
ফাঁদে পড়ার আরেক নাম ‘কালা পানি’
কালাপানি বা কালাপানি পার করা কথাগুলো আমাদের কাছে মোটামুটি পরিচিত। পাঠ্যবইয়ের ইতিহাসেই পাওয়া যায় কালাপানি পার হতে চাইত না বর্ণ হিন্দুরা। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের অন্যতম কারণ যে এটি ছিল তা অবশ্য বলা হয় না। তবে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বহু কর্মীকে নির্বাসন দেয়া হয়েছিল আন্দামানে, সেটি কম-বেশি সবারই জানা। মূলত সমুদ্র বা সমুদ্র পাড়ি দেয়াকে কালাপানি বলা হলেও আন্দামান জেলে নির্বাসনই একটা সময় ব্যবহারিকভাবে কালাপানি হিসেবে পরিচিতি পায়। সেখানে একবার যারা গেছে তাদের অনেকেই ফিরতে পারেনি। যারাও ফিরেছে, অসুস্থ হয়ে ফিরেছে। জীবনে তাদের আর কিছু ছিল না। আন্দামান এমন একটি জায়গা, যেখানে মানুষকে আটকে রাখা হতো। সে ধারণা ধরেই নির্মিত হয়েছে নতুন ওটিটি সিরিজ ‘কালা পানি’।
সিরিজের পটভূমি আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ ও সেখানকার সাধারণ মানুষ নিয়ে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা এখানে বিস্তারিতভাবে অবশ্য আসে না। দেখা যায় নির্দিষ্ট কিছু মানুষ আছে, যারা এ গল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। গল্পটিকে সহজেই যুক্ত করা যায় কভিড-১৯ মহামারীর সঙ্গে। ২০২০ সালে ছড়িয়ে পড়া মহামারীর আদলেই এ সিরিজে দেখানো হয় একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগকে। তবে ঘটনার সময়কাল ২০২৭ সাল। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে কোনো একটি কারণে কিছু মানুষ আক্রান্ত হয় ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশনে। সেখানকার ডাক্তার সৌদামিনি সিং পুরনো এক রোগের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পেলেও নতুন করে এর ছড়িয়ে পড়ার কারণ নির্দিষ্ট করতে পারেন না। সেটি খুঁজতে গিয়ে মারা যান তিনি এবং এরই মধ্যে মৃত্যু হতে শুরু করে মানুষের।
কভিড-১৯ অতিমারী দেখিয়েছিল মানুষের অন্ধকার রূপ। সে বিষয়টি এসেছে সামীর সাক্সেনা ও অমিত গোলানী পরিচালিত এ সিরিজে। এখানে মানুষের চরিত্রের দুটো দিক দেখানো হয়। একদিকে সৌদামিনি সিং, রিতু গাগরা ও শশী মহাজনের মতো মানুষেরা চায় বৃহত্তর পরিসরে আন্দামান নিকোবরের সাধারণ মানুষকে বাঁচাতে। অন্যদিকে এসিপি কেতন কামাতের মতো লোক চায় এর মধ্য দিয়েই নিজের মুনাফা বের করে নিতে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান অ্যাটম। তারা অবশ্য মুনাফার চিন্তা ততদিনে ছেড়েছে, কিন্তু তদন্তে একসময় বেরিয়ে আসে ব্যাকটেরিয়ার বিস্তারের পেছনে ছিল তাদেরই অসতর্ক আচরণ।
সিরিজটি কোনোভাবেই থ্রিলার নয়। ড্রামা বলা চলে। পাশাপাশি আছে পরিবেশ সচেতনতা ও স্থানীয় ইতিহাস, পুরাণ ও আদিবাসীদের কথা। সিরিজে এটিই ছিল কোনো না কোনোভাবে মূল বিষয়। সিরিজের শুরুতেই দেখা যায় আন্দামান নিকোবরের আদিবাসীদের। তারা সেখানকার পানির লাইন নষ্ট করে দেয়। শুরুতে মনে হয়েছিল সভ্য মানুষের প্রতি এটি তাদের শত্রুতা, কিন্তু শেষে বোঝা যায় আদিবাসীরা জানত পানি থেকেই ছড়াচ্ছে ব্যাকটেরিয়াটি। কালা পানি আমাদের এটিও দেখায় যে আদিবাসীরা তাদের এলাকার ‘ইকো সিস্টেম’কে জানার পাশাপাশি জানে কেমন করে স্থানীয় নানা সমস্যার সমাধান করতে হবে। বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা না জানলেও পরিবেশ থেকে তারা সংগ্রহ করে নিতে পারে প্রতিষেধক। কিন্তু আধুনিক মানুষ সে প্রাকৃতিক প্রতিষেধকই ধ্বংস করছে দিনের পর দিন।
সিরিজে অভিনয় করা পরিচিত মুখ মোনা সিং (সৌদামিনি সিং), চিন্ময় মান্ডেলকার (শশী মহাজন), অময় বাগ (কেতন কামাত) ও আশুতোষ গোয়রিকর (গভর্নর জিবরান কাদরী)। বহুদিন পর ক্যামেরার সামনে এলেন আশুতোষ। তবে এক এপিসোডেই অভিনয়ের সুযোগ পেয়েছেন মোনা সিং। অময় বাগকে অনেকেই ‘অসুর’ থেকে চেনেন, কিন্তু সিরিজে অতি অভিনয়ই করলেন তিনি। তবে সেসব পুষিয়ে দিয়েছেন চিরঞ্জীবী চরিত্রে সুকান্ত গোয়েল। সংলাপ, অভিব্যক্তি ও টাইমিংয়ে অসাধারণ কাজ করেছেন তিনি। এছাড়া সন্তোষ চরিত্রে বিকাশ কুমার ও জ্যোৎস্না চরিত্রে আরুশী শর্মা, রিতু চরিত্রে রাধিকা মেহরোত্রাও ভালো অভিনয় করেছেন।
সিরিজের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পরিবেশ ও মানুষের কথা বলার চেষ্টা করা হয়েছে। বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে বাস্তুসংস্থান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি কোনো অঞ্চলে ‘উন্নয়ন কর্মকাণ্ড’ শুরুর আগে সেখানকার ইতিহাস জানাটাও জরুরি। এদিক থেকে কালা পানি একটি শক্ত অবস্থানে আছে। তবে আট এপিসোড নিয়ে সিরিজটি প্রায় আট ঘণ্টা দৈর্ঘ্যের। সিরিজ হিসেবেও বেশিই লম্বা বলা যায়। কিছু জিনিস বাদ দিয়ে সময়টা কমানো যেত। অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘসূত্রতা দর্শককে বিরক্ত করে। তবে এর বাইরে মানবতা, সারভাইভাল থেকে শুরু করে শেষ দৃশ্যের সিনেমাটোগ্রাফি মিলিয়ে কালা পানি উপভোগ্য ও ধাক্কা দেয়ার মতো একটি সিরিজ। পাশাপাশি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ সিরিজ বুঝিয়ে দেয় জেল বা নির্বাসন নয়, ফাঁদে পড়ার নামই কালা পানি।



