
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাংস্কৃতিক জাগরণ জরুরি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। আমাদের অগ্রসর হওয়ার জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দরকার ছিল।
এ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে আমাদের বহু রকমের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। মধ্যবিত্ত একাংশের জন্য চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তারা বিদেশে গিয়ে কাজ করছে, নানারকম ব্যবসা বাণিজ্য করছে। শিক্ষার ক্ষেত্রেও বেশ অগ্রসর হচ্ছে, মেয়েরা লেখাপড়া শিখছে। কিন্তু সমাজে কোনও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে নি। অর্থাৎ সমাজের মূল কাঠামোতে কোনও পরিবর্তন হয় নি।
সশস্ত্র যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অনেক মৃত্যু, অনেক রক্ত, অনেক অশ্রুর বিনিময়ে আমরা রাষ্ট্র পরিবর্তন করেছি। এটা আমরা করেছি মুক্তির লক্ষ্যে সমাজকে বদালানোর জন্য। মুক্তির সঙ্গে সমাজের পরিবর্তন যুক্ত।
সমাজ পরিবর্তিত না হলে মানুষের মুক্তি আসবে না। আমরা চাই এই সমাজ পরিবতির্ত হোক। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন একটি সংগঠিত আন্দোলন। সেই আন্দোলনের সঙ্গে রাজনীতি থাকবে এবং এর সঙ্গে সংস্কৃতিক আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকবে।
সংস্কৃতি মানুষের বিজয় পতাকা; প্রকৃতি, পরিবেশ ও প্রবৃত্তির ওপর মানুষের জয়ের চিহ্ন। কিন্তু কেবল চিহ্ন বললে কিছুই বলা হয় না। কেননা সংস্কৃতি সব সময়েই অত্যন্ত জীবন্ত ও পরিব্যপ্ত। অনেকটা পানির মতো, সহজ কিন্তু শক্তিশালী, থাকলে বোঝা যায় না, না-থাকলে বোঝা যায়। তাই বলা যায় যে, সংস্কৃতি শিক্ষার চেয়েও ব্যাপ্ত ও জরুরি। সংস্কৃতির স্তর দেখে মানুষের স্তর জানা যায়। এও জানা আমাদের যে, মানুষের সংস্কৃতি আছে, পশুর নেই।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল হিংস্রতার এবং নারকীয় তৎপতার বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা। স্বাধীনতার মাধ্যমে একটি সামাজিক পরিবর্তন এবং সাংস্কৃতিক জগরণ চেয়েছিলাম। কিন্তু সেই কাজটা আমরা আজও করতে পারি নি। সংস্কৃতিক আন্দোলনকে আমরা এতকাল উপেক্ষা করেছি। অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সাংস্কৃতিক জাগরণ জরুরি।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের গ্রামে গ্রামে গ্রন্থাগার গড়ে তুলতে হবে। নাটক, গান, আলোচনা, পত্রিকা, দেওয়াল পত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে, মানুষ সংঘবদ্ধ হবে এবং প্রতিরোধও গড়ে তুলতে পারবে। অর্থাৎ মানুষকে সামাজিক করার জন্য সংস্কৃতিক আন্দোলন প্রয়োজন।
রাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে সমাজ বদলানো যাবে না। সমাজকে বদলাতে হলে রাষ্ট্রকেও বদলাতে হবে। এ ক্ষেত্রে একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। যেখানে মানুষের সঙ্গে মানুষের বৈষম্য কমবে এবং মানুষের অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী হবে, স্থানীয় সরকার স্বাধীনভাবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা পরিচালিত হবে, তারাই নিজেদের উন্নয়নে পরিকল্পনা ও অর্থসংগ্রহ করবে। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে মাতৃভাষার চর্চা হবে এবং তার মধ্যে আন্তর্জাতিকতাও থাকবে। এই মাতৃভাষার চর্চা আমাদের সংকীর্ণ করবে না। এর মাধ্যমে আমরা আন্তর্জাতিকতাকে ধারণ করবো, সারা বিশ্বে যত অর্জন আছে, যত গৌরব আছে, যত কৃতিত্ব আছে সবগুলোর অংশীদার হবো। কিন্তু বিশ্বায়ন যাকে বলে তার অধীনে আমরা চলে যাব না।
অনুলিখন: জাকির হোসেন



