো বোলে আমাকে প্রশ্ন করেছিল, ‘আব্বুর চেহারা এমন কেন মুবিন মামা! আব্বুর কি হয়েছে!’

আমার কাছে রেজোয়ানের প্রশ্নটার কোন ব্যাখ্যা ছিল না। আমার কাছে কেবলই কলজে ফেটে যাওয়া কষ্ট ছিল। আমি রেজোয়ানকে কোলের মধ্যেই বুকের সঙ্গে খুব শক্ত করে চেপে ধরেছিলাম। রেজোয়ান আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার কাঁধে মুখ লুকিয়েছিল।

এই দৃশ্য মনে পড়লে আজও আমি সমান কষ্ট পাই। এই স্মৃতি আজও আমার বুকটা ভেঙে দেয়।

তিন.

‘নিরাপদ সড়ক চাই।’

খুব ছোট্ট একটা দাবি। এই দাবির শ্লোগানটা বলছে, আপনি যখন রাস্তায় চলাচল করবেন, ফুটপাতে হাঁটবেন, দাঁড়িয়ে থাকবেন, তখন কোন যান রাস্তা ছেড়ে আপনার ওপর উঠে পড়বে না। আপনাকে চাপা দেবে না। রাস্তায় চলাচল করা যানবাহনগুলো ফিটনেস নিয়ে রাস্তায় নামবে, যেন চালক তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে না ফেলে। এবং সর্বোপরি যিনি যান পরিচালক করবেন, তিনি যান চালানোর যোগ্য বলে বিবেচিত হওয়ার পরেই যান চালাবেন। রাস্তায় চলাচলের যে আইনগুলো আছে, সে আইনগুলো জানবেন এবং মেনে চলবেন।

কি সাধারণ একটা দাবি না! অথচ এই দাবি যুগ যুগ ধরে মানুষ জানিয়ে আসছেন রাষ্ট্রর কাছে। রাষ্ট্র পরিচালনাকারিরা কখনওই এই দাবি কান পেতে শোনে নি।

এবার স্কুলের বাচ্চারা যেভাবে এই দাবি নিয়ে রাজপথে নামল, পৃথিবীবাসী শুনল। সকলে আপ্লুত হল। আমিও হলাম। স্কুলের ছেলেমেয়েরা রাস্তায় রাস্তায় গাড়ির চালকদের লাইসেন্স চেক করে। সকলে দেখে। আমোদ পায়। হাসে। আমিও। বাচ্চারাই সেসব ঘটনা ভিডিও করে। আমরা যারা কাছে থেকে দেখতে পারি না, তারা দেখি। আমরাও আমোদ পাই। হাসি। সকলের মত আমরাও বাহবা দেই। কিন্তু পৃথিবীবাসী শুনলেও আমাদের রাষ্ট্র পরিচালকরা শুনল না।

কতগুলো স্কুলের বাচ্চা রাস্তা পেরুবে। জেব্রা ক্রসিং খালি নাই। তারা গাড়ির বনেটের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে রাস্তা পার হল। রাস্তার পথচারীরা, যাত্রীরা খুব হাসল। ‘সাবাশ সাবাশ’ বলে চিৎকার করল। আমিও দেখলাম। দেখে খুব আমোদ পেলাম।

এভাবেই প্রতিবাদ প্রতিরোধ আর আন্দোলন আনন্দ দিয়ে চলছিল। দেখা গেল, শুধু বাস চালক নয়, ব্যক্তিগত গাড়ি, সরকারি কর্মকর্তা, রাজনীতিক, মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ সদস্য, সেনা সদস্য এমনি আশি ভাগ লোকই ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি, মোটর বাইক চালাচ্ছে! এক সাংবাদিক পরিসংখ্যান বের করে জানালেন, ঢাকা শহরে ঊনিশ লাখ লোকের ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। আর গাড়ি চলছে পঁয়ত্রিশ লাখ। তাহলে বাকি ষোল লাখ যান কারা চালায়?

চার.

জাকির ভাই বাচ্চাদের এই আন্দোলনকে বললেন, “বিশ্ববাসী এতোদিন দেশে দেশে দেখেছে গণঅভ‌্যুত্থান। আর বাংলাদেশ বিশ্বাবাসীকে দেখালো শিশুঅভ‌্যুত্থান!!! শাবাশ বাংলাদেশ!!!”

কিন্তু আমাদের স্বার্থবাজ রাজনীতিকদের বাচ্চাদের এই জাগরণ সহ্য হল না।

তারপর সব কেমন জানি হয়ে গেল। বাচ্চাদের এই আন্দোলন আওয়ামী লীগের জন্যে একটা সুযোগ নিয়ে এসেছিল। আওয়ামী লীগ সে সুযোগ নিল না। অথবা নিতে ব্যর্থ হল। তারা বাচ্চাদের আন্দোলনটাকে নিজেদের আরও একটা ব্যর্থতা হিসাবে গণ্য করল। তারা আন্দোলন বন্ধ করতে চাইল। বাচ্চাদের ঘরে ফিরে যেতে বলল। বাচ্চাদেরকে যে দেশের অতিষ্ঠ হয়ে ওঠা সাধারণ মানুষ সমর্থন করছে, সেটা তারা দেখল না। ওইটুকু বাচ্চাদের বিএনপি জামাত বলতে লাগল!

বিএনপি বাচ্চাদের আন্দোলনে সংহতি জানালো। মানুষ বুঝল তারা বাচ্চাদের আন্দোলনের ক্রেডিট নিতে চায়। জামাত তো ওঁত পেতেই ছিল। তারা তাদের নখদন্ত বের করল। তারপর আমরা দেখলাম বাচ্চাদের ওপরে পুলিশের সঙ্গে কিছু লোক জানোয়ারের মত হামলে পড়ল। নির্দয়ভাবে পেটাতে লাগল। একটা হুলুস্থুল শুরু হয়ে গেল। ভুতের মত উল্টো পথে চলা রাজনীতিকরা তাদের স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হতে লাগল। ফেসবুকেও তারা ছড়িয়ে পড়ল।

পাঁচ.

শুরু হল নোংরামি। খবর ছড়িয়ে দেওয়া হল, দুজন ছাত্রর চোখ তুলে ফেলা হয়েছে, চারজন ছাত্রকে মেরে ফেলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চারজন ছাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়েছে, এমন খবরও ছাড়িয়ে দেওয়া হল। এই খবর সংবাদমাধ্যম নয়, ফেসবুকে ছড়ানো হল। নামীদামী লোকজন লাইভে এসে চিৎকার চেঁচামেচি করে সেসব বলতে লাগল। সত্য কি কেউ জানে না। মানুষ বিভ্রান্ত হতে লাগল।

আমার ইনবক্সেও এসব খবর আসতে লাগল। আমি দেখলাম, তারা নিজ নিজ রাজনৈতিক আদর্শর সঙ্গে যেটা যায়, সেটাই পাঠাচ্ছে। বিএনপি জামাতের আদর্শে যিনি বিশ্বাস করেন, তিনি আওয়ামী লীগকে দায়ি করা খবর দেখাতে চাইছেন। যিনি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করেন, তিনি দেখাতে চাইলেন বিএনপি জামাত সব ষড়যন্ত্র করছে।

আমি তাদেরকে নিষেধ করলাম আমাকে ওসব পাঠাতে। তারা শুনল না। আমাকে তাদের ইনবক্স ব্লক করতে হল।

কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজপথের আন্দোলনের অভিজ্ঞতা কোন কাজেই লাগল না। তারা স্কুলের বাচ্চাদের আন্দোলনের গুরুত্ব বুঝতে ব্যর্থ হল। শুধু তাই নয়, আওয়ামী লীগ গেল নয়টা বছর যে সরকার পরিচালনা করছে, সে অভিজ্ঞতাও তাদের কাজে লাগল না। তারা হঠকারি সিদ্ধান্ত নিল। ইন্টারনেটের ফোর জি, থ্রি জি গতি কমিয়ে টু জি করে দিল। আওয়ামী ছাত্র যুবকেরা পিটিয়ে আন্দোলন বন্ধ করতে চাইল। এই কাজ আমরা স্বৈরাচার এরশাদকে করতে দেখেছি। গণতান্ত্রিক সরকার কেন স্বৈরাচারের মত করবে!

সাধারণ মানুষকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসএমএস দিয়ে জানাতে লাগল, কারও চোখ তুলে ফেলা হয় নি, কেউ মারা যায় নি, কেউ ধর্ষিত হয় নি। এগুলো গুজব। গুজব যেন কেউ বিশ্বাস না করে।

আমরা গুজব বিশ্বাস করি নাই। কিন্তু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসএমএস করে কেন বলল না, যারা হেলমেট পরে লাঠিসোটা হাতে ছোট ছোট বাচ্চাদের পেটালো, তাদের ধরা হবে। তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে। বলল না, ছাত্রদের ভীড়ে অছাত্রদের ধরা হবে। বলল না, স্কুলের বাচ্চাগুলো যে দাবি নিয়ে রাস্তায় নেমেছিল, যা যা করে দেখিয়েছিল, সে কাজগুলো তাদের লজ্জা দিয়েছে। তারা পরিবহণ আইন উন্নত ও কার্যকর করবে।

কেন বলল না?

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension