
ভারতীয় গণতন্ত্রের এ কী হলো
বিজয় প্রসাদ
গত ১৮ ও ১৯ ডিসেম্বর ভারতের সংসদের দুটি কক্ষের ১৪১ সদস্যকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়। তাদের প্রত্যেকেই ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এবং তার নেতা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরোধিতাকারী দলগুলোর সদস্য। সরকার বলেছে যে এই নির্বাচিত সদস্যদের ‘উচ্ছৃঙ্খল আচরণের’ জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। বিজেপিবিরোধী দলগুলো এর আগে ‘ইন্ডিয়া’ জোট গঠন করেছে। তারা এ পদক্ষেপকে ‘গণতন্ত্র হত্যা’ বলে অভিহিত করে অভিযোগ তুলেছে, বিজেপি সরকার ভারতে ‘চরম স্বৈরাচার’ প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারতের নির্বাচিত বিরোধী শিবিরকে দুর্বল করার নানা প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় এ বহিষ্কারের ঘটনা ঘটে।
এরই মধ্যে ১৮ ডিসেম্বর জনপ্রিয় ভারতীয় সংবাদ পোর্টাল নিউজক্লিক ঘোষণা করেছে, ভারতের আয়কর (আইটি) বিভাগ ‘আমাদের অ্যাকাউন্টগুলো কার্যত ফ্রিজ করে রেখেছে।’ পোর্টালটি তার কর্মীদের বেতন দিতে পারছে না, যার মানে এই পোর্টাল এখন বন্ধ হওয়ার কাছাকাছি।
নিউজক্লিকের সম্পাদকদের অভিমত, আইটি বিভাগের এই পদক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে ‘প্রশাসনিক-আইনি অবরোধের একটি ধারাবাহিকতা’, যার শুরু ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট-ইডির অভিযানের মাধ্যমে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে আইটি বিভাগের তল্লাশির মাধ্যমে এটি আরও গভীর হয়। এ বছরের অক্টোবরে চলে বড় আকারের এক অভিযান, যার মাধ্যমে নিউজক্লিকের প্রতিষ্ঠাতা প্রবীর পুরকায়স্থ এবং এর প্রশাসনিক কর্মকর্তা অমিত চক্রবর্তীকে গ্রেপ্তার করা হয়। দু’জনেই এখন কারাগারে আছেন।
ভারতীয় গণতন্ত্রের অঙ্গ
গত বছর ফেব্রুয়ারিতে দি ইকোনমিস্ট লিখেছিল, ‘ভারতের গণতন্ত্রের অঙ্গগুলো ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।’ তারও দুই বছর আগে ভারতের নেতৃস্থানীয় অর্থনীতিবিদ এবং নোবেল বিজয়ী অমর্ত্য সেন বলেছিলেন, ‘গণতন্ত্র হলো আলোচনার মাধ্যমে সরকার পরিচালনা এবং আপনি যদি আলোচনাকে আতঙ্কের বস্তু করে তোলেন তাহলে আপনি গণতন্ত্র পাবেন না, আপনি এবার যেভাবেই ভোট গণনা করুন। এবং এটি এখন ব্যাপকভাবে সত্য। মানুষ এখন ভয় পাচ্ছে। আমি আগে কখনও এটা দেখিনি।’
ভারতের সবচেয়ে সম্মানিত সাংবাদিকদের একজন এন রাম (দ্য হিন্দুর সাবেক সম্পাদক) এ বছরের আগস্টে ভারতীয় গণতন্ত্রের এই ‘ক্ষয়’ এবং নিউজক্লিকের ওপর হামলার প্রেক্ষাপটে লিখেছেন, এ আক্রমণ “আমার দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নতুন এক সংকোচন নির্দেশ করে, যা নরেন্দ্র মোদির ‘নতুন ভারত’-এ এক দশক ধরে নিরবচ্ছিন্ন এক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে বিভ্রান্তিকর, ভয় দেখানো এবং অপমান করার রাষ্ট্র পরিচালিত এক ম্যাককার্থীয় প্রচারণা প্রত্যক্ষ করেছি।’ বিশ্বকে তিনি লিখেছেন, ‘আতঙ্কের সঙ্গে তা দেখতে হবে।’
পেগাসাসের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরকার সাংবাদিকদের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালাচ্ছে; এমনকি সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত যোগাযোগের বিষয়াদি ব্যবহার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। ভয় দেখানোর পাশাপাশি সাংবাদিকদের শারীরিকভাবেও আক্রমণ করা হচ্ছে (এ ক্ষেত্রে বিশেষ মনোযোগে আছে মুসলিম সাংবাদিকরা, জম্মু ও কাশ্মীর এবং ২০২১-২২ সালের কৃষক বিক্ষোভ নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকরা)। নিউজক্লিককে টার্গেট করাও মিডিয়ার ওপর সরকারের এই ব্যাপক হামলার অংশ ছিল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের ভূমিকা
২০২০ সালের এপ্রিলে নিউইয়র্ক টাইমস ভারতে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে একটি প্রতিবেদন ছাপায়। এর শিরোনামটিও ছিল বেশ শক্তিশালী: ‘মোদি জমানায় ভারতের সংবাদমাধ্যম অতটা মুক্ত নয়।’ সেখানে দেখানো হয় কীভাবে মোদি ওই বছর মার্চে বড় মিডিয়া হাউসগুলোর মালিকদের সঙ্গে দেখা করে ‘অনুপ্রেরণাদায়ক ও ইতিবাচক গল্প’ প্রকাশের কথা বলেছিলেন।
যখন ভারতীয় মিডিয়া কভিড-১৯ মহামারিতে সরকারের বিপর্যয়মূলক কর্মকাণ্ডের প্রতিবেদন প্রকাশ করতে শুরু করে তখন মোদি সরকার সুপ্রিম কোর্টে গিয়ে যুক্তি দেয় যে সব ভারতীয় মিডিয়াকে অবশ্যই ‘শুধু সরকারি ভাষ্যটিই প্রকাশ করতে হবে।’ আদালত সরকারের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলেও বলে যে মিডিয়াকে অবশ্যই অন্যান্য ব্যাখ্যার পাশাপাশি সরকারি ভাষ্যও প্রকাশ করতে হবে। আদালতের এ আদেশকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ আখ্যা দিয়ে দ্য অয়ারের সম্পাদক সিদ্ধার্থ ভারদারাজন তখন বলেন, এটিকে ‘মিডিয়ার বিষয়বস্তুর ওপর সেন্সরশিপের আগাম অনুমোদন’ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
এ ঘটনার কয়েক মাস পরই নিউজক্লিকের ওপর ভারত সরকারের ‘প্রশাসনিক-আইনি অবরোধ’ শুরু হয়; কারণ পোর্টালটি তখন শুধু কভিড মহামারি নয়, ভারতের সংবিধান রক্ষার ও কৃষক আন্দোলন নিয়েও পক্ষপাতহীন প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তবে বারবার তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের পরও ভারত সরকারের বিভিন্ন সংস্থা নিউজক্লিকের কার্যক্রমে বেআইনি কিছু খুঁজে পায়নি। আপত্তিকর বিদেশি তহবিল গ্রহণ সম্পর্কে অস্পষ্ট অভিযোগও ফাঁপা প্রমাণিত হয়, যখন নিউজক্লিক বলে যে ভারতীয় আইন মেনেই তারা ওই তহবিল নিয়েছে।
এদিকে নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে মামলাটি যখন হিমঘরে চলে গেছে বলে মনে হয়েছিল, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এ বছরের আগস্টে নিউজক্লিকে তহবিল সরবরাহকারী ফাউন্ডেশনগুলোর বিরুদ্ধে একটি বিশালাংশে অনুমানমূলক এবং অপমানজনক নিবন্ধ প্রকাশ করে। এটি প্রকাশের পরের দিনই ভারত সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা অপরাধের ‘প্রমাণ’ হিসেবে গল্পটিকে ব্যবহার করে নিউজক্লিকের বিরুদ্ধে তাণ্ডব চালায়।
নিউইয়র্ক টাইমসকে আগে সতর্ক করা হয়েছিল, এ ধরনের প্রতিবেদন ভারত সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা দমনে ব্যবহার করবে। বাস্তবেও দেখা গেল, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনটি নিউজক্লিককে শায়েস্তা ও বন্ধ করতে ভারত সরকারকে এক প্রকার বিশ্বাসযোগ্য উপাদান সরবরাহ করেছে, যা তারা এখন আইটি বিভাগ দিয়ে করে চলেছে।
উল্টাপাল্টা পৃথিবী
বহিষ্কৃত ওই ১৪১ জন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো, গত ১৩ ডিসেম্বর সংসদ ভবনের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনাকে তারা ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ওইদিন দুই ব্যক্তি প্রেস গ্যালারি থেকে হলের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং নির্বাচিত ব্যক্তিদের মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব ও মণিপুরে জাতিগত সহিংসতার মতো সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে ব্যর্থতার প্রতিবাদে ক্যানিস্টার থেকে ধোঁয়া ছাড়েন।
ওই ব্যক্তিরা বিজেপির সংসদ সদস্য প্রতাপ সিনহার কাছ থেকে সংসদে প্রবেশের পাস পেয়েছেন। অথচ তাঁকে সাসপেন্ড করা হয়নি। যারা সংসদে ধোঁয়া বোমা নিক্ষেপ করেছিল বা যারা এর পরিকল্পনা করেছিল, তাদের বিরোধীদের সঙ্গে যোগসূত্র তো দূর স্থান, কোনো রাজনৈতিক পটভূমি নেই। বিক্ষোভকারীদের একজন মনোরঞ্জন ডিকে ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানের চাকরি হারিয়ে পারিবারিক খামারে কাজ করতে ফিরে আসতে হয়েছিল; পারিবারিক আর্থিক সমস্যার কারণে স্কুল ছেড়ে সাগর শর্মাকে ট্যাক্সি চালাতে হচ্ছে। একটি এমএ, একটি এমএড এবং একটি এমফিল ডিগ্রি নিয়েও আজাদ কোনো চাকরি খুঁজে পাননি।
এরা মোদির ভারত নিয়ে হতাশাগ্রস্ত তরুণ। সাধারণ গণতান্ত্রিক পন্থায় নিজেদের কথা শোনাতে তারা চেষ্টা করেছিলেন কিন্তু সফল হয়নি। তাদের কাজে যে কোনো মূল্যে কিছু করার ছাপ স্পষ্ট, যা বৃহত্তর সামাজিক সংকটের লক্ষণ; সংসদ সদস্যদের বরখাস্ত করা এবং নিউজক্লিকের অর্থায়নের ওপর হামলাও সেই সংকটেরই লক্ষণ; তা হলো ভারতে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ।
লেখক: ভারতীয় ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক; এশিয়া টাইমস থেকে ভাষান্তর করেছেন সাইফুর রহমান তপন, দৈনিক সমকালের সৌজন্যে।



