প্রধান খবরবাংলাদেশমুক্তিযুদ্ধ

রাজনৈতিক দ্বিধাবিভক্তির কারণেই কুখ্যাত রাজাকারদের জন্যেও শোক

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একদিন পারেরহাট বন্দরের গৌরাঙ্গ সাহার বাড়িতে হামলা চালায় দশ-বারো জনের একটা সশস্ত্র রাজাকার দল। তারা গৌরাঙ্গ সাহার বাড়ি থেকে তার তিন বোনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। নিয়ে গিয়ে তুলে দেয় পাকিস্তান আর্মির হাতে। এই দলের নেতা ছিলো দেইল্লা রাজাকার।

এই দেইল্লা রাজাকার দেশ স্বাধীন হবার পরে সুফি রূপ ধারণ করে। নিজের নাম কিছুটা পরিবর্তন করে আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বনে যায়।

শুধু গৌরাঙ্গ সাহাই এমন ভয়াবহ বিপদে পড়েনি। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর নেতৃত্বে রাজাকারদের এক বিশাল বাহিনী হোগলাবুনিয়ার হিন্দু পাড়া আক্রমণ করে। তাদের আক্রমণের সংবাদে হিন্দুরা যে যেদিকে পারে পালিয়ে গিয়েছিলো। মধুসূদন ঘরামি আর শেফালি ঘরামির দুর্ভাগ্য। তারা পালাতে পারেনি। রাজাকার বাহিনীর কিছু সদস্য শেফালি ঘরামিকে ধর্ষণ করে।

উপরে যে দু’টো ঘটনা বললাম, এই রকম অসংখ্য ঘটনা রাজাকার দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ঘটিয়েছে। হিন্দুদের বাড়িতে আগুন দেওয়া, বাড়ি-ঘর, দোকান-পাট লুট করা, হিন্দু মেয়েদের ধর্ষণ করা, তাদের পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া, খুন করা, হিন্দুদের ধর্মান্তরিত করা, হেন কোনো অপরাধ নেই যা এই রাজাকাররা এবং তাদের নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী করে নাই।

দেশ স্বাধীন হবার পরেই এই সব কুলাঙ্গার রাজাকার-আলবদরদের বিচার হওয়া উচিত ছিলো। দুর্ভাগ্য আমাদের যে এই কাজটা করা হয়নি। করা হয়নি বলেই এইসব রাজাকাররা দ্রুত তাদের বেশ পরিবর্তন করে ফেলেছিল। কেউ আল্লামা হয়েছে, কেউ মওলানা সেজেছে, কেউ অন্য রূপ ধরেছে, কেউ বা মুক্তিযোদ্ধার সনদই নিয়ে ফেলেছে।

অন্য দেশে হলে হয়তো সম্ভব হতো না। রঙ্গ ভরা বঙ্গ দেশে বলেই সম্ভব হয়েছে। এর প্রধান কারণ দু’টো। এক: আমাদের স্মৃতিশক্তি গোল্ডফিশের মতো। দুই: আমরা রাজনৈতিকভাবে প্রচণ্ড রকমের দ্বিধাবিভক্ত।

এই দ্বিধা-বিভক্তি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসেও প্রভাব ফেলেছে প্রবলভাবে। যে কারণে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো একজন কুখ্যাত রাজাকারের জন্যেও শোক স্ট্যাটাস দিচ্ছে মানুষ।

দেইল্লা রাজাকার ওরফে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী পিরোজপুর জেলার তৎকালীন ইন্দুরকানীর (বর্তমানে জিয়ানগর উপজেলা) সাউথখালী গ্রামে ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মরহুম ইউসুফ আলী শিকদার। তার প্রকৃত নাম দেলোয়ার হোসেন শিকদার। তাকে ‘দেইল্লা’ নামে সকলে চিনতেন। আসুন দেখে নেয়া যাক ১৯৭১-এ তার যত কুকীর্তি-

১. একাত্তরের ৪ মে মধ্যম মাছিমপুর বাসস্ট্যান্ডের পেছনে জমায়েত হওয়া ২০ জন নিরীহ বাঙালিকে গুলি করে হত্যা।

২. একইদিন মাছিমপুর হিন্দুপাড়ায় আক্রমণ চালিয়ে বিজয় কৃষ্ণ মিস্ত্রী, উপেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, সুরেন্দ্রনাথ মিস্ত্রী, মতিলাল মিস্ত্রী, যজ্ঞেশ্বর মন্ডল, সুরেন মন্ডলসহ ১৩ ব্যক্তিকে গুলি করে হত্যা।

৩. একইদিন ধোপাবাড়িরে সামনে দেবেন্দ্রনাথ মন্ডল, খগেন্দ্রনাথ, পুলিন বিহারী, মুকুন্দ বালাকে হত্যা।

৪. ৫ মে পিরোজপুরের এসডিপিও ফয়জুর রহমান আহমেদ, এসডিও মো. আব্দুর রাজ্জাক, ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট সাঈফ মিজানুর রহমানসহ কয়েকজনকে লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি চালিয়ে হত্যা।

৫. ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে আন্ধাকুল গ্রামের বিমল হাওলাদারের ভাই ও বাবাকে ধরে কুড়িয়ানা হাইস্কুল ক্যাম্পে নিয়ে তাদেরসহ ২৫০০/৩০০০ নিরীহ বাঙালিকে কুড়িয়ানা পেয়ারা বাগানে নিয়ে হত্যা।

৬. ২৫ মে থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময়ের যে কোনো এক দিন হোগলাবুনিয়া গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে তরণী সিকদার ও তার ছেলে নির্মল সিকদার, শ্যামকান্ত সিকদার, বানীকান্ত সিকদার, হরলাল কর্মকার, মাইঠভাঙ্গারের প্রকাশ সিকদারসহ ১০ জনকে গুলি চালিয়ে হত্যার পর নদীতে লাশ ফেলে দেওয়া।

৭. ৪ মে হতে ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে পাড়েরহাটে আক্রমণ করে হরলাল মালাকার, অরকুমার মির্জা, তরণীকান্ত সিকদার, নন্দকুমার সিকদারসহ ১৪ হিন্দুকে রশিতে বেঁধে পাকিস্তানি সেনাছাউনীতে নিয়ে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া।

প্রসঙ্গত, যুদ্ধাপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। আপিলে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়৷ পরে সাঈদীর খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন দায়ের করেন তার আইনজীবী৷ তারপর রাষ্ট্রপক্ষ তার শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করে৷ আর রিভিউয়ের রায়ে সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড নয়, আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়া হয়।

Show More

Related Articles

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button

Adblock Detected

Please, Deactivate The Adblock Extension